Bengali Poets, Everyday Lies and the Humour of Life | Robbar
Robbar
  • ২০ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৭ নভেম্বর ২০২৬

গুল ফুটুক না ফুটুক

তারাপদ রায় এতই অ-মাইক ছিলেন যে কখনও, কোনও অবস্থাতেই নীচু গলায় কথা বলতে পারতেন না। ওঁর লেখা থেকে জানা যায়, তারাপদদা আর মিনতি বউদির ফুলশয‌্যার রাত্তিরে আড়িপাতার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি। নতুন স্বামী তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রী-কে কী কী বলেছিলেন সেটা তাঁর পাশের বাড়ি, তার পাশের বাড়ি, তার তার পাশের বাড়ি থেকে স্পষ্ট শোনা গিয়েছিল! 

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ২০:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

বিষয়গত এবং লিখন বা কথনশৈলীর কারণে তারাপদ রায়ের বেশিরভাগ কাহিনিই ‘গুলবাজি’ বলে মনে হলেও, আমি ব‌্যক্তিগতভাবে মনে করি, সেসব কাহিনির শতকরা ৭৫ ভাগ (তর্ক করলে, শতকরা ৮০…) সত্যি। একটু ‘গারনিশ’ করে পরিবেশন করেছেন তারাপদ রায়।

তারাপদদার বেশিরভাগ গল্পই পরিবারের বা আশপাশের লোকজন নিয়ে। এমনকী, পোষ‌্য গণেশও অন‌ায়াসে ঢুকে পড়েছে অনেক কাহিনির মধ্যে। বিজন রায়কে মনে আছে? তারাপদ রায়ের ছোট ভাই। সেই যে ছেলেবেলায় টাঙ্গাইলে যাকে ‘কুইনাইন’ ট‌্যাবলেট খাওয়াতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’ তারাপদ রায়ের বাবার মুহুরিকে। শেষ পর্যন্ত পরাস্তই হয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটা একটু মনে করিয়ে দিই।

zoom
তারাপদ রায়, শুরুর দিনগুলিতে

ম‌্যালেরিয়া থেকে বাঁচানোর জন্য ছোটদের ‘কুইনাইন’ খাওয়ানোর সম‌্যক দায়িত্ব ন‌্যস্ত হয়েছিল মুহুরিবাবুর ওপর। বলা বাহুল‌্য, সেটা চাকরির অঙ্গ হিসেবেই বিবেচ‌্য। আর সবাইকে ‘কুইনাইন’ গলাধঃকরণে সমর্থ হলেও, বিজন রায়কে তিনি কিছুতেই বাগে আনতে পারছিলেন না। তার একটাই কথা, ‘আমি খাবো না। ভীষণ তিতো!’ শেষে মুহুরিবাবু ব‌্যবহারিক বিদ‌্যাপ্রয়োগের দিকে ঝুঁকলেন। ট‌্যাবলেটটি দু’-ভাগ করে একভাগ নিজের মুখে ফেলে, কষ্টের হাসি মুখে এনে বিজনদাকে বললেন, ‘এই দ্যাখো, আমি তো খেলাম। খেয়ে নাও, কিছু হবে না।’ বিজন রায় সেই অবশিষ্ট আধখানা ট‌্যাবলেট হাতে নিয়ে, অভিনিবেশ সহকারে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিরীক্ষণ করে, মুহুরিবাবুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘খুব ভুল হয়ে গিয়েছে, ওই আধখানা তো আমার ছিল, এটা তো আমার নয়!’ বলেই দ্রুত অকুস্থল ত‌্যাগ।

zoom
কুইনাইনের বিজ্ঞাপন

সেই বিজন রায়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ সম্ভবত লিট্‌ল রাসেল স্ট্রিটের বাড়িতে। হাসিখুশি মানুষ– একটু বেশিই হাসিখুশি। সরকারি চাকুরে। তিনি এখন আমার ‘বিজনদা’। দেখা হলেই আকর্ণবিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে বলতেন, ‘অরণি এসেছ? খুব ভালো।’ এই বিজনদাও, তারাপদ রায়ের দাদার মতোই বহু কাহিনির প্রধান চরিত্র। কাহিনির কথা থাক, সেসব আপনারা যথা সময়ে পড়ে নেবেন। আমার ‘আঁখো দেখা’ ঘটনাটি বলি।

একদিন তারাপদদার বাড়ির সান্ধ‌্যকালীন আড্ডায় যোগ দিয়েছি। এমন সময় বিজনদা অফিস থেকে ফিরলেন। যথারীতি একগাল হাসি। তারপর জামাকাপড় ছাড়তে অন্দরে প্রবেশ। পরক্ষণেই বেরিয়ে এলেন। তখন তাঁর একটি পা প‌্যান্টের ভিতরে, অন‌্যটি অর্গলমুক্ত। সাদা আন্ডারওয়‌্যার পরিদৃশ‌্যমান। যাতে আরও কোনও বড় বিপর্যয় না-ঘটে, সেই জন‌্য প‌্যান্টটি দু’হাতে ধরে তারাপদদার কাছাকাছি এসে বললেন, ‘দাদা কাল সমাজে একটা কবিতা দিতেই হবে! আমার এক কলিগ পাড়ার পুজোর স‌্যুভেনিরের জন‌্য চেয়েছে।’ তারাপদ রায় নিজস্ব ভঙ্গিতে চোখ কুঁচকে, আড়চোখে একবার দেখলেন, তারপর বললেন, ‘কবিতা পরে। আগে তুমি প‌্যান্টটা খোলো, না-হয় ঠিক করে পরো!’ বিজনদা নিজের দিকে তাকিয়ে অবিকল ‘হযবরল’-র ন‌্যাড়ার মতো খ‌্যা খ‌্যা করে হাসতে হাসতে চোখের আড়ালে চলে গেলেন।

 

ওই বিজনদাকে তাঁর দাদা একবার একটা কঠিন কাজ দিয়েছিলেন। একদিন তারাপদদা বললেন, ‘‘জানো অরণি, একজন পুরুষ ও একজন মহিলা পালা করে রাত এগারোটার পর ক’দিন ধরে ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন, ‘তারাপদ রায় কেমন আছেন? কী করছেন?’ ওই সময় সাধারণত বিজনই ফোন ধরে। ওর ধারণা, এসব আসলে তুকতাক। কেউ ওর দাদার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। আমি আজ ওকে বলে দিয়েছি, ফোনটা এলে ও বলবে, ‘দাদা এইমাত্র একটা ছোট প‌্যান্ট পরে গায়ে তেল মেখে সিঁদকাঠি নিয়ে বেরিয়ে গেল। সম্ভবত আপনাদের বাড়ির দিকেই!’ বিজনকে বোঝালাম, এ হচ্ছে তুকতাকের অ‌্যান্টিডোট। বিজন কোনওক্রমে নিমরাজি হয়েছে।’’ বিজনদা সত্যি সত্যি কী বলেছেন, জানতে পারিনি। তবে তাঁরা আর ফোন করেননি।

zoom

একদিন তারাপদদা বললেন, ‘জানো অরণি, খুব জোর বেঁচে গেলাম!’ মুখে কৌতূহল মাখিয়ে তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। বললেন, ‘‘তাতাইয়ের এক বন্ধুনি সেদিন এসে আমার বলল, ‘আঙ্কল আপনার লেখা আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমি ঠিক করেছি, আপনার কিছু লেখা আমি ইংরেজিতে অনুবাদ করব।’ আমি তো খুব খুশি। মনের আনন্দ চাপতে না-পেরে সুনীলের সনির্বন্ধ অনুরোধ উপেক্ষা করে, দু’-এক কলি গানও গেয়ে ফেললাম। মেয়েটি চলে গেল। আমিও বাথরুমে ঢুকে এটা-সেটা করতে করতে একেবারে আঁতকে উঠলাম। আরে, আমার লেখার অনুবাদ হলে তো একেবারে অনর্থ হয়ে যাবে! আমার বেশিরভাগ লেখাই তো ইংরেজি থেকে টোকা! অনুবাদ হলে তো কপিরাইট আইনে ধরা পড়ে যাব। একেবারে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কোনওরকমে মেয়েটিকে নিরস্ত করলাম। বেঁচে গেলাম এ যাত্রা।’’ সবটা শোনার পর আমি বললাম, ‘‘সে তো হল। বড়জোর বেঁচে গেলেন। কিন্তু সুনীলের ‘সনির্বন্ধ অনুরোধ’ ব‌্যাপারটা কী?’’

“একবার মার্কাস স্কোয়ারে বঙ্গ-সংস্কৃতি সম্মেলনে আমরা, কৃত্তিবাসীরা, স্টল দিয়েছিলাম। সে ছিল আমাদের ঘোর যৌবনের সময়। স্টলে বইপত্তরের সঙ্গে বেশ কিছু মাটির খুরিও ছিল। পালা করে কয়েকজন স্টলের পিছনদিকে গিয়ে খুরির সদ্ব্যবহার করে ফুরফুরে মেজাজে ফিরে আসছিল। সেদিন বোধহয় মেলার শেষদিন। ফেস্টুন-টেস্টুন, বইপত্তর গুছিয়ে মেলা ছাড়ার আগে ঠিক হল একটা সমবেত সংগীত হবে, হলও। সবাই গাইছে দেখে আমি যেই যোগ দিয়েছি, দেখলাম এক এক করে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। একে-অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ভাঙা মেলার ফিরতি মানুষজন পায়ে পায়ে এসে জড়ো হচ্ছে ‘কৃত্তিবাস’-এর স্টলের সামনে। সুনীল আমাকে থামাল আর অনুরোধ করল, আমি যেন নিজের বাড়ির কলঘরের বাইরে গান গেয়ে কোনও আসর পণ্ড না করি! দুঃখ করেছিলাম, তবে মেনেও নিয়েছিলাম। বন্ধু তো! সুনীল আরও একটা অনুরোধ করেছিল। বলেছিল, হিন্দি বলার চেষ্টা না-করতে। একবার বেড়াতে গিয়ে এক টাঙ্গাওয়ালার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টায় তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘হামলোগ বোলতাকো বোলতা বলতা হ‌্যায়, তুমলোগ বোলতাকো কেয়া বলতা হ‌্যয় ভাই?’ লোকটি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে, দ্রুত স্থানত‌্যাগ করেছিল। এমনকী, প্রাপ্য ভাড়া না নিয়েই!

zoom
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; ছবি সৌজন্য: রাহুল সেন

তারাপদদা এতই অ-মাইক ছিলেন যে কখনও, কোনও অবস্থাতেই নীচু গলায় কথা বলতে পারতেন না। এ নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে তাঁকে অনেকবার। 

একবারের কথা বলি। সাধারণত বাঙালি বাড়িতে ফুলশয‌্যার রাত্তিরে সমবয়সি আত্মীয়দের– বউদি, ননদ, বন্ধুর দল– আড়িপাতার একটা রেওয়াজ চালু। তারাপদ রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, তারাপদদা আর মিনতি বউদির ফুলশয‌্যার রাত্তিরে আড়িপাতার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি। নতুন স্বামী তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রীকে কী কী বলেছিলেন, সেটা তাঁর পাশের বাড়ি, তার পাশের বাড়ি, তার তার পাশের বাড়ি থেকে স্পষ্ট শোনা গিয়েছিল! পরের দিন রাস্তায় পাড়ার এক দাদাস্থানীয় ভদ্রলোক একটু ভর্ৎসনার সুরেই বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার নতুন বউকে, তারাপদ, ফুলশয‌্যার রাত্তিরে যে-যে কথা বললে সেসব সারা পাড়াকে না-শোনালেও পারতে!’

একবার শান্তিনিকেতনের গেস্ট হাউসের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন তারাপদ রায়। সম্ভবত ‘পূর্বপল্লি গেস্ট হাউস’। আড্ডা-ঘোরাঘুরি সেরে ফিরতে একটু রাত্তিরই হয়ে গিয়েছিল। রাত্তিরের খাবার ঘরেই আনিয়ে নিয়েছিলেন। গোটা দুয়েক রুটি আর তরকারি। আঙুল দিয়ে রুটি ছিঁড়তে পারলেন না। দু’-হাত লাগালেন! তাও হল না। একটু একটু করে রোখ চেপে যাচ্ছে। বুঝতে পারলেন দু’-হাতেও হবে না। খিদেও বিশেষ নেই। ফেরার সময় দু’টি কুকুরকে পায়চারি করতে দেখেছিলেন। ঘর থেকেই ফ্লাইং সসারের মতো রুটি দুটোকে উড়িয়ে দিলেন হাওয়ায়। উঠোনে তাদের পড়ার ক্ষীণ আওয়াজও পেলেন। তারপর সে কী তুমুল শশব্দ লড়াই! বেশ কিছুক্ষণ চলল সে লড়াই। তারপর সব শান্ত। তারাপদদাও গড়িয়ে গেলেন ঘুমে। সকালবেলায় ঘুম ভাঙার পর বারান্দায় এসে উনি সবিস্ময়ে আবিস্কার করলেন, উঠোনে দুই ঘুমন্ত সারমেয় আর তাদের মাঝে দু’টি অক্ষত রুটি!

zoom

অনেকক্ষণ ধরেই শুধু তারাপদ রায়ের কথা হচ্ছে, এবার শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের সঙ্গত দরকার। এ কাহিনি টর্পেডো আর ডনের কাহিনি। তারাপদদা একদিন বললেন, ‘‘অরণি, শক্তি যখন এলোমেলো থাকে, পারতপক্ষে ওকে আমি ঘাঁটাই না। কিন্তু কপালের কী গেরো– একবার আলটপকাভাবে শক্তির কথার পিঠে একটা কথা বলে খুব ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমরা বন্ডেল রোডে থাকি। আমার ঘরটা মেজেনাইন ফ্লোরে (গ‌্যারাজের ওপরের ঘর, অনেকে বলেন ‘দেড়তলা’)। শক্তি একদিন বেশ রাত্তিরের দিকে রঙিন অবস্থায় এসে হাজির। আমিও একেবারে বেরঙিন নই। আমি প্রথমেই বললাম, ‘এত রাত্তিরে এলে শক্তি, আমাকে তো এখনই শুয়ে পড়তে হবে। কাল সকাল সকাল অফিসে মন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি মিটিং।’ শক্তি বলল, ‘আমি এখনই চলে যাব, তোমাদের সঙ্গে একটা দরকারি বিষয়ে আলোচনা করতে এলাম। এক জায়গা থেকে কিছু টাকা পেলাম, বন্ধুদের একদিন খাওয়াতে চাই। তোমার সঙ্গে বসে মেনুটা ঠিক করেই চলে যাব।’ বললাম, ‘বলো, কী মেনু?’ আমি ঠিক করেই রেখেছিলাম কোনও মতান্তরে যাব না। সবই ঠিক ছিল, গোল বাধল চাটনিতে এসে। একেই বলে গেরো! শক্তি বলেছিল আলুবোখরার চাটনি। আমি বললাম, ‘এত ঝামেলায় না গিয়ে আনারসের চাটনি করলেই হয়। খরচ কম হবে, খেতেও ভালো হবে। শক্তি বলল, ‘না, আনারস নয়, চাটনি হলে আলুবোখরারই হবে।’ একটু জেদ চেপে গেল। আমি বললাম, ‘আনারসই ভালো হবে।’ ঘড়ির কাঁটা ঘুরেই চলেছে। নিজেকে সামলে নিলাম। যথেষ্ট দেরি হয়ে গিয়েছে। শক্তিকে প্রায় জবরদস্তি বিদায় জানিয়ে শুয়ে পড়লাম।

আমার মাথার কাছে জানলা। বন্ধ। কিছুক্ষণ পরেই সেই জানলায় ধাক্কা। জানলা খুলে তাজ্জব হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা যারা শক্তিকে চিনি, বিশেষ করে রঙিন শক্তিকে, তারা ওর কোনও কিছুতেই তাজ্জব হওয়া কবেই ছেড়ে দিয়েছি। জানলা খুলে দেখি, শক্তি এই রাতদুপুরে কোথা থেকে একটা বড় গাছের ডাল জোগাড় করেছে। টানা রিকশায় বসে ওই গাছের ডাল দিয়ে জানলায় ধাক্কা মারছে। মেজেনাইন ফ্লোর হওয়ায়, রিকশায় বসা অবস্থায় গেছো ডাল দিয়ে আমার জানলায় ধাক্কা মারা যায়। জানলা খুলতেই শক্তি বলল, ‘তারাপদ, আলুবোখরা মেনে নাও।’ আমি বললাম, ‘আনারস’। বলে জানলা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়লাম। মিনিট দশেক পরে আবার জানলায় টোকা। টোকার জোর ক্রমশ বাড়তে লাগল। আশপাশের দু’-একটা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল। আমি নীরবে জানলা বন্ধ করে দিলাম। দশ মিনিট পর আবার। এবার আমি জানলা খুলতে বাধ‌্য হলাম। কেননা শুধু শক্তি নয়, আরও কয়েকজনের গলার আওয়াজ পেলাম। মনে হল শক্তি এদের জুটিয়ে এনেছে। এরা প্রত্যেকেই আলুবোখরার দলের লোক! ভুল। এরা আমারই প্রতিবেশী, রহস‌্যের সন্ধানে কৌতূহলী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। তারা শক্তির কাছাকাছি আসার আগেই শক্তি উঠল, ‘আমি অনেক ভেবে, তারাপদ, মনস্থ করলাম আনারসই হবে।’ রিকশা-সহ শক্তিকে চলে যেতে দেখলাম। কিন্তু বিশ্বাস নেই আবার আসতে পারে ভাবতে ভাবতে আধো ঘুম আধো জাগরণে রাত কাটল। ভোরবেলা ভয়ে ভয়ে জানলা খুলে শক্তি বা রিকশার দেখা পেলাম না। কিন্তু সেই গাছের ডাল একাকী রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।

এই কাহিনির একটি পুনশ্চ আছে। পুনশ্চ এই– আনারস নয়, আলুবোখরা নয়, সেই ভোজসভাই কোনও দিন বাস্তবায়িত হয়নি!’’

zoom
শিল্পী কুট্টির চোখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আমি প্রথমেই বলেছিলাম গুলবাজির জন‌্য তারাপদ রায়ের প্রসিদ্ধি থাকলেও তারাপদদার কোনও কাহিনিই সম্পূর্ণ বানানো নয়। শেষে বলি, একবার আমি নিজেই তারাপদদার নিখাদ গুলবাজিতে বিদ্ধ হয়েছিলাম। অনেকদিনের পুরনো কথা। তখন তিনি থাকতেন পণ্ডিতিয়া রোডে। একদিন একটা পত্রিকার কাজে ওঁর বাড়িতে গিয়েছি। আমাদের অনেক দিনের পরিচয়। আমার ১৮-১৯ বছর বয়স থেকেই। কয়েকদিন আগেই তারাপদদা আমেরিকা ঘুরে এসেছেন। প্রথমবার, মার্কিন সরকারের আমন্ত্রণে। তখন বাঙালি মধ‌্যবিত্ত বাড়িতে বাড়িতে টিভি ঢুকে পড়েনি। আর টিভি বলতে তখন ‘ভারত’, ‘টেলিরামা’, ‘কোনারক’, ‘ইসি’ ইত‌্যাদি। তারাপদদার ঘরে দেখলাম বিচিত্রনামের এক টিভি। ‘TOBLERONE’। ওই নামে কোনও টিভির কথা কোনও দিন শুনিনি। বিজ্ঞাপনও দেখিনি। তারাপদদা কিঞ্চিৎ গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘এই টিভির নাম এখানে শুনবে কোত্থেকে? আমেরিকা থেকে নিয়ে এলাম। খুব ভালো টিভি।’

সরল বিশ্বাসে বাড়ি চলে এলাম। এর কিছুদিন পর কানাডা প্রবাসী দাদা-বউদি অনেক জিনিসের সঙ্গে তিনকোনা এক চকোলেট বার নিয়ে এসেছিলেন। নাম, ‘TOBLERONE’. চকোলেটটা দেখেই তারাপদদার বাড়ির টিভির রহস‌্য বুঝে গেলাম। আমেরিকা থেকে টিভি নয়, নিয়ে এসেছিলেন চকোলেট। তারই বাক্সটা কায়দা করে কেটে, টিভির নামের উপর মেরে রেখেছিলেন বাড়িতে আসা মানুষজনকে ধন্ধে ফেলার জন্যে। টিভিটা আসলে ছিল ‘BHARAT TV’।

পরবর্তী সাক্ষাতে তারাপদদাকে ব‌্যাপারটা বলতে উনি নিজস্ব ভঙ্গিতে একটা চোখ ছোট করে উদাস হওয়ার ভান করলেন। মুখে একটা মজা মাখানো হাসি। এটা ছিল তারাপদ রায়ের শতকরা ১০০ ভাগ গুলবাজি।

Bengali books Bengali Poetry Fake Krittibas Lie Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shakti Chattopadhyay Sunil Gangopadhyay Tarapada Roy Wit

Share this article on