


তাঁর পূর্বসূরিদের ধরনেই সত্যজিৎ পশ্চিমি যুক্তিবাদের মূল সূত্রগুলিকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছেন। যে মানবতাবাদ রেনেসাঁ থেকে দেকার্তের হাত ধরে বিশ্বাস করে, মানুষ শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও প্রণালীবদ্ধ যুক্তির প্রভাবেই ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারে, গ্লোব হাতে অপু সেই মতবাদের শরিক ‘অপরাজিত’-তে। তবু কেমন যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল মাত্র ১১ বছরে। সত্যজিৎ রায়ের জীবনে অপু ট্রিলজি এবং ক্যালকাটা ট্রিলজি– এই দুই তিনের কলহ মূলত একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রীয় প্রণয়প্রস্তাব।
তিন সংখ্যাটার যতরকম মাহাত্ম্যই থাকুক আমাদের সংস্কৃতিতে– পৌরাণিক বা মনস্তাত্ত্বিক, সত্যজিৎ রায়ের জীবনে এই তিন সংখ্যাটি প্রায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই দু’টি তিনের কলহ মূলত একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রীয় প্রণয়প্রস্তাব।
৬৭ বছর আগের একদিন শ্রী অপূর্ব কুমার রায়, অপু, তাঁর সদ্যপরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। কী অসামান্য সেই ডিজলভ: পৌরাণিক ছবির বিস্ময় থেকে এক্কাগাড়ির দাম্পত্য! বাস্তবিক সত্যজিৎ রায়ের ও সেইসূত্রে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আধুনিকতার ধারণা বিষয়ে এই অংশটিকে একটি মন্তব্য হিসেবেই পড়া যেতে পারে। আসলে অপুর ইতিবৃত্ত তো সমগ্র উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথম ভাগ জুড়ে আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত প্রগতি বা আলোকপ্রাপ্তি সম্পর্কে যা ভেবেছে– তারই একটি দৈব রূপকথা।

মার্কস যে বর্ণাশ্রম-ভিত্তিক বদ্ধ ভারতীয় পল্লিসমাজের কথা খেয়াল করেছিলেন, তার একটি থেকে হরিহর ও তাঁর পরিবার বেরিয়ে আসে। ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র থেকে এই গন্তব্য একমুখী; কোনও দিন সত্যজিৎ রায় অপুকে আর তাঁর জন্মভিটেয় ফেরাবেন না। ‘দেশ’ বলতে একটি ভৌগোলিক মানচিত্র জন্ম নিল ঔপনিবেশিক শিক্ষার বদান্যতায়। সূর্যঘড়ি অপুকে ‘সময়’ চেনায়। হেডমাস্টারমশাই তাকে লিভিংস্টোনের ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়তে দিলে সে ‘অজানা’কে আবিষ্কার করে। তারপরেই শিয়ালদা স্টেশনে তার ঐতিহাসিক অবতরণ। অপু হ্যারিসন রোডে দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনও অসুখ বোধ করে না, বরং সে ছাপাখানায় এসে পৌঁছলে আমাদের মনে করার সঙ্গত কারণ থাকে যে, এই সেই ‘গুটেনবার্গ ছায়াপথ’, যে পথ ধরে শুধু ধর্মশাস্ত্র গির্জার থেকে বেরিয়ে আসবে না, জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণও সম্ভব হবে। মনে পড়ে, প্রেসের এজমালি ঘর থেকে মা-কে লেখা তার চিঠির শেষ লাইন– ‘আমার ঘরে একটি বিজলী বাতি আছে।’ ‘অপরাজিত’ মুক্তি পায় ১৯৫৬-এ, আর মাত্র আট বছর বাদে মিডিয়াবিদ মার্শাল ম্যাটলুহান টরন্টো থেকে জানাবেন, ‘বিজলী বাতি’ একটি তথ্য।
‘অপুর সংসার’-এর যুগের স্বপ্নের কথা প্রয়াণের কিছু আগে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ত্রয়ী’ আধুনিকতার একটি চলমান স্বপ্নমালা, তাদের স্রষ্টা বঙ্গীয় আধুনিকতার অন্যতম প্রবক্তা।

অপুকে কে আলাদা করে দিল সর্বজয়ার থেকে? এই দায় একমাত্র কলকাতা শহরের; লীলা বা অন্য কোনও আকর্ষণের প্রশ্নই অবান্তর। পুরোহিত-পুত্র হয়েও সে বংশানুক্রমিক পেশায় থাকতে চাইল না। মলিন ঘর থেকে সে বাঁশিতে সুদূরকে ডাক দেয়। মায়ের শেষকৃত্যের জন্যেও গ্রামে থাকতে নারাজ। বোঝাই যায়, সভ্যতার রূপান্তর বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্যের অবতারণা করা হল। ‘যা কিছু কঠিন তা বাতাসে গলে যায়, যা কিছু অলৌকিক তা হয়ে যায় ঐহিক’– ‘অপরাজিত’-তে অপূর্বর মূল্যবোধ যেভাবে বদলে যায়, তাতে তো সময়ে সময়ে সাম্যবাদী ইস্তেহারের ‘বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়েত’ অংশের অসামান্য কয়েকটি অনুচ্ছেদ মনে পড়ে। কেউ কি ভেবেছিল, কাশবনের অদূরে একটি রেলগাড়ি গ্রাম্য বালকটিকে টেনে নিয়ে যাবে শহরের ইতিহাসে? ‘পথের পাঁচালী’র গ্রামচ্যুতি থেকে অপুর সংসারের দাম্পত্য-নির্মাণ সত্যজিৎ রায়ের প্রগতি সম্পর্কিত ধারণা থেকে উদ্ভূত। এই প্রগতি রৈখিক ও একমুখী। তার গতি শুধু সামনের দিকেই। তাতে ক্ষণতরেও পশ্চাৎভ্রমণ নেই, নেই কোনও আকস্মিক বাঁক। অর্থাৎ, সংশয় নেই। তাঁর উনিশ শতকীয় পূর্বসূরিদের ধরনেই সত্যজিৎ পশ্চিমি যুক্তিবাদের মূল সূত্রগুলিকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছেন। যে মানবতাবাদ রেনেসাঁ থেকে দেকার্তের হাত ধরে বিশ্বাস করে, মানুষ শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও প্রণালীবদ্ধ যুক্তির প্রভাবেই ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারে, গ্লোব হাতে অপু সেই মতবাদের শরিক ‘অপরাজিত’-তে। তবু কেমন যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল মাত্র ১১ বছরে। অপূর্ব যখন অপর্ণার দিকে তাকিয়ে থাকত, তখন ‘একটি কথার দ্বিধাথরোথরো চূড়ে’ ভর করত গীতিকবিতা। সাতের দশকের শুরুতেই সিদ্ধার্থ যখন খররৌদ্রে জেব্রাক্রসিং পার হতে থাকা তরুণীর বক্ষদেশের দিকে তাকায়, তখন নয়নে মদিরেক্ষণ মায়া নেই। রহস্যমোচন করে মেডিকাল কলেজের লেকচার থিয়েটার। এখানে পাঁচের দশকের কুসুমের মাস নয়, সাতের দশকের আমিষ গন্ধ।

নেহরু যুগের অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নাগরিকের ভূমিকা, পরিকল্পনার আশ্বাস সিদ্ধার্থকে উন্নয়নের মৌতাতে মজিয়ে দিতে পারে না। মধ্যবয়সি, ঈষৎ লাজুক কন্ডোম-ক্রেতাকে সে খেয়াল করে তাচ্ছিল্যভরে। ফিল্ম ডিভিশনের তথ্যচিত্রে সুহাসিনী ইন্দিরা গান্ধীকে দেখে সে চোখ বোজে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কৌটো ভেঙে পয়সা বের করে নেওয়া বা যুবতী নার্সের বক্ষবন্ধনী ও ফিল্ম সোসাইটির ‘আর্ট’ তার কাছে নৈতিকতার দহন বা সাংস্কৃতিক প্ররোচনা নয়। উদ্দেশ্যহীনতার ক্লান্তি অথবা উপায়হীন উদাসীনতা। স্বভাব-বিরুদ্ধভাবে সত্যজিৎকে বেশ তিক্ত ও বিচলিত লাগে। এই বিরক্তি ও আত্মগ্লানি তাঁকে এমনকী, ‘সীমাবদ্ধ’ বা ‘জনঅরণ্য’তেও সঙ্গ দিয়ে যাবে। সিঁড়িতে ওঠার অন্তহীন দৌড়ে শ্যামলেন্দুর পরচুলা খসে পড়ে। তার হাতে রক্ত দেখা যায়। নগরীর মহৎ রাত্রিতে ‘জন অরণ্য’র নায়ক নিতান্ত মাংসাশী শ্বাপদের মতো মেয়েমানুষ শিকার করে। সাতের দশকের অপুকে তো আর শাপভ্রষ্ট দেবশিশুর মতো মনে হয় না। স্বপ্ন-বিপর্যয়ের এই ইতিবৃত্ত তাহলে কীভাবে পড়া হবে? যুযুধমান এই ত্রয়ী, এই ধাঁধার জবাব এত সরল নয় যে, বিভূতিভূষণ থেকে সুনীল পর্যন্ত উপন্যাসের ঋতুবদল খেয়াল করলেই হদিশ মিলবে। সত্যজিৎ তো অনুবাদক মাত্র নন।

রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত আমরা সান্ত্বনা খুঁজতাম বিজ্ঞান-সমর্থিত যুক্তিবাদে। বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মাধিকরণ ও সচিবালয় যে বাণী প্রচার করত তা মূলত পাশ্চাত্য দীপায়নের পাঠক্রম। গত শতকের ১৯৬৮ সাল নাগাদ কতিপয় ছাত্র ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর দখল করলে পাশ্চাত্য সভ্যতা বুঝতে পারে পাঠাভ্যাস বদল করতে হবে। দেখারও রকমফের আছে। আমি তুলনা টানছি না, কিন্তু ছয়ের দশকের কমিউনিস্ট পার্টির ক্রমান্বয়ী বিভাজন, খাদ্য আন্দোলন, জমির লড়াই, অগ্রজের অটল বিশ্বাস টলিয়ে দেয়। সত্যজিৎ ইতিহাসের রেখাচিত্র বুঝতে অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। কিছুটা ক্রুদ্ধ দেখায় তাঁকে। যে মূল্যবোধ তাঁকে গঠন করেছে, তা দ্বিধা ও অনিশ্চয়তায় আকীর্ণ হয়। এই ব্যর্থতা বড় মাপে দেখলে সত্যজিৎ রায়ের একার নয়। তথাকথিত উনিশ শতকীয় মানবতাবাদেরও। এনলাইটেনমেন্টের প্রকৃতির মধ্যেই তার সীমাবদ্ধতা। অপূর্ব ও সিদ্ধার্থর পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্যামলেন্দু ও সোমনাথের নরকযাত্রা এই সীমাবদ্ধতার একটি স্বীকৃতি। ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে তিন তাসের খেলা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved