Donald Trump’s Election Defeat: What Went Wrong? Robbar
Robbar
  • ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৬ নভেম্বর ২০২৬

ট্রাম্পের টালমাটাল পৃথিবী

মার্কিন মুলুকে ভোট-রঙ্গ নতুন করে চর্চায়। কারণ, নির্বাচনী ফলাফলে বেশ বেকায়দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের কাছে রিপাবলিকদের ভরাডুবি প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন মার্কিনীদের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পছন্দ করা স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি নিজের পতনের কারণ হয়ে দেখা দিলেন? না কি ইরান যুদ্ধের পরিণতি, সঙ্গে বারাক ওবাকা নির্বাচনী প্রচার– কোনটা ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হল ট্রাম্পের এহেন পতনে?

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ১৮:০৯   
Facebook WhatsApp Messenger

একটি রেস্তোরাঁ, বারাক ওবামার একটি বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য, মার্কিন ট্রেজারি-সচিবের বিচিত্র আত্মপক্ষ সমর্থন এবং হোয়াইট হাউজের এক বেমক্কা নৈশভোজ, শেষপর্যন্ত চিজকেক ফ্যাক্টরিই হয়ে উঠল রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের সবচেয়ে হাস্যকর ও মজাদার প্রতীক!

আমেরিকার রাজনীতিতে কাদা ছোড়াছুড়ি মোটেই নতুন কিছু নয়। কিন্তু একটি রেস্তোরাঁকে ঘিরে প্রাক্তন ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের এমন অদ্ভুত সংঘাত সচরাচর দেখা যায় না। আর সেই চাপানউতোরের শেষ দৃশ্যটি তো রীতিমতো হাস্যরসের উপাদান!

গল্পের শুরু বারাক ওবামার একটি মন্তব্য দিয়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের অন্দরসজ্জায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে সোনা দিয়ে চারিদিক মুড়ে, জাঁকজমক এবং আড়ম্বরের যে উৎকট প্রদর্শনী শুরু করেছেন, তা নিয়ে কটাক্ষ করতে গিয়ে ওবামা বলেছিলেন, ‘ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ দেখে মনে হচ্ছে, সাদ্দাম হুসেন যেন একটি চিজকেক ফ্যাক্টরি খুলেছেন!’

zoom
ওবামার চালে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন

ক্ষুরধার মন্তব্য। একদিকে ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হুসেনের প্রাসাদের অতিরিক্ত জাঁকজমক, অন্যদিকে আমেরিকার জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেন চিজকেক ফ্যাক্টরির চোখধাঁধানো সাজসজ্জা– দু’টিকে এক সুতোয় বেঁধে ওবামা যেন ট্রাম্পের রুচিবোধকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন।

কিন্তু ট্রাম্প কি আর এমন অপমান হজম করার মানুষ!

মিসিসিপির এক নির্বাচনী সভায় তিনি প্রায় সাত মিনিট ধরে নিজের হোয়াইট হাউজ সংস্কারের পক্ষে সাফাই গাইলেন। চিজকেক ফ্যাক্টরির প্রশংসাও করলেন। জানালেন, এটি একটি সফল আমেরিকান ব্যবসা। ওবামা না কি বুঝতেই পারেন না, হোয়াইট হাউজের মতো ঐতিহাসিক সৌধের রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে করতে হয়।

নাটকের শেষ এখানেই নয়, বরং আসল মজাটা তখনও বাকি।

২৮ অক্টোবর জর্জিয়ার এক নির্বাচনী সভায় ওবামা ফের প্রসঙ্গটি টেনে আনলেন। তাঁর বিস্ময়, ট্রাম্প প্রশাসন সাদ্দাম হুসেনের সঙ্গে তুলনায় যতটা না ক্ষুব্ধ হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে চিজকেক ফ্যাক্টরির সঙ্গে হোয়াইট হাউজের নাম জড়িয়ে যাওয়ায়! তারপর একেবারে ঘরোয়া যুক্তি হাজির করলেন ওবামা। বললেন, তাঁর দুটি মেয়ে রয়েছে। তাদের বড় করতে গিয়ে চিজকেক ফ্যাক্টরিতে যে কতবার যেতে হয়েছে, তা তিনি ভালোই জানেন। রসিকতা করে তাঁর বক্তব্য, “দুই মেয়ের বাবা হয়ে কি চিজকেক ফ্যাক্টরি না-চিনে বেঁচে থাকা যায়?”

zoom
নির্বাচনী প্রচারে প্রাক্তন মার্কিন প্রসিডেন্ট ওবামা

ওবামা এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াকে অভিহিত করেন এক অভিনব নামে– ‘হোল অফ গভর্নমেন্ট রেসপন্স’, অর্থাৎ গোটা সরকারকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হল প্রতিক্রিয়া জানানোর কাজে! কেন এমন বললেন? কারণ, ট্রেজারি-সচিব স্কট বেসেন্টকেও এই রেস্তোঁরার পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গেল। এক সময়কার হেজ ফান্ড ম্যানেজার, বিপুল সম্পদের মালিক বেসেন্ট ওয়াশিংটনের একটি চিজকেক ফ্যাক্টরির সামনে হাজির হয়ে রেস্তোঁরাটির প্রতি তাঁর আনুগত্য ঘোষণা করলেন। কী খাবেন, সেটাও জানালেন ফলাও করে– ফ্রেঞ্চ ডিপ চিজবার্গার! এগ রোল নয়!

ওবামার কটাক্ষ ছিল, দেশের অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর সমস্যার দিকে নজর দেওয়ার বদলে ট্রেজারি-সচিবকে কি না রেস্তোঁরার মেনু নিয়ে প্রচারে নামতে হচ্ছে, রাজনৈতিক বিদ্রুপের এর চেয়ে উপাদেয় নমুনা আর কী হতে পারে?

কিন্তু এই কাহিনির সবচেয়ে হাস্যকর দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হল ৩ নভেম্বর, নির্বাচনের রাতে।

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ফল ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই এগিয়ে। হোয়াইট হাউজের ইস্ট রুমে নির্বাচনের ফল দেখার জন্য জমায়েত হয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। জমকালো সেই পার্টিতে তাঁদের জন্য অর্ডার দেওয়া হল চিজকেক ফ্যাক্টরির খাবার। হোয়াইট হাউজের এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল– ওবামার কটাক্ষকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, চিজকেক ফ্যাক্টরির নাম নিয়ে যতই ঠাট্টা হোক, ট্রাম্প শিবির তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়!

zoom
ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাঙবেন তবু মচকাবেন না

কিন্তু রাজনীতি যে সবসময় চিত্রনাট্য মেনে চলে না! হোয়াইট হাউজের হর্তাকর্তারা ভেবেছিলেন, মঙ্গলবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর অনুগত ক্যাবিনেটের সদস্য এবং MAGA-র সমর্থকদের উল্লাসে মেতে ওঠা সময়ের অপেক্ষা। ট্রাম্প অনুগামীরা ভেবেছিলেন, টিভি দেখতে দেখতে নানা ধরনের মুখরোচক স্ন্যাক্স ও রাতের খাবারটা চিজকেক ফ্যাক্টরি থেকে আনালে বেশ মজা হবে। ‘ডেইলি মেল’ এবং ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ পত্রিকায় এই খবর বিশদে বেরিয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ট্রাম্প ও তাঁর অতিথিদের আনন্দ করার মতো কিছুই ঘটছে না।

রিপোর্ট অনুযায়ী, খাবারের মধ্যে ছিল স্লাইডার, এগরোল এবং আরও নানা পদ। কিন্তু নির্বাচনী ফল যত স্পষ্ট হতে লাগল, উৎসবের মেজাজ ততই উধাও। একের পর এক আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের খবর আসতে থাকায় ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের তেতলায় তাঁর সর্বক্ষণের সহকারী ন্যাটালি হার্পকে সঙ্গে নিয়ে অন্ধকার ঘরে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানি ধারে-কাছে তো ছিলেনই না, ওয়াশিংটনেও ছিলেন কি না সন্দেহ। এরই মধ্যে ট্রাম্পের অসহায়তা ফুটে উঠল ফক্স নিউজে তাঁর একটি ফোন-সাক্ষাৎকারে। সেখানে কথা বলতে গিয়েই তিনি কার্যত চ্যানেলের সঞ্চালকের কাছে পাল্টা যুক্তিতে ধাক্কা খেলেন।

zoom

রিপাবলিকানদের হারের ব্যাপকতা যখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেই সময় ফোনে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ফক্স নিউজে পড়লাম, আমি না কি জনপ্রিয় নই। ফক্সের জনমত সমীক্ষাগুলি রাবিশ! আপনাদের উচিত ভালো কোনও সমীক্ষক নিয়োগ করা। কারণ আপনাদের সমীক্ষার ফলই সবচেয়ে খারাপ।’ জবাবে ফক্স নিউজের সঞ্চালক ব্রেট বেয়ার বলেন, ‘কিন্তু আজ রাতের নির্বাচনী ফলাফল তো আসলে ফক্সের জনমত সমীক্ষার ফলের সঙ্গেই যথেষ্ট মিলে যাচ্ছে।’ এই কথোপকথনের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই নানা মন্তব্য শুরু হয়। এক্স-এ একজন লিখেছেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্পকে ভীষণ অসহায় দেখাচ্ছে। এই নির্বাচন আসলে তাঁরই জনপ্রিয়তার ওপর গণভোট। কিন্তু তাঁকে সে-কথা বলবে কে?’ আর একজনের কটাক্ষ, ‘পরিস্থিতি যে কতটা খারাপ, তা বোঝা যায় যখন ট্রাম্প ফক্স নিউজের ওপরেই ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছেন।’

এরপর আর কী হতে পারে! যে নৈশভোজ হওয়ার কথা ছিল আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শনী, তা পরিণত হল হতাশার আসরে। রাত ১০টার মধ্যেই ইস্ট রুমে পড়ে থাকা বার্গারের ছোট ছোট টুকরো আর ট্রে-ভর্তি এগরোল এবং আরও অন্যান্য খাবার না-খাওয়া অবস্থায় বাসি হতে শুরু করল। খাবারের ট্রে পড়ে রইল, অনেক খাবারই ছোঁয়া হল না। কর্মকর্তারা একে একে সরে গেলেন। বিদেশসচিব মার্কো রুবিও-কে আগে দেখা গেলেও পরে তাঁর টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় আরও সব হোমরাচোমরাও দুঃখ ভুলতে রাজধানীর পানশালাগুলিতে গা ঢাকা দিলেন।

zoom
ট্রাম্পের ভরাডুবির নেপথ্যে অন্যতম বড় কারণ বিদেশসচিব মার্কো রুবিও-র ভূমিকা

ট্রাম্প তখন কী করছেন?

প্রথম নির্বাচনী ফল প্রকাশের এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এতটাই রেগে যান যে, কিছুক্ষণের জন্য কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। সেই সময় তাঁর পাশে শুধু ব্যক্তিগত সহকারী হার্প এবং ‘চিফ অব স্টাফ’ সুসি ওয়াইলস।

‘তিনি ফক্স নিউজ দেখছেন, কিন্তু প্রায় একটি কথাও বলছেন না। রাগে-ক্ষোভে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন।’ হোয়াইট হাউজের এক অভ্যন্তরীণ সূত্র ডেইলি মেলকে এমনটাই জানিয়েছে। আর এক সূত্রের খবর, ‘প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আবাসস্থলে আলো প্রায় নেই বললেই চলে। পরিবেশটা ভীষণ বিষণ্ণ।’

ট্রাম্পকে সব সময় খুশির খবর শোনাতে আগ্রহী তাঁর চাটুকারের দল ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিল। ‘ডেইলি মেল’কে এক সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সুসি ওয়াইলস হোয়াইট হাউসের কর্মীদের বলে আসছিলেন যে, শেষপর্যন্ত রিপাবলিকানরাই জয়ী হবে। ট্রাম্পের প্রাক্তন নির্বাচনী প্রচার-পরিচালক ক্রিস লা সিভিটাও প্রতি বৃহস্পতিবারের সাপ্তাহিক বৈঠকে প্রেসিডেন্টকে একই আশ্বাস দিতেন। এই ভিত্তিহীন তোষামোদি ও স্তোকবাক্যের জেরেই মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ওয়েস্ট উইংয়ের কর্মীরা আলোচনা করছিলেন, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সেনেট– দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বাড়বে।

অন্য এক সূত্রের স্মৃতিচারণ, টেলিভিশনের সংবাদপাঠকেরা যখন একের পর এক রিপাবলিকান প্রার্থীর লজ্জাজনক পরাজয়ের খবর ঘোষণা করছেন, তখন প্রেসিডেন্টের দীর্ঘদিনের কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট জেসন মিলার আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাঁর সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছিল।

zoom
নির্বাচনে হারের ধাক্কায় বিষণ্ণ ট্রাম্প

ট্রাম্পের প্রবল ক্ষোভ অবশ্য তাঁকে পুরোপুরি চুপ করিয়ে রাখতে পারেনি। ট্রুথ সোশালে তিনি নিজের রাগ প্রকাশ করতে শুরু করেন। মনের ঝাল মেটাতে একটি পোস্টে তাঁর মন্তব্য: ‘এই পরাজয়ের জন্য ফক্স নিউজও দায়ী।’ অন্য একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট যদি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ ছয় মাসে RINO (নামে রিপাবলিকান, কাজে ডেমোক্র্যাট) হয়ে না যেতেন, তা হলে তিনি হারতেন না।’

এদিকে, প্রেসিডেন্ট যখন অনলাইনে নিজের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তখন হোয়াইট হাউজ থেকে মাত্র তিন রাস্তা দূরের একটি পানশালায় হুইস্কিতে চুমুক দিচ্ছিলেন তাঁর পদলেহী চাটুকাররা। রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়ের দায়ে প্রশাসনের কোন কোন মাথায় শেষ পর্যন্ত কোপ পড়তে পারে, তা নিয়েই চলছিল তাঁদের গোপন আলোচনা।

তবে মদের গেলাস হাতে এই চর্চা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে শুরু হয়েছে দোষারোপ, নেতৃত্বের লড়াই এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে অস্বস্তিকর আত্মসমীক্ষা। মাইক জনসনের বিদায়ের সম্ভাবনায় নেতৃত্বের দাবিদার স্টিভ স্ক্যালিস ও জিম জর্ডান। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

zoom
নড়বড়ে মসনদ, ট্রাম্পকে যেন সেই কথাই বলছেন ভান্স

ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে নাটকের অভাব নেই। কিন্তু ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কার্যত রাজনৈতিক প্রহসন। যে দল এত দিন নিজেদের অপরাজেয় মনে করত, তারা এখন পরাজয়ের দায় কার, তা নিয়ে পরস্পরের দিকে আঙুল তুলছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। হাউসে অন্তত ৩০টি আসন খুইয়েছে তারা। সেনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাকি দু’বছর ট্রাম্পকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে লড়াই করেই কাটাতে হবে। ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টের থাকবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা।

তবে নির্বাচনী পরাজয়ের চেয়েও বড় সংকট এখন দলের অভ্যন্তরে। কেউ দুষছেন হোয়াইট হাউজকে, কেউ কংগ্রেসের নেতৃত্বকে, আবার কেউ MAGA আন্দোলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ তুলছেন সহকর্মীদের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন এখন শুধু কেন হারল রিপাবলিকানরা, তা নয়; এই পরাজয়ের পর নেতৃত্বে টিকে থাকবেন কারা, ঘুরছে সেই প্রশ্নও।

প্রথম রাজনৈতিক বলি ‘হাউজ স্পিকার’ মাইক জনসন। ২০২৩ সালে কেভিন ম্যাকার্থিকে সরিয়ে দেওয়ার পর রিপাবলিকানদের নেতৃত্বের সংকটের মধ্যে তুলনামূলক অপরিচিত জনসন আপসের প্রার্থী হিসেবে স্পিকার হন। সেই কারণেই তাঁকে বলা হত ‘আকস্মিক স্পিকার’। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল অসাধারণ। প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা হত দু’জনের। ট্রাম্পের কণ্ঠস্বর নকল করে সেই কথোপকথনের বিবরণও দিতেন জনসন। বিনিময়ে তিনি হাউজে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ আইন ও কর-ব্যয়ের বিল পাশ করাতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু ক্রমশ তাঁর স্বাধীন নেতৃত্বের পরিচয় মুছে গিয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবেই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

zoom
ট্রাম্পের ভরসা রাখতে ব্যর্থ মাইক জনসন

নির্বাচনের আগে ২২টি রাজ্যের ৪০টিরও বেশি কেন্দ্রে প্রচার চালিয়েও দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করতে পারেননি তিনি। নির্বাচনের রাতে লুইজিয়ানায় নিজের অনুষ্ঠানে দীর্ঘক্ষণ অনুপস্থিত থাকেন। ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর শিবিরে নেমে আসে বিষণ্ণতা। পরদিনই জনসন জানিয়ে দেন, আগামী কংগ্রেসে সংখ্যালঘু দলনেতার পদে তিনি লড়বেন না। কংগ্রেস সদস্য থাকলেও তাঁর স্পিকার-অধ্যায় কার্যত শেষ। নির্বাচনের আগে তিনি মজা করে বলেছিলেন, দল হারলে শ্রেভপোর্টে ফিরে ঘাস কাটার ব্যবসা শুরু করতে পারেন। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বাগান অবশ্য এখন সত্যিই আগাছায় ভরে গিয়েছে!

জনসনের বিদায়ে নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে এসেছেন স্টিভ স্ক্যালিস ও জিম জর্ডান। লুইজিয়ানার স্ক্যালিস অভিজ্ঞ, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং ব্যবসাবান্ধব রক্ষণশীল শিবিরের প্রতিনিধি। ২০১৭ সালে বন্দুকবাজের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েও তিনি রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলেন। পরে রক্তের ক্যান্সারেও আক্রান্ত হন; ২০২৪ সালে জানান, রোগটি প্রশমিত হয়েছে।

অন্যদিকে, ওহাইওর জিম জর্ডান অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, প্রাক্তন কুস্তি প্রশিক্ষক জর্ডান ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক এবং ডেমোক্র্যাটদের আপসহীন সমালোচক। তাঁর যুক্তি, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করবে। সেই আক্রমণ সামলাতে রিপাবলিকানদের দরকার একজন লড়াকু নেতা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আসলে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে দ্বন্দ্ব। স্ক্যালিস চান দলের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে এনে মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছতে। জর্ডানের শিবির মনে করে, পরাজয়ের জবাব আরও আক্রমণাত্মক MAGA রাজনীতি দিয়েই দিতে হবে।

বিড়ম্বনা হল, ২০২৩ সালে স্পিকার পদে লড়াই করতে গিয়ে দু’জনেই ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁদের দ্বন্দ্বের জেরেই শেষপর্যন্ত আপসের প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছিলেন জনসন। এবার তাঁরা আবার মুখোমুখি, তবে নেতৃত্বের লড়াই এবার একটি পরাজিত বিরোধী দলের। ১০ নভেম্বর গোপন ব্যালটে নেতৃত্ব নির্বাচন হওয়ার কথা। শীর্ষপদ ছাড়াও হুইপ এবং নির্বাচনী সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা রিচার্ড হাডসন নিজেই নিজের কংগ্রেসীয় আসন হারানোর মুখে।

zoom
ভোটপ্রচারে ট্রাম্প

নির্বাচনের পর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এসেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের কাছ থেকে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ভ্যান্স প্রকাশ্যেই ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রধান কারণ বলেছেন। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মন্তব্য, ‘আমাদের হারার কারণ যুদ্ধ।’ ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরোধী হিসেবে পরিচিত। এবার তিনি কার্যত ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশনীতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন। ভাবী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ইরান যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলেও ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

ট্রাম্প অবশ্য স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং নির্বাচনে তার প্রভাব পড়েছে। কিন্তু সামরিক অভিযানকে ভুল সিদ্ধান্ত বলতে তিনি রাজি নন। এখানেই ফুটে উঠেছে সম্ভাব্য উত্তরসূরি ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দূরত্ব। আর ব্লেমগেমের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে ট্রাম্পকে টেক্কা কে আর দিতে পারে! সংবিধান অনুযায়ী, ট্রাম্প তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে পারবেন না। ফলে ২০২৮ সালের নেতৃত্বের লড়াই কার্যত শুরু হয়ে গিয়েছে। ভ্যান্সের লক্ষ্য, MAGA সমর্থকদের উত্তরাধিকারী হওয়া, কিন্তু ট্রাম্পের প্রতিটি জনবিরোধী সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলা। অন্যদিকে, ভ্যান্সের প্রতিযোগী বিদেশসচিব রুবিও। শোনা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি জোরদার করতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ইস্তফা দিতে পারেন।

পারস্পরিক দোষারোপের পালা নিয়ে এখন ওয়াশিংটন উত্তাল। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এবং ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর বৃত্তান্ত। হোয়াইট হাউজের ‘ডেপুটি চিফ অব স্টাফ’ তথা ট্রাম্পের অন্যতম রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার কট্টর অভিবাসী-বিরোধী বলে পরিচিত। কিন্তু অভিবাসী বিতাড়নের হুজুগে তিনি খোদ মেলানিয়া ট্রাম্পের বিশেষ পরিচিত কয়েকজনকেও আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে ছেড়েছেন। ব্যস! আর যায় কোথায়! মেলানিয়া এই নিয়ে ট্রাম্পের কাছে নালিশ করেছেন। হোয়াইট হাউজের ‘চিফ অব স্টাফ’ সুসি ওয়াইলসও মিলারের কঠোর ও বিতর্কিত অভিবাসী বিতাড়ন অভিযানের বিরোধিতা করেছেন। এরপর ট্রাম্প নিজেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, মিলার কি ক্রমশ দলের কাছে বোঝা হয়ে উঠছেন? সুসি ওয়াইলসও ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন, যাতে মিলারকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

zoom
বিধ্বস্ত ট্রাম্প

এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর দোষারোপের পালা ক্রমেই বাড়ছে। হোয়াইট হাউজের অন্দরমহল থেকে মিলারের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক ক্ষতিকর তথ্য সামনে আসছে। কাজেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে। কী দ্রুত পাল্টে যায় পরিস্থিতি! মিলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও সুসি ওয়াইলসকে ‘চিফ অব স্টাফ’-এর পদ থেকে সরিয়ে নিজে সেই দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আর এখন তাঁর নিজের পদই বিপন্ন। ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর সমালোচকদের শান্ত করতে ট্রাম্পও ‘বলির পাঁঠা’ খুঁজছেন। সেই ব্যক্তি হতে পারেন মিলার। MAGA-র উগ্র ও কঠোর অভিবাসন নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন তাঁর মধ্যেই দেখা গিয়েছে। ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার’ হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’(ICE)-এর একদল আগ্রাসী কর্মীকে নামানো হয়েছিল বিভিন্ন এলাকায়। তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়, হয়রানির শিকার হয় বহু নাগরিক এবং অনেক নিরপরাধ মানুষ সেই অভিযানে আহতও হন। এমনকী, ক্যামেরার সামনে নিরস্ত্র ও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এসবের জন্য কোনও অনুশোচনা দেখা যায়নি; বরং অভিযুক্তদের সমর্থন করা হয়েছে।

লক্ষ লক্ষ মার্কিন নাগরিক টেলিভিশনের পর্দায় এসব দেখে বুঝেছিলেন, এ তাঁদের ভালোবাসার দেশ নয়। সেই প্রতিবাদেই প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন এবং মঙ্গলবার ভোটের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। পাশাপাশি মিলারের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের মতে, তাঁর নীতিতে মানবিক সহানুভূতির কোনও স্থান নেই। তিনি পদে থাকলে মার্কিন নাগরিকদের ওপর আরও কঠোর নীতি চাপানোর চেষ্টা করবেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাতে অহেতুক বিতর্ক আরও বাড়বে। এখন তাঁকে সরানোর জন্য তাই দলের অন্দরেই চাপ বাড়ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে অপমানজনক পরাজয়ের পর ক্ষুব্ধ ট্রাম্পও নানা জনকে শাস্তি দেওয়ার ফিকির খুঁজছেন। সেই তালিকায় মিলারের নাম ক্রমশ সামনে আসছে। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনে এবার একের পর এক অপসারণের চিত্র ফুটে বেরবে। সরানোর তালিকায় প্রথম নামটি হতেই পারে স্টিফেন মিলারের!

আগামী জানুয়ারিতে নব-নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সদস্যরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে যাবে আর এক সুনামি। ট্রাম্প এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে পর্বত-প্রমাণ দুর্নীতির তদন্ত হবে। ট্রাম্পের চাটুকার বাহিনীও রেহাই পাবে না। বলা সহজ হলেও করা সহজ নয়। তবু ট্রাম্পকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও উঠছে। দাবি উঠছে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার ল্যাজেগোবরে অবস্থার জন্য অন্যতম দায়ী যুদ্ধ-সচিব হেগসেথকেও পত্রপাঠ বিদায় করার।

তবে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংকট নিছক নির্বাচনী পরাজয়ের নয়। নেতৃত্ব, আদর্শ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্তিত্বের লড়াইও এর সঙ্গে জড়িত। পরাজয়ের ধাক্কায় রিপাবলিকান পার্টি এখন শুধু নতুন নেতা খুঁজছে না, খুঁজছে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

……………………

American Democracy American Politics Barack Obama Democratic Party Donald Trump Election Campaign Iran-US Conflict Republican Party Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Trump Administration Trump Political Strategy US Election US Political Campaign US Voters USA-Iran War White House

Share this article on