The Art of the Somersault: Strange Twists of Nature। Robbar
Robbar
  • ২১ কার্তিক ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৮ নভেম্বর ২০২৬

সোজা থাকলেই বিপদ!

ডিগবাজি বললেই সবার প্রথমে মাথায় আসে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এক দলের জনপ্রিয় নেতা সুবিধে বুঝে দল বদল করছেন– হামেশাই হচ্ছে এমনটা! কিন্তু শুধু কি তাই? প্রকৃতি হোক বা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ডিগবাজির অনুষঙ্গ রয়েছে সর্বত্র। এমনকী, ভালোমতো খুঁজলে, একাধিক সাহিত্যেও পাওয়া যায় ডিগবাজির প্রসঙ্গ। আসলে ডিগবাজির মধ্যে যে আনন্দ, আমোদ আর যা-ইচ্ছে-তাই করার অপার স্বাধীনতা রয়েছে, তেমনটা আর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে কি?

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৮, ২০২৬, ০০:১৬   
Facebook WhatsApp Messenger

ঢেঁকি যখন স্বর্গে গেলেও কাজ করে চলে, তখন এই মর্তে চোখের সামনে বা আড়ালে ঘটে চলা একটি কাজের প্রসঙ্গে তাকে ডেকে আনা নিশ্চয়ই কোনও অপরাধ হবে না। একটা কাঠের পাটাতনের মাথা একবার ওপরে ওঠে আর পা নীচে নামে, পরক্ষণেই ঘটে এর উল্টো– পা উঠে যায় ওপরে আর মাথা নেমে আসে নীচে। অবস্থানের এই বারবার বদলই ঢেঁকিকে অমর করে তুলেছে, একটি বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় আর ‘ই’ যোগ করে এই অদ্ভুত কাজকে বলা হয়েছে ঢেঁকিবাজি।

zoom
ঢেঁকি ও মেয়েরা। শিল্পী: হরেন দাস

মুখের ভেতর জিভ যখন নিজের জায়গা বদল করল ঢেঁকির কথা বলতে গিয়ে, সেখানেও সেই একই ঘটনা, এক-পা এগয় তো দু’-পা পিছয়। বাংলা বর্ণমালার কথা খেয়াল করে দেখুন, ‘ঢ’ থেকে এক পা পিছিয়ে ‘ড’ আর ‘ক’ থেকে দু’-পা এগিয়ে ‘গ’– এইরকম স্বরধ্বনিকেও এগিয়ে পিছিয়ে জায়গা বদল করে, ‘বাজি’-কে অক্ষত রেখে আর-একটি শব্দ তৈরি করে ফেলল জিভ– ‘ডিগবাজি’। ঢেঁকিবাজি’ থেকে ‘ডিগবাজি’ এল বাংলা শব্দের ভাঁড়ারে। তবে অর্থের কিছু ফারাকও দেখা গেল। ঢেঁকিবাজিতে কাঠের পাটাতনটির জায়গায় ডিগবাজিতে ব্যক্তিই দক্ষ হয়ে উঠল অবস্থান বদলে ফেলার ক্ষেত্রে।

zoom
সূত্র: ইন্টারনেট

এখন আর মনে নেই, ছোটবেলায় কে প্রথম শিখিয়েছিল ডিগবাজি খেতে। তবে বিছানার ওপরে হোক কিংবা মোলায়েম ঘাসে, ডিগবাজি ছিল আমোদের প্রকাশ। আনন্দেরও। একটি মাপা শটে যখন বল ঢুকে যেত বিপক্ষের গোলে, তখন ভিতর থেকেই কে যেন উল্টে-পাল্টে দিত শরীর। খেলার মাঠের এমন উদ্‌যাপন– পাড়ার মাঠ থেকে বিশ্বের তাবড় রঙ্গমঞ্চে, এখনও সমানে চলেছে সেই ট্র্যাডিশন। কিন্তু শব্দের অর্থ যে বদলে যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে! এমন নির্বিষ শব্দ তার অন্য সব অর্থ ছেড়ে কখন যেন ঢুকে পড়ল সংবাদপত্রের পাতায়। তার গায়ে লাগল অনৈতিকতার ছোপ। মাঠ একটা রইল বটে, কিন্তু সেই নির্ভেজাল আমোদ কী ক্ষুণ্ণ হল অনেকটা?

রাজনীতির মাঠের ডিগবাজিই ক্রমশ হয়ে উঠল এই শব্দের প্রকট অর্থ। নচিকেতা চক্রবর্তী কবেই যেন তাঁর এক অতি জনপ্রিয় গানে তো বলেই দিয়েছেন এসব কথা, ‘আজকে যিনি দক্ষিণেতে, কালকে তিনি বামের/আজকে যিনি তেরঙ্গাতে, কাল ভক্ত রামের।’ ডিগবাজির এমন উদাহরণ আমাদের দেশে বা রাজ্যে এত আছে, তা নিয়ে কথা বলতে ভয় হয়। তারপর দেখা গেল, আমাকেও ছোটবেলার মতো ডিগবাজি খেতে হল! তাই সে ঝুঁকি না-নিয়ে অন্য দেশে যাওয়া যাক।

zoom
শিল্পী: জেমস স্টেইনবার্গ

রাজনৈতিক ডিগবাজিকে মজাদার করে তোলার জন্য নানা কিসিমের শব্দও পাওয়া যায়। জানি না, পেলে বা গ্যারিঞ্চা গোল করে মাঠে ডিগবাজি দিতেন কি না, কিন্তু ব্রাজিলের রাজনৈতিক মাঠে ডিগবাজি দেওয়ার চল খুব বেশি, আর সেই কারণে একটি বিশেষ শব্দও আছে তাদের ডিকশনারিতে। যদি ‘ট্রোকা ট্রোকা’ শব্দ শোনা যায় স্থানীয় লোকেদের মুখে, তাহলে বুঝবেন তাঁরা ডিগবাজির কথাই বলছে। ইতালিতে নাকি সরাসরি ডিগবাজি বলা হয় না, বলা হয় ‘ছাতা-বদল’। ছাতা-বদলের মতো ‘কোট-বদল’ বা ‘জামা-বদল’-এরও চল আছে; এছাড়া আছে ‘ফ্লিপ-ফ্লপ’, ‘পার্টি হপিং’, ‘পার্টি সুইচিং’ বা ‘ফ্লোর-ক্রসিং’– ডিগবাজির আবার কত সমার্থক শব্দ! তবে এই নিয়ে সীমাহীন বাড়াবাড়ির জন্য একবার ফিরতেই হবে আমাদের দেশে। বছর ষাটেক আগে হরিয়ানার এক নির্বাচিত প্রতিনিধি গয়া লাল নাকি একদিনে তিনবার ডিগবাজি খান, আর তাঁর এই যাওয়া-আসার কারণে নাকি কংগ্রেসের এক নেতা প্রেসের কাছে বলেন, ‘গয়া রাম অব আয়া রাম হ্যায়।’ এরপর থেকেই নাকি ‘আয়ারাম গয়ারাম’ শব্দবন্ধটি চালু হয়ে যায় ভারতীয় বেশ কয়েকটি ভাষায়।

…………………………………………………….

বছর ষাটেক আগে হরিয়ানার এক নির্বাচিত প্রতিনিধি গয়া লাল নাকি একদিনে তিনবার ডিগবাজি খান আর তাঁর এই যাওয়া-আসার কারণে নাকি কংগ্রেসের এক নেতা প্রেসের কাছে বলেন, ‘গয়া রাম অব আয়া রাম হ্যায়।’ এরপর থেকেই নাকি ‘আয়ারাম গয়ারাম’ শব্দবন্ধটি চালু হয়ে যায় ভারতীয় বেশ কয়েকটি ভাষায়।

…………………………………………………….

তবে শুধু রাজনীতি নয়, নিজের আদর্শ, দর্শন আর বিশ্বাসের থেকেও যে ডিগবাজি দেওয়া যায়, সে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত জাপানের লেখক কেনজাবুরো ওই। একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর কয়েকজন চরমপন্থী সদস্য নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করলে, সেই গোষ্ঠীর দুই ধর্মীয় গুরু জনমানসের সামনে এসে নিজেদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের প্রচারিত আদর্শ, সবই প্রত্যাহার করে নেন। তাঁদের এই হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তকে সাধারণ লোক এবং মিডিয়া ব্যঙ্গ করে ‘ডিগবাজি’ বলে মনে করে। দশ বছর পরে অবশ্য আবার ফিরে আসেন এই দুই ধর্মগুরু। কেনজাবুরো ওই-এর এই উপন্যাসের ইংরেজি তরজমার নাম ‘সমারসল্ট’ (ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল অনূদিত)।    

zoom

জি কে চেস্টারটনের গল্পের এক চরিত্র, ছবি-আঁকিয়ে, কবি এবং গোয়েন্দা গ্যাব্রিয়েল গেল মনে করত, যদি মাথা মাটিতে রেখে তার ওপর দাঁড়ানো যায়, তাহলে সে ল্যান্ডস্কেপ হোক বা অন্য যে-কোনও দৃশ্য, অনেক বেশি স্পষ্ট বা সজীব দেখতে লাগে। জীবনের সত্য নাকি উন্মোচিত হয় এই গতানুগতিক দৃষ্টির বাইরে অন্যভাবে দেখার মধ্য দিয়ে। সমাজ আর সংসারের নানা কূটকচালিকে সরিয়ে জীবনকে বুঝতে হলে ডিগবাজি আবশ্যক। চেস্টারটনের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন কি না, জানি না, কিন্তু চিন্তার আশ্চর্য মিল পাওয়া যায় আমেরিকার কবি ডেভিড ইগনাটাও-এর একটি কবিতার মধ্যে। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ব্যাগেল’ কবিতায় দেখা যাচ্ছে যে কথকের হাত থেকে পড়ে গিয়েছে গোলাকার কেক– ব্যাগেল। যেই না হাওয়া এসে তা উড়িয়ে নিয়ে গেল, তখনই তার মনের মধ্যে জেগে উঠল আশ্চর্য এক অনুভূতি, নিজেকে দোষী মনে হতে লাগল আর মনে হল, কোনও এক অভিশাপ বুঝি নেমে আসবে তার ওপর। ব্যাগেল গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে তার পিছনে দৌড় দিল সে, নীচু হয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে। এমন সময়ে হঠাৎই হোঁচট খেয়ে রাস্তায় ডিগবাজি খেল, যেন সে ভ্যাংচাচ্ছে ব্যাগেলটিকে আর অদ্ভুতভাবে মনের ভয়-বিরক্তি-অনুশোচনা যেন ডিগবাজি খেয়ে একেবারে আনন্দে ভরে উঠল,–

 … I found myself doubled over
and rolling down the street
head over heels, one complete somersault
after another like a bagel
and strangely happy with myself.

আসলে ডিগবাজির মধ্যেই আছে আনন্দ, আমোদ আর যা-ইচ্ছে-তাই করার অপার স্বাধীনতা। আপনাদের মনে পড়বে, বছর দশেক আগে ইংল্যান্ডের নর্থ ডেভন-এ বসেছিল ফোক মিউজিক ফেস্টিভ্যালের আসর। ২০১৪-’১৫ জুড়ে চলেছিল সেই উৎসব। সেই জমায়েতে হাজির হয়ে, বিচিত্র সব তাঁবু সাজিয়ে সংগীতের সুরে মাতোয়ারা হয়ে অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায় মেতেছিলেন মানুষ। যা খুশি করার সনদ ছিল তাঁদের। খেয়াল করবেন, এই ফেস্টিভ্যালের নাম ছিল ‘সমারসল্ট ফেস্টিভাল’। ডিগবাজি এখানে এসেছিল বন্য স্বাধীনতার উদ্‌যাপনের ছাড়পত্র হয়ে, উৎসবের উদ্যোক্তারা যার ক্যাপশন দিয়েছিলেন ‘ওয়াইল্ড ওয়েলবিইং’!

zoom
সমারসল্ট ফেস্টিভাল

তবে বন্য ডিগবাজি কি শুধুই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বয়ে আনে? পুরুষ মাকড়সা রেডব্যাক-এর কাছে কিন্তু একেবারেই তা নয়। প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালি অভিশাপ লেগে আছে এই বিশেষ পুরুষ মাকড়সার যৌনজীবনে। নারী মাকড়সার সঙ্গে যৌনমিলনের পর চরম উত্তেজনায় নাকি উত্তুঙ্গ বিষাদে পুরুষ মাকড়সা একটি নিখুঁত ডিগবাজি খেয়ে ঢুকে যায় স্ত্রীর মুখের মধ্যে– এভাবেই প্রাণত্যাগ করে তারা। এই ডিগবাজি আসলে ‘সেলফ স্যাক্রিফাইসিং সমারসল্ট’– এক চরম আত্মঘাতী ডিগবাজি। পাঠক, এটি একেবারেই নিখাদ জীবজাগতিক রহস্য, নারী-পুরুষ মাকড়সার মধ্য দিয়ে আবার কোনও মেটাফরের ইশারা খুঁজবেন না প্লিজ! মাথায় রাখবেন, সাপ কিন্তু ভয় পেলে অনেক সময়ে ডিগবাজি খায়।

zoom
রেডব্যাক মাকড়সা

এই লেখার শুরুতে বাংলা বর্ণমালার কথা বলেছিলাম, আবার ফিরি সেখানেই। কারণ জীবনে প্রথম ডিগবাজির কথা শুনেছিলাম এই প্রসঙ্গেই। তখনও মজা করে ডিগবাজি দিতে শিখিনি। তারপর অবশ্য নানা বয়সে নানা রকমের ডিগবাজি দিয়েছি। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়ও ডিগবাজি কম দেয়নি। সেইসব কথা চাপা থাকাই ভালো! যাই হোক, প্রথম ডিগবাজির কথা শুনেছিলাম, ‘৯-কার যেন ডিগবাজি খায়।’ তখন একমাত্র ৯-কারকেই এ-জন্য ভালো লাগত… কেমন নিজের মতো মজা করছে ওইসব অজগর-ঈগল-উট, ওল খেয়ে গলা ধরা, ঝুলে থাকা ‘ঊ’ আর অকারণ পুজো করে যাওয়া ঋষিমশাইদের ভিড়ে!

কিন্তু বড় হয়ে দেখলাম, ৯-কার এমন ডিগবাজি খেল, এত ডিগবাজি খেল, বর্ণমালা থেকেই বেরিয়ে গেল। সুতরাং, সাধু সাবধান, এই বাজি কিন্তু বিপজ্জনক, হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার!

Animal Behaviour Backflip Acrobatics Kali Puja Special Redback Spider Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Science and Nature Somersault Spider Mating Behaviour

Share this article on