

‘মশাই, একটু দল পাই কোথায় বলতে পারেন?’ অন্তত এই পশ্চিমবঙ্গে কার সাধ্যি আছে উত্তর দেবে: এ তো দলপাইয়ের সময় নয়! দলপাইয়ের আবার সময় হয় রে ভাই! চাইলেও পাওয়া যায়। সিজনাল ফ্রুট যেমন সিজনকে ঢপ মেরে অন্য ঋতুতে দিব্যি হাজির, এই যেমন ভরা ডিসেম্বরেও কাঁচা আম– তেমনই এক দল থেকে অন্য দলে লাফায় দলের পোকা। কে-ই বা আটকাবে! স্রেফ দলযোগ স্ট্রং হলেই হল। আজ সবুজ দল, কাল গেরুয়া দল, পরশু পরিস্রুত শুদ্ধ দল। দল গভীর হলেই সাঁতরাতে চায় মন। কেউ কেউ আদর্শবান– দলমগ্ন, কেউ অন্যমনস্ক দলদস্যু– দলকন্যার প্রতি একটু ইয়ে। মনে পড়ে যাবেই, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘সাঁতারু ও দলকন্যা’।
‘দল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে?’ লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। ছেলেবেলায় শেখানো বুলি মনে পড়ে: ‘দলের আরেক নাম জীবন।’ সকালে ঘুম থেকে উঠে দল, রাতে শুতে যাওয়ার আগে দল, মধ্যদুপুরে, তপ্তবেলায় আকণ্ঠ দলপান। রাস্তায়, অফিসে, যানবাহনে, মল-এ, ক্যাফেতে, স্বগৃহে-স্বফ্ল্যাটে-স্বকুঁড়েয়, এমনকী– সাত সমুদ্দুর তেরো নদী জুড়ে স্রেফ দল, দল, দল, শুধু দল। উঠতি যুবক-যুবতী কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে বলে ওঠে আজও ওই রবীন্দ্রপঙ্ক্তি: বেলা যে হয়ে এল, দলকে চল্। তারপর যৌবনমদে মত্ত হয়ে দলবাজি।

সিলেবাসেও এমনকী, সুকুমার রায়ের ‘অবাক দলপান’ ছিল। ‘মশাই, একটু দল পাই কোথায় বলতে পারেন?’ অন্তত এই পশ্চিমবঙ্গে কার সাধ্যি আছে উত্তর দেবে: এ তো দলপাইয়ের সময় নয়! দলপাইয়ের আবার সময় হয় রে ভাই! চাইলেও পাওয়া যায়। সিজনাল ফ্রুট যেমন সিজনকে ঢপ মেরে অন্য ঋতুতে দিব্যি হাজির, এই যেমন ভরা ডিসেম্বরেও কাঁচা আম– তেমনই এক দল থেকে অন্য দলে লাফায় দলের পোকা। কে-ই বা আটকাবে! স্রেফ দলযোগ স্ট্রং হলেই হল। আজ সবুজ দল, কাল গেরুয়া দল, পরশু পরিস্রুত শুদ্ধ দল। দল গভীর হলেই সাঁতরাতে চায় মন। কেউ কেউ আদর্শবান– দলমগ্ন, কেউ অন্যমনস্ক দলদস্যু– দলকন্যার প্রতি একটু ইয়ে। মনে পড়ে যাবেই, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘সাঁতারু ও দলকন্যা’। কে জানে কী হয়েছিল তারপর, কীরকম লেভেলের দলকেলি! উৎপলকুমার বসুর থেকে ধার করে এনে বলেছিল কিনা, ‘তুমি আমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল/ স্পর্শ করি দলের অধিকারে’

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘দলের ওপর পানি’– অতি জরুরি বই, না-হলে দল কী করে শুদ্ধ হবে, সেই জন্যই তো সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেল বইখানা! এমনকী, জয়া মিত্রও, দলের ওপর আস্ত এক বই লিখেছিলেন: ‘দলের নাম ভালোবাসা’। দলজ্যান্ত সব উদাহরণ আমাদের বাংলাভাষায়, তবু দল নিয়ে আমরা থোড়াই ভাবিত! পৃথিবী জুড়ে নাকি দলচর প্রাণীর সংখ্যাও ক্রমেই কমছে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অলৌকিক দলযান’-এ চড়ে, কোথায় চলেছে তারা? কোন দেশভাগে?
জীবনে একটু বদহজম হলেই, দলযোগ জরুরি। ওষুধ তো এমনি এমনি কাজ করে না, দল ছাড়া। তাছাড়া, যত বড় অসুখই হোক, ব্রহ্মতালুতে নাকি দল দিতে হবেই! এ-ও এক মহৌষধি! শীতকাল এসেই পড়ল, কী দলবিরোধী ঋতু রে বাবা! বডিতে দলের ছোঁয়া লাগলেই তিড়িংবিরিং! এদিকে পেঁচো মাতাল বাদে, কে না জানে, সকলেরই দল লাগে মদের টেবিলে। রঙিন দলের সঙ্গে পরিস্রুত দল মিশলেই জনগণের মাথা ঝিমঝিম! খুব বেশিদিন দলছুট হলে কেউ বাঁচে না। সন্ধে পেরলে দলতেষ্টা যে কী জিনিস, তারা জানে। কল্পবিজ্ঞানের অদ্রীশ বর্ধন, সেই কবে লিখেছিলেন, ‘অতল দলের শহর’! ভাবা যায়!

দলের নানা স্তর– উপরিভাগ, মধ্যভাগ, নিম্নভাগ। উপরিভাগে যাঁরা থাকেন, তাঁরা তো খালি চোখেই দৃশ্যমান। কিন্তু গভীরে যাঁরা– তাঁরা অদৃশ্য। দলের গভীরতা মাপতে ডুবুরি লাগে। গভীরে ডুব দিয়ে এমন সব জিনিস পাওয়া যায়, যা থাকার কথাই নয়। পুরনো বোতল, ভাঙা চেয়ার, কিছু প্রতিশ্রুতি, দু’-চারটে পদত্যাগপত্র, না খোলা কেস ফাইল, টাকার বান্ডিল। মাঝে মাঝে একটা-দুটো আদর্শও পাওয়া যায় কি? ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ লিখেছিলেন হেলাল হাফিজ। মিছিল মানেই তো দলের ফোঁটা। কোন বই? ‘যে দলে আগুন জ্বলে’। আগুনই তো ছড়িয়ে পড়ার কথা, আগুনই তো বিপ্লবের সহজ পাঠ।
বাঁধ ব্যাপারখানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধ না থাকলে ছড়িয়ে পড়ে দল। আবার বাঁধ বেশি শক্ত হলে আটকে যায়। বাঁধের দু’দিকে তখন চাপটাপ বাড়ে। একদিন বাঁধ ভাঙে তো বটেই। আর সামলানো যায় না দলকে। যাঁরা এতদিন বাঁধ বেঁধে রেখেছিলেন, প্রথমে ভেসে যান তাঁরাই! দলের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়। তার মধ্যেই কেউ কেউ থাকেন, টিকে যান। জাঁদরেল গোছের আর কী– দলে কুমির, ডাঙার বাঘ! দলের ভিতরে এমন কেউ থাকেনই, যাঁরা সব জানেন, কিন্তু কিছু বলেন না। তাঁরা ‘গভীর দলের মাছ’। ছোট মাছরা উপরেই ঘোরাফেরা করে। বড় মাছদের দেখা যায় না। খাবারের সময় উপরে উঠে আসে ঠিক। তখন ছোট মাছদের দল হাপিস। দলের খাদ্যশৃঙ্খল এমনটাই। কেউ কাউকে খাওয়ায়, কেউ কাউকে খায়। তবে সব মাছই নিজেকে ‘বড় মাছ’ ভাবে। ‘ছোট মাছ’ বলে নিজেকে পরিচয় দিতে চায় না কেউই।

সবার সব দল সহ্য হয় না। পেটের ব্যামো থাকলে তো আরওই। কেউ যে কোনও দলই ঢকঢকিয়ে খান, কেউ খান ফুটিয়ে, কেউ আবার ছেঁকে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, না-জেনে দল খাওয়া। পেট কেন, মাথার গোলমাল পর্যন্ত হতে পারে তেমন বাড়াবাড়ি হলে। কে না জানে, দলীয় বদহজম হলে চিকিৎসা কঠিন। কারণ, তখন রোগী নিজে মানতে চান না যে তাঁর পেটে সমস্যা। তখনও কেবলই দলের গুণগান করেন। যাকে বলে ওই ‘মগজধোলাই’, কবেই ঘটে গিয়েছে যেন! তাঁর কাছে ব্যাপারটা দলের মতো পরিষ্কার হয় না মোটেই।
বাংলা সাহিত্যে দলবাজি নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে কথা ওঠে, মিলিয়েও যায়। ঢেউয়ের যা কাজ। হুমায়ূন আহমেদ তো আস্ত উপন্যাস লিখেছিলেন: ‘আমার আছে দল’। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্বীকারোক্তি এপার বাংলায় নেই কেন? বছর দেড় আগে, ‘দশমিক’ পত্রিকার বইমেলা বুলেটিনে লেখা হয়েছিল: সকলেই কবি নয়; কেউ কেউ লবি। আর কবিতায় তো দল থাকতেই পারে। সিলেবাসেই তো রয়েছে– রুদ্ধদল-মুক্তদল।

দলের বিচিত্র অর্থনীতি। কোথাও দলের অভাব, কোথাও আবার উপচে পড়ছে। বারেবারে আলোচনা হয় আন্তর্জাতিক স্তরে: এমন আধুনিক পৃথিবী কি চেয়েছি, যেখানে দল দাম দিয়ে কিনে নিতে হবে? দলের বাজারে তাই ভারসাম্য জরুরি। কেউ দল বেচে খায়, কেউ দল কিনে বাঁচে। কেউ আবার দলের ব্যবসা না-করেও দিব্যি দলীয় দালালি করে। দলের অর্থনীতি বুঝতে গেলে আগে বুঝতে হবে, দল কতটা প্রয়োজন আর বিলাসিতাই বা কতখানি! দলেরও থাকা উচিত সীমান্ত। দল যেন মাথার উপর না ওঠে, গলার কাছে না আসে, চোখে না ঢোকে। দল যেন উপযোগী থাকে পানের, উপযোগী থাকে সাঁতারের, বেঁচে থাকার উপযোগী থাকে। তারচেয়েও বড় কথা– দল যেন ঘোলা না হয়। কারণ ঘোলা দলে মুখ দেখা যায় না নিজের। তাছাড়া, ইদানীং, দলভাগেরও একটা ব্যাপার দেখা যাচ্ছে। পুরো গঙ্গাপদ্মা কেস!
মাঝে মাঝে দেখা যায় দলসংকটও। সেসময় অবশ্য, সক্কলেই দল বাঁচানোর কথা বলেন। পোস্টার পড়ে রাস্তায় রাস্তায়, কিংবা হাতে হাতে কমদামি লিফলেট (স্বাভাবিকভাবেই সচেতনামূলক): দলের অপচয় বন্ধ করুন। অথচ দলের জন্য সেভাবে দাঁড়ায় কেউ? বন্ধ চোখ কি খুলে যায় কারও? অন্তত এক-দু’জনের? সকলেই কি উদাসীন কিংবা আখের গোছাতে ব্যস্তসমস্ত?
অথচ হাওড়ার এক পুরনো পাড়ায়, আজীবন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সৎ, নির্লোভ, অবিবাহিত ব্রজদা, পার্টিজান, তাঁর জীবনের শেষ লগ্নে, দীর্ঘ গোঁ-গোঁ চিৎকারেও, একবিন্দু দল পায়নি।
……………………………………………………..
অত্যন্ত দুঃখিত। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই, সম্ভবত, সমস্ত জল দলে পরিণত হয়েছে। হে পাঠক, মার্জনা করবেন, দল নিয়ে আমার কোনও সম্যক জ্ঞান নেই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved