Kriti Sanon’s Latest Ad Draws Criticism। Robbar
Robbar
  • ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বোনদের বুঝি ক্লিভেজ থাকতে নেই!

অবিরাম অনুশাসনের পাহাড় চাপাতে চাপাতে এদেশে আমরা সামাজিক সম্পর্কগুলোর স্বাভাবিক মাত্রাগুলোই ক্রমশ ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি যে, ভাই-বোনের নিখাদ, নিটোল সম্পর্কে শরীর, শালীনতা কিংবা পোশাকের মাপের কোনও জায়গাই নেই। তাই সেখানে জামার ঝুল পাঁচ ইঞ্চি খাটো হলেও দোষের কিছু নেই। বরং দোষের, সেই দিকে খাটো চোখ দিয়ে তাকানোয়, ছোট মন নিয়ে প্রশ্ন করায়। দোষের, পৃথিবীর সব সম্পর্ককেই কেবলমাত্র নারী-পুরুষের সম্পর্কের বাইনারিতে ভেঙে ফেলায়।

শেষ আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১০:২৬   
Facebook WhatsApp Messenger

সেই সময়টা আমরাও পাইনি। কিন্তু দু’-চারবার চোখে দেখেছি।

রেডিমেড রাখি তখনও এতটা জনপ্রিয় হয়নি। স্কুলের সিনিয়র দিদিরা পাঁচ টাকা করে ‘অ্যাঙ্কর’ কোম্পানির লম্বাটে ধরনের সিল্ক সুতোর বান্ডিল বা ‘স্কেইন’ কিনত। সেই সুতো দুই আঙুলের মাঝে ইনফিনিটি লুপের মতো করে পেঁচিয়ে মাঝখানটায় গিট বেঁধে দুই ধারের ভাঁজ কেটে দেওয়া হত। তারপর টুথব্রাশ দিয়ে নাগারে ঘষে সেই সুতো থেকে রেশম বের করে রাখি বানানো হত। এরকম একেকটা স্কেইন থেকে মোটামুটি দুই থেকে আড়াইটা রাখি তৈরি করা যেত। বলা বাহুল্য, পাঁচ টাকা অর্থমূল্য নয়ের দশকে ছিল বিরাট এবং ওই অর্থমূল্যে সেই সময় রেডিমেড রাখিও পাওয়া যেত। কিন্তু তখন কেনা রাখির থেকে হাতে বানানো রাখির কদর ছিল ঢের বেশি। মনে আছে, আমার মা হাতের কাজে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন না বলে, রাখির দিন আমার পাওয়া সিনিয়র দিদিদের হাতে বানানো রাখিগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। বলতেন, ‘দেখেছ? কী চমৎকার হাতের কাজ!’

zoom

তাই বাঙালি জীবনে রাখি যে আসলে ‘ভাইয়ের হাতে বাঁধা বোনের রক্ষাকবজ’এর ন্যারেটিভের থেকে ঢের বেশি শৈল্পিক ও রাবীন্দ্রিক– তা ছোটবেলাতেই বুঝেছিলাম। তখনও ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড’-এর  আমদানি হয়নি; বরং সব বন্ধুবান্ধবকে রাখি পরানোর এক ব্যাপক প্রচলন ছিল। আর আমার বেড়ে ওঠার চোখ দিয়ে দেখে বললে, সেই সময়ের কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে ভাই-বোনের উৎসব বলতে আমরা মূলত ‘ভ্রাতৃদ্বিতীয়া’ বুঝতাম, আর ‘রাখিবন্ধন’ ছিল সব্বার জন্য– ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, মা-মামি-কাকা– প্রত্যেকের। আসলে আমরা রাখি বলতে, রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা সম্প্রীতির বন্ধনকেই বুঝতাম; যা সবার সঙ্গে গড়ে তোলা যায়। আমায় যে বুড়ো রিকশাজেঠু স্কুলে নিয়ে যেতেন, তাঁকেও আমি রাখি পরাতাম। আর আমাদের স্কুলে তো রীতিমতো নিয়ম ছিল; রাখির দিন প্রত্যেককে অন্তত একটি রাখি সঙ্গে আনতে হত এবং সকালের প্রার্থনা-লাইনে ঠিক পাশের বন্ধুটিকেই তা পরাতে হত। ইশকুলের সবাই যাতে অন্তত একটি করে রাখি পায়, তা নির্দিষ্ট করতেই স্কুলের বড়দি এই নিয়মটি চালু করেছিলেন।

সেই সময়ের যাপন তাই রাখি উৎসবটিকে আমাদের শিল্পের নিক্তিতে, মৈত্রীর নিক্তিতে আর সাম্যের নিক্তিতে চিনতে শিখিয়েছিল। তাই এ-বছর রাখি উৎসবের আগে প্রকাশিত প্রসিদ্ধ গয়না কোম্পানির বিজ্ঞাপনটি দেখে প্রথমে ঠাওরই করতে পারিনি যে, সেটি থেকে এমন মারাত্মক বিতর্ক তৈরি হতে পারে! সত্যি বলতে কি, বিজ্ঞাপনটি কোন পণ্যের, তার বক্তব্য কী, রাখিটি কেমন এবং বোনটি যে ভাইয়ের পাশাপাশি তার পোষ্য সারমেয়টিকেও সমান আদরে রাখি পরিয়ে দিচ্ছে– সেসব স্নেহময়ী সখ্যের মতো বিষয়গুলি ব্যতিরেকে যে বোনের ভূমিকায় অভিনেত্রী কৃতি শ্যাননের পোশাকের নেক-লাইনের দিকে সকল স্পটলাইট ঘোরানো যেতে পারে, সে-কথা অনুমান করাও খুব সহজও নয়। কিন্তু গত কয়েকদিনে এই আপাত কঠিন বিষয়টিই প্রবলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

zoom

জনপ্রিয় অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত থেকে নেটাগরিকদের এক বড় অংশ কৃতি শ্যাননের এই খোলামেলা ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাক দেখে ‘গেল গেল’ রব তুলেছেন। রব উঠেছে দুটো বিষয় নিয়ে– এক, বিজ্ঞাপনটিতে ভাইকে রাখি পরানোর সময় কৃতি শ্যাননের ক্লিভেজ দেখা যাচ্ছে কেন, তা নিয়ে; এবং দুই, ভাইয়ের আগে কেন পোষ্য কুকুরকে রাখি পরানো হয়েছে, তা নিয়ে। এর মধ্যে প্রথম বিতর্কটিই বেশি মাথাচাড়া দিয়েছে; কারণ আমাদের দেশে মেয়েদের সমালোচনায় ঘুলিয়ে ওঠা জল বরাবরই অন্য যে-কোনও বিষয়ে ঘুলিয়ে ওঠা জলের থেকে অনেক বেশি কর্দমাক্ত।

যুগ পাল্টায়, সময় পাল্টায়, হাতে বোনা রাখি পাল্টে যায় রেডিমেড রাখিতে; তার চাকচিক্য বাড়ে, শিল্পগুণ কমে, শুধু বদলায় না মেয়েদের পোশাক-পুলিশির ট্রেন্ড! উৎসবে হোক বা বিতর্কসভায়, শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে হোক বা অফিস পার্টিতে, বিদেশ-ভ্রমণে হোক বা পাড়ার আড্ডায়, কলেজের অনুষ্ঠানে থেকে ফ্ল্যাটের গেট-টুগেদার, সার্কাসের খেলা দেখানো থেকে, সাঁতার কাটার সময় থেকে নিজের ঘর পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েরা কখন কী পরবে, কীভাবে পরবে, তার নিরন্তর সালিশি সভা বসতে থাকে।

এই কাদা ছোড়াছুড়ির অভিঘাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে গয়না বিপণন সংস্থাটি নিজেদের বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করেছে; পাবলিক নোটিশ দিয়ে তারা ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছে। তারা জানিয়েছে যে, এবার রাখি উৎসবে তাদের এই বিজ্ঞাপন প্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সারমেয় প্রেমের বার্তা প্রদান করা। তবে কেন জানি না, আমার মনে হয়, এই বিজ্ঞাপনটি খানিক পোশাক-পুলিশির ব্যাপারটিকেও ‘নরমালাইজ’ করার চেষ্টা করেছিল। হয়তো বলতে চেয়েছিল, উৎসব-অনুষ্ঠানের দিনে মেয়েরা নিজেদের মতো করে সাজবে, নিজেদের মতো করে আত্মপ্রকাশ ঘটাবে– তবেই না উৎসবের প্রকৃত উদযাপন!

zoom

তবে সে গুড়ে বালি। এবং অনুমান করা যায় যে তীব্র বিতর্কের ঘটনার পর থেকে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি নিজেরাই বিজ্ঞাপন নির্মাণের সময় মহিলাদের পোশাক-পুলিশির দায়িত্বটি নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন। সেটাই স্বাভাবিক। যেকোনও বাণিজ্যিক সংস্থার উদ্দেশ্য ক্রেতার মন জয় করা; নিজেদের লভ্যাংশ বাড়ানো। সামাজিক বার্তা প্রদান করে সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ ঘটানো নয়। বিজ্ঞাপন দুনিয়ার ‘পিতা’ ডেভিড অগিলভি যেমন বলেছিলেন, ‘যতই সৃজনশীল হোক না কেন, পাবলিক না-নিলে বিজ্ঞাপন সফল হয় না।’

এ তো গেল একটা দিক, কিন্তু আমার মতে, এর থেকেও বেশি পীড়াদায়ক দিকটি হল যে, অবিরাম অনুশাসনের পাহাড় চাপাতে চাপাতে এদেশে আমরা সামাজিক সম্পর্কগুলোর স্বাভাবিক মাত্রাগুলোই ক্রমশ ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি যে, ভাই-বোনের নিখাদ, নিটোল সম্পর্কে শরীর, শালীনতা কিংবা পোশাকের মাপের কোনও জায়গাই নেই। তাই সেখানে জামার ঝুল পাঁচ ইঞ্চি খাটো হলেও দোষের কিছু নেই। বরং দোষের, সেই দিকে খাটো চোখ দিয়ে তাকানোয়, ছোট মন নিয়ে প্রশ্ন করায়। দোষের, পৃথিবীর সব সম্পর্ককেই কেবলমাত্র নারী-পুরুষের সম্পর্কের বাইনারিতে ভেঙে ফেলায়। নইলে সেই উদোম বয়স থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে যে ভাইবোন, সেই ভাইয়ের সামনে বোনের জামার নেকলাইন আর সেখান থেকে উঁকি দেওয়া বক্ষবিভাজিকা নিয়ে মনের মধ্যে অশালীন প্রশ্ন আসে কী করে? বোনদের বুঝি ক্লিভেজ থাকতে নেই? না কি তাদের শরীরই থাকে না? নাকি এ-সংসারের পুরুষ মানুষদের আমরা এতটাই যৌনকাঙ্ক্ষী করে বড় করেছি যে, যেকোনও নারী শরীর দেখলেই সে-সম্পর্কের মাত্রা ভুলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে?

zoom
যে ছবি ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে

কৃতি শ্যাননের বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষিতে তাই কাঠগড়ায় যদি কাউকে তুলতেই হয়, তাহলে সে আমাদের অন্তরাত্মা। আমাদের দেখার চোখ, ভাবার মন, আর দিনে দিনে সংকীর্ণতর হয়ে পড়া হৃদয়; যা ছোট থেকে আরও ছোট, আরও আরও অনেক ছোট হতে হতে সত্যি সত্যিই সেই লালবিহারী দে-র বাংলার লোককথার ‘ডালিমকুমার’ বা ‘জীবন-কৌতুক’ গল্পের ডালিমকুমারের হৃদয়ের মতো বাক্সবন্দি হয়ে তলিয়ে আছে অতল অন্ধকারে।…

আর সমস্যা এই যে, সেখান থেকে আলো কিছুতেই আসিতেছে না।

………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন প্রহেলী ধর চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা

………………..

AdDebate BollywoodControversy Kangana Ranaut KritiSanon KritiSanonAd KritiSanonControversy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on