Winter in Santiniketan: Festival, Tagore Songs and Nature | Robbar
Robbar
  • ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ৪ নভেম্বর ২০২৬

শীত, ঠাকুরের আপন দেশে

গৌরপ্রাঙ্গণ জুড়ে শীত সকালের নরম আলো, আর বৈতালিকের প্রার্থনার পরেই ছাত্রছাত্রীরা সেখানে খুঁজে নিচ্ছে রোদ্দুরমাখা এক-একটা জায়গা– ক্লাসের জন্য আসন পাতবে, এসে পড়বেন মাস্টারমশাই। ফ্ল্যাশব্যাকে দেখছি, ক্লাসে ‘শান্তিনিকেতনে শীতকাল’ নিয়ে আমাদের রচনা লেখা শুরু, গানের ক্লাসে রবীন্দ্রনাথের শীতের গান একের পর এক শিখে নিচ্ছি। কোনও কোনও সকালে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কাছেই একটু বেরিয়ে পড়া ছিল আমাদের, প্রকৃতির রং-রূপ-ছোঁয়া তখন নাগালের মধ্যেই।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১৮:২৫   
Facebook WhatsApp Messenger

শিউলির দিন শেষ, কোপাইয়ের তীরে কাশ বিবর্ণ। আর অল্পকালেই হেমন্ত-পর্ব পার হয়ে, হিমমাখা ভোর ও কুয়াশায় অস্বচ্ছ সন্ধ্যা নিয়ে, শীত এসে পড়ল শান্তিনিকেতনে। নভেম্বরের শেষ থেকেই এখানে অল্প ঠান্ডা, দিন ছোট হয়ে এসেছে, বিকেলের শেষ আলো আশ্রম মাঠের পশ্চিমে দীর্ঘ গাছগুলিকে মুড়ে নেয় মায়ায়। এবার শুকনো হাওয়ায় গাছে গাছে সবুজ পত্ররূপ বিবর্ণ হয়ে আসবে, তবে মরশুমি ফুলে বর্ণময় হয়ে উঠবে চারিদিক। ‘শান্তিনিকেতন বাড়ি’-র উত্তর-পশ্চিমে উদ্যান বিভাগ জুড়ে রঙিন ফুলের কেয়ারির প্রস্তুতি শেষ। আর কিছুদিনেই দেখব, উপাসনা গৃহ সংলগ্ন বাগানে, শান্ত ছাতিমতলার প্রান্ত জুড়ে, উত্তরায়ণে ফুল-সম্ভার। সারা বছরের গুলঞ্চ তো আছেই, আর হেমন্তের হিমঝুরি তখনও অপূর্ব ফুলসজ্জা নিয়ে দাঁড়িয়ে। 

zoom
শিল্পী: নন্দলাল বসু

গৌরপ্রাঙ্গণ জুড়ে শীত-সকালের নরম আলো, আর বৈতালিকের প্রার্থনার পরেই ছাত্রছাত্রীরা সেখানে খুঁজে নিচ্ছে রোদ্দুরমাখা এক-একটা জায়গা– ক্লাসের জন্য আসন পাতবে, এসে পড়বেন মাস্টারমশাই। শীতের দিনে বকুলতলা কি আম্রকুঞ্জে গাছের ঘন ছায়ার তলায় ক্লাস করতে ছোটদের উৎসাহ কিছু কম। ফ্ল্যাশব্যাকে দেখছি, ক্লাসে ‘শান্তিনিকেতনে শীতকাল’ নিয়ে আমাদের রচনা লেখা শুরু, গানের ক্লাসে রবীন্দ্রনাথের শীতের গান একের পর এক শিখে নিচ্ছি আমরা। কোনও কোনও সকালে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কাছেই একটু বেরিয়ে পড়া ছিল আমাদের, প্রকৃতির রং-রূপ-ছোঁয়া তখন নাগালের মধ্যেই। পাতা-ঝরা দেখাতে আমাদের প্রকৃতিপাঠ ক্লাসের মাস্টারমশাই শেষ-শীতে এক-একদিন নিজেই নিয়ে যাচ্ছেন উপাসনা গৃহের সামনে পুরনো মেলার মাঠে (এখন ‘জগদীশ কানন’), তখনও প্রবেশ ছিল অবাধ। মাঠের মাঝখান দিয়ে যে কাঁকরের পথ উত্তরে সোজা গিয়ে মিলেছে রতনকুঠির সামনের রাস্তায়, তার দু’পাশে আমলকী গাছের সারি, ঝিরিঝিরি পাতা ঝরছে। ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকীর এই ডালে ডালে/ পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে’ অথবা ‘আমলকী-ডাল সাজল কাঙাল, খসিয়ে দিল পল্লবজাল’ তখন গানের খাতা থেকে উঠে এসেছে দৃষ্টির ভিতরেই, সেই আমাদের মুগ্ধ বাল্যে। 

zoom
শিল্পী: বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

শূন্যতা আর পূর্ণতার আশ্চর্য সহাবস্থান শান্তিনিকেতনে শীত জুড়ে, যতদূর চোখ যায়– এদিকে-ওদিকে গাছ জীর্ণ হলুদ পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে, যেন ঝরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়, আবার মরশুমি ফুলের রঙের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠছে চারিদিক। ঋতুচক্রের সঙ্গে মিলিয়ে গানের যাত্রা এখানে অব্যাহত সারা বছর– হিমের দিন শুরু হতেই রবীন্দ্রনাথের শীতের গান গাওয়ার পালা। আশ্রম ক্যাম্পাসে বেলার দিকের গানের ক্লাসগুলিতে ছাত্রছাত্রী গাইছে সমবেত, “শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে ব’লে/ শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে…”, ‘আমরা নূতন প্রাণের চর হা হা…’, অথবা ‘একি মায়া, লুকাও কায়া জীর্ণ শীতের সাজে…’– উপরে আকাশ স্বচ্ছ নীল, হালকা উষ্ণ রোদ্দুর। মঙ্গলবার সন্ধ্যায়, উত্তরীয়-ফুল-পাতায় সাজানো সাপ্তাহিক বিভাগীয় সাহিত্যসভায় সেই সব গান থাকছেই, সঙ্গে ছাত্রছাত্রীর মিলিত নাচ। কখনও মাস্টারমশাই শেখাচ্ছেন, ‘এল যে শীতের বেলা বরষ-পরে/ এবার ফসল কাটো, লও গো ঘরে…’। ওদিকে অঘ্রান-পৌষ জুড়ে জেলার ঘরে ঘরে নবান্নেরই আয়োজন– গান আর চেনা লৌকিক ভুবন কখন মিলে যায়।

zoom
শিল্পী: নন্দলাল বসু

বিবর্ণতার পাশাপাশিই রঙের উদ্ভাস শীতের শান্তিনিকেতনে। একদিকে সবুজ প্রকৃতির লাবণ্য কম, রুক্ষ উদাস রূপ, অন্যদিকে যত্নের কেয়ারিতে চন্দ্রমল্লিকা, পিটুনিয়া, প্যানজি, আরও অজস্র ফুলের উৎসব। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার আর রতনকুঠির বাগানে গোলাপের সমারোহ; হ্যামিলটোনিয়া গাছগুলিও ভরে উঠছে থোকায় ফোটা সুগন্ধী ফুলে। মনে পড়ছে, হাতে ড্রইং খাতা আর জলরং, পূর্ব-তোরণের একতলায় ছবি আঁকার ক্লাস থেকে বেরিয়ে এক-এক দিন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তিনপাহাড়ের পশ্চিমে সবুজ লনের দিকে, তার প্রান্তে রঙিন পপি দেখে বসে আঁকব। ‘শান্তিনিকেতন বাড়ি’-র সামনে, পথের দু’পাশে বেড়ার ধার দিয়ে, উজ্জ্বল হলুদ, কমলা ন্যাস্ট্রাশিয়াম ফুলের বেড– অন্য একদিন, আরও একটু উচ্চাশী হয়ে, সে-ও আঁকতে চলেছি। ছোটবেলার সেসব ছবির কী দাম ছিল জানি না, তবে ওই রং আর বিস্ময়ের মুহূর্তগুলিই শীতের অনুষঙ্গ হয়ে রইল আজও পর্যন্ত। আশ্চর্য নয় যে, এখানে শিশুদের শীতের ছড়ায় মেলা-পিকনিক-পিঠেপার্বণ, ফুলের কথা আর পাতাঝরার কথা সমস্তই মিলে থাকে। রঙিন গরম জামায় তাদের চলাচল, উচ্ছলতা, আনন্দ পাঠশালা থেকে আশ্রম মাঠ, গৌরপ্রাঙ্গণ থেকে বকুলতলা, তাদের কলরোল সারা সকাল, শীতের এই চেনা ছবিও কম বর্ণবহুল নয়।

zoom
শিল্পী: বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

শ্যামবাটির পথ ধরে শীতের বিকেলে হেঁটে এগিয়ে চলেছি, দু’পাশে প্রকৃতি ধূসর… সেচখালের কিছু আগে, বাঁদিকে দূরের শর-কাশ, বুনো ঘাসের জঙ্গলের ভিতরে আবছা জলরেখা, ডিয়ার পার্কের ওয়াচ টাওয়ার, কুয়াশার জাল নেমে আসছে– দূর থেকে সেদিন শিল্পী বিনোদবিহারীর ল্যান্ডস্কেপ ছবি মনে হয়েছিল। আরও এগলে বাঁ-দিকে সোনাঝুরি বন, খোয়াই, সামনে গোয়ালপাড়ার পথ, তারও পরে শীতের কোপাই নদী গোধূলির সাক্ষী হয়ে জেগে থাকে। অল্প তিরতিরে জলধারা, এখানে ওখানে চরা, শ্যাওলায় জড়ানো আগাছা, দু’পাশে শুকনো কাশবন শরতের স্মৃতি হয়ে… আর এইসব নিয়েই হিম-কুয়াশার কোপাই।

শীতের খোয়াইয়ের রূপও বর্ষার জলে ভরা খোয়াইয়ের সঙ্গে মেলে না। ফেরার পথ প্রায় নির্জন, কুয়াশা-মোড়া, মনে পড়ে যায়– স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শীতের প্রকৃতিকে ‘কঠিন’, ‘কাঙাল’ বলে, তার ‘জীর্ণ সাজ’, ‘সাজ-খসাবার লীলা’-র কথা বলে, তার বহুরূপের সমাদরই করে নেন তাঁর গানে। কখনও তিনি বলেন, ‘কৃপণ হয়ে হে মহারাজ, রইবে কি আজ/ আপন ভুবন-মাঝে’, কখনও বলেন, ‘হে সন্ন্যাসী,/ হিমগিরি ফেলে নীচে নেমে এলে কিসের জন্য।/ কুন্দমালতী করিছে মিনতি, হও প্রসন্ন।’

zoom
শিল্পী: সেলিম মুন্সী

ডিসেম্বর থেকেই সকালে উত্তরের হাওয়ায় এখানে হিমের ছোঁয়া, ক্লাস শুরু হচ্ছে দেরিতে। দেখতে দেখতে বিকেল আরও ছোট হয়ে আসছে, সন্ধ্যায় বাতাস ভারী হয়ে থাকে ছাতিম ফুলের তীব্র গন্ধে। একই সঙ্গে, আনন্দ উচ্ছ্বাসেরও উপলক্ষ ডিসেম্বর জুড়েই– ছাত্রছাত্রীদের বার্ষিক স্পোর্টস, পিকনিক, শিল্প-প্রদর্শনী, এক্সকার্সনের পাশাপাশি উৎসব-অনুষ্ঠান-মেলাও। প্রথম সপ্তাহে ‘নন্দন মেলা’ অথবা শেষ সপ্তাহে ‘পৌষমেলা’ শান্তিনিকেতনের শিল্প-সংস্কৃতি-প্রথা মিলিয়ে নিয়ে এক অর্থে এখানকার জীবনের অঙ্গই। শিল্পী নন্দলাল বসুর নামাঙ্কিত বার্ষিক নন্দন মেলা (১, ২ ডিসেম্বর) যেন নান্দনিকতার মহোৎসব; ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু হয়ে কলাভবন ক্যাম্পাসে বিশিষ্ট শিল্পী, অধ্যাপক আর ছাত্রছাত্রীদের শিল্প-নিদর্শনের এই এক আশ্চর্য পরিসর!

পৌষমেলার সূচনায় ৭ পৌষ সকালে ছাতিমতলায় উপাসনা, ৮ পৌষ আম্রকুঞ্জে বিশ্বভারতীর সদ্য-উত্তীর্ণ স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সমাবর্তন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা-দিবস পালন– এখানকার পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে সবই জড়িয়ে। অপূর্ব আলোকোজ্জ্বল উপাসনা গৃহে ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ‘খ্রিস্ট উৎসব’-এর আয়োজন প্রাসঙ্গিক পাঠে, গানে, প্রার্থনায়। তবে সব মিলিয়ে, পৌষমেলা, যা শান্তিনিকেতনের সমার্থক প্রায়, এখন এখানকার ‘উইন্টার কার্নিভাল’ হয়ে উঠেছে, তার এই সময়ের ভিড়, বিনোদন আর বিচিত্র পসরা সবটা নিয়েই। 

zoom
শিল্পী: কবরী বন্দ্য়োপাধ্য়ায়

নতুন বছরের শুরু থেকেই শান্তিনিকেতনে শীত তীব্র, দিন শুরুই হয় তাপমাত্রার চর্চা দিয়ে, মিডিয়ার খবর আর পূর্বাভাস নিয়ে কথা হতেই থাকে। তার মধ্যেই মিঠে রোদ্দুরে সারা সকালের ক্লাস, ব্যস্ত চলাচল, অতিথি-সমাগম, আর ফুলের সমারোহ, যতদূর চোখ যায়। পথে উৎসাহী টুরিস্টের ভিড়, তাঁরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন তিনপাহাড়, ‘মন্দির’ থেকে শুরু করে উত্তরায়ণ, উদয়ন, নন্দন, কলাভবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে যেভাবে সম্ভব। আরও এগিয়ে গিয়ে শ্রীনিকেতন, বল্লভপুর, খোয়াই, কোপাই, ‘আমার কুটির’ আর ‘সোনাঝুরির হাট’। ১১ মাঘ এখানে রীতি অনুযায়ী ‘মাঘোৎসব’; ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে তিন দিনের মাঘমেলা (শ্রীনিকেতনের বার্ষিক উৎসব) একটি স্নিগ্ধ, শান্ত আবহে গ্রামীণ বাংলার হস্তশিল্প প্রদর্শন আর বাউল, কবিগান, কবির লড়াই নিয়ে এখনও একটি লৌকিক পরিসর।

মাঘ শেষ হয়ে আসে, শীত যাই যাই করে, শান্তিনিকেতন প্রস্তুত হতে থাকে ঋতু-বদলের জন্য, শালবীথি জুড়ে এখন ঝরাপাতার আলপনা। মনে পড়ে যায়, ‘শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা/ তারি লাগি রইনু বসে সকল বেলা…’। এবার কচিপাতার দিন, আম্রকুঞ্জে নতুন মঞ্জরীর দিন, আর দক্ষিণ হাওয়ার।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন উমা চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

………………….

Ballavpur Christmas Khoai Maghotsob Memoir Poushmela Rabindra Sangeet Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan Sonajhuri Winter Diaries

Share this article on