Robbar

আরাবল্লি না থাকলে আমূল বদলে যাবে ভারতের জলবায়ু

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 6, 2026 2:58 pm
  • Updated:January 7, 2026 8:18 pm  

ভারত মৌসুমী বায়ুর দেশ। কিন্তু মৌসুমী বায়ু হঠাৎ কেন আমাদের দেশে আসে? আসে, কারণ– উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের নিম্নচাপ মৌসুমী বায়ুকে টেনে নিয়ে আসে আমাদের দেশে। সে আসে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এবং সব শেষে গিয়ে পৌঁছয় উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় অঞ্চলে। সেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আরাবল্লি এই বায়ুকে বাধা দেয় এবং বৃষ্টিপাতে সহযোগিতা করে। শুধু তাই নয় আরও উত্তরে গিয়ে হরিয়ানা, দিল্লি ও পশ্চিম গুজরাট অঞ্চলে তা বৃষ্টির সমবন্টন নিয়ন্ত্রণ করে।

দীপাঞ্জন মিশ্র

আজ থেকে ১.৪ বিলিয়ন অর্থাৎ ১৮০ কোটি বছর আগের কথা। পৃথিবী তখনও খুব অস্থির। একের পর এক প্লেট একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নতুন কিছু-না-কিছু ভূমিরূপ তৈরি হচ্ছে। নরম শরীরের ‘ডিকনিসোনিয়া’ প্রাণীরা জন্ম নিচ্ছে। ঠিক এইরকম একটা সময়ে দু’টি প্লেটের ধাক্কায় তৈরি হয় আরাবল্লি। পৃথিবীর সব থেকে পুরনো পর্বতমালাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ‘আরবল্লি’ কথাটা এসেছে সংস্কৃত ‘আরা’ এবং ‘ভালি’ থেকে, যার অর্থ ‘শিখর-শ্রেণি’। অর্থাৎ বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে এই পর্বতমালা একসময় সুউচ্চ ছিল, যার প্রমাণ হিসেবে এখনও রয়ে গিয়েছে ‘গুরুশিখর’।

সৃষ্টির পরবর্তী ১৮০ কোটি বছরে আরবল্লি চোখের সামনে জন্ম নিতে দেখেছে পশ্চিমঘাট আর হিমালয়কে। তার সঙ্গে নিজে জন্ম দিয়েছে লুনি, সবরমতী, বানস ইত্যাদি পশ্চিম ভারতের বিখ্যাত নদীগুলিকে। নদীর জন্ম দিতে গিয়ে একের পর এক ক্ষয়কার্যের মুখোমুখি হয়েছে। যার দরুণ নিজের উচ্চতাও হারিয়েছে।

আরাবল্লি পর্বতমালা। আলোকচিত্র: লেখক।

এ তো গেল ইতিহাস, ভূগোল এসবের কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আরাবল্লি পর্বতমালাকে নিজের গুরুত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে। কারণ যা কিছুর গুরুত্ব কম বা নেই– তাকে আমরা কখনওই রাখতে চাই না। আরাবল্লির দুর্ভাগ্য যে সে-ও গুরুত্বহীনের দলে পড়ে গিয়েছে। তার অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি চলছে। তাই আরাবল্লির গুরুত্ব ঠিক কী, তা জানাটা বিশেষ প্রয়োজন বলে মনে হয়।

পশ্চিম ভারতের অনেকটা সমান্তরালভাবে বিস্তৃত এই পর্বতমালা দিল্লি, হরিয়ানা থেকে গুজরাট অবধি প্রায় ৬৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ। তার উত্তরদিকের অংশ নানা প্রকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে নিচু এবং দক্ষিণে গুজরাটের দিকটি অপেক্ষাকৃত উঁচু। ভারতের জলবায়ু অঞ্চলের শ্রেণিবিন্যাস রক্ষার্থে এই পর্বতমালার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত মৌসুমী বায়ুর দেশ। কিন্তু মৌসুমী বায়ু হঠাৎ কেন আমাদের দেশে আসে? আসে, কারণ– উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের নিম্নচাপ মৌসুমী বায়ুকে টেনে নিয়ে আসে আমাদের দেশে। সে আসে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এবং সব শেষে গিয়ে পৌঁছয় উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় অঞ্চলে। সেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আরাবল্লি এই বায়ুকে বাধা দেয় এবং বৃষ্টিপাতে সহযোগিতা করে। শুধু তাই নয় আরও উত্তরে গিয়ে হরিয়ানা, দিল্লি ও পশ্চিম গুজরাট অঞ্চলে তা বৃষ্টির সমবন্টন নিয়ন্ত্রণ করে। তাছাড়া সুদূর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হওয়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝা যখন ভারতে এসে পৌঁছয়, তখনও একইরকম দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে আরাবল্লি বৃষ্টির বন্টন করে– যা ফুঁসতে থাকা থর মরুভূমির আগ্রাসন থেকে উত্তর পশ্চিমের রাজ্যগুলিকে রক্ষা করে।

সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গুরুশিখর থেকে আরাবল্লি পর্বত শ্রেণি

এছাড়াও এই সুবিস্তৃত পর্বতশ্রেণির সবুজ চাদর এই এলাকার স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে সাহায্য করে; এবং মরুভূমির এগিয়ে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রচুর ফাটলে ভরা আরাবল্লি বৃষ্টির জল সরাসরি পাঠিয়ে দেয় ভূমিভাগের নিচে– যা ভৌম জলস্তর তৈরিতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য ছোট ছোট উপত্যকা বা গভীর জমি, প্রাকৃতিক জল ধরে রাখে, যা পর্যাপ্ত জলের যোগান দেয় সারা বছর ধরে। এ বাদে গাঙ্গেয় উপত্যকায় জলের যোগান দেওয়া, পশ্চিমের ব্যাপক ধুলোর ঝড় থেকে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের মতো নিচু ভূমিভাগগুলোকে ক্রমাগত রক্ষা করা এসব তো আছেই। শীতের সময়ের রক্ষাকর্তা আরবল্লি, হিমালয়ের সঙ্গে মিলে মধ্য এশিয়া থেকে আসা শীতল বাতাসকে বাধা দেয়। উত্তর ভারত ও মধ্য ভারতকে শৈত্যপ্রবাহের হাত থেকে রক্ষা করে।

এবার একবার ভেবে দেখা যাক আরবল্লি নেই। এই শূন্যতাটুকু একবার চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ অনুভব করুন, পাঠক। কেমন খালি লাগছে না? দেখতে পাবেন– গরম বালি ক্রমশ গলা টিপে ধরেছে পশ্চিমের ছোট ছোট নদীগুলোর; ক্রমে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের পশ্চিম প্রান্ত বালিতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে; গঙ্গার গতিপথ হারিয়ে যাচ্ছে গরম বালিতে; ভারতের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে– তাই না?

হ্যাঁ, বৃদ্ধ আরাবল্লি না থাকলে ঠিক এরকমটাই হবে।

রনথম্বোর ন্যাশনাল পার্ক, রাজস্থান

উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আরাবল্লি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মেরুদণ্ড। এই পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল রাজ্য, দুর্গ, বাণিজ্যপথ এবং শক্তিশালী রাজবংশের শাসনব্যবস্থা। ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বে এই পর্বতমালা ঘিরে গড়ে উঠেছিল নানা সভ্যতা। এছাড়া এই পর্বতমালায় পাওয়া গেছে প্রস্তরযুগের উপকরণও। তেশাম পাহাড়শ্রেণি এবং তার আশেপাশের এলাকাগুলিতে প্রাপ্ত সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থল তার প্রমাণ। তামা ও অন্যান্য খনিজে ভরপুর আরাবল্লি আসলে তৎকালীন সিন্ধু সভ্যতার বাণিজ্যে ও ধাতুবিদ্যায় ব্যবহৃত হত।

তাছাড়া এই পর্বতশ্রেণির বুকে লুকিয়ে রয়েছে ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের নানা ঘটনা। মধ্যযুগের প্রথম ভাগে (আনুমানিক ৮-১২ শতক ) আরাবল্লি অঞ্চল ছিল রাজপুত রাজবংশগুলির প্রধান ঘাঁটি। বিশেষত গুহিল, চৌহান, পরমার এবং সোলাঙ্কি বংশ এই পাহাড়ঘেরা ভূপ্রকৃতিকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করে তুলেছিল। আরাবল্লির দুর্গম পাহাড়, সংকীর্ণ গিরিপথ ও বনভূমি, শত্রু আক্রমণ প্রতিরোধে স্বাভাবিক দুর্গের কাজ করত। জল-জঙ্গলে ঘেরা এই পাহাড় বাইরের শত্রুদের কাছে ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল এই সময়ে।

রাণা প্রতাপের জন্মস্থান কুম্ভলগড় দুর্গ, রাজস্থান আরাবল্লি

আরাবল্লি পর্বতমালার গায়ে গড়ে তোলা দুর্গগুলি মধ্যযুগীয় ভারতের সামরিক স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণও বটে। কুম্ভলগড়, রানথম্ভোর, চিত্তোরগড় প্রভৃতি দুর্গগুলি কেবল রাজ্যের নিরাপত্তাই নয়, শাসন ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। মেবার অঞ্চলে রাজপুতরা বারবার দিল্লি সালতানাত ও পরবর্তীকালে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এই পাহাড়কে আশ্রয় করে। আসলে অত্যন্ত মূল্যবান খনিজ পদার্থে ভরপুর আরাবল্লির দখল নিতে সকলেই চাইত; আর তা থেকেই এত লড়াই।

পাহাড় দখলের এই যে লড়াই, তা বহুদিনের। কখনও বাইরের শক্তি, কখনও-বা দেশের অভ্যন্তরের শক্তি– প্রায় সকলেই লড়াই করেছে এই মূল্যবান সম্পদকে হাতের মুঠোয় আনতে। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে কেউই পেরে ওঠেনি কখনও। তার কারণ মানুষের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক।

ছোট্ট একটা গ্রামের গল্প বলে শেষ করি!

তখন আমি চাকরি নিয়ে বদলি হয়েছি রাজস্থানের উদয়পুরের কাছের একটি গ্রামে। চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা এই গ্রামটায় হাতে-গোনা ক’জন মানুষ থাকে। আমার ঠাঁই হয়েছিল স্কুল থেকে কিছু দূরে, একদম গ্রামের শেষ প্রান্তের একটা ভাড়াবাড়িতে। সেই বাড়ির ছাদ গিয়ে মিশেছে আরাবল্লির ঢালে।

সন্ধেরাতের মায়াবী আরাবল্লি, মাউন্ট আবু

সমুদ্র সমতল থেকে উঠে আসা একজন মানুষ আমি। এই দৃশ্য আমাকে রোজ বিস্মিত করত। সন্ধে নামার আগে রোজ দেখতাম এক দল মহিলা পাহাড় বেয়ে উঠছে উপরদিকে; আর ঠিক সন্ধের পর, সাতটা নাগাদ তারা লণ্ঠন হাতে লাইন করে নেমে আসছে। পরে সেই পাহাড়ে চড়ে জানতে পেরেছিলাম, এই স্থান তাদের পূর্বপুরুষদের। তারা রোজ সেখানে তাঁদের স্মরণ করতে আসে। কিছুটা অবাক হলেও, বুঝেছিলাম, এখানকার মানুষ এভাবেই পাহাড়কে আঁকড়ে ধরে বাঁচে।

এ ঘটনার কয়েক মাস পরে, তখন বর্ষার সময়– আমাদের বাংলায় তখন ভরপুর বর্ষা চলছে। আমি খবর পাচ্ছি বাড়ি থেকে। আর রাজস্থানের গ্রামের মানুষের মুখে শুনতে পাচ্ছি যে তারা দিন গুনছে। পাশের জলাধারগুলোর জলের মাপ নিচ্ছে। এক শিক্ষিকাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এই তো একটাই সুযোগ। বছরে একটাবার বর্ষা আসে এই সময়। একটু ভালো জল না-হলে কী করে সারাবছর চলবে! তাই তারা জলাধারগুলো দেখে নেয়। বুঝে নেয়, ঠিক কতটা বৃষ্টির প্রয়োজন তাদের এ বছর। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে– কী চাষ হবে, কখন চাষ হবে ইত্যাদি। সে বছর দেরি করে হলেও বৃষ্টি হয়েছিল বেশ ভালো। সকলের মুখে সেদিন হাসি দেখেছিলাম। আর দেখেছিলাম স্বস্তির ছায়া।

আসলে মানুষ চায় এরকমই নিজেদের আশেপাশের জিনিসগুলোর সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে। সেই সম্পর্ক তাদের বেঁচে থাকার পথ, বেঁচে থাকার অর্থ ও অভিমুখ ঠিক করে দেয়। এই আন্তরিকতার সামনে দাঁড়িয়ে, এমন এক ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক আত্মীয়কে নিশ্চিহ্ন হতে দেওয়া যায় কি? 

বিচার আমাদের হাতে। প্রয়োজনে স্বার্থপর হতে হবে। কারণ এ স্বার্থ আত্মীয়তার, এ সংকট অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে।