priyanath sen friend and guide of rabindranath tagore | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

প্রিয় বন্ধু, প্রিয়নাথ

প্রিয়নাথবাবু রবীন্দ্রনাথের থেকে সাত বছরের বড় ছিলেন, কিন্তু তাতে তাঁদের সখ্যে কোনও বাধা তৈরি হয়নি, কারণ দু’জনেরই মনের কলসটি ভর্তি থাকত কাব্যরসে।। রবীন্দ্রনাথকে জানতে গেলে, গোটা মানুষটাকে জানতে গেলে, প্রিয়নাথ সেনের বন্ধুত্বের কথা, সেই দিনগুলোর গড়িয়ে যাওয়ার কথাও জানতে হয়– যার জন্য জীবনস্মৃতিতে একটি পুরো অধ্যায় তিনি রচনা করেছেন। 

Published by: Robbar Digital

Posted:July 31, 2026 4:16 pm | Updated:July 31, 2026 5:40 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

খাঁটি বন্ধুত্ব এক বিরল জিনিস। ঠিকঠাক বন্ধু পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার। বলা হয়, যার বিচ্ছেদ সহ্য করা যায় না, তাকেই বন্ধু বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের মতো জীবন-রসিক মানুষের বন্ধু থাকবে না, তা কি হয়, তবে এটাও স্বীকার করতে হবে– তাঁর মনন চিন্তন যাপন প্রণালীর সঙ্গে গুণগত মিল না থাকলে তো যে কেউ রবীন্দ্রনাথের বন্ধু হতে পারেন না। মানুষের জীবনে বন্ধু আর বন্ধুত্ব নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় থাকে বইকি! রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ছিল। দেখা যাক কে কে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু।

‘আয় তবে সহচরি হাতে হাতে ধরি ধরি’– সহচরী না হোক, কবির সহচর বেশ কয়েকজন ছিলেন এবং তাদের হাত ধরে ধরে কবির কবিতা গান গল্প নাটক উপন্যাস চিত্রশিল্প প্রভৃতি সৃষ্টির প্রদীপখানি ঘুরে ঘুরে বেড়াত। তার অনেক পরিচয়ই পাওয়া যায় কবির জীবনচরিতে এবং অবশ্যই তাঁর নিজের লেখা জীবনস্মৃতিতে। শুধু কাব্যজগৎ নয় কবির সাংসারিক-পারিবারিক জীবন, জমিদারি জীবন, ঠাকুর কোম্পানির মালিক হিসেবে ব্যবসা-ইচ্ছুক জীবন, শিলাইদহ পতিসর সাজাদপুরে থাকাকালীন চাষবাসে তীব্র মনোযোগী জীবন– বহুমুখী সব ক্ষেত্রেই এই বন্ধুদের সখ্য ও সাহচর্য কবিকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যিক, কবি রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান নেহাত কম নয়। নিখাদ বন্ধুত্ব এক বিরল জিনিস এই পৃথিবীতে। তিনি অনেক শত্রুতাও পেয়েছেন, তবুও হীরকখণ্ডের মতো উজ্জ্বল কিছু বন্ধুত্ব তাঁর জীবনে এসেছে। যেগুলির কেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং পরিধি জুড়ে বিশেষ কয়েকজন। তেমনই একজন– প্রিয়নাথ সেন, যাঁর জন্য জীবনস্মৃতিতে একটি পুরো অধ্যায় রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ।

zoom
প্রিয়নাথ সেন ও রবীন্দ্রনাথ

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বলছেন প্রিয়নাথ সেন একজন পণ্ডিতপ্রবর, বহু ভাষাবিদ এবং সাহিত্যের সাত সমুদ্রের একজন নাবিক। জার্মান ভাষাসাহিত্য, ফরাসি, সংস্কৃত, ইংরেজি ও বাংলা ভাষাসাহিত্যে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ এবং প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি। সাহিত্যের রাজপথ থেকে গলিপথ পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ যাতায়াত এবং তাঁর সম্পূর্ণ সাহচর্য রবীন্দ্রনাথ নিজে উপলব্ধি, উপভোগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন– ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’ লেখার কালে প্রিয়নাথ সেনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছেন, কিন্তু যখন তিনি ‘ভগ্নহৃদয়’ লেখেন, তখন তাঁর এতটা প্রশংসা পাননি। বস্তুত প্রিয়নাথ সেনের কাব্যিক বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষণে রবীন্দ্রনাথের যথেষ্ট বিশ্বাস সমীহ থাকত। সেজন্য সমস্ত লেখা প্রথমেই প্রিয়নাথ সেনের হাতে তুলে দিতেন এবং তাঁর সুচিন্তিত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। শুধু তাই নয়, প্রিয়নাথ সেন বন্ধু রবীন্দ্রনাথের এইসব লেখা নিজে পড়তেন এবং অন্য মানুষদেরও পড়িয়ে তাঁদের মতামত নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে জানাতেন। এখানে বলতেই পারি, আজকের যুগে যখন আমরা লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের আশায় থাকি সোশাল মিডিয়ায় কোনও কিছু পোস্ট করার পরে, রবীন্দ্রনাথও কিন্তু সেই একই আশায় থাকতেন তাঁর নিজের লেখাটি প্রিয়নাথ সেনের হাতে তুলে দেওয়ার পরে। এবং একজন শুভানুধ্যায়ী হিসাবে প্রিয়নাথবাবু রবীন্দ্রনাথের এইসব লেখার কাটাছেঁড়া করতেন, ত্রুটি-গুণাগুণ বিচার করতেন এবং বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথ এতে যথেষ্টই সমৃদ্ধ হতেন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, সেই সময়ে প্রিয়নাথ সেনের সাহচর্য না পেলে তাঁর কাব্য-জমির আবাদে ফসলের ফলন কতটা হত বা কাব্যের বর্ষা কতটা ঝরঝরিয়ে নামত– তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

zoom
পণ্ডিতপ্রবর প্রিয়নাথ সেন

শুধু কাব্যের বলয়ের বন্ধুত্বই নয়, প্রিয়নাথবাবু ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সাংসারিক-পারিবারিক জীবনের একটা ঢাল। নানা ঝড়ঝাপটায় রবীন্দ্রনাথ যখন অস্থির হতেন, প্রিয়নাথবাবু তাঁকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতেন, কবিকে সুরক্ষা দেওয়ার কাণ্ডারী হয়ে উঠতেন। স্ত্রীর মৃত্যু, সন্তানদের মৃত্যু, সন্তানদের রোগজ্বালা, মেয়েদের বিয়ে, বিয়ের আগের সমস্যা, বিয়ের পরের সমস্যা, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি পারিবারিক সমস্ত ঝঞ্ঝায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে আগলে রাখতেন। ছাতার মতো সুরক্ষা দিতেন।

শিলাইদহ পতিসর সাজাদপুরে জমিদার রবীন্দ্রনাথ নানাবিধ উদ্ভাবনশীল কাজে নিজেকে নিযুক্ত করতেন। এইসব কাজের গুণাগুণ বিচার করে, সঠিক-বেঠিক বিচার করে প্রিয়নাথ সেন মতামত দিতেন এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ সেই মতামতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিতেন। জ্যোতিদাদার মতো রবীন্দ্রনাথেরও ইচ্ছা হল ব্যবসা করার। খোলা হল ঠাকুর কোম্পানি। এই কোম্পানি পাট চাষের উদ্যোগ নিল। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হলেন। লোকসান করলেন কোম্পানি চালাতে গিয়ে। দেনার দায়ে জর্জরিত হলেন। উদ্ধারকারী হিসেবে এগিয়ে এলেন প্রিয়নাথ সেন। নিজে দায়িত্ব নিয়ে একেবারে খাঁটি ব্যবসায়িক বুদ্ধি দিয়ে এর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওর সুদ মেটান, তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্য একজনের আসলের ধার মেটান– এইভাবে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত দেনা তিনি মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। রবীন্দ্রনাথের গায়ে এইসব বিড়ম্বনার আঁচটিও লাগতে দেননি। এইসব দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকতেন পণ্ডিতপ্রবর বন্ধু প্রিয়নাথ সেন। প্রিয়নাথ সেনের বন্ধুত্ব রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল এক মহামূল্যবান উপহার।

অনেক বিষয়ে ব্যুৎপত্তির মতো ফলিত জ্যোতিষচর্চায় প্রিয়নাথ সেনের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর সঙ্গে তাঁর একবার তর্ক হয়েছিল যে ফলিত জ্যোতিষের সারবত্তা আছে কি না! প্রিয়নাথবাবু ফলিত জ্যোতিষচর্চা করতেন অর্থাৎ হাত দেখা কুষ্ঠীবিচার এগুলিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও এসবে বিশ্বাস করতেন। প্রিয়নাথবাবু রবীন্দ্রনাথের কোষ্ঠীবিচার করে যা যা লিখে দিয়েছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। মীন রাশি মীন লগ্নের ‘লগনচাঁদা ছেলে রবি’-র কোষ্ঠীবিচারের যে হদিস পাওয়া যায়– সেখানে অবশ্য শুধু সাফল্য নয়, অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা মৃত্যুশোকের কথাও বলা ছিল। প্রিয়নাথ সেনের কোষ্ঠীবিচার ছিল অভ্রান্ত নির্ভুল। একটা চিঠিতে পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথ, প্রিয়বাবুকে লিখছেন– আপনার কাছে আমার ছেলেমেয়ের যে কোষ্ঠীগুলি আছে তা তাড়াতাড়ি বিচার করে যদি পাঠিয়ে দেন তো ভালো হয়– রথীর মা অস্থির হচ্ছে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, ছেলেমেয়েদের কোষ্ঠীবিচারের জন্যেও রবীন্দ্রনাথ এই বন্ধুকেই ভরসা করতেন।

প্রিয়নাথবাবু রবীন্দ্রনাথের থেকে সাত বছরের বড় ছিলেন, কিন্তু তাতে তাঁদের সখ্যে কোনও বাধা তৈরি হয়নি, কারণ দু’জনেরই মনের কলসটি ভর্তি থাকত কাব্যরসে।। রবীন্দ্রনাথকে জানতে গেলে, গোটা মানুষটাকে জানতে গেলে, প্রিয়নাথ সেনের বন্ধুত্বের কথা, সেই দিনগুলোর গড়িয়ে যাওয়ার কথাও জানতে হয়– যার জন্য জীবনস্মৃতিতে একটি পুরো অধ্যায় তিনি রচনা করেছেন।

zoom
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, প্রিয়নাথ সেন, বৈকুণ্ঠনাথ দাস (সামনের সারি), রবীন্দ্রনাথ, প্রমথনাথ চৌধুরী, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (পিছনের সারি)

গতকাল, ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস পালিত হল সাড়ম্বরে। মানুষে মানুষে যোগ আর অল্প বা বেশি ঘনিষ্ঠতাই বন্ধুত্বের সূচনা করে। বিপদে-আপদে পাশে থাকা মানুষই প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে। যেভাবে প্রিয়নাথ সেনের বন্ধুত্ব পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আরও একবার জীবনস্মৃতি পড়ে নিলে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুদের জানা হয়ে যেতে পারে। আর সেই সূত্রে আমরাও যদি রবির বন্ধু হয়ে উঠতে পারি, অথবা রবি যদি সত্যি সত্যি আমাদের প্রাণের সখা হয়ে ওঠেন– তবে তো সেই পুরনো দিনের জীবনস্মৃতি আরও একবার ফিরে পড়া যেতেই পারে।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন তনুশ্রী ভট্টাচার্য-র অন্যান্য লেখা

……………………

Jiban Smriti Priyanath Sen Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar প্রিয়নাথ সেন

Share this article on