অর্ধেন্দু সর্বদা তাঁর সহপাঠীদের বেশভূষা নিয়ে পরামর্শ দিতেন। বিশেষ করে যাঁরা শিল্পী হতে চলেছেন তাঁদের উদ্দেশে এক ঝাঁক উপদেশ বহাল ছিল। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ যদিও একে ‘অযাচিত উপদেশ’ বলেছেন। উপদেশের মধ্যে অন্যতম– ‘ধুতির সঙ্গে শার্ট পরা এ একেবারে অশিল্পীজনোচিত; ধুতির সঙ্গে পাঞ্জাবি পরতেই হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৫.
একসময় শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানা রসিকতার ঝড় বয়েছে, বিশেষ রসিকতার কেন্দ্রে ছিল কলাভবন। সে অনেকটাই তাদের পোশাকআশাক, বোহেমিয়ান ভাবভঙ্গির জন্য। আধুনিক বাঙালির ফ্যাশন-ট্রেন্ড এখানেই তৈরি হয়েছিল কি না জানি না। তবে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শেষের কবিতা’য় অমিতের জবানিতে ফ্যাশন আর স্টাইলের সার কথাটুকু বলে দিয়েছেন। খেয়াল করলে দেখি, সেকালে শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েরা অন্যদের থেকে বেশ আলাদা। এর কারণও যথেষ্ট। দিগন্তবিস্তৃত খোয়াই, গাছগাছালিতে ছাওয়া প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য স্বাভাবিকভাবেই নগরজীবন থেকে তাদের কিছু স্বতন্ত্র করে তুলবে। সেই অন্যরকম পরিবেশের জীবনচর্যা যে কিছু ভিন্নতর হবে, এ কোনও নতুন কথা নয়!

যা অন্যদের চোখে সহজে বিসদৃশ লাগবে, সেই ভিন্নতার বঙ্কিম সংজ্ঞা গড়ে উঠতেও দেরি হয় না। এখানেও তাই, অনায়াসে ছেলেমেয়েরা ‘শান্তিনিকেতনী’ বা ‘ন্যাকা’ সম্বোধনে ভূষিত হয়েছে। এখনও হঠাৎ করে কোথাও বাঁকা ভঙ্গি ভেসে ওঠে বইকি। শান্তিনিকেতন প্রসঙ্গে সেই বহুচর্চিত বাক্য ‘এই গরু সর-না, নইলে তোকে ফুল ছুড়ে মারব’ ইত্যাদি বক্রোক্তি গড়ে উঠেছে ঠিক কবে– তা জানা না-গেলেও হয়তো দু’য়ের দশকের গোড়াতে এর উদ্ভব। অন্যদের দোষ দেওয়া চলে না, কলকাতার ইটপাথুরে জীবন ছাড়িয়ে প্রকৃতির এমন আনন্দিত বন্দনা আর কোথায়? যা আশ্রমের ঋতু উৎসব? বেদমন্ত্র পাঠ, গানের সুর, রং-রেখার মায়া, কবিতার প্রবাহে চলা দিনযাপনের ছন্দ এই ভিন্নতার কারণ হয়ে থাকবে। যদিও দেখা যায় বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ঢের আগে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের দিকেই ধেয়ে এসেছে বিদ্রুপের অজস্র বাণ। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সেই তরুণ কবি হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গসমাজের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার পাশাপাশি অভিজাত সাজগোজ, এমনকী তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যকেও টার্গেট করা হয়েছে বারবার। সুযোগ পেলেই কবিকে খোঁচা দিয়েছে সম্পাদকের দল। মনে পড়বে ‘নবজীবন’ পত্রিকায় অক্ষয় সরকারের ‘ভাই হাততালি’ লেখায় কীভাবে আছড়ে পড়েছিল তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ– ‘রবীন্দ্রনাথ প্রতিভার দীপশিখা, ধীরে ধীরে জ্বলিলে এই শিখা স্বীয় বর্ধমান আলোকে চারিদিক আলোকিত করিবে; প্রাচীন সুগন্ধী তৈল নিবেদিত দীপের ন্যায় সেই অমল আলোকের সঙ্গে সঙ্গে সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত করিবে। সেই অমল, কোমল, কমলশোভাসমন্বিত মুখশ্রী– সেই উজ্জ্বল সলজ্জ ভাসা ভাসা, ভ্রমর-ভর-স্পন্দিত-পদ্ম-পলাশ-লোচন– সেই ঝামর-চামর-নিন্দিত, গুচ্ছে গুচ্ছে স্বভাব-বেণীবিনায়ত চিকুর ঝলমল মুখমণ্ডল, সেই রহস্যে আনন্দে মাখান, হাসি খুশি করা অধরপ্রান্ত– সেই সৎচিন্তার প্রসর ক্ষেত্র, সুন্দর শুভ্র, পরিষ্কার দর্পণোপম ললাট– ভগবানের এরূপ অতুল সৃষ্টি কখনও বৃথা হইবার নহে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। একদা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন এমন আক্রমণের টার্গেট, সেখানে তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি তির্যক ভঙ্গি বা ছাত্রছাত্রীদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিনিক্ষেপ কি স্বাভাবিক নয়? তবুও বলতে হবে, এ নিয়ে আটপৌরে বাঙালিকে বোধহয় দোষ দেওয়া যায় না। কলাভবনের কোনও কোনও ছাত্রের বেশবিন্যাস, চুলের কায়দা বা কথাবার্তায় নিঃসন্দেহে কিছু লালিত্যের আধিক্য প্রকাশ পেয়ে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে কলাভবনের একেবারে গোড়ার দিকের ছাত্র অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা ধরা যাক। প্রথমে তিনি কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন অসিতকুমার ছিলেন সেখানকার শিক্ষক। পরে অসিতকুমার কলাভবনে যোগ দিলে তিনিও শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। একেবারে শুরুতে যে চারজন ছাত্রকে নিয়ে কলাভবন গড়ে উঠেছে, অর্ধেন্দুপ্রসাদ তাঁদের অন্যতম। বাকি তিনজন ছাত্র যথাক্রমে হীরাচাঁদ দুগার, কৃষ্ণকিঙ্কর ঘোষ আর ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা। বিনোদবিহারী এসেছেন ঠিক পরেই।
এই দলে বিনোদবিহারী ছিলেন বয়সের দিক থেকে সবার ছোট। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ আর বিনোদ যে ঘরে থাকতেন তার পাশের ঘরে ছিলেন এই তিন ছাত্র– সকলেই কলকাতার আর্ট স্কুল থেকে এসেছেন। এঁদের মধ্যে অর্ধেন্দু সবচেয়ে সুদর্শন, শুধু তাই নয়, সে বিষয়ে নিজেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁর বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন– ‘এমনিতে দেখতে সুন্দর চেহারা, তার ওপরে একটু শৌখিন হওয়ায় যত্ন করে চেহারায় বেশ ঔজ্জ্বল্য এনেছিলেন। সুগন্ধ দ্রব্য ব্যবহার করতে ভালোবাসতেন। জামাকাপড় সর্বদা ধোপদুরস্ত। চোখে পাশনে চশমা, চশমার কাঁচের কোনো শক্তি নেই (পাওয়ারলেস)। প্রত্যেকদিনের জন্য এক-একটি ফিতার রঙ ছিল, সেই অনুযায়ী ফিতা পালটানো হত।’

অর্ধেন্দুর সাজের গল্প এখানেই শেষ নয়। ‘রোদে বের হলে মাথার ওপরে থাকত সুন্দর একটি বর্মি ছাতা, পায়েও ঐ দেশীয় সুন্দর এক জোড়া কাঠের স্যান্ডেল।’ আর তাঁর সাজের ফিনিশিং টাচ হতো ফুল দিয়ে– ‘প্রায়ই হাতে ধরা থাকতো কোনো সুগন্ধী ফুল।’ অর্থাৎ বাহুমূলে সুরভিত ডিওডরেন্ট, চোখে পাশনে চশমা আর কালীঘাট পটের বাবুর মতো হাতে ফুল ছিল ফ্যাশানের স্টেটমেন্ট। ছবি আঁকা শিখতে আসা অর্ধেন্দুপ্রসাদ নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক চলমান পটচিত্র। খানিক রসিকতার সুরে বললে, এ প্রায় পরশুরামের সেই লালিমা পাল (পুং)-এর জীবন্ত সংস্করণ।
বিনোদবিহারী অবশ্য তাঁর দুই সতীর্থ ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ এবং অর্ধেন্দু– দু’জনের কথাই বলেছেন। ত্রিপুরার অভিজাত পরিবারের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ নিজের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন। বিনোদবিহারী এঁদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন– ‘ধীরেনকৃষ্ণ আসেন ফিনফিনে পাঞ্জাবি, হাতে এসরাজ, wash-এর কাজ করেন, কাগজ ভিজিয়ে বোর্ডের ওপর রেখে কিছুক্ষণ এসরাজ বাজান, গান করেন। আর একদিকে অর্ধেন্দুপ্রসাদ– চোখে পাঁশনে, পাঁশনের ফিতে রোজই বদলান, খুব ঝাঁঝালো scent ব্যবহার করেন। ক্রামরিশ তাঁকে বলতেন, ‘a young man, with strong scent’। অর্থাৎ ফ্যাশনের দিক থেকে কলাভবনের ছাত্র ধীরেন্দ্রকৃষ্ণও কিছু কম ছিলেন না। তবে অর্ধেন্দু বুঝি তাঁকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন বিচিত্ররকম রোমান্টিক ভাবভঙ্গিতেও।

কলাভবনের সেই আদি পর্বে ‘দ্বারিক’ বাড়ি আর ছাত্রাবাসের মধ্যে ছিল এক সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। তার মাঝখানে একটা শিরিষ গাছ, শরতে সে কচিপাতায় সেজে উঠত। একদিন শরতের সকালে ছাত্রেরা কলাভবনের ক্লাসে চলেছে, পথে দেখা গেল সেই সবুজ মাঠে ‘সুবেশধারী’ অর্ধেন্দুপ্রসাদ আলুলায়িত অবস্থায় শয়ান। সেই কোমল নবতৃণদলের উপরে ঈষৎ কাত হয়ে তিনি ভূমিশয্যা গ্রহণ করেছেন। কৌতূহলী হয়ে তাঁকে ‘এখানে এমন করে শুয়ে আছেন কেন’– (সেকালে সহপাঠীদের পরস্পরের মধ্যে ‘আপনি’ সম্বোধনের প্রচলন ছিল) এই প্রশ্ন করায়, অর্ধেন্দু যেন মাখো মাখো ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন– ‘সারা নিশি ছিলেম শুয়ে বিজন ভুঁয়ে মেঠোফুলের পাশাপাশি’। তখন শরতকালের সূচনা হয়েছে, আকাশে যেমন নীলের সমারোহ, তেমনই মাঠের ঘাসফুলেও নীল লাল হলুদ বেগুনি ইত্যাদি রঙের ছড়াছড়ি। এ যেন সবুজ গালিচার ওপরে নানা রঙের মণিমাণিক্য ছড়ানো। অবশেষে বোঝা গেল, অর্ধেন্দুর এই ভূমিতে লুটিয়ে পড়ার কারণ রবীন্দ্রনাথের গান। কিছুদিন আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁদের শিখিয়েছিলেন এই গানটি– ‘সারা নিশি ছিলেম শুয়ে বিজন ভুঁয়ে/ আমার মেঠো ফুলের পাশাপাশি,/ তখন শুনেছিলেন তারার বাঁশি…’। অর্ধেন্দু ‘তারার বাঁশি’ শুনতে পেয়েছিলেন কি না জানা নেই, তবে প্রভাতে বিজন ভুঁয়ে মেঠো ফুলের মধ্যে তাঁকে শায়িত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সেই মুহূর্তে তিনি হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রগানের ইলাস্ট্রেটশন। তবে কি তাঁর লালিত্যময় ব্যক্তিত্বের পিছনে কাজ করেছে রবীন্দ্রনাথের গান?

ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের কথায় জানা যায়, অর্ধেন্দু সর্বদা তাঁর সহপাঠীদের বেশভূষা নিয়ে পরামর্শ দিতেন। বিশেষ করে যাঁরা শিল্পী হতে চলেছেন তাঁদের উদ্দেশে এক ঝাঁক উপদেশ বহাল ছিল। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ যদিও একে ‘অযাচিত উপদেশ’ বলেছেন। উপদেশের মধ্যে অন্যতম– ‘ধুতির সঙ্গে শার্ট পরা এ একেবারে অশিল্পীজনোচিত; ধুতির সঙ্গে পাঞ্জাবি পরতেই হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছাত্রদের কাছে জাপানভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জাপানিদের গুণ ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি ‘চপ-স্টিক’ দিয়ে খাওয়ার গল্পও করেছিলেন। হঠাৎ একদিন অর্ধেন্দুপ্রসাদের শখ হল তিনি জাপানিদের মতো দুটো কাঠি দিয়ে খাবেন। ধীরেন্দ্রকে সেই রকম দুটো বাঁশের কাঠি জোগাড় করে দিতে বললে, তিনি এনে দিলেন। সেই সময়ে রান্নাঘরে সবাই পাশাপাশি খেতে বসার রেওয়াজ। ভাত ডাল সাধারণভাবে হাত দিয়ে খেলেও আলু খাওয়ার সময় অর্ধেন্দু জাপানি কায়দায় খাওয়া শুরু করলেন। ধীরেন্দ্র বলেছেন, ‘অর্ধেন্দুবাবু ডাল ভাত হাত দিয়েই খেলেন, আলুগুলোকে কিন্তু খেলেন কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। পাশের ছেলেরা এইসব দেখে বলাবলি করছিল, “শিল্পীদের কাণ্ডকারখানা সবই অদ্ভুত রকমের”।

তবে ছাত্র হিসেবে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁর প্রশংসা করেছেন। অর্ধেন্দুর রেখাঙ্কন, রং লাগানো এবং ছবি ফিনিশিং-এর হাত খুব ভালো ছিল। ছাত্রজীবনেও অনেক ভালো ছবি এঁকেছেন। কলকাতার সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের বার্ষিক প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে এবং বিক্রিও হয়েছে। ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি ভালো গানও গাইতেন। তাই সামগ্রিকভাবে অর্ধেন্দুপ্রসাদকে কেবল কোমল লাবণ্যময় ন্যাকামিসিক্ত ব্যক্তিত্বের দলে ফেলা যাবে না। তাঁর গুণাবলির দিকেও তাকাতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, ভিতরে ও বাইরে তিনি এক নিঃশর্ত কবিসত্তায় আবৃত ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর ছবির তালিকা থেকেও অনুমান করা যায়, কল্পনার গভীর অবগাহনে স্নাত হয়েছে তাঁর চিত্রজগৎ। তার সাক্ষ্য বহন করে ছবির শিরোনাম। ‘বর্ষাস্নাত বীথিকা’, ‘খেলার সাথি’, ‘দুয়োরাণী’, ‘মেঘমল্লার’, ‘চন্দ্রোদয়’ ইত্যাদি নামের মধ্যে রোমান্টিকতার সুবাস ছড়িয়ে আছে। ছাত্রাবস্থায় বিনোদবিহারীর সঙ্গে তাঁর গভীর হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল, উভয়ের মধ্যে চিঠিপত্রের আদানপ্রদান ছিল। তবে আশ্রমের আচার্য কলাভবনের এই শৌখিন ছাত্রটিকে নিয়ে কি ভাবছিলেন– তা আমাদের জানা নেই।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন গল্পকলা-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved