

হয়তো-বা অজান্তেই মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট থেকেছেন বলে তিনি তাঁর দেশ-কাল-পরিবেশ-মানুষের অনবদ্য মূল্যায়নকে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন অর্ন্তলীন প্রতিবাদের সঙ্গে। কোনও উচ্চস্বরে, জোরালো, মুষ্টিবদ্ধ প্রতিবাদ নয়, পক্ষান্তরে সচেতন, যুক্তিনির্ভর, বুদ্ধিদীপ্ত, বিরোধী মতপ্রকাশ বা বৃত্তান্ত– যার অভিঘাত আপনাকে ভিন্ন খাতে ভাবতে বাধ্য করবে। সেই তরুণ বয়স থেকেই এই প্রতিবাদী প্রবণতা তাঁকে উদ্দীপিত করেছিল।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭, মৃত্যুদিবস ১৩ আগস্ট, ২০২৬। চিরবিদায়ের পর তাঁকে ঘিরে অগণিত গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রী, অধীনস্থ গবেষক, সহকর্মী-সহযোগী, এমনকী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও সদস্যরা যে সুগভীর শোকপ্রকাশ করেছিলেন; এবং যে প্রগাঢ় ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বর্ষিত হয়েছিল– তা দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। শীর্ণ, খর্বাকৃতি, মৃদুভাষী, প্রচারবিমুখ এই অসামান্য ইতিহাসবিদ কোন জাদুমন্ত্র আয়ত্ত করেছিলেন? আমি বারবার নিজেকেই এই প্রশ্ন করেছি: অন্য দুই অমূল্য স্তম্ভ ইরফান হাবিব ও রোমিলা থাপার ৯০ অতিক্রম করেছেন, তাঁদেরও প্রস্থানের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে। তাঁরা কি ঠিক এই পরিমাণ তন্ময় ও মুখর স্বীকৃতি পাবেন? জানি না। তবে এটা জানি, এঁরা দু’জন চলে গেলে ভারতের ইতিহাস সাধনার ক্ষেত্রে যে তীব্র অভাবের সৃষ্টি হবে, তা পূরণ করা প্রায় দুঃসাধ্য।
এ-প্রসঙ্গে শুধু একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সুখ্যাত সাংবাদিক রাভিস কুমার সুমিত সরকারকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য তাঁর ইউটিউবে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, সেই অনুষ্ঠানে শ্রোতৃসংখ্যা ছিল তিন লক্ষ ষাট হাজার! না, আমি এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না।

আমার বিষয় সাহিত্য ও সাহিত্যতত্ত্ব, ইতিহাস নয়। যদিও সাহিত্যপাঠ শুরু করার পর্বে আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল– সাহিত্যের সঙ্গে তাল রেখে ইতিহাস পড়তে হবে, অর্থাৎ শুধু শেক্সপিয়রের নাটক পড়লে চলবে না, এলিজাবেথীয় যুগকে জানতে হবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। সেই আর্ন্তবিষয়ী অধ্যবসায়কে স্মরণে রেখেই আমি সুমিতদার অনন্য অবদানের বৈশিষ্ট্য অতীব নম্রতার সঙ্গে উপস্থাপন করছি।
আমার মনে হয়েছে, হয়তো-বা অজান্তেই মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট থেকেছেন বলে তিনি তাঁর দেশ-কাল-পরিবেশ-মানুষের অনবদ্য মূল্যায়নকে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন অর্ন্তলীন প্রতিবাদের সঙ্গে। কোনও উচ্চস্বরে, জোরালো, মুষ্টিবদ্ধ প্রতিবাদ নয়, পক্ষান্তরে সচেতন, যুক্তিনির্ভর, বুদ্ধিদীপ্ত, বিরোধী মতপ্রকাশ বা বৃত্তান্ত– যার অভিঘাত আপনাকে ভিন্ন খাতে ভাবতে বাধ্য করবে। সেই তরুণ বয়স থেকেই এই প্রতিবাদী প্রবণতা তাঁকে উদ্দীপিত করেছিল।

প্রথম দৃষ্টান্ত। বটবৃক্ষসম পিতা প্রণম্য সুশোভন সরকার লিখেছিলেন ‘অমিত সেন’ ছদ্মনামে ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ নামে একটি পুস্তিকা। সেটি পড়ে অতীতে হইহই পড়ে গিয়েছিল– উনি যা লিখেছেন, তা-ই ধ্রুবসত্য।
কিন্তু সুশোভনবাবু বিরাট ভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন। আদ্যন্ত সৎ এই মানুষটি তাঁর ভ্রান্তি স্বীকারও করেছিলেন মুক্তকণ্ঠে। কিন্তু পিতার সংশোধনের আগেই ‘দুর্বিনীত’ পুত্র, পিতার মূল্যায়নের সমালোচনা করে বসে। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির তোতাপাখি কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘এ কী দূরাচার! পুত্র এভাবে পিতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে কীভাবে?’ আর প্রাজ্ঞ সুশোভনবাবু সুমিতদার প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘ও ঠিক করেছে। ভিন্ন মতের অবকাশ অবশ্যই রয়েছে। একাধিক ভিন্নমতাবলম্বী হাতে হাত ধরে সমাজবাদের চূড়ান্ত সিদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।’

তাঁর প্রথম আলোরণ-সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘Swadeshi Movement in Bengal 1903-1918’ (১৯৭৩) ইতিহাস রচনার ধরনটাই পালটিয়ে দেয়। তিনি প্রথম সেই চরম জটিল এবং বিক্ষত পর্বের চিত্র আঁকতে গিয়ে উচ্চবর্ণ, উচ্চশ্রেণি, অর্থসর্বস্ব, শক্তিমত্ত সম্প্রদায়কে অতিক্রম করে পৌঁছে গেলেন নিম্নবর্গের অত্যাচার, সাধারণ মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত দরিদ্র কৃষক, সংখ্যালঘু কোণঠাসা মানুষের সুখ-দুঃখ-স্বপ্ন-বেদনায়। এবং তা মূর্তায়িত হয়ে উঠল তাঁর ইতিহাসে। নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, ভারতে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই বইটি প্রথম ‘subaltern text’। রণজিৎ গুহর নেতৃত্বে সাতের দশকের মাঝামাঝি যে বহুবিজ্ঞাপিত ‘subaltern movement’ শুরু হয়েছিল, তার আগেই এই বইটি প্রকাশিত হয়। অবশ্য প্রস্তুতি চলেছিল অনেক আগে থেকেই। সুমিতদার স্বভাব ছিল ভীষণ খুঁতখুঁতে। এই বইটি সম্পর্কে তাঁর মনে অনেক প্রশ্ন জমতে থাকে, যদিও স্বনামধন্য নীহাররঞ্জন রায় বলেছিলেন, ‘এই বইটির পরে, সুমিত যদি আর একটিও বই না লিখত, সে অগ্রণী ইতিহাসবিদের সম্মান পেত।’ আমি এই বইটিকে সেই গবেষণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখি, যাকে অমর্ত্য সেন বলেছেন ‘Combative history’, এই গবেষণাগ্রন্থ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ একসঙ্গে পড়া এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

এর পরের পর্বে, ১৯৭৬-’৭৭ সালে, নিম্নবর্গ ইতিহাস রচনার শুরু, রণজিৎ গুহর সঙ্গে সাসেক্সে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি এই গোষ্ঠীর কাছাকাছি আসেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অভিজাতদের ইতিহাস-রচনার সমূহ বিকল্প চাই। কিন্তু মোহভঙ্গ হল কয়েক বছর পরেই। নয়ের দশকের সূচনায় লেখা তাঁর সুতীক্ষ্ণ নিবন্ধ ‘The Decline of the Subaltern Studies in India’ (‘Writing Social History’ গ্রন্থে অন্তভুর্ক্ত, ১৯৯৭) চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কীভাবে নিম্নবর্গের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ইতিহাসবিদরা তাঁদের মাটি-জল-হাওয়া-আকাশ থেকে সরে গিয়ে পাশ্চাত্যের উত্তর আধুনিকতার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। ইউরোপের ‘Enlightenment Rationalism’ বা আলোকময় যৌক্তিকতাকে প্রত্যাখান করে তাঁরা জোর দিচ্ছেন নিছক ‘Cultural Studies’ বা সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের ওপর– যার সঙ্গে তৃণমূল বা শোষিত নিম্নবর্গের যোগ নেহাতই অত্যল্প। আরও সহজ করে বললে, তাঁদের মন্ত্রগুরু হয়েছেন কার্ল মার্কস-আন্তোনিও গ্রামশি এবং এডওয়ার্ড টমসনের পরিবর্তে মিশেল ফুকো, এডওয়ার্ড সইদ এমনকী জঁস-ফ্রাঁসোয়া লিওতার্দ। শেষোক্ত তিনজন অবশ্যই বর্জনীয় নন, তাঁদের স্বকীয় মূল্য প্রশ্নাতীত; কিন্তু তাঁরা প্রথমোক্ত তিনজনকে কেন আবৃত করে রাখবেন! অতএব, আবার প্রতিবাদ।

কিন্তু এসবই যেন মহড়া মনে হয়, যখন প্রতিবাদী সুমিত সরকার সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান হিন্দুত্ববাদ প্রণীত ইতিহাসকে। ইরফান হাবিব থেকে শুরু করে তনিকা সরকার (সুমিতদার স্ত্রী এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু)– অনেকেই হিন্দুত্বের ইতিহাসকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছেন যুক্তি আর দৃষ্টান্ত পরিবেশন করে। কিন্তু যখন ‘Beyond Nationalist Frames’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত (২০০২) তাঁর লেখা ‘Hinduism and History’ নিবন্ধটি পড়ি, তখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়– ‘Myth-making’ বা পুরাণনির্মাণ এবং ইতিহাসের ভিতর দুস্তর পার্থক্য।

হিন্দুত্বের সর্বাধিক ভ্রান্তি হল যে, সে হিন্দুধর্মের মরমিয়া নির্মাণ, স্বাভাবিক ঔদার্য এবং অন্তর্লীন মানবতাকে হটিয়ে দিয়ে তার স্থানে বসিয়েছে একরঙা-মোহান্ধ সংকীর্ণ ধর্মীয়তা– যার ভিত্তি পরধর্মের প্রতি বিদ্বেষ এবং ঘোরতর অসহিষ্ণুতা। এদের প্রত্যাঘাত করার জন্য মার্কসীয় সুমিত সরকার বেছে নিলেন পরমভক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসকে। একেই বলে বাজিমাত! সুমিত সরকার আমাদের এই প্রমত্তপর্বে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এই সাধকটি গির্জার ভিতরে ঢুকে যিশুর বন্দনা করতেন, মসজিদে ঢুকে খোদাকে আহ্বান করতেন, কারণ তাঁর কাছে এঁরা প্রত্যেকে এক– তাঁর ভাষায় ‘যত মত তত পথ’। আমি এতদিন রামকৃষ্ণের সম্পর্কে যত নিবন্ধ পড়েছি, সেগুলির ভিতর সর্বোৎকৃষ্টটি লিখেছেন সুমিত সরকার– ‘Kalijuga, Chakri and Bhakti: Ramakrishna and His times’ (‘Writing Social History’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত, ১৯৯৭)।

দীর্ঘকাল ধরে এই ক্ষুদ্র মানুষটির সঙ্গে প্রবল পরাক্রান্ত হিন্দুত্বের সংঘাত চলেছে। চোখরাঙানি, শাসানি কোনও কিছুই বাদ পড়েনি, কিন্তু তিনি অবিচল থেকে গিয়েছেন। এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে যে, এই ‘আত্মীয়তা’র (?) পর, ২০০০ সালে, তৎকালীন সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রী মুরলীমনোহর যোশি, সুমিত সরকার সম্পাদিত, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিকাল রিসার্চের অর্থানুকুল্যে প্রকাশিত ‘Towards Freedom’ পরম্পরার ষষ্ঠ খণ্ডটির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন। সম্পাদক নিজে কিন্তু কিছু লেখেননি। তিনি শুধু সুসংবদ্ধভাবে, ঈর্ষণীয় মুনশিয়ানার সঙ্গে একটির পর একটি নথি সাজিয়েছেন– যেগুলি একত্রিত আকারে ক্ষুব্ধ চারের দশকের সংঘ পরিবারের প্রকৃত ভূমিকা উন্মোচন করে।
ভূমিকাটি কী? সংঘ পরিবার স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনও অংশ নেয়নি, ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে এসেছে, এমনকী মাঝেমধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাও করেছে। এই খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে, যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। সুতরাং সম্পাদক এবং মুখবন্ধ রচয়িতার ভূমিকায়ও তিনি সেই প্রতিবাদী রয়ে গেলেন; প্রতি মুহূর্তে আপসহীন, প্রতি মুহূর্তে সংগ্রামী– তাঁর একান্ত নিজস্ব নম্র পরিশীলিত বিন্যাস।
…………………
পড়ুন শারদ সংখ্যা-র অন্যান্য লেখা
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved