

উত্তমের থেকে ১৩ বছরের বড় অসিতবরণ পাঁচের দশকের শুরুতে ছিলেন অন্যতম ভরসাযোগ্য অভিনেতা। বিমল রায়ের ডাকে অসিতবরণ বোম্বে চলে যাওয়ার কারণে যে তাৎক্ষণিক শূন্যতা তৈরী হয়, উত্তমের পলে হাওয়া জাগার পিছনে সেটারও ভূমিকা আছে। নিউ থিয়েটার্সের শেষ বড় ছবি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ দিয়ে বসন্ত চৌধুরীর রুপোলি পর্দার জীবন শুরু। কিন্তু ওই একই সময় থেকে উত্তমের উত্তরোত্তর সাফল্য বসন্ত ও বোম্বে-ফেরত অসিতবরণকে আর কোনওদিনই সেই অর্থে নায়কোচিত পাদপ্রদীপে ফেরাতে পারেনি।
‘শতবর্ষের আলোকে’ সুলভ লেখায় সচরাচর শতবর্ষীর একটা রেট্রোস্পেক্টিভ মূল্যায়নের উদ্যোগ থাকে। উত্তমের শতবর্ষ নিয়ে এর মধ্যে এত কিছু লেখা হয়ে গিয়েছে যে, পাঠকের কাছে আবার উত্তম কীরকম মহাকায় তারকা, বা চমৎকার অভিনেতা বা ক্ষণজীবী শিল্পী– সেই নিয়ে বিশেষ কিছু আলোকপাত করার নেই। এই লেখায় বরং চেষ্টা হয়েছে তারকা উত্তমের ঊষালগ্নের দিকে কিঞ্চিৎ চোখ ফেরানোর। তারকা জিনিসটাকে ‘জ্ঞাত’ হিসাবে ধরে না-নিয়ে বরং চেষ্টা করা হয়েছে একটা সময়ের নিরিখে তারকার জিনিওলজিটা ধরার।

সত্যজিৎ রায় উত্তমকে নিয়ে তার স্মৃতিচারণে বলছেন, ‘হে উত্তম, বাংলা ছবির প্রথম তারকা, অন্তত হলিউড অর্থে।’ উত্তমের পূর্বে হলিউড-জনিত বিশ্বায়িত স্টারডমের সেরকম উপস্থিতি বাংলা ছবিতে দেখেননি সত্যজিৎ। এই মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এই লক্ষ্যে উত্তম যে শুরু থেকেই অভীষ্ট ছিলেন, এরকম কোনও চিহ্ন নেই। উত্তমের এক্সপোজার ছিল না, সেটা নয়, কারণ মেট্রো সিনেমার চিফ প্রোজেকশনিস্ট পিতার দৌলতে হলিউডের ছবি দেখার একটা অভ্যেস তৈরি হয়েছিল। ওই পর্যন্তই। বাকিটা উৎসাহ, অভিনয় ভালোবাসার প্রতি অটুট থাকা, টুকটাক এটা-ওটা শেখা, আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকার খতিয়ান। অনেকটা খামতি নিয়ে শুরু করেও উত্তমের ক্রমোন্নতি আলোচিত একটি বিষয়। কিন্তু শুধুই কি মেধা, তাগিদ, ধৈর্য আর রুপোলি পর্দার প্রতি এক অমোঘ টান যথেষ্ট ছিল?

অনস্বীকার্য যে চারের দশক থেকে শুরু হওয়া অস্থির সময়– যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, দেশভাগ সবকিছু মিলে– বাংলা সিনেমা-চেতনার ভেতরে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। মূলধারার ছবির মেজাজে শনাক্তযোগ্য বদল আসতে লাগে আরও কয়েকটা বছর। পঞ্চাশের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় নতুন অধ্যায়– স্টুডিওর পতন আর তারকাযুগের উত্থান। অন্যদিকে বাংলা ছবির অলিন্দে ‘আর্ট সিনেমার’ আগমন। সঙ্গত প্রশ্ন, প্রমথেশ বড়ুয়ার পর, অর্থাৎ চারের দশকের শুরুর দিক থেকে পঞ্চান্ন অবধি ১০-১২ বছরে বাংলা ছবিতে কি একটা ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছিল? সেখানে সম্ভাবনা, দুর্ঘটনা, সিনেমা ব্যবসার ওঠাপড়া, রাজনীতি এবং সিনেমার নিজস্ব পাকদণ্ডীর ভূমিকা কি ছিল? এই প্রশ্নেরই তৃতীয় দিক হল, উত্তমকুমারের বিপুল তারকাখ্যাতিই কি স্টুডিও সিস্টেমকে গ্রাস করল, না কি স্টুডিও ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিল নয়া তারকাযুগ?

এগুলো বুঝতে হলে একটু ফিরে তাকাতে হবে। গত শতকের দুইয়ের দশক থেকে তিনের দশকের মাঝামাঝি অবধি মূলত ছিল ম্যাডানদের দাপট। সিনেমার শব্দযুগ আসার পর সেই ভার গিয়ে পড়ে নিউ থিয়েটার্সের ওপর। সেই সময়কার বাংলা ছবি যেটুকু দেখা যায়, তাতে স্পষ্ট যে, এই দুই ‘রেজিম’-এর যথাক্রম একাধিপত্যের ফলে মূলধারার ছবির মধ্যে কিছু ঐকান্তিক চিহ্ন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে নিউ থিয়েটার্সের বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে, মধ্য চল্লিশ থেকে বাংলা ছবির কোনও প্রধান ধারা চিহ্নিত করাটা খানিক দুষ্কর হয়ে ওঠে।

তবে ভুল হবে যদি মনে করা হয়, উত্তমকুমারের আগে বাংলায় ‘তারকা’র জন্ম হয়নি। বাংলা ছবির ইতিহাসে প্রথম তারকা যদি কাউকে বলা যায়, তিনি নিঃসন্দেহে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবির সেই দৃশ্যটি– রবি ঘোষের ধনঞ্জয় বাড়ির তিন বউকে নির্জন দুপুরে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকা থেকে উত্তমকুমারের একটি সাক্ষাৎকার শোনাচ্ছে। সাক্ষাৎকারের শেষে ছায়া দেবীর বড় বউ চরিত্রটি বলে ওঠে, ‘তোদের বাপু উত্তমকুমার, আমাদের সময় ছিল দুর্গাদাস ব্যানার্জি।’ তপন সিনহা ছয় দশকের আটপৌরে জয়েন্ট ফ্যামিলির যে চিত্র ধরতে চাইছেন, তাতে এই পুরনো ও নতুন তারকার দ্বৈত ব্যবহার সময়ের মেজাজ ধরার এক চমৎকার উদাহরণ। সেই সূত্র ধরে অনেকেই মনে করেন, উত্তম ছিলেন দুর্গাদাসের উত্তরাধিকারী। কথাটি পুরোপুরি সত্যও নয়, আবার সম্পূর্ণ মিথ্যাও নয়। মিথ্যা নয় এই কারণে যে, নির্বাক যুগে দর্শকের কাছে তারকা পরিচিতি প্রথম এনে দিয়েছিলেন দুর্গাদাস। তখনকার যে দর্শকরা হলিউডি তারকা-সংস্কৃতি সম্পর্কে সামান্য হলেও অবহিত ছিলেন, তাঁদের কাছে দুর্গাদাস বাংলা সিনেমার প্রথম তারকা। তাই তাঁকে উত্তমের পূর্বসূরি বলা অন্যায় নয়। কিন্তু অন্যদিকে, দুর্গাদাস তাঁর সময়ের অভিনয়ধারার প্রতিভূ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই অভিনয়ভঙ্গি চারের দশক পেরতেই ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে। সেই অর্থে উত্তম যে নতুন ধরনের অভিনয়ের ধারক, সেটা দুর্গাদাসের উল্টোদিক, ঠিক উত্তরসূরি-সুলভ নয়। এই কারণেই উত্তমের সেই অর্থে কোনও পূর্বসূরি দেখেননি শ্রী রায়।

দুর্গাদাসের পরে স্বাভাবিকভাবেই আসে প্রমথেশ বড়ুয়ার নাম। বাংলা ছবিতে বড়ুয়াই প্রথম বিখ্যাত অভিনেতা যার কোনও থিয়েটার-ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। আসামের গৌরীপুর রাজপরিবারে বেড়ে ওঠা সংক্ষিপ্ত জীবনে আগাগোড়াই একটা মেদুর রোমান্টিকতা বজায় ছিল। তাঁর চলচ্চিত্রজীবনও ছিল খামখেয়ালি, তাই হয়ত বড়ুয়ার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল আত্মঘাতী রোম্যান্টিসিজম, আর সেটাই তাঁর ‘tour de force’ ‘দেবদাস’ ছবিকে কালজয়ী করে তোলে। তবুও বড়ুয়া ছিলেন এক অনন্য পথিকৃৎ– চলচ্চিত্র কাণ্ডারি, প্রযোজক, স্টুডিও-কর্তা, অভিনেতা; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাংলা ছবির এক যুগের প্রতীক। খ্যাতনামা সমাজতাত্ত্বিক আশিস নন্দী লিখেছেন যে, বড়ুয়া ছিলেন রাজপ্রথাগত জমিদারি মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা আধুনিক শহুরে ভারতবর্ষের প্রতিনিধি– ভারতে খুব কম পাবলিক ফিগার আছেন, যাঁরা এত সুন্দরভাবে এক মৌলিক রূপান্তরকে জীবনে ও তাঁর শিল্পতে ধারণ করতে পেরেছেন। এই লেখকের মতে বড়ুয়ার সবচেয়ে বড় লিগ্যাসি হল এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে, বাংলা সিনেমার প্রধান পুরুষ চরিত্রকে আধুনিক, শিক্ষিত, কসমোপলিটান হতে হবে। বা হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। উত্তমের এক ধারার ছবিতে আমরা এই ধারণার পূর্ণতা দেখি।

তবে এও ঠিক যে, দুর্গাদাস বা বড়ুয়া কেউই ছিলেন না উত্তমকুমারের সরাসরি পূর্বসূরি। তারকাসত্তা না হলেও অভিনয়ের নিরিখে তাঁর প্রকৃত পূর্বসূরি ছিলেন ছবি বিশ্বাস। ছবি বিশ্বাসের প্রতিভা, বহুমুখিতা ও ‘স্ক্রিন প্রেজেন্স’ বাংলা ছবির সর্বকালের সেরা সম্পদ। বাংলা ছবিতে একদিকে সত্যজিৎ ও অন্যদিকে উত্তম (ও আরও অনেকে) সম্পূর্ণ নতুন যে আধুনিকতা বয়ে নিয়ে এল– সিনেমার অভিনয়ে, পরিসরে, প্রাসঙ্গিকতায়– অভিনয়ের ক্ষেত্রে সেই আধুনিকতার অগ্রদূত কিন্তু ছিলেন ‘ছবি’। অর্থাৎ পর্দায় সাবলীলতার, ‘ন্যাচারালিজম’-এর যে স্বকীয়তা উত্তম একেবারে হস্তগত করে ফেলেছিলেন, সেই চরিত্রমাফিক ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যর’ উৎস কিন্তু ছবি বিশ্বাস। ছবি বিশ্বাস না থাকলে বাংলা ছবির অভিনয়ের পালে ওই আধুনিকতার হাওয়া লাগতে, এই লেখকের মতে, আরও দেরি হত। গত বছর ১২৫-এ পড়া ছবি বিশ্বাস বাংলা ছবির, বিশেষত প্রধান পুরুষ চরিত্রের, প্রাপ্তবয়স্কতায় উত্তরণের কাহিনির রূপকার হিসাবে তুলনারহিত। বড়ুয়ার শেষ সময় থেকেই যে ক’জন পুরুষ অভিনেতার নামডাক হতে থাকে, তাদের একজনের কথা তো বললাম, ছবি বিশ্বাস। অন্য দু’জন পাহাড়ি সান্যাল এবং জহর গাঙ্গুলি। তারা দু’জনেই তখন প্রধান অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু দু’জনের কেউই সেই অর্থে মধ্য চারের দশক থেকে আর যুবক-নায়ক হওয়ার অবস্থায় বা বয়সে ছিলেন না।

রাধারমণ ভট্টাচার্যের ‘উদয়ের পথে’ স্টুডিও জমানার বাংলা ছবির একটি মাইলফলক। কিন্তু রাধারমণ কোনওদিনই সেই অর্থে সিনেমার নায়ক হওয়ার দৌড়ে ছিলেন না। আর দুই গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা ছিলেন ধীরাজ ভট্টাচার্য এবং নীতিশ মুখার্জি। ধীরাজ ভট্টাচার্যকে একটা সময় মনে করা হত বড়ুয়ার সাক্ষাৎ উত্তরসূরি। নীতিশ মুখার্জীকেও মনে করা হত বাংলা ছবির একজন অন্যতম স্তম্ভস্বরূপ। কিন্তু এই দু’জনেরই অভিনয়ের রীতিতে নাটকের ছাপ এতটাই স্পষ্ট যে, আরও অনেক বছর অভিনয় করলেও সেই অর্থে বাংলা ছবির বদলানো আঙ্গিক তার কেউই অভিনয়ে ধারণ করতে পারেননি। যেমন সারাজীবন ‘নাটকীয়ই’ থেকে গিয়েছিলেন শিশির ভাদুড়ী আর অহীন্দ্র চৌধুরী। সিনেমার ক্রাফ্ট আর মেজাজের ভোলবদল সত্ত্বেও তাদের নাটকের মেজাজের কোনও রকমফের হয়নি, অন্তত সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে।

কিন্তু তাই বলে ওই সময়ে আর কোনও তরুণ অভিনেতা মেধা বা রূপ বা গৌরবাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আসেনি, সেরকম ভাবার কোনও কারণ নেই। প্রমথেশের যে ‘প্রটেজে’ তখন খুব আলোড়ন তৈরি করেন, তিনি রবীন মজুমদার। ছবির নাম ‘শাপমুক্তি’। কিন্তু প্রথম দু’টি ছবির পরেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন রবীন মজুমদার। তাঁর অভিনয় ক্ষমতা এবং চমৎকার গানের গলা থাকলেও অচিরেই বিস্মৃত হয়ে পড়তে থাকেন তরুণ এই অভিনেতা। ওই একই সময়ে নিউ থিয়েটার্স সুযোগ করে দিয়েছিলেন রথীন ব্যানার্জীকে। ১৯৪২-এর ‘শোধবোধ’ ছবিতে। সেই ছবিটির পর রথীন ব্যানার্জী উধাও হয়ে যান। জ্যোতিপ্রকাশ ভট্টাচার্য ‘মীনাক্ষী’ ছবিতে সাফল্য পেলেন। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তিনি হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন। বিমল রায়ের ‘অঞ্জনগড়’-এ তুমুল সম্ভাবনাময় হিসেবে উঠে আসেন রাজা গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু তারপরেই একটি দুর্ঘটনায় অত্যন্ত কম বয়সে মারা যান তিনি। এছাড়া ছিলেন দেবী মুখোপাধ্যায়, সমরকুমার, প্রবীরকুমার। এঁরা প্রত্যেকেই চারের দশক মাঝামাঝি থেকে পাঁচের দশকের শুরুর মধ্যে সিনেমায় আসেন। দেবী মুখোপাধ্যায় ছাড়া অন্যান্যরা একাধিক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। এদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে চরিত্রাভিনেতা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থে নায়ক হওয়ার মতো জোর বা পর্দার উপস্থিতি এঁদের কারওরই ছিল না।

আরও চারজনের কথা এখানে বলতে হয়। অভি ভট্টাচার্য, শীতল বটব্যাল বা প্রদীপকুমার, বসন্ত চৌধুরী এবং অসিতবরণ। প্রথম দু’জনেরই বাংলা ছবিতে সরাসরি উপস্থিতি কম, কিন্তু অভি ভট্টাচার্য এবং তারপর প্রদীপকুমার বোম্বেতে ডাক না পেলে উত্তমের প্রথমদিকের যেটুকু সুযোগ সেটুকুও সহজে ধরা দিত না। এটা যতটা কাকতালীয়, ততটাই উত্তমের গল্পে জরুরি একটি বাঁক। উত্তমের থেকে ১৩ বছরের বড় অসিতবরণ পাঁচের দশকের শুরুতে ছিলেন অন্যতম ভরসাযোগ্য অভিনেতা। স্টুডিও সিস্টেমের তখন যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাঁরা অসিতবরণের উপর ভরসা রাখছে, এই কাহিনি একাধিকবার জানা যায়। আবার বিমল রায়ের ডাকে অসিতবরণ বোম্বে চলে যাওয়ার কারণে যে তাৎক্ষণিক শূন্যতা তৈরি হয়, উত্তমের পালে হাওয়া জাগার পিছনে সেটারও ভূমিকা আছে। নিউ থিয়েটার্সের শেষ বড় ছবি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ দিয়ে বসন্ত চৌধুরীর রুপোলি পর্দার জীবন শুরু। কিন্তু ওই একই সময় থেকে উত্তমের উত্তরোত্তর সাফল্য বসন্ত ও বোম্বে-ফেরত অসিতবরণকে আর কোনওদিনই সেই অর্থে নায়কোচিত পাদপ্রদীপে ফেরাতে পারেনি।

উত্তমের তিন বিশেষ সহকর্মী ও পরবর্তীকালে সহযোদ্ধা– ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকাশ রায় ও তরুণকুমার অন্য কোনও সময়ে জন্মালে আরও খ্যাতির দাবিদার হতেন। অন্তত হওয়া উচিত ছিল। শেক্সপিয়রের সমকালীন নাট্যকারদের বলা হত ‘ইউনিভার্সিটি উইটস’, আর এ-ও বলা হয় যে, এঁদের মধ্যে ক্রিস্টোফার মারলো বা বেন জনসন এর একমাত্র ‘দুর্ভোগ’ ছিল যে, তাঁরা শেক্সপিয়রের সমকালীন। কবির বিরাটকায় ছায়াবিহীন অন্য যে কোনও যুগে জন্মালে তাঁরা আকাশ ছুঁতেন। এই লেখকের মতে ভানু, বিকাশ ও তরুণ বাংলা ছবির ‘ইউনিভার্সিটি উইটস’।

এই তালিকা এখানে রাখার কারণ দুটো। এক, এই এত অভিনেতার যে কেউ বয়স বা সুযোগের রকমফেরে, বা বদলানো সময়ের ইঙ্গিত ধরতে পেরে কি উত্তমের সমগোত্রীয় হয়ে উঠতে পারতেন? অন্তত কাগজে-কলমে সেরকম কোনও সম্ভাবনা তৈরি না হওয়ায় প্রশ্ন ওঠেই যে, পাঁচের দশকের পর উত্তমের একচ্ছত্র আধিপত্য শুধুই ভাগ্য নির্ধারিত এক প্রশ্রয়মাত্র কি না? যেমন, এমপি স্টুডিও যখন উত্তমকে ১৯৫১ সালে চুক্তিবদ্ধ করল এবং তার জন্য উত্তমের পোর্ট কমিশনার্স-এর চাকরিও ছাড়তে হল না, সেই চুক্তি কি শুধুই উত্তমকে ভালোবেসে? এর আগের সব ছবি ফ্লপ, প্রতিশ্রুতিও যে অফুরান সেরকম নয়, অথচ চাকরি রেখে মুরলিধর চট্টোপাধ্যায় উত্তমকে বেশ মোটা মাস মাইনে দিয়ে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করলেন। কেন?

উত্তমের প্রতি একটা স্নেহ ছিল এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধু স্নেহের বশবর্তী হয়ে তারা উত্তমকে অত্যন্ত লোভনীয় একটি চুক্তি সই করালেন– সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই। এর পিছনে অন্য দুটো কারণ হতে পারে। এক, উত্তমের প্রতি ‘ইনভেস্টেড’ থাকলে এর ভবিষ্যৎ আছে! একজন সম্ভাবনাময় অভিনেতাকে একটি স্টুডিও নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে এলে ‘রিটার্নস’ অনিবার্য। স্টুডিও ব্যবস্থার যে অচিরেই মৃত্যু হবে সেটা তো জানা ছিল না, অন্তত সেটা তখন অবধি নিশ্চিত ছিল না। আর ইতিহাস বলছে যে, একজন অভিনেতাকে ঘিরে স্টুডিওর পরিকল্পনা গড়ে উঠলে তার সম্ভাবনা অসীম, এর আগে প্রমথেশ এবং দুর্গাদাস দু’জনেই সেটা দেখিয়েছিলেন। কাজেই সেখানের একটা তাগিদ থেকে থাকতে পারে উত্তমকে চুক্তিবদ্ধ করার। কিন্তু আসল কারণটি সম্ভবত দ্বিতীয়টি। অভি ভট্টাচার্য, প্রদীপকুমার, অসিতবরণের মতো উত্তমও যাতে বোম্বেমুখী না হয়, সেইজন্য উত্তমের সম্ভাবনার সামান্য আঁচ পেয়েই তাকে চুক্তিবদ্ধ করেন মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়। অর্থাৎ এর পিছনে উত্তম যতটা কারণ, বাকিদের বোম্বে চলে যাওয়া তার থেকে বড় কারণ।

এর একটা ভালো দিক হল যে, একদিকে স্টুডিও ব্যবস্থার লিগাসির একটা ছোট্ট অংশীদার হতে পেরেছিলেন উত্তম। কিন্তু, মজার কথা হল যে, নাটক থেকে না এসেও ‘ষ্টার’-এ উত্তম-সাবিত্রীর ‘শ্যামলী’ যেমন হয়ে রইল কমার্শিয়াল থিয়েটারের যুগান্তের সাক্ষী, সেরকমই উত্তমের তারকায়নের হাত ধরে ওই ক’বছরে সমান্তরালভাবে স্টুডিও ব্যবস্থার সমাপ্তিও ঘটে গেল। এমপির চুক্তিপত্র নিয়ে হাতে চাঁদ-পাওয়া উত্তম ‘বসু পরিবার’-এ প্রথম সাফল্যের স্বাদ পেলেন। এর পর ‘বৌঠাকুরনীর হাট’-এ ডাক পাওয়ার পর সেই চুক্তি-বিচ্ছেদ আর ১৯৫৪-এ ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ও পরে ‘শাপমোচন’ তুমুল সফল হওয়ার পর স্টুডিও-চুক্তিবদ্ধ অভিনেতার গল্পটাই উঠে গেল।

তাই জিজ্ঞেস করা যায় যে, স্টুডিও ব্যবস্থার ঐতিহ্য বহন করেই কি উত্তমের ওই জায়গাতে পৌঁছনো, নাকি বড়ুয়া থেকে কিছুটা, দুর্গাদাস থেকে কিছুটা, ছবি বিশ্বাস থেকে অনেকটা এবং বাকিদের থেকেও একটু-আধটু এই ‘উইসডম’টা আয়ত্ত করা যে, সিনেমার নিজস্ব ভাষার সঙ্গে অভিনেতার ভাষার বদলটা ভীষণ জরুরি? সিনেমার বদলানো স্বাক্ষরের সঙ্গে পাল্লা না-দিলে অভিনেতারা যে তামাদি হয়ে যেতে পারেন, অচিরেই সেটা বোঝার একটি ক্ষমতা কি উত্তমের নিজস্ব? খুব সম্ভবত। তার সঙ্গে এটাও বোঝার ক্ষমতা যে, স্টুডিও পরবর্তী সময়ে বিশ্বের ছবির সঙ্গে বাংলার দর্শকের সেতুবন্ধন বাড়বে, সেই দর্শক বাংলা ছবির পাশাপাশি ইংরেজি ছবি দেখবে এবং আগের থেকে অনেক বেশি খুঁটিয়ে অভিনয় বুঝতে পারবে, বা ফিল্ম সোসাইটি, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইত্যাদি মিলিয়ে ছবির শিল্পগুণ নিয়ে আলোচনা অচিরেই প্রাপ্তমনস্ক হবে?

অর্থাৎ মেধা, পূর্বসূরিদের থেকে শেখার ইচ্ছে, ভাগ্যের ফের, বা বদলানো অভিনয়ের ধারাই শুধু নয়, উত্তম নিজের বিকাশে হয়তো কাজে লাগিয়েছিলেন এক অন্যরকমের ‘দেখা’-কে। না হলে মাত্র তিন-চার বছরে ‘বসু পরিবার’-এ উত্তমের অভিনয়ের পাশে ‘উপহার’-এর উত্তমের ওরকম চোখে পড়ার মতো আশ্চর্য তফাত হয় না। বড়ুয়া-পরবর্তী সময়টি ভ্যাকুয়াম তো ছিলই না, বরং সবদিক থেকেই ছিল উত্তেজনাপূর্ণ, যার শুধু সিনেমার দিকের কিছুটা এখানে বলা হল। ওই সময়ের রাজনীতির কথা পাঠককে নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত বা ভাগ্যের সমন্বয়ে উত্তমের সমকালীন, সমসাময়িক এবং সমমানের কোনও অভিনেতা আর রইলেন না। বা তাঁরা ঝুঁকে পড়লেন মধ্যগগনের ওপারে। অনেকে স্রেফ উবে গেলেন বা দুর্ঘটনার শিকার হলেন, বোম্বে চলে গেলেন, বা পিছিয়ে পড়লেন শুধুমাত্র বদলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না-পেরে। কিন্তু উত্তমকেই দেখা যাচ্ছে যে চারের দশকের শেষের দিকে একেবারে স্টুডিও ব্যবস্থার ঘরানার মধ্যে যা শুরু সেই মাত্র পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে শুধু যে সেই ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে নতুন একটি তারকাযুগের সূচনা করছেন তাই নয়, তাঁর হাত ধরে বাংলা ছবিতে মূল ভূমিকায় চরিত্র এবং অভিনয় দুটোই আদ্যোপান্ত বদলে যাচ্ছে।

তাই আমরা যদি বলি অনেকদিন ‘স্ট্রাগল’ করে, হঠাৎই তারকা হলেন উত্তম, সেখানে রূপকথাসুলভ রোমাঞ্চ থাকলেও ইতিহাস নেই। বরং আছে সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত, বিভিন্নজনের বিভিন্নভাবে ওই বৃত্ত থেকে ছিটকে যাওয়া, স্টুডিও ব্যবস্থার অপরিণাম বিনির্মাণ, বিশ্বায়িত নতুন অভিনয়ের ধারার সঙ্গে প্রায় অসচেতনভাবে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়া এবং এই আস্ত বদলকে ‘দেখা’র সহজাত ক্ষমতা। সেটাই খুব সম্ভবত তারকার ‘জিনিয়ালজি’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved