Menstrual Poetry: Breaking the Period Taboo। Robbar
Robbar
  • ২ কার্তিক ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২০ অক্টোবর ২০২৬

কবিতার ঋতু

ঋতুস্রাবের লেখালিখি। আজ দ্বিতীয় পর্ব। রক্তস্রোতের পরম্পরা কীভাবে ফুটে উঠেছে কবিতায়।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১৩:২৩   
Facebook WhatsApp Messenger

পাঠককে মনে করিয়ে দিই, আগের পর্ব শেষ হয়েছিল এই কথা মেনে নিয়ে যে, নারীদের যোনি আসলে একটি হৃদয়। আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলা যেতে পারে নারীদের যোনি আসলে একটি মাতৃহৃদয়। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ইভ এন্সলার  তাঁর ‘ভ্যাজাইনা মোনোলগস’-এ। যে অঙ্গ প্রতি মাসে নিয়ম করে হপ্তাব্যাপী রক্তপাত ঘটায় যাতে একটি জন্মসম্ভাবনাকে আবারও লালন করা যায় যত্নে– সে জন্মের বীজ শেষ পর্যন্ত অঙ্কুরিত হবে কি হবে না তা না জেনেই– এই ধরনের মহৎ আত্মদান একটি মাতৃহৃদয় ছাড়া আর কেই বা করতে পারে? তাই এন্সলার যখন বলছেন– 

‘I was in the room. I remember.’ 

zoom

……………………………………………………………….

পড়ুন প্রথম পর্ব: ঋতুলিখন 

……………………………………………………………….

তখন কি তিনি শুধুমাত্র একটি প্রসবকক্ষে থাকার কথাই বলছেন? অবশ্যই না। তিনি বলছেন যোনির ভিতরে থাকার কথা। প্রতি মাসে যে রক্তপ্লাবন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এই যোনিপথের ভিতরকার শান্ত বসতি– এই ধ্বংস, আর্তনাদ, ব্যথার রক্তিম মাসিক পরব– এই আত্মভুক প্রলয়সংসারে দিনের পর দিন ঘর করার কথা বলেছেন এন্সলার। যে মানুষ বন্যায় ভিটেমাটি হারায়নি সে শুকনো ডাঙায় ত্রাণ হাতে দাঁড়িয়ে  বন্যার ক্ষয়ক্ষতির কথা কী করে বুঝবে? কী করেই বা জানবে জল সরে গেলে উর্বর পলিমাটিতে ফসল বোনার সুখ? সুতরাং দেখা গেল যোনি আসলে একটি বসতি। গ্রাম। সংসার। যোনি একটি ঘর। নদীর পাশের ঘর। প্রতি বর্ষায় ভেসে গেলেও ওই প্লাবনই তাকে দেয় নবান্নের পলি, ধানচারা-গমচারা।

zoom
ইভ এন্সলার

 

মার্কিন কবি অ্যানি সেক্সটন তাঁর ‘মেন্সট্রুয়েশন অ্যাট ফর্টি’ কবিতায় সেই ঘরকে ফিরিয়ে আনছেন। লিখছেন- 

‘blood worn like a corsage
to bloom
one on the left and one on the right–
It’s a warm room,
the place of the blood.
Leave the door open on its hinges!’ 

কবি রক্তকে ফুলের অলংকার বলেছেন, যে ফুল প্রস্ফুটিত হবে একটি ঘরের দু’পাশে। বা ঘরের দরজার দু’পাশে। কবিতাটায় এর আগে দুই হাতের দুই বাজুবন্ধের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে– দুই বাজুবন্ধের উপর ফুটে ওঠা রক্তপুষ্পের আভাস। মাঝখানে একটি উষ্ণ কক্ষ। সে কি নারীশরীর? কিন্তু এই কক্ষটিকে কবি বলছেন ‘আ প্লেস অফ দ্য ব্লাড’ অর্থাৎ জরায়ু। সুতরাং জরায়ু একটি ঘর। যোনিপথ সেই ঘরের দরজা। সেক্সট্ন বলছেন এই ঘরের দরজার কবজা খুলে রাখতে। তা তো রাখতেই হবে। কারণ প্লাবন অবশ্যম্ভাবী। এই রক্তস্রোত নিশ্চিত করবে যাতে নতুন ভ্রূণ পায় যত্নের বিছানা। উগান্ডার কবি আওয়াদিফো ওলগা কিলি তাঁর ‘Hello Period’ কবিতায় লিখছেন– 

The moon just nicely appeared
Opening the doors of the uterus
Dear Uterus, about one lunar month
From puberty, you shed your lining
As blood stains on my bed sheets
I see a flower into an eerie metaphor.

zoom
শিল্পী: ইউসা মিউসুকা

এই কবিতাতেও জরায়ু একটি কক্ষ। তার দরজা খুলে নেমে এসেছে রক্তিম চাঁদ। সেই রক্তবর্ণ চন্দ্রালোকই জরায়ু থেকে বেরিয়ে আসছে শোণিতস্রোত হয়ে। সেই রক্তের দাগ যখন সদ্য ঋতুমতী এই কিশোরী আবিষ্কার করছে তার বিছানার চাদরে, তখন সেই দাগ একটি আশ্চর্য লাল গোলাপ! কী করে বোঝা গেল যে কবিতার কথক এক কিশোরী? কারণ কবিতায় ‘পিউবার্টি’ বা বয়োপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। যেহেতু এই কিশোরী প্রথমবার এই অভিজ্ঞতা আহরণ করছে, তাই শরীরের এই পরিবর্তন তার কাছে বিস্ময়কর, অলৌকিক!

zoom

আফ্রিকান-আমেরিকান কবি ল্যুসিল ক্লিফটনের চোখে প্রতি মাসে ফিরে আসা এই শোণিতস্রোত সুন্দর, নির্ভীক, দুরন্ত এবং বিশ্বস্ত এক জীবনপ্রবাহ। তিনি বলছেন যে, এই আদিম স্রোতের থেকেও সুন্দর, সাহসী, একনিষ্ঠ কোনও স্রোত যদি থেকে থাকে তবে তা শুধু নারীদের শরীরে নয়, এই গ্রহে প্রাণ ধারণ করে চলা প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে দিয়ে যেন প্রবাহিত হয়। ক্লিফটন তাঁর ‘Poem in Praise for Menstruation’ কবিতায় লিখছেন, 

if there is somewhere water
more powerful than this wild
water
pray that it flows also
through animals
beautiful and faithful and ancient
and female and brave.

zoom
ঋতুস্রাবের রক্ত দিয়ে ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী তিমি পাল্‌

সুতরাং নারীদের ওপর সেই আদিকাল থেকে ঋতুকালীন যে সমস্ত নিয়ম-নিষেধ বেঁধে দিয়েছে সমাজ এবং ধর্ম, সেই সমস্ত লজ্জাদীর্ণ অশুচিতা এবং অস্পৃশ্যতাকে অতিক্রম করে নারীশরীর এবং মন প্রতিমাসে প্রায় একই সময়ে তাদের শরীরে ফিরে আসা রক্তনদীর তরঙ্গকে স্বীকার করেছে, গ্রহণ করেছে এবং উদযাপনও করেছে। ঋতু চলাকালীন নারীশরীরে নানাবিধ হরমোনের তারতম্য দেখা যায়। ফলস্বরূপ শুধুমাত্র শারীরিক যন্ত্রণা এবং প্রদাহ নয়– এই সময় নারীরা মানসিকভাবেও বিপন্ন বোধ করে। এই বিপন্নতার কারণ অবশ্যই যেমন শারীরিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ঠিক তেমনই তার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে যুগ যুগ ধরে ঋতু রক্তকে কেন্দ্র করে নারীদের উপর সমাজারোপিত অশুচিতার ধারণা। এই ধারণার ভিত্তিপ্রস্তর এতই দৃঢ় যে এমনকী, আধুনিক সময়ে মানবশরীর বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত নারীরাও ঋতু চলাকালীন প্রার্থনাস্থল, পূজার রীতি-রেওয়াজ, সামাজিক শুভ অনুষ্ঠানের আচার-আচরণ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন। এই শারীরিক অশুচিতার ব্যাপারটা নারীদের মস্তিষ্কগ্রন্থিতে এমন জোরালো ভাবে স্থান করে নিয়েছে যে, ঋতুর সঙ্গে এই সমস্ত ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কোনও বৈজ্ঞানিক সংযোগ নেই– একথা জেনেও নারীরা নিজেদের অশুচি মনে করেন।

zoom
সোইবাম হরিপ্রিয়া

 

ভারতীয় কবি সোইবাম হরিপ্রিয়া তাঁর ‘Five Day’s Untouchable’ কবিতায় বলছেন,

For five days
Quarantined from the rest
By this unholy fluid
Wrapped with untouchable phanek
Phanek after Phanek
Carrying my untouchable-ness
Accursed piece of cloth
Contaminated for a lifetime. 

এই কবি উত্তর-পূর্ব ভারতের মেইতেই সম্প্রদায়ের এক নারী। মেইতেই নারীরা নিম্নাঙ্গে স্কার্টের মতো জড়ানো যায় এমন একরকম পোশাক ব্যবহার করেন, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘ফানেক’। মেইতেইরা মনে করেন, ঋতু চলাকালীন কোনও নারীর ফানেক যদি অন্য কেউ স্পর্শ করে বা বাড়ি থেকে বেরনোর সময় যদি ওই নারীর ফানেক যদি কারও চোখে পড়ে তবে সেই ব্যক্তির জন্য দিনটি হয়ে উঠবে অশুভ। ওই নারীর স্বামী যদি কোনওভাবে ঋতুস্রাব চলাকালীন তার স্ত্রীর ফানেক স্পর্শ করেন তবে তা ঘোর বিপদ ডেকে আনতে পারে তার জীবনে। তাই এই ফানেক, যা কিনা একটি নির্জীব বস্ত্রখণ্ডমাত্র, তা কবির কাছে হয়ে উঠেছে এক অভিশাপ, তাই তিনি বলছেন ‘Accursed piece of cloth’ যা সারাজীবনের জন্য ঋতুরক্ত দ্বারা দূষিত হয়ে গিয়েছে। এই কবিতারই শেষ অংশে পাঠক সাক্ষী থাকেন এক অতি সাধারণ অথচ অর্থপূর্ণ দৃশ্যের। এই দৃশ্যে দেখা যায় ঋতু চলাকালীন এক নারীর ফানেক বাইরে উঠোনে একটি দড়ি থেকে ঝুলছে। হঠাৎ বৃষ্টি নামায় কাপড়টি যথারীতি ভিজছে এবং বস্ত্রখণ্ডটি চুইয়ে টপ টপ করে জল মাটিতে পড়ছে। কবিতার কথকের স্বামী চুপ করে বসে কাপড়টিকে ভিজে যেতে দেখছে কিন্তু তুলে আনছে না কারণ ঋতুমতী স্ত্রীর ফানেক স্পর্শ করলে তার জীবনে নেমে আসবে ঘোর অমঙ্গল! 

zoom

এই ঋতুকালীন দূরত্ব আবার একই অঞ্চলের অন্য এক নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়ে উঠেছে এক শান্তির আশ্রয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য এক নারী কবি, শ্রীমা নিঙোমবাম লিখছেন,

How beautiful it was to be red
Myself red
And the red sky of dusk
And I recall what I whispered
That evening in red
In the ears of the hill-echoes
‘Where shall you take me tomorrow?’
Far away from that furry thing
I touched beside my bed in my nightmare
Far away from the unknown who stalked me
When sleep bound my limbs. 

zoom
শ্রীমা নিঙোমবাম

এই কবিতা একেবারেই পূর্ববর্তী কবিতার উলটপুরাণ। কবিতাটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঋতু শুরু হওয়ার সময়টি কবিতার কথকের কাছে হয়ে উঠেছে এক নিভৃত শান্তির ঠিকানা। তাই এই লোহিত-নদীর স্রোত তার কাছে সুন্দর– ঠিক গোধূলি আকাশের মতো। ঋতুকালীন এই অবকাশ বা অবসর এই নারীকে নিয়ে চলেছে দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরবর্তী কোনও নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। রোজকার বৈবাহিক জীবনের শরীরসঙ্গমে ক্লান্ত এই নারী তার পুরুষসঙ্গীকে অভিহিত করছে ‘furry thing’ বলে যা থেকে আন্দাজ করা যায়, এই পুরুষের শরীর অত্যন্ত লোমশ এবং সম্ভবত তা এই নারীর কাছে অস্বস্তিকর। এই একই বাক্যে ‘bed’ এবং ‘nightmare’ শব্দ দু’টির ব্যবহার এই নারীর প্রাত্যহিক শরীরপ্রণয় সংক্রান্ত আতঙ্ককে আবরণবিহীনভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে। পরের দু’টি পঙ‌্ক্তি থেকে ধারণা করা যায় যে, এই নারী সমস্ত পুরুষচোখ থেকে দূরবর্তী কোনও অন্তরাল খুঁজছে। যে অজানা-অচেনা পুরুষরা এই নারীকে প্রতিদিন উত্যক্ত  করে তারাও ঋতু চলাকালীন তাকে বিরক্ত করবে না, কারণ এই সময় তার দেহ অশুচি। তাই মাসিকের সময় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে পাঁচ দিনের বিরতি এই নারীর কাছে নিজের মনের পরিচর্যার সময়ও বটে। 

zoom
কমলা দাস। সূত্র: ইন্টারনেট

যুগ যুগ ধরে ঋতু চলাকালীন নারীশরীরের উপর যত রকম নিষেধাজ্ঞাই চাপানো হয়ে থাক না কেন, একথা অস্বীকার করা যায় না যে এই, অশুচি এবং অস্পৃশ্য নারীশরীরই বারবার হয়ে উঠেছে বহু পুরুষের কামনার গন্তব্য। যেহেতু ঋতু চলাকালীন মেয়েদের শরীরকে অপরিচ্ছন্ন, অশুচি বলে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা হয়, তাই এই সময় কোনও নারীর সঙ্গে শরীরসঙ্গমে লিপ্ত হওয়া আসলে একটি নিষেধ লঙ্ঘন করা, যা অনেক সময় নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এক আশ্চর্য কামোদ্দীপনার জন্ম দেয়। নিষিদ্ধ, গোপন যে কোনও বিষয়ের প্রতি মানুষের স্বাভাবিকভাবে কৌতূহল তৈরি হয় এবং নিষেধ লঙ্ঘন করার মধ্যে থাকে এক বেপরোয়া, দুঃসাহসী আনন্দ। মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। ঋতুকালীন সংগম বহু নারী-পুরুষের কাছেই একরকম উত্তেজক যৌন আকাঙ্ক্ষা বা কল্পনা। সাহিত্যে বারবার এই যৌন প্রবৃত্তির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। নারীর ঋতুরক্ত, সেই রক্তের গন্ধ-স্পর্শ অনেক পুরুষের মধ্যে তীব্র যৌন উত্তেজনা তৈরি করে। বহু নারীশরীরও ঋতু চলাকালীন প্রবল কামতাড়না অনুভব করে। কমলা দাস তাঁর ‘The Looking Glass’ কবিতায় কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে উপহার হিসেবে ঋতুরক্ত দেওয়ার কথা বলেছেন, 

Gift him all,
Gift him what makes you woman, the scent of
Long hair, the musk of sweat between the breasts,
The warm shock of menstrual blood, and all your
Endless female hungers. 

zoom
মন্দাক্রান্তা সেন

প্রতিটি পঙ‌্ক্তিতে ধরা যাচ্ছে প্রচলিত ‘মেল গেজ’-এর বিপ্রতীপে এই কবিতার সদর্প অবস্থান। ঘাম, ঋতুরক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বর্জ্য থেকে হয়ে উঠছে কাঙ্ক্ষিত উপহার– যে উপহার নারী স্বচ্ছন্দে দিচ্ছে এমন এক পুরুষকে যে এমন উপহার আকাঙ্ক্ষা করে। বাংলা ভাষার শক্তিশালী কবি মন্দাক্রান্তা সেন রজঃস্বলা নারীর প্রতি নারী ও পুরুষ উভয়েরই আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছেন তাঁর ‘প্রসাধনময়ী: সংকেত কবিতা’-য়।  এই কবিতা পাঠককে এক লিঙ্গ-বিভেদ বর্জিত কাম প্রবৃত্তির নিভৃত বলয়ে নিয়ে ফেলে, যেখানে ঘৃণ্য, ধর্মীয় ও সামাজিক নিষেধ-আরোপিত রক্তাক্ত নারীশরীরই হয়ে ওঠে কামাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু, হয়ে ওঠে অন্ধকারে আলোর উদ্ভাস। তাই এই কবিতায় কবি লিখছেন, 

মুখে রক্ত বুকে রক্ত রক্ত তার দু’পায়ের ফাঁকে
রক্তের আদিম গন্ধে সে আকুল করেছে আমাকে
রক্তের আমিষ গন্ধে আকাঙ্ক্ষাও তিলে তিলে রাঙা
সাধের অকূল গাঙ, মধ্যিখানে তিনকোণা ডাঙা
কে কাকে পুরুষ বলে কেবা কাকে বলতে পারে নারী
অন্ধকারে যাকে পাই সে আলো তো আমার, আমারই…

zoom
মেন্সটুরেশন। শিল্পী: অনীশ কাপুর

এখানে একটি কবিতার উল্লেখ না করলেই নয়, কিন্তু পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ কবির পরিচয় দিতে আমি অপারগ। এই কবির কবিতা আমার লেখায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটিই শর্ত তিনি আমার সামনে রেখেছেন– তা এই যে, কোনওমতেই যেন তাঁর পরিচয় প্রকাশিত না হয়। এই কবিতায় এক পুরুষ একজন রজস্বলা নারীর সঙ্গে রতিক্রিয়ায় লিপ্ত এবং এই মিলন নারী-পুরুষ উভয়ের কাছেই হয়ে উঠেছে স্বর্গীয়। কবিতাটি এইভাবে চলেছে–

হে ঋতুরক্ত, থাকো বহমান
পুরুষাঙ্গটি লাল হয়ে যান

তবু ওঠানামা তিনি থামান না
দেবীর গোঙ্গানি, কী সুখ-কান্না 

ক্রমেই তীব্র, এটাই আদেশ
দেবীর কণ্ঠে চরম আবেশ 

স্বয়ং সূর্য হল এ যুবক
দেবী-স্তন থেকে রৌদ্র-শোষক

দেবীর কথার অতি বাধ্য সে
আনন্দ দিক দাঁড়িয়ে ও বসে

বাৎসায়নের সকল আসন
জানে সে, এমনই দেবীর শাসন 

দেবী সঙ্গম চাইলেই তবে
সূর্যদেবকে ডেকে আনা হবে

এই কবিতায় সব থেকে চোখে পড়ার মতো বিষয় হল ঋতুকালীন সঙ্গমে এই দুই নারী পুরুষ অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ। কোনও সামাজিক বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার এরা ধার ধারে না। এখানে পুরুষসঙ্গীকে শাসন করছে নারী। পুরুষটি সমস্ত রকম ভাবে নারীটিকে রতিসুখ দিতে চেষ্টা করছে। যৌনতার মধ্যেও পুরুষতন্ত্র এবং পুরুষের কুক্ষিগত ক্ষমতা যেভাবে অনায়াসে ঢুকে পড়ে, যার ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুরুষের ইচ্ছের বশে নারীদের শরীর চালিত হয়, সেই চিরাচরিত সমীকরণকে সম্পূর্ণ উল্টে দিচ্ছে এই কবিতা। এখানে পুরুষ চালিত হচ্ছে নারীর আদেশে। কিন্তু সেই আদেশ মান্য করেই আনন্দ পাচ্ছে পুরুষটি। দু’জনেরই গন্তব্য এক– আনন্দ। এই নারী যেমন আদেশ দিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, পুরুষটি আনন্দ পাচ্ছে সেই আদেশ পূর্ণ করে তার সঙ্গিনীকে সর্বসুখ দিতে পারার মাধ্যমে। এই কবিতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, ঋতুকালে নারী শরীর কখনওই অস্পৃশ্য নয়। সেই শরীরকে বর্জন না করে, পুরুষটি বরং নারীর ঋতুকালীন শরীরকে উদযাপন করছে, সম্মান জানাচ্ছে এই নারীর সমস্ত রকম যৌন আকাঙ্ক্ষাকে। 

zoom
এইলিন মাইলস

এতদূর পর্যন্ত এসে মনে পড়ে যাচ্ছে, মার্কিন কবি এইলিন মাইলসের কবিতা ‘Bleeding Hearts’-এর কথা। এই কবিতায় মাইলস লিখছেন, 

Know what
I’m jealous of?
Last night.
pussy
bleeding and shaking
wet with
memory
grief and relief.’

একজন ট্রান্সসেক্সুয়াল পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই কবিতাকে বিচার করলে এই ঈর্ষার অনুভূতির কথা অনুধাবন করা সম্ভব হয়। কবি নিজের যৌনপরিচয় দিতে গিয়ে ‘জেন্ডারড নট’ (gendered knot) শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে নিজের সত্তার মধ্যে তিনি নারী এবং পুরুষ উভয় সত্তাকেই অনুভব করেন। এই সূত্র ধরেও এই কবিতাকে বিভিন্ন আলোয় খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব। একজন পুরুষ যে তার নিজের অন্তর্জগতে নিজেকে নারী বলে মনে করেন তার ঋতুরক্তে প্লাবিত যোনির প্রতি ঈর্ষা কী স্বাভাবিক নয়? একজন নারীই গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারেন, তাই একমাত্র একজন নারীই ঋতুমতী হতে পারেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বে বলেছেন পুরুষাঙ্গ না থাকার ফলে নারীদের মধ্যে সেই পুরুষাঙ্গ অধিকার করার প্রবল প্রবণতা এবং আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। জ্যাক লাঁকান এই তত্ত্বকে আরও পরিমার্জনা করে বলেছেন, যে জিনিস যার কাছে নেই. তার প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। সুতরাং নারীর যদি পুরুষের যৌনাঙ্গের প্রতি আকর্ষণ থাকে, উল্টোটা না-হওয়ার কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ অন্তত নেই। 

ফিরে আসি কমলা দাসের কবিতায়। তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে পুরুষের প্রতারণা, প্রত্যাখ্যান। তিনি ‘Sunset, Blue Bird’ কবিতায় গর্ভধারণের কারণে ঋতুরক্তের অনুপস্থিতির ফলস্বরূপ প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা বলেছেন। কবিতাটি বলছে, 

‘he loved me and I was happy and thought he was happy too
After a year two yellow moons waxed and waned without a sign of
blood and I told him lying on his lap I told him and suddenly the sun set on that beautiful face his breath was heavy in my ear he
said not a word he no longer comes to me, no longer stands at the open window to smile at me but everywhere I look I see him everywhere I do not look I see him I see him in all I see him in everything.’  

zoom
শিল্পী: রোকিও মনতোয়া

এখানে ঋতুররক্তের অনুপস্থিতির সঙ্গে এক নারীর কাঙ্ক্ষিত পুরুষের অনুপস্থিতির অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। রক্তধারা যতদিন প্রবাহিত ছিল ততদিন ওই পুরুষ ভালোবেসেছে এই নারীকে, কিন্তু রক্ত প্লাবন বন্ধ হয়ে যখন গর্ভে এসেছে সন্তানভ্রূণ, সেই মুহূর্তে এই নারীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়েছে তার পুরুষসঙ্গী। অথচ এই নারী যেদিকেই তাকাচ্ছে দেখতে পাচ্ছে তার ভালোবাসার পুরুষটিকে– যে তার শরীরই চেয়েছিল মাত্র– না, তার প্রেম নয়। 

মন্দাক্রান্তা সেন তাঁর ‘ডাইনে বাঁয়ে’ কবিতায় নারী মনের এবং শরীরের দু’টি আলাদা পৃথিবীর কথা বলছেন। এই কবিতা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। কবিতাটি এরকম, 

ডাকতে তোকে চাইনে। তবু একটু দাঁড়া।
ঠাকুরদালান ডাইনে। বাঁয়ে বেশ্যাপাড়া। 

ঠিক করে আজ বলতো ভেবে, তুই কী নিবি?
রজস্বলার রক্তমাখা দুই পৃথিবী!

ছাড়তে তোকে চাইনে। তবু নাহয় ছাড়ি।
পুজোর বেদি ডাইনে। বাঁয়ে ব্যারাকবাড়ি।

ঠিক করে আজ দ্যাখ তো ভেবে, কোথায় যাবি?
কোথায় আছে রক্তরাঙা সুখের চাবি!

বলতে তোকে চাইনে। তবু আজকে বলি,
স্বর্গ তোমার ডাইনে। বাঁয়ে আদিম গলি। 

ডাইনে বাঁয়ে সামলে চলিস? খুব হিসেবি?
আমি তোমার বেশ্যা, আমি তোমার দেবী।

যে সমাজ ঋতু শুরু হওয়ার আগে বালিকাদের কুমারী পুজো করে ভক্তি-ভরে, সেই বালিকা ঋতুমতী হলে তার দেহকে কলুষিত বলে চিহ্নিত করে সেই একই সমাজ। ভাবতে আশ্চর্য লাগে একই মেয়েকে তার জীবদ্দশার বিভিন্ন পর্যায়ে, কখনও দেখা হয় দেবী রূপে, কখনো অশুচি অস্পৃশ্য বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই নারী কখনও দেবী, আবার সমাজের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত ভূমিকা পালন করতে সে অসম্মত হলে, বা নিজের কামাকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করলে সেই নারীই হয়ে যায় বেশ্যা, পতিতা। এই ধর্মীয় এবং সামাজিক ভণ্ডামির সামনে এ-কবিতা রেখেছে এক প্রতিস্পর্ধী প্রশ্নচিহ্ন। এও সত্য তিনবার এ-লেখায় ‘ডাইনে’ শব্দটি প্রযুক্ত। এই ‘ডাইনে’ কথাটি আসলে সাংকেতিক। লেখক কী এখানে ‘ডাইনি’ বোঝাতে চাননি? আদিবাসী সমাজে যাকে ‘ডায়েন’ বলা হয়– তাদের কথা?

zoom

এখানে বলা জরুরি কবি অমৃতা ভট্টাচার্য রজস্বলা নামেই একটি গোটা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম-কবিতাটির একটি অংশ বলছে, 

‘জলের তখন অশ্বিনী-মঘা, বিরোধী মুকুট ধারণ
মানবী গুনছে রক্তের মাপ, রজঃস্বলার বারণ
জ্বলছে কারণ উন্মন কোণ– এ রক্ত অজুহাত
মূলত যৌন, সূর্পনখার নাক কাটা সংঘাত
মূল্য তোমার দেবীকর্ষণে, পবিত্র নষ্টামি
আদিমের স্রোত ভাগাভাগি যদি, ওহে অন্তর্যামী

এই কবিতাটি পড়তে গিয়ে মনে হয় অশ্বিনী এবং মঘা নক্ষত্র দ্বারা চালিত যুবক-যুবতীর বিবাহ সম্বন্ধ স্থির করার কথা এখানে বলা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রমতে এই দুই নক্ষত্রে অবস্থানকারী নরনারীর মধ্যে সম্পর্ক বহুলাংশেই শান্তিপূর্ণ হয়। কিন্তু এই ধর্মমত, জ্যোতিষশাস্ত্র যদি কোনও নারী মানতে অসম্মত হয়? সে যদি বরং এ বিষয়ে বেশি ভাবিত হয় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় একজন বিবাহিত নারী হিসেবে তার উপর কী কী নিষেধাজ্ঞা বসানো হবে? তাই সে ‘বিরোধী’ মুকুট ধারণ করছে। তার সঙ্গে সংঘাত বাধছে ধর্মান্ধ সমাজের। নিজের মনের কথা স্পষ্ট বলতে গিয়ে সে অপমানিত হচ্ছে। অপমানে তো নাক কাটা যায়। সেই অর্থে সব নারীই সূর্পনখা। তাই না? এই নারী ভাবছে  বিবাহ তো মূলত যৌনতার কারণে– বিবাহ পরবর্তী যৌনতা সমাজস্বীকৃত এবং পবিত্র। রতিক্রিয়ার সময় নারী-পুরুষ যেমন একত্রে সুখ লাভ করে, তেমনই মাসিক রক্তস্রাবের যন্ত্রণা কেন একা নারীকে সহ্য করতে হবে? কেন প্রতি মাসের এই শারীরিক কষ্ট নারী এবং পুরুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে না? এই নারী, সমস্ত নারীকূলের প্রতিনিধি হিসেবে এই কঠিন প্রশ্ন সৃষ্টিকর্তা বা  অন্তর্যামীর সামনে রাখছে। 

zoom
ঋতুস্রাবের রক্তধারা। শিল্পী: অজ্ঞাত

এবার চোখ ফেরানো যাক এমন একটি কবিতার দিকে যেটি নারীত্ব এবং প্রকৃতির এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে। পূর্বে উল্লিখিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কবির কবিতাটি একবার দেখে নেওয়া যাক– 

এ চোখ এখনো রক্ত ফোঁপায়
যেচোখ নারীর দু উরুর ফাঁকে 

মাসে চারদিন কে যেন কোপায়
তলপেট নাড়ি কুঁচকেই থাকে  

ধরিত্রী হন ঋতুমতী সেই
ভূগর্ভ থেকে বেরোয় ম্যাগমা

সম্বচ্ছর প্রতিটি মাসেই
লাভা শুষে বেঁচে রয়েছি, দ্যাখ মা 

এই কবিতায় নারীদের ঋতুকালীন যন্ত্রণার তীব্রতাকে কবি ধরেছেন প্রকৃতির প্রতিরূপ এনে। নারী নিজেই ধরিত্রী। মাটি কুপিয়ে যেমন বীজ রোপণ করার উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়, তেমনই গর্ভে ভ্রূণ রোপণের জন্যও প্রয়োজন ঋতুকালীন রক্তস্রাবের। ভূগর্ভ থেকে যখন ম্যাগমা উঠে আসে তখন ধরণীর নিজের শরীরই পুড়ে খাক হয়ে যায়, ধরিত্রী মা যন্ত্রণায় কাতরান। কিন্তু এই লাভাস্তর মাটির সঙ্গে মিশে তৈরি করে উর্বর জমি ঠিক যেমন ঋতুকালে শরীর থেকে ক্রমাগত রক্ত নির্গমনের ফলে নারী যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয় কিন্তু এই শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সন্তানধারণের জন্য মাতৃজরায়ুকে উর্বর করে তোলে। মাটিতে মিশে থাকা খনিজ আকরিক যেমন ফসলের মাধ্যমে, খাবার হয়ে ধরিত্রীর সন্তানদের কাছে পৌঁছয়, তাদের প্রাণধারণের রসদ হয়ে ওঠে, ঠিক সেইভাবেই জরায়ুর  ভিতরের রক্ত এবং টিস্যুর এই স্তর যা প্রতি মাসে ঋতুস্রাব হয়ে বেরিয়ে আসে– তা-ই গর্ভে ভ্রূণ রোপিত হওয়ার পর তাকে সমস্তরকম খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। কত অল্প কথায় কবি নারীকে প্রকৃতি হিসেবে এই কবিতায় বন্দনা করেছেন, এবং এমন একটি পৃথিবী তৈরি করেছেন যে, পৃথিবীতে সন্তান মায়ের কষ্ট এবং যন্ত্রণা দেখে তা গভীরভাবে অনুভব করছে ফলে তার চোখ থেকেই ধরে পড়ছে মায়ের যোনিরক্ত। 

zoom

এই নিবন্ধ শুরু হয়েছিল ইভ এন্সলারের জরায়ুকক্ষে নিজের উপস্থিতির অনুভূতির কথা দিয়ে। তিনি ‘The Vagina Monologues’-এ লিখেছেন যে তিনি ঋতুস্রাব প্রসঙ্গে বহু মহিলার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারগুলি নিতে নিতে তিনি বুঝতে পেরেছেন শারীরিকভাবে মহিলারা একে অপরের থেকে দূরে থাকলেও, তাঁদের সকলের কণ্ঠস্বর যেন একে অপরের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি। বিভিন্ন নারীর ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা যেন অসংখ্য নদী-উপনদী হয়ে একটি মূল রক্তস্রোতে এসে মিলিত হয়েছে। ঘটনা, অভিজ্ঞতা পৃথক হলেও সেগুলি সম্মিলিত হয়েছে একটি বৃহত্তর নারী-অভিজ্ঞতার মূলধারায়। সেই মূলস্রোত হয়ে উঠেছে অসংখ্য নারীকন্ঠে উচ্চারিত এক চরাচর-অন্তরীক্ষব্যাপী সমবেত সংগীত– যে সুরস্রোতের শামিল হয়েছে এন্সলারের নিজস্ব কণ্ঠস্বরও। 

‘I interviewed many women about menstruation. There was a choral thing that began to occur, a kind of wild collective song. Women echoed each other. I let the voices bleed into one another. I got lost in the bleeding.’

 

 

Body Politics Feminist Poetry Menstruation and Literature Menstruation Poetry Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Women’s Writing

Share this article on