nepal flood survivor faces guilt of his dead companion | Robbar
Robbar
  • ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৫ নভেম্বর ২০২৬

বেঁচে থাকার অপরাধ

নেপালের ভয়াবহ বন্যা থেকে বেঁচে ফিরেছেন অসমের কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিক। বিপর্যয়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরও অনেকে। জীবিত শ্রমিকদের মধ্যে একজন বলছেন, তিনি হয়তো বেঁচে আছেন, কিন্তু তাঁর আত্মীয়রা ফেরেননি। বেঁচে ফেরা, বেঁচে থাকাটাই তাঁর কাছে এখন অপরাধের সমান। মনে হচ্ছে, প্রাণে বাঁচার অধিকার পেয়েছেন তিনি, জীবনে বাঁচার অধিকার হারিয়েছেন।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১৬:৪০   
Facebook WhatsApp Messenger

‘দ্য মাইগ্রেশন স্টোরি’-তে প্রকাশিত ‘I Feel Guilty to Celebrate My Survival’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে সাংবাদিক আরশাদ আহমেদ লিখেছেন, অসমের কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিকের কথা। তাঁরা সদ্য নেপালের ভয়াবহ বন্যা থেকে বেঁচে ফিরেছেন। সেই একই বিপর্যয়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরও অনেকে। জীবিত শ্রমিকদের মধ্যে একজন বলছেন, তিনি হয়তো বেঁচে ফিরতে পেরেছেন, কিন্তু তাঁর আত্মীয়রা ফেরেননি। বেঁচে ফেরা, বেঁচে থাকাটাই তাঁর কাছে এখন অপরাধের সমান। দুনিয়ার চোখে তিনি ‘ভাগ্যবান’ হলেও, যাঁরা আর ফিরে এলেন না, তাঁদের পরিণতির সঙ্গে তাঁর বেঁচে থাকাটা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, দুটোকে তিনি আর আলাদা করে দেখতে পারছেন না।

zoom
বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি, নেপাল, সূত্র: ইন্টারনেট

আমরা সাধারণত বেঁচে ফেরাকে মৃত্যুর বিপরীত বলে ভাবি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি– অতএব তাঁর তো স্বস্তি পাওয়ার কথা! জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কথা। আনন্দ করারও কথা হয়তো। কিন্তু বেঁচে থাকাটাই যদি অপরাধবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েও যদি কেউ ভাবতে শুরু করেন, বাকি জীবনটা উপভোগ করার অধিকার কি তাঁর আদৌ রয়েছে? সাধারণত কোনও বিপর্যয়কে আমরা দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির হিসেব দিয়েই বুঝতে চাই।

আমরা অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করি, আমাদের কৃতকার্যের সঙ্গে তার ফলাফল বা পরিণতির একটা সম্পর্ক রয়েছে। মনে করি, নিজের জীবনের উপর অন্তত কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আমাদের আছে। অথচ একটা বিপর্যয় কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। পাশের মানুষটি মারা গেলেন, কিন্তু আমি বেঁচে গেলাম! কেন? আমি সতর্ক ছিলাম বলে? বেশি দায়িত্বশীল ছিলাম বলে? নাকি প্রয়োজনীয় সাহস দেখিয়েছিলাম? হয়তো এর কোনওটাই নয়। হয়তো এইসবের সঙ্গে বেঁচে থাকা বা না-থাকার কোনও সম্পর্কই ছিল না।

zoom
মৃত অট্টালিকার স্তূপ, সূত্র: ইন্টারনেট

বেঁচে ফেরা মানুষদের মধ্যে কেউ কেউ তখন এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন, যার হয়তো কোনও উত্তরই নেই। সেদিন যদি আর একটু অপেক্ষা করতাম… যদি অন্য কারও দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিতাম… যদি সবাই মিলে অন্য একটা রাস্তা ধরতাম… তাহলে কি মানুষটিকে বাঁচানো যেত? মনে মনে বারবার সেই ঘটনার অন্যরকম সব ছবি তৈরি হতে থাকে। প্রতিটা ছবিতেই যেন কাউকে বাঁচানোর একটা সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে। বাস্তবে হয়তো অন্য কিছু করার সুযোগই ছিল না। তবু সেই মানুষটা বিশ্বাস করতে চান, তিনি অন্যভাবে কিছু করলে সেদিনের পরিণতি বদলে যেতে পারত। নিজের বেঁচে যাওয়া বা অন্যের মৃত্যু, কোনওটার উপরেই যে তাঁর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ছিল না, এটা মেনে নেওয়ার চাইতে নিজেকে দোষারোপ করা অনেক সহজ।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সারভাইভার গিল্ট’। অর্থাৎ বেঁচে যাওয়া-জনিত অপরাধবোধ। কিন্তু এই শব্দবন্ধ দিয়ে মনের ভিতরের সমস্ত দ্বন্দ্বকে বোঝানো যায় না। সাধারণত অপরাধবোধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনও কাজ করা কিংবা করতে না-পারার দায়। অথচ এখানে সেই মানুষটার অপরাধ ঠিক কী? তিনি বেঁচে আছেন! অন্যরা নেই। এবং শুধু এই বেঁচে থাকাটাই তাঁর কাছে অপরাধ বলে মনে হচ্ছে।

অপরাধবোধ আর লজ্জাবোধের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। অপরাধবোধ থেকে প্রশ্ন ওঠে, আমি কি অন্যভাবে কিছু করতে পারতাম? অন্যদিকে লজ্জাবোধ নিজেকে নিয়েই প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। ‘আমি’ আসলে কেমন মানুষ? নিজেকে হয়তো তিনি বরাবর দায়িত্বশীল বলেই জেনেছেন, বিশ্বাস করেছেন, বিপদে অন্যদের রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু বিপদের দিনে পালিয়ে নিজের প্রাণরক্ষা করেছিলেন, নিজেকেও অবাক করে দিয়ে। কিংবা হয়তো আতঙ্কে স্থির হয়ে গিয়েছিলেন। চেয়েও কাউকে সাহায্য করতে পারেননি। প্রাণ বাঁচানোর সহজাত প্রবৃত্তিটুকুকেও তখন বিচার করা হয়, অন্যকে বাঁচানোর এক কল্পিত নৈতিক দায়িত্বের নিরিখে। যেন নিজে বেঁচে যাওয়ার আগে অন্যকে বাঁচানোই তাঁর কর্তব্য ছিল। নিজের মনের ভিতরেই যেন একটা আদালত বসে আছে। সেখানে বারবার নিজের কাজের সাফাই দিতে হয়। অথচ সেই আদালত কোনও দিনই রায় ঘোষণা করবে না।

zoom
সহানুভূতি, শোক। সূত্র: ইন্টারনেট

বিপর্যয় শুধু বাইরের পৃথিবীর উপর, প্রকৃতির উপর আস্থা টলিয়ে দেয় না, নিজের মনের উপর ভরসাও নষ্ট করে দিতে পারে। ঘটনার কিছু মুহূর্ত এখনও এত স্পষ্টভাবে মনে আছে কেন? অথচ অন্য কত কিছুই তো একেবারে মুছে গেল! যে অভিজ্ঞতা এত ভয়াবহ ছিল, তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে কেন কিছুই অনুভব হচ্ছে না আজ? নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোই অচেনা ঠেকতে পারে এমন অবস্থায়। সার্ভাইভারের নিজেরই মনে হতে পারে, তিনি আর আগের মানুষটা নেই।

একসঙ্গে খেতে বসা, হঠাৎ হেসে ওঠা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কোনও ছোট্ট আনন্দের মুহূর্তেও মনে পড়ে যাচ্ছে, না-ফেরা মানুষেরা তো আর এই সুযোগটুকু কোনও দিন পাবে না! মুহূর্তে সেই আনন্দের সময়টিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হচ্ছে যেন! অথবা, হয়তো একটা গোটা দিন কেটে গেল মৃত কিংবা নিখোঁজ প্রিয়জনের কথা না-ভেবেই। মনে পড়তেই, হানা দিল অপরাধবোধ। কারও কারও কাছে তখন নিজের দুঃখ-কষ্টও এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে। অসুখী থাকাই যেন মৃত মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র উপায়। ফলে নিজের যন্ত্রণাকে আঁকড়ে থাকাটাই হয়ে ওঠে তাঁদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার একমাত্র পথ।

কিন্তু কাউকে মনে রাখার অর্থ কি নিজের জীবনটাকেই চিরতরে থামিয়ে রাখা? শোকের তীব্রতাই কি ভালোবাসার একমাত্র পরিমাপক? নিজের বেঁচে থাকাটাকে আজীবনের মতো শাস্তিস্বরূপ করে না তুলে কি স্মৃতি নিয়েও বেঁচে থাকা যায় না? কাউকে কৃতজ্ঞ হতে বলে, ইতিবাচক চিন্তা করতে বলে কিংবা অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে না। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সেই মানুষটা হয়তো ভাবছেন, তিনি আবার জীবনকে ভালোবাসতে শুরু করলে, যিনি মারা গিয়েছেন, তাঁকেই যেন পরিত্যাগ করা হবে। হয়তো নতুন করে বাঁচার পথ খুলতে শুরু করে তখনই, যখন শোক আর আনন্দকে আর পরস্পরের বিরোধী বলে মনে হয় না। যখন কাউকে মনে রাখার অর্থ সারা জীবন কষ্ট পেয়ে যাওয়া নয়।

zoom
যারা চলে গেল, সূত্র: ইন্টারনেট

কিন্তু এখানে আরেকটা পার্থক্যও মনে রাখা জরুরি। আনন্দ পাওয়ার অধিকার নিজের মনে যুক্তি হিসেবে মেনে নেওয়া, আর সত্যিই আনন্দ অনুভব করতে পারা কিন্তু এক জিনিস নয়। অপরাধবোধ প্রথমটার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর অনুভূতির অসাড়তা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা দ্বিতীয় অবস্থানকেও কঠিন করে তুলতে পারে। শুধুমাত্র উৎসাহ দিয়ে কোনওটারই সমাধান করা যায় না।

এহেন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশেষ ধরনের নিঃসঙ্গতাও। এমন কিছু জানার বা এমন কিছু অনুভব করার নিঃসঙ্গতা, যা অন্য কাউকে সহজে বোঝানো যায় না। বেঁচে ফেরা মানুষটা হয়তো চান, কেউ তাঁর মনের কথাটা বুঝুক। আবার একই সঙ্গে তাঁর মনে হতে পারে, যাঁরা সেখানে ছিলেন না তাঁরা কীভাবেই বা সবটা বুঝবেন! অনেক সময় এই নীরবতাকে আমরা ‘এড়িয়ে যাওয়া’ বলে ধরে নিই। কখনও কখনও এই নীরবতা আসলে নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যের ব্যাখ্যা থেকে আড়ালে রাখার বা আগলে রাখার উপায়ও বটে। যা গভীরভাবে অনুভব করি, তার সব কিছুই তো সঙ্গে সঙ্গে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর বারবার সেই অভিজ্ঞতার কথা মুখ ফুটে কথা বললেই যে তা আমার কাছে সহনীয় হয়ে উঠবে, এমনও তো নয়।

তাহলে আমরা তাঁকে নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি কেন? বেঁচে ফেরা মানুষটাকে কথা বলতে হবে, নিজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে হবে, সুস্থ হয়ে উঠতে হবে, প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সব কিছু সামলে নিচ্ছেন– এমনটা কেন চাই? হয়তো কোনও সমাধান না-পাওয়ার যন্ত্রণা আমাদেরকেও অস্বস্তির মধ্যে ফেলে। আমরা চাই, বেঁচে ফেরা মানুষটা কৃতজ্ঞ থাকুন। কারণ কৃতজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাঁর বেঁচে থাকাকে আমরা অর্থবহ করে তুলতে পারি। আমরা চাই, তিনি ঘুরে দাঁড়ান, কারণ তাঁর ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের আশ্বস্ত করে যে, ভয়াবহ বিপর্যয়ও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমরা চাই, তাঁর শোকের একটা সমাপ্তি ঘটুক। কারণ শেষ না-হওয়া শোক জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ ঘিরে আমাদের এতদিনকার চেনা ধারণাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।আর এভাবেই আমরা অজান্তে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠাটাকেও আমাদের কর্তব্য বানিয়ে ফেলি।

মানসিক আঘাত বা ‘ট্রমা’ বোঝার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিপর্যয়ের পর মানুষের প্রতিটি প্রতিক্রিয়াকে শুধু ট্রমার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়। ভয়, অপরাধবোধ, রাগ কিংবা অনুভূতির অসাড়তাও কখনও এমন মানসিক সংকটের লক্ষণ হতে পারে। তার জন্য পেশাদার চিকিৎসা বা সহায়তা প্রয়োজন। আবার এই অনুভূতিগুলো নানা নৈতিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা অনিশ্চয়তারও বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতিমাত্রই কিন্তু অসুস্থতার লক্ষণ নয়। তেমনই বেঁচে ফেরা প্রত্যেকটা মানুষই অপরাধবোধে ভোগেন, এমন নয়। কেউ হয়তো সত্যিই স্বস্তি পান, কেউ হয়তো পরিস্থিতির ওপর ক্ষুব্ধ হন।

zoom
সূত্র: ইন্টারনেট

কিন্তু জীবনকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার বিষয়টা নিছক ব্যক্তিমানুষের মনের ভিতরের লড়াই নয়। তিনি যে-জগতে ফিরছেন, তার অবস্থাও ঠিক করে দেয় বেঁচে থাকাটা আসলে কেমন হবে। আরশাদ আহমেদের প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের কথাই ধরা যাক। ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হওয়ার অনেক আগে থেকেই তাঁদের জীবন জুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থইথই করত। বাড়ির আশপাশের এলাকায় কাজের যথেষ্ট সুযোগ ছিল না বলেই তাঁরা জীবিকার খোঁজে দূরে পাড়ি দিয়েছিলেন, মানে বাধ্য হয়েছিলেন। বন্যা থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরার পরেও তাঁদের সেই আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হয়নি।

সেই ঘটনার পরে একজন শ্রমিক হয়তো আবার সেই বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। অথচ তাঁর সামনে তো অন্য কোনও বাস্তবসম্মত বিকল্পও নেই– কাজ হারানোর ভয়, অনাহারের ভয়, ঋণের বোঝা। প্রতিটা পথেই যখন বিপদ, তখন তাঁর সামনে বেছে নেওয়ার সুযোগ আসলে কতটুকু?

এবার ধরা যাক, সেই মানুষটি কাউন্সেলিং পেলেন। ধীরে ধীরে উদ্বেগ সামলাতে শিখলেন। নিজের উপর কিছুটা ভরসাও ফিরে পেলেন হয়তো। কিন্তু যে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি তাঁকে প্রথম থেকেই বিপন্ন করে রেখেছিল, তা যদি আগের মতোই থেকে যায়, তাহলে আমরা তাঁকে ঠিক কোন জীবনে ফিরে যেতে সাহায্য করলাম? এখানেই ব্যক্তিগত মানসিক সংকট আর সমাজের কাঠামোগত বৈষম্য ও বিপন্নতা একে-অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরা মানুষদের আমরা প্রায়ই অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলি। তাঁরা আবার কাজে ফিরেছেন মানেই অদম্য মনোবল। তাঁরা হাসতে পারছেন মানেই অসাধারণ মানসিক শক্তি। কিন্তু এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পগুলো, যাকে আমরা ‘রেজিলিয়েন্স’ বলি, কখনও কখনও রাজনৈতিকভাবে খুব নিরাপদ আর সুবিধাজনক আখ্যান হয়ে ওঠে। মানুষের সমস্ত প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতাকে আমরা প্রশংসায় ভরিয়ে দিই। অথচ প্রশ্ন করি না, কেন তাঁদের এত প্রতিকূলতা সহ্য করতে হল? কেন বারবার নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াই লড়তে হল?

zoom
মৃত্যু উপত্যকা, ছবি: রয়টার্স

যে সমাজ মানুষকে বারবার বিপদের মুখে ঠেলে দেয়, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার ক্ষমতাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়ে সেই সমাজ নিজের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। তেমনই প্রতিটা বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তিগত উত্তরণ ঘটতেই হবে, এমন কোনও কথাও নেই। সব যন্ত্রণাই নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয় না। কেউ কেউ কেবল নিজের কাজ করতে চান, পরিবারের যত্ন নিতে চান, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চান। চান না, তাঁদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাটাই তাঁদের চিরকালীন পরিচয় হয়ে থাকুক। উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসনের পরে মানসিক স্বাস্থ্যকে আলাদা একটা পরিষেবা হিসেবে জুড়ে দিলেই কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয় না।

দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টাকে পুনর্বাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বেঁচে ফেরা মানুষ এবং নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। তাঁদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। ক্ষতিপূরণ ও প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। জীবিকা সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনমতো স্বেচ্ছায় মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। কী ধরনের সহায়তা তাঁদের প্রয়োজন, বেঁচে ফেরা মানুষরা যেন সে-আলোচনায় অংশ নেন এবং সিদ্ধান্ত নেন তা নিশ্চিত করতে হবে। আর এইসব সহায়তা পাওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁদের কোনও একটা মানসিক রোগের আওতায় এনে রোগী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা চলবে না।

পরিবার ও সমাজেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এমন একটা পরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে কেউ চুপ করে থাকলেই সেটাকে ব্যর্থতা বলে ধরে নেওয়া হবে না। যেখানে শোকের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। যেখানে কেউ একটু আনন্দ পেলেই সেটাকে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রমাণ হিসেবে দেখানোর তাগিদও থাকবে না।

zoom
নতুন করে শুরু

কতজন বাড়ি ফিরলেন, কতজন আবার কাজে যোগ দিলেন কিংবা কতজন আর নিজের কষ্টের কথা বলছেন না– শুধুমাত্র এইসব হিসেব দিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার মাত্রা বিচার করা যায় না। আমাদের জানতে হবে, মানুষগুলো সত্যিই কি নিজেদের জীবনের উপর আবার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন? অসহায়তা আর অভাবের চাপে বাধ্য হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের বাইরে তাঁদের সামনে কি কোনও নতুন বিকল্প তৈরি হয়েছে? সবচেয়ে বড় কথা, যে পৃথিবীতে তাঁরা ফিরে এসেছেন, সেখানে কি আগের চেয়ে একটু বেশি নিরাপদে বাঁচার সুযোগ রয়েছে?

আরশাদ আহমেদের প্রতিবেদনে ঠাঁই পাওয়া সেই শ্রমিক যেন আমাদের ভুলে যাওয়া বৈষম্যের কথাগুলোকেই ফের মনে করিয়ে দেন। মনে করিয়ে দেন, প্রাণে বেঁচে থাকা আর নিজের বেঁচে থাকার অধিকার মন থেকে মেনে নিতে পারা এক জিনিস নয়। আমাদের দায়িত্ব, কারও হয়ে তাঁর বেঁচে ফেরার আনন্দ উদ্‌যাপন করা নয়। তিনি কীভাবে সুস্থ হয়ে উঠবেন, সেই পথও ঠিক করে দেওয়া নয়। বরং এমন সামাজিক সম্পর্ক, পরিসর ও বাস্তব পরিস্থিতি গড়ে তোলা, যেখানে মৃত মানুষদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলা আর নিজের জীবনটাকে বাঁচা– এই দুই পরস্পরের বিরোধী হয়ে উঠবে না। প্রাণে বাঁচার অধিকারের সঙ্গে জীবনটাকে বাঁচার অধিকারও যেন থাকে। বেঁচে যাওয়ার মূল্য যেন সারাজীবন অপরাধবোধ বয়ে বেড়ানো হয়ে না ওঠে।

disaster survivor Mental Health Migrant worker migration Nepal Disaster Nepal Flood survivor

Share this article on