খুব অল্প সময়ে ১৩ কোটি মানুষের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে জাত গণনার রিপোর্ট প্রকাশ করে দেশে কিছুটা হইচই ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। নীতীশের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে বিহারের ৮৩ শতাংশ বাসিন্দাই নিম্নবর্ণের। এর মধ্যে ৩৬.০১ শতাংশ ‘অতি পিছড়ে বর্গ’ তথা ইবিসি। ২৭.১ শতাংশ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতি তথা ওবিসি। তফসিলি জাতি ১৯.৬৫ শতাংশ। তফসিলি উপজাতি ১.৬৮ শতাংশ। বিহারে উচ্চবর্ণের বাসিন্দা, তথা ব্রাহ্মণ, রাজপুত, ভূমিহার ও বানিয়ারা জনসংখ্যার মাত্র ১৫.৫ শতাংশ। ইবিসি ও ওবিসি মিলিয়ে জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশ হওয়ায় নীতীশ তাঁর রাজ্যে সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় ৬৫ শতাংশ সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করে দিয়েছেন।
নীতীশের এই তড়িঘড়ি জাত গণনার রিপোর্ট প্রকাশ এবং সংরক্ষণ বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। লোকসভা ভোটের মুখে নীতীশ প্যানডোরার বাক্স খুলেছেন বলে রাজনৈতিক মহলের কোনও কোনও অংশ থেকে বলা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ১৯৯০ সালে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি সেই ৩০ বছর আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ফলে, ‘মণ্ডল বনাম কমণ্ডল’ লড়াই ফিরিয়ে আনা কার্যত অসম্ভব। নীতীশের জাত গণনার রিপোর্টের কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাবই নেই।
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস অবশ্য নীতীশের পদক্ষেপে জাদু দেখছে। যে কংগ্রেস বরাবর জাতিভিত্তিক জনগণনার বিরোধিতা করে এসেছে, তারাই হঠাৎ জাত গণনার রিপোর্ট তৈরির প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করেছে রাজ্যে রাজ্যে। যে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার ভোট প্রক্রিয়া চলছে, তার সর্বত্র ইস্তাহারে কংগ্রেস জাত গণনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লোকসভা ভোটে জিতলে গোটা দেশে জাত গণনা হবে বলে রাহুল গান্ধীরা ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, বিজেপির হিন্দুত্বর রাজনীতিকে মোকাবিলা করতেই কংগ্রেস এতদিন বাদে ভি. পি. সিংয়ের লাইনে হাঁটতে শুরু করেছে।
নয়ের দশকের গোড়ায় লালকৃষ্ণ আদবানি যখন রামরথ বের করার প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের হাতিয়ার ছিল মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট। যে রিপোর্ট রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে প্রকাশ করতে চাননি। মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট সামনে এনে ভি. পি. সুকৌশলে বিজেপির হিন্দুভোট একত্রীকরণের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন। মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পরই দেশজুড়ে দপ করে আগুন জ্বলে উঠেছিল। হিন্দি বলয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ওবিসি ও উচ্চবর্ণের জনগোষ্ঠী। মণ্ডল রাজনীতি হিন্দি বলয়ে হিন্দু ভোটে যে বিভাজন তৈরি করে দিয়েছিল, তা রামমন্দির আন্দোলনের উত্তাল ঢেউকে অন্তত ব্যালট বাক্সে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছিল। লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, মায়াবতী, নীতীশ কুমাররা জাতের নামে ও সামাজিক ন্যায়ের কথা বলে কোটি কোটি মানুষকে নিজেদের ছাতার তলায় আনতে পেরেছিলন। হিন্দু পরিচিতিসত্ত্বার রাজনীতি পরাস্ত হয়েছিল। ১৯৯১ সালের লোকসভা ভোটে আদবানি সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে পারেননি। এমনকী, ১৯৯৮ ও ’৯৯-তেও অটলবিহারী বাজপেয়ীকে জাতভিত্তিক দলগুলির সঙ্গে আপস তথা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ‘কোয়ালিশন’ বা মিলিজুলি সরকার গড়তে হয়েছিল।