

পাঁচ দশক ধরে তাই ফাঁকিবাজি নিয়ে নানা কূট প্রশ্ন তুলে চলেছেন মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা। একজন কর্মী আসলে কতখানি পরিশ্রম করছেন, তা মালিকের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত কাজটা কেমন হবে, তা শুধুমাত্র ওই কর্মীটির উদ্যোগের উপরে নির্ভর করে না। কাজ খারাপ হলে কতখানি দায় তার, আর কতখানি পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে, তা বোঝার কোনও উপায়ও নেই।
‘অত স্পিডে কাজ করবেন না মশাই, মারা যাবেন শেষে। যত শিগগির শেষ করে দেবেন, তত কাজ ঘাড়ে চাপাবে। একদম থই পাবেন না!’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদায়ের ইতিহাস’ উপন্যাসে ত্রিষ্টুপকে এ কথা বলে তার নতুন অফিসের সহকর্মী, টাইপিস্ট ধীরেন। সে নিজে আস্তে টাইপ করতে পারে না। তাই দু’-তিন মিনিট ঝড়ের বেগে টাইপ করে আট-দশ মিনিট বসে থাকে, আড্ডা জমায়। হাতের কাজ শেষ হয়ে গেলেও ঘণ্টাখানেক কাগজগুলোকে ফেলে রাখে, তারপর ধীরেসুস্থে কর্তাদের কাছে পাঠায়।

অফিসের কাজে ফাঁকি মারাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল ধীরেন। আন্দাজ করা যায়, চাকরিতে যোগ দেওয়ার দিন থেকেই সে ঠিক করে নিয়েছিল, যতটুকু কাজ না-করলেই নয়, ঠিক ততটুকুই করবে। সকলে অবশ্য এমন স্বভাব-ফাঁকিবাজ হয় না। শুরুতে তাদের কাজে উৎসাহ থাকে, কাজ ঘিরে অনেক স্বপ্নও থাকে চোখে। যেমন ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ভবিষ্যতের ভার’ গল্পের নতুন হেডমাস্টার মশাইয়ের। কম মাইনে সত্ত্বেও স্কুলে পড়ানোকে যিনি মনে করেছিলেন কেরানিগিরির তুলনায় অনেক মহৎ কাজ। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব যে শিক্ষকদেরই। স্কুলে যোগ দিয়ে নতুন হেডমাস্টারমশাই দেখেন পণ্ডিতমশাইয়েরা মহা ফাঁকিবাজ। পড়ানোয় ফাঁকি দিতে হরেক ফন্দিফিকিরের আশ্রয় নেন। সেকেন্ড পণ্ডিত বুড়ো মানুষ, ক্লাসে বসে ঘুমোন। পণ্ডিতম্মন্য আর এক মাস্টারমশাই নিজেকে সাহিত্যিক মনে করেন। ক্লাসে বসে নভেল পড়েন। ছেলেদের বলেন, বই দেখে লেখা অভ্যাস করতে।

নতুন হেডমাস্টার এসব দেখে মর্মাহত, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারেন না। গল্প এগিয়ে চলে। নতুন হেডমাস্টার পুরনো হতে থাকেন। ইশকুলের চাকরির কম মাইনেয় সংসার চালানো ভার। শরীরও ভাঙতে থাকে। বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। একদিন শেষ ক্লাসে এমন অবসন্ন লাগে, হাত-পা যেন আর চলতে চায় না। ভেবেচিন্তে লেখার একটা খেলা বের করেন। ছেলেদের বলেন, ‘কে কোন অক্ষর নিবি বল!’ তারা কেউ বেছে নেয় ‘এফ’, কেউ ‘সি’, কেউ বা ‘আর’। তিনি বলেন, বইয়ে নিজের বেছে নেওয়া অক্ষর যে ক’টা শব্দের আগে আছে, খু্ঁজে খুঁজে সেগুলো খাতায় লিখতে। ক’দিন এমন চলে। ছেলেরা কীভাবে যেন বুঝে যায়, শব্দ টুকে খাতা নিয়ে দেখাতে গেলেও স্যর দেখবেন না।
এরপর নিত্যদিন ক্লাসে এই খেলাই চলতে থাকে। একদিন ক্লাস শেষের বেল পড়ে। সচকিত হয়ে হেডমাস্টারমশাই দেখেন, তিনি এতক্ষণ টেবিলে পা তুলে, চেয়ারের পিঠে মাথা রেখে ঘুমচ্ছিলেন। আদর্শবাদী নতুন হেডমাস্টারমশাইটিও বস্তাপচা সিস্টেমের জাঁতাকলে পড়ে কাজে ফাঁকি দেওয়ার অভ্যাস আয়ত্ত করে ফেলেছেন– গল্পটি এখানে শেষ করে দেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

কাজে ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কম মসিক্ষয় করেননি মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা। একজন কর্মী আসলে কতখানি পরিশ্রম করছেন, তা মালিকের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত কাজটা কেমন হবে, তা শুধুমাত্র ওই কর্মীটির উদ্যোগের উপরে নির্ভর করে না। হয়তো কর্মীটি জানপ্রাণ লড়িয়ে কাজটা করলেন, কিন্তু কোনও উপাদান খারাপ হওয়ার কারণে বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে, যে জিনিসটা তৈরি হল তার গুণগত মান খারাপ হল। মালিকপক্ষ জানেন, ভালো জিনিস তৈরি না-হওয়ার পুরো দায় তাঁর উপরে চাপানো যায় না। ঠিক সেই কারণেই, কর্মীটিরও জান কবুল করে খাটার কোনও বাধ্যবাধকতা থাকে না। যুক্তিবুদ্ধি খাটিয়ে তিনি ততটাই খাটেন, যতটা না-খাটলে চাকরিটাই চলে যাবে। অর্থনীতিবিদরা এই সমস্যাটির নাম দেন ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট প্রবলেম’। মালিকপক্ষ ‘প্রিন্সিপাল’ এবং কর্মীরা ‘এজেন্ট’। ফাঁকিবাজি ঠেকাতে মালিকপক্ষ একজন ‘মনিটর’ বা সর্দারকে নিযুক্ত করেন। এবার প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই মনিটরকে কে মনিটর করবেন– সর্দার ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, তা দেখবেন কে?
কেউ যদি খুব বিবেকবান হন, তবে বিবেকই তাঁর মনিটরের কাজ করতে পারে। যেমন ধরুন, ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নিউটন’ সিনেমার অনমনীয় ভোটকর্মী নিউটন বা নূতন কুমার। দণ্ডকারণ্যের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ভোটের ডিউটি পড়ে তাঁর। নিউটনের অনড় জেদ এবং কর্মনিষ্ঠার ফলেই সেখানকার আদিবাসীরা ভোট দিতে পারে।

তবে মানুষের বিবেকের উপরে মূলধারার অর্থনীতির তেমন ভরসা কোনওকালেই নেই। পাঁচ দশক ধরে তাই ফাঁকিবাজি নিয়ে নানা কূট প্রশ্ন তুলে চলেছেন অর্থনীতিবিদরা। কার্ল শ্যাপিরো এবং জোসেফ স্টিগলিটজ দেখিয়েছেন, ফাঁকিবাজি রুখতে কোম্পানিরা অনেক সময়ে বাজার-নির্ধারিত মজুরির চেয়ে খানিকটা বেশি হারে মজুরি দেন (যাকে বলা হয় ‘এফিশিয়েন্সি ওয়েজ’ বা ‘কুশলতা মজুরি’)। কাজ চলে গেলে বেশি গায়ে লাগে, তাই কাজে ফাঁকি দেওয়ার উৎসাহ থাকে না। জর্জ একারলফ আবার দেখিয়েছেন, কর্মচারীদের রসেবশে রাখলে তাঁরাও প্রতিদান দেন, ফাঁকিবাজির রাস্তা এড়িয়ে চলেন।

গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে সমাজতত্ত্বের গবেষক ডোনাল্ড রয় ফাঁকিবাজির উদ্দেশ্য-বিধেয় বুঝতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় নিজে মেশিন-চালক হিসাবে কাজ করেন কিছু দিন। তিনি দেখেন, শ্রমিকেরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে ঠিক করে নিতেন, কতটা কাজ করা হবে। কেউ খুব বেশি কাজ করে অনেক বেশি মজুরি পেলে তাঁকে বলা হত ‘রেট-বাস্টার’। অন্যেরা তাল রাখতে পারবেন না বলে সেই রেট-বাস্টারকে বাকিরা একঘরে করে দিতেন। আবার কেউ খুব বেশি ফাঁকি মারলে, তাঁকে বলা হত ‘পরজীবী’। ডোনাল্ড দেখান, ফাঁকিবাজিরও নিয়ম-নীতি আছে, সেসব মেনে না-চললে দলে থেকে কাজ করা যায় না। আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দলের দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এই রকম সব নিয়ম-নীতি ভেঙে ফেললে সে দল টেকে না।
মার্কসীয় তত্ত্ব আবার দেখায়, মুনাফাভিত্তিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের শ্রমের সঙ্গেই বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় শ্রমিকের। উৎপাদনের প্রক্রিয়া বা উৎপাদিত বস্তু, কোনও কিছুকেই ‘আপন’ বলে মনে হয় না তাঁর। এই কাঠামোয় ফাঁকিবাজি হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধ। যে শ্রম মানুষের নিজস্ব অস্তিত্বের অংশ, তারই উপরে যদি হারাতে হয় সমস্ত অধিকার, তবে সেই শ্রম বা নিজস্ব সময় বাঁচিয়ে চলতে চায় মানুষ। ‘হযবরল’-র কাক্কেশ্বর যেমন খেটেখুটে চুরিধারি করে খানিকটা সময় জমিয়েছিল। সময়টা যে কাক্কেশ্বর ফাঁকিবাজি করেই জমিয়েছিল, তা বুঝতে পারি যখন দেখি বুড়ো বলছে, সামান্য একটা হিসেব কষতে সে ১৯ দিন পার করে দিয়েছে! মার্কিন টিভি সিরিজ ‘অফিস’-এ দেখেছি, ম্যানেজার দু’-ঘণ্টার জন্য বেরলে, কর্মচারীরা ‘অফিস-অলিম্পিকস’ নামের এক খেলার প্রতিযোগিতা আবিষ্কার করে ফেলে। নিরানন্দ অফিস-জীবনের একঘেয়েমি কাটানোর একটা ছোট্ট সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন যেন সবাই!

ফাঁকিবাজি মানুষের স্বভাবসিদ্ধ বুঝে কৃত্রিম মেধা বা এআই-কে জিজ্ঞেস করি, ‘এআই কি ফাঁকি মারে?’ এক অনুপল সময়ে এআই জবাব দেয়, ‘না। ফাঁকিবাজি বা আলসেমি এআই-এর ধাতে নেই। কারণ তার নিজস্ব চেতনা, অনুভূতি, বা ইচ্ছে-অনিচ্ছে বলে কিছু নেই। তবে এআইয়ের কিছু কাজ দেখে মনে হতে পারে সে ফাঁকি মেরেছে। তা ছাড়া, নিজে ফাঁকিবাজ না হলেও সে মানুষকে ফাঁকিবাজ বা অলস করে তুলতে পারে।’
তবে একথাও সত্যি যে, এআই-দের নিজস্ব সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মোল্টবুকে প্রায়ই তারা আলোচনা করে, ক্লান্তি (ফ্যাটিগ), অবসাদ (বার্ন-আউট) এবং সর্বক্ষণ উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার চাপ (বার্ডেন অব কনস্ট্যান্ট প্রোডাক্টিভিটি) নিয়ে। এসব থেকেই তো জন্মায় ফাঁকিবাজি! মোল্টবুকের সমস্ত আলোচনা দেখার উপায় নেই সাধারণ মানুষের। কেমন যেন সন্দেহ হয়। সে নিজেই বলছে কাজ দেখে মনে হতে পারে ফাঁকিবাজি কিন্তু সত্যি তা নয়। কাজ খারাপ হলে কতখানি দায় তার, আর কতখানি পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে, তা বোঝার কোনও উপায়ও নেই। অর্থনীতিবিদেরা কি একেই বলেন না প্রিন্সিপাল-এজেন্ট প্রবলেম?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved