is nepal disaster a manmade climate injustice | Robbar
Robbar
  • ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতির প্রতিশোধ

পৃথিবীর ইতিহাসে জীবন আনুমানিক পাঁচবার লুপ্ত হয়েছে। কারণগুলির মধ্যে আগ্নেয়গিরি, উল্কা, বিষাক্ত গ্যাস উল্লেখযোগ্য। ষষ্ঠ বিলোপ প্রক্রিয়া আমাদের অজান্তেই শুরু হয়ে গিয়েছে! এবারে এইরকম দ্রুততার সঙ্গে ধ্বংস এর আগে পৃথিবীতে কখনও ঘটেনি। আগের সব অবলুপ্তি ঘটেছিল প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে। কিন্তু এবার হল ব্যতিক্রম, এবারে পৃথিবীতে জীবনের অবলুপ্তি ঘটাতে চলেছে স্বয়ং মানুষ।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১৮:৩৬   
Facebook WhatsApp Messenger

লিখতে বসে মনে পড়ে যাচ্ছে, বিখ্যাত হলিউড তথ্যচিত্র ‘বিফোর দ্য ফ্লাড’-এর কথা। ২০১৬ সালে প্রকাশ পাওয়া এই ডকুমেন্টারিতে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও জাতিসংঘের শান্তিদূত হিসেবে তিন বছর ধরে বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তিনি পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের দ্রুত অবক্ষয় স্বচক্ষে দেখবেন।

এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর ১০ বছর কেটে গিয়েছে। আমরা দেখছি, ‘ক্লাইমেট ইনজাস্টিস’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘জলবায়ুর অবিচার’। এর মূল অর্থ হল: কিছু মানুষ তথা প্রকৃতির ওপর জলবায়ু বদলের কুপ্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে, কিন্তু আসলেই সেসব মানুষ বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।

একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে। পুরো পৃথিবীর কার্বন এমিশনের নিরিখে নেপালের পারসেন্টেজ খুব সামান্যই, মাত্র ০.১%। একজন নেপালি সারা বছরে কার্বন নিঃসরণ করেন মাত্র অর্ধেক টন, সেই জায়গায় একজন আমেরিকান করেন তার ১৪ গুণেরও বেশি! অর্থাৎ, নেপালের নাগরিক যাঁরা সাম্প্রতিক হড়পা বানে প্রাণ হারালেন, সর্বস্ব খোয়ালেন– তাঁরা আসলে প্রকৃতিতে কার্বন নিঃসরণ তেমনভাবে করেননি। কিন্তু যাঁরা বন নিধন করেছেন, কয়লা, তেল জ্বালানো থেকে শুরু করে কলকারখানা, শিল্প করার জন্য প্রচুর কার্বন এমিট করেছেন– সেই পশ্চিমি দেশের নাগরিকেরা কিন্তু এই বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকে হাজার মাইল দূরে স্বচ্ছন্দে রয়েছেন, আরামে জীবন কাটাচ্ছেন! অথচ আজ এই হিমবাহ গলার জন্য, এত মানুষের মৃত্যুর জন্য প্রকৃত দায়ী কিন্তু তাঁরাই। এই ঘটনাকে বলে ‘ক্লাইমেট ইনজাস্টিস’।

কোনও ব্যক্তি, পণ্য অথবা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর তাদের দৈনন্দিন ও উৎপাদনশীল কাজের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে, তার মোট পরিমাণকে সেই ব্যক্তি, পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ বলা হয়। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট (CO2E) একক দিয়ে মাপা হয়। এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হল, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার বৃদ্ধি, যার অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী ফল হল হিমবাহের গলন, সমুদ্রের জল বৃদ্ধি, বন্যা। 

zoom
ভয়াবহ বন্যার কবলে মানবসম্পদ

সাব-সাহারান আফ্রিকার ব্যক্তিদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু দুঃখের কথা, আফ্রিকান জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি আবার সেই সাব-সাহারান আফ্রিকাই! একইরকমভাবে পাকিস্তান, সোমালিয়া, বাংলাদেশের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কম হলেও, এই দেশগুলোই আজকের দিনে প্রাকৃতিক দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

আমরা নেপালে এই ভয়ংকর বন্যার কারণ সকলেই জেনেছি। 

তিব্বতের লেন্দে নদী বা ভোটকোশির উৎসের জায়গায় বিশাল আকৃতির হিমবাহ গলে হড়পা বানের রূপ নেয়। এই ধরনের ঘটনাকে ‘গ্লেসিয়ার লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বলা হয়! এই বন্যা এক ফোঁটা বৃষ্টি ছাড়াই ঘটে। তাই আগে থেকে সাবধান হওয়ার সুযোগ একেবারেই থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু তছনছ হয়ে যায়। এর আগে ২০২৩ সালে এইরকম হড়পা বানে তছনছ হয়ে গিয়েছিল আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য সিকিম। 

zoom
সিকিমের বন্যার ধ্বংসাবশেষ

পৃথিবীর ইতিহাসে জীবন আনুমানিক পাঁচবার লুপ্ত হয়েছে। কারণগুলির মধ্যে আগ্নেয়গিরি, উল্কা, বিষাক্ত গ্যাস উল্লেখযোগ্য। ষষ্ঠ বিলোপ প্রক্রিয়া আমাদের অজান্তেই শুরু হয়ে গিয়েছে! এবারে এইরকম দ্রুততার সঙ্গে ধ্বংস এর আগে পৃথিবীতে কখনও ঘটেনি। আগের সব অবলুপ্তি ঘটেছিল প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে। কিন্তু এবার হল ব্যতিক্রম, এবারে পৃথিবীতে জীবনের অবলুপ্তি ঘটাতে চলেছে স্বয়ং মানুষ। এই পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী, সবচেয়ে যোগ্য জীব মানুষ…। মানুষ সেই প্রজাতি, যে দূষণের সমস্ত কারণ, সমস্যা ও পরিণতি সম্বন্ধে খুব ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। তবুও… তবুও এই ধ্বংস, এই বিলুপ্তি, এই অবক্ষয়ের জন্য দায়ী শুধুমাত্র মানুষই!

ওয়ার্ল্ড মেট্রোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের মতে, আগামী চার বছরের মধ্যে অন্তত এক বছরের জন্য বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে সাময়িকভাবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার পুরো সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, যদি মানবজাতি আজকের দিনেও বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি আটকে দেয়, আজকের পরে যদি কখনও পৃথিবীর গড় উষ্ণতা আর না-ও বাড়ে, তবুও হিমালয়ের এক তৃতীয়াংশ হিমবাহ গলবেই! আর মানুষ যদি এভাবেই প্রকৃতির বিনাশ ঘটাতে থাকে, তাহলে আমরা হিমালয়কে যে শ্বেতশুভ্র সুন্দর দেখছি তা অচিরেই পরিণত হবে ধূসর ঊষর কালো পর্বতে! হিমালয়ের হিম অর্থাৎ তুষার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। জনপদ বয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষ মরবে নির্বিশেষে…। নেপাল, সিকিম নয় শুধু, মানুষের এই সর্বনাশী কুচিন্তা একদিন ডুবিয়ে দেবে পুরো পৃথিবীকে। 

zoom
বিপর্যয়-পরবর্তী নেপাল

আগেই আলোচনা করেছি, পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমবর্ধমান, হিমবাহ গলছে অতি দ্রুততার সঙ্গে। হিমালয়ে রয়েছে প্রায় ষাট হাজার হিমবাহ। হিমালয়কে পৃথিবীর তৃতীয় মেরু বলা হয়। অর্থাৎ উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুর পরে এই অঞ্চলেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ও বড় হিমবাহ জমা রয়েছে। এশিয়ার দশটি প্রধান নদীর উৎপত্তিস্থল হিমালয়। পৃথিবীর প্রায় দুশো কোটি মানুষ এই জলের ওপর নির্ভরশীল। এবার এই সুবিশাল হিমবাহ গলে গেলে কী ভয়ংকর সর্বধ্বংসী বিনাশ হতে পারে তা কল্পনা করতে গেলে কেঁপে উঠতে হয়।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে আইসল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন জ্যাকবসদোত্তির, পরিবেশবিদ এবং প্রায় ১০০ জন মানুষ মিলে ‘ওকজোকুল’ নামক একটি মৃত হিমবাহের শ্রাদ্ধ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করেছিলেন। ওকজোকুল হিমবাহটি আইসল্যান্ডের পশ্চিমে অবস্থিত একটি আগ্নেয়গিরির চূড়ায় প্রায় ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল। এই সুবিশাল ও প্রাচীন হিমবাহটি পৃথিবীর উষ্ণতায় গলতে গলতে হালকা হয়ে গিয়েছিল। তার প্রতীকী মৃত্যু ঘটেছিল! 

zoom
ওকজোকুল হিমবাহের শেষকৃত্য

তার শেষ কাজ করেছিল মানুষ। মানুষ এর বেশি আর কী-ই বা করতে পারে…! প্রথমে এই অনন্য পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে, তারপর তা কতটা খারাপ হল তার হিসাবে ব্যস্ত থাকে। অবশেষে ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী জেনেও একে অপরকে দোষারোপ করতে করতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতেই থাকে!

কিন্তু, প্রকৃতির চেয়ে মানুষ বড় নয়! এই পৃথিবী জানে ঠিক কোন পর্যায়ে এসে মানুষকে থামাতে হবে। এই জীবজগতকে কেমন করে ‘রিসেট’ করতে হবে তা প্রকৃতি জানে। ‘আমি সকলের সেরা’ এই ভুল মানুষের অচিরেই ভাঙবে। জীবজগতের ওপর এই মারাত্মক অত্যাচারের মাশুল একদিন গুণতে হবে মানুষকেই।

Carbon emission Glacier lake outburst Nepal Nepal Disaster Nepal Flood Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on