Recipes of Separation: Food, Gender Roles, and Divorce in India। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

আমার ছেলে হাত পুড়িয়ে খাবে?

‘আমার ছেলে হাত পুড়িয়ে খাবে?’– এই বিস্ময়ের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন গর্ব আর ‘এনটাইটলমেন্ট’ ঢুকে বসে থাকে শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার ফাঁপা অধিকারের নিরিখে, তার নোংরা কাদা ঘেঁটে পরিষ্কার করা সাংঘাতিক শক্ত। কারণ বিন্দুমাত্র কোনও যোগ্যতা ছাড়া, বিন্দুমাত্র শ্রম ছাড়া, বিন্দুমাত্র কায়িক বা মানসিক অংশগ্রহণ ছাড়া, শুধুমাত্র অটুট পুংলিঙ্গ সুদ্ধ জন্মে যাওয়ার যোগ্যতাটুকুকে সম্বল করে যারা দীর্ঘদিন তোয়াজ পেয়ে এসেছে ভৃত্যমনোভাবাপন্ন হয়ে সুখে-থাকা মেয়েদের কাছ থেকে, আজ তাদের কাছ থেকে হঠাৎ ক্ষীরের বাটি কেড়ে নিতে গেলে তারাই বা দেবে কেন?

Published by: Robbar Digital

Posted:March 27, 2026 4:58 pm | Updated:March 28, 2026 5:11 pm  
Facebook WhatsApp Messenger
Recipes of Separation: Food, Gender Roles, and Divorce in India

‘ইউ আর নট ম্যারিইং আ মেইড, ইউ আর ম্যারিইং আ লাইফ পার্টনার।’ অতি সম্প্রতি একটি ডিভোর্সের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য এক লহমায় টান মেরেছে ভারতীয় পরিবারের একেবারে অন্দরে– ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠানটির আসল চেহারা নিয়ে। ২০১৭ সালে বিয়ে হয়েছিল যে-দম্পতির, সেখানে পুরুষটির অভিযোগ অবশ্য বহুবিধ। বিয়ের কয়েক দিনের মাথায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার, সন্তানজন্মের সময় থেকে নিজের বাড়ি চলে যাওয়া এবং সেই সন্তানের জন্মের পরের অনুষ্ঠানে বাবা-সহ পরিবারের কাউকেই প্রবেশাধিকার না দেওয়া– তালিকা অনেক লম্বা। তবু, সবচেয়ে জোরালো অভিযোগটি ‘ক্রুয়েলটি’ বা নিষ্ঠুরতার। কী সেই নিষ্ঠুর আচরণ? স্ত্রী বাড়ির কোনও কাজ করতে চান না, বিশেষত বাড়ির কারওর জন্য রান্না করতে তিনি স্পষ্টত অস্বীকার করেছেন। সুতরাং, এই মর্মে ডিভোর্স চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্বামী। মামলা চলছে অবশ্য বহু দিন যাবৎ, এর আগে মধ্যস্থতা করার জন্য বেশ অনেকটা সময় দেওয়া হয়েছিল, তবু বাদী পক্ষ নিজের দাবিতে অনড়। আর সেখানেই, গৃহকর্মে যোগদান করতে অস্বীকৃত হওয়ার বিষয়টিকে দাম্পত্য সমস্যার কারণ হিসেবে মানতে সম্পূর্ণ নারাজ হয়ে এই দেশ-কাঁপানো মন্তব্যটি করল জাস্টিস সন্দীপ মেহতা এবং জাস্টিস বিক্রম নাথের বেঞ্চ।

zoom
‘অপুর সংসার’ ছবির দৃশ্য

এখন কথা হল, যে-মামলা কোর্ট অবধি গড়ায়, সেখানকার হিসেব বাইরে আসে, কিন্তু যেসব মামলা নিত্য দিনেরাতে ঘরের ভেতরের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে চলে মেয়েদের? এখানে চারটি মন্তব্য হয়তো আসে আদত বিচারশালা থেকে, চারটি মন্তব্য আসে দেশজোড়া খাপ পঞ্চায়েত থেকে, আরও চারটি মন্তব্য আসে গেরস্ত ঘরের আনাচকানাচ থেকে, আর ষোলো আনার শেষ চার আনা মন্তব্য করতে বসে ভুরু কুঁচকে ওঠে আমাদের। আমরা, সেই মেয়েরা, যারা বেড়ে উঠলাম মোটের ওপর লিঙ্গবৈষম্যহীন এক-একটি আপাতনিরপেক্ষ আলতো সংস্কৃতিবান মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে। বড় হওয়ার গোটা সময়টায় কেউ আমাদের গৃহকর্মে নিপুণ হওয়ার দায় শেখাল না কোনও দিন। বিয়ে নাকি মেয়েদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিকল্প পথ, একথা বিন্দুমাত্র টের না পেয়ে আমরা যারা পড়াশোনা আর কেরিয়ারকে মাথায় রেখে বহু বিনিদ্র রাত কাটালাম চাপা টেনশনে। আর একা থাকতে গিয়ে যদি বা একে-তাকে জিজ্ঞেস করে গোড়ার রাঁধাবাড়ার দিনগুলো উতরে দিলাম, অধিকাংশ দিন বাসন মাজার ভয়ে ফ্রাইপ্যান থেকে থালা পর্যন্তও আমাদের ভাত-তরকারির প্রোমোশন হয়নি। আমরা সেই মেয়েরা। অথচ এই আমরাই অবাক হয়ে দেখলাম পুরুষ বন্ধুরা যখন ক্রমশ সহপাঠী থেকে সহকর্মী হয়ে উঠল, তখন তাদের জীবন যে নির্ভার গার্হস্থ্য স্বাচ্ছন্দ্য আর দায়হীন ফুরফুরে উদ্‌যাপনে ভরা, তার কতটুকু রইল আমাদের পরিসরে?

zoom
‘মিসেস’ ছবির একটি দৃশ্য

আমি অপরিসীম ক্লান্তি পড়ে নিই আমার মহিলা সহকর্মীটির চোখে-মুখে, বছর তিনেক হল, ছোট্ট ছেলে রয়েছে তার। অসুস্থ বাচ্চা সকাল থেকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে মাকে, তবু সেই ছোট্ট মুঠি ছাড়িয়ে এনে তাকে দৈনন্দিন কাজের জোয়াল কাঁধে চড়াতে ছুটে আসতে হয়েছে ২২ কিলোমিটার দূরের কর্মক্ষেত্রে। বাড়িতে কর্মসহায়ক আচমকা ছুটি নিচ্ছে যখন, ভোরবেলা উঠে রাঁধাবাড়া সেরে, সবার রোজের সহজতা যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে আমার মেয়ে বন্ধুরা চোখে ভারী চশমা এঁটে দায়িত্ব সামলাচ্ছে অকপট। অথচ সেই একই কর্মক্ষেত্রের পুরুষ সহকর্মীটি তৃপ্তিভরা মুখে ব্যাগ থেকে লাঞ্চবক্স বের করে আমাদের প্রত্যেককে যখন ভাগ নেওয়ার ডাক দিচ্ছে, তখন যদি একটা আলগা প্রশ্ন করি, কী এনেছ আজ? সে নির্ভাবনায় উত্তর দিচ্ছে, ‘জানি না, দেখি কী বানিয়ে দিয়েছে!’ আপাত নিষ্পাপ একটা উত্তর। কিন্তু আমার ক্লিন্ন মন, কূট মাথা। আমি শুধু ভাবি, আহা, এত ‘প্রিভিলেজ’! বাড়িতে কী রান্না হচ্ছে, তা পর্যন্ত না-জানলেও কী সুন্দর দিন চলে যায়! অথচ এই চিত্তভাবনাহীন চলাফেরা আমরা কিছুতেই আয়ত্ত করে উঠতে তো পারলাম না! 

zoom
‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন’ ছবির দৃশ্য

বিশেষ করে, সমস্যাটা গেড়ে বসে আছে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেই। যে-পরিবারের অর্থনীতি যত স্থিতিশীল, সেখানে পুরুষদের গৃহশ্রমে অংশগ্রহণ তত কম। যেখানে ঘরে বাইরে উদয়াস্ত দু’জনেই কাজ না-করলে সংসারের চাকায় তেল জোটানো মুশকিল, সেখানে শ্রমের লিঙ্গবিভাজন করার শৌখিনতা পর্যন্ত বিষয়টা গড়াতে পায়নি। কিন্তু অর্থ যেখানে শ্রমের স্বাচ্ছন্দ্য একটু হলেও জোগান দিয়েছে, সেই সমস্ত পরিবারের ছেলেরা গৃহশ্রমে অভ্যস্ত করে বড় করে তোলার রীতি বিপজ্জনকরকম ক্ষীণ। ‘আমার ছেলে হাত পুড়িয়ে খাবে?’– এই বিস্ময়ের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন গর্ব আর ‘এনটাইটলমেন্ট’ ঢুকে বসে থাকে শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার ফাঁপা অধিকারের নিরিখে, তার নোংরা কাদা ঘেঁটে পরিষ্কার করার কাজ সাংঘাতিক শক্ত। কারণ বিন্দুমাত্র কোনও যোগ্যতা ছাড়া, বিন্দুমাত্র শ্রম ছাড়া, বিন্দুমাত্র কায়িক বা মানসিক অংশগ্রহণ ছাড়া, শুধুমাত্র অটুট পুংলিঙ্গ সুদ্ধ জন্মে যাওয়ার যোগ্যতাটুকুকে সম্বল করে যারা দীর্ঘদিন তোয়াজ পেয়ে এসেছে ভৃত্যমনোভাবাপন্ন হয়ে সুখে-থাকা মেয়েদের কাছ থেকে, আজ তাদের কাছ থেকে হঠাৎ ক্ষীরের বাটি কেড়ে নিতে গেলে তারাই বা দেবে কেন? উপরন্তু এতদিন ধরে এই পুং-ইগোয় যেসব মেয়ে নিয়মিত বাতাস করে এলেন, তাঁরাই বা সহজে ছাড়বেন কেন? শুধুমাত্র উন্নত দরের পেটচুক্তির গৃহভৃত্য হওয়ার সুবাদে তাঁদেরও তো পারিবারিক সম্মান মিলেছে যথেষ্টই! যেখানে এই সংসারচালনা এবং সংসারের ভৃত্য হয়ে থাকাটুকুকে সমাজে চিরকাল মহিমান্বিত করে আসা হয়েছে ‘সুগৃহিণী’, ‘গৃহকর্ত্রী’, ‘হোম মিনিস্টার’ গোছের কূটনৈতিক গ্লোরিফিকেশনের মাধ্যমে।   

zoom
শিল্পী: এম. এফ. হুসেন

 

নাম না-করেই একটা আদ্যোপান্ত সত্যি ঘটনা এই প্রসঙ্গে বলার লোভ সামলাতে পারছি না। সে আমারই বন্ধু, অতি উজ্জ্বল সপ্রতিভ এক মেয়ে, বছর পাঁচেক অধ্যাপনা করছে জেলার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভাগে একমাত্র মহিলা হওয়ার সুবাদে, বিভাগীয় মিটিং-এ একদিন ট্রে ভরা চায়ের কাপ সভামধ্যে বিলি করার অযাচিত দায়িত্ব এসে পড়ে তার ঘাড়ে। সচেতন প্রতিবাদে সে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘কেন, আপনারা নিজে নিয়ে নিন!’ উত্তর আসে, ‘তোমরা দিলে দেখতে ভালো লাগে।’ চমকে উঠেছিল মেয়েটি সেদিন। ঘেন্নায়, অপমানে। কিন্তু এই ‘দেখতে ভালো লাগা’টাই আসলে চিরপরিচিত অভ্যেস। মেয়েদের গৃহকর্মে নিপুণ হতে দেখার অভ্যেস, মেয়েদের হাতে খাদ্যবস্তু প্রস্তুত এবং বিতরিত হতে দেখার অভ্যেস, বিনা স্বীকৃতি ও বিনা পারিশ্রমিকে মেয়েদের শুশ্রূষা পেয়ে আসার অভ্যেস এবং অবশ্যই জন্মাবধি পুত্রগরবে গরবিনী মায়েদের হাতে বিরাট শিশু হয়ে বেড়ে ওঠার অভ্যেস।

‘বিয়ে’ নামক প্রাতিষ্ঠানিক ভাবনাটির সঙ্গে এমনিতেই দেনা এবং পাওনার একটা সূক্ষ্ম ‘ট্রানজ্যাকশন’ জড়িয়ে থাকা আমাদের দীর্ঘদিনের কুসাংস্কৃতিক রীতি। আজও পর্যন্ত বিয়ের খরচ অঘোষিতভাবে মেয়েটির পরিবারের তরফে বহন করার প্রথা তো আছেই, সেই সঙ্গে আসবাব থেকে শুরু করে গয়না এবং টাকাকড়ি সংক্রান্ত উপহারের তালিকাও বেশ মোটা। বধূবরণের রীতির মধ্যে ভাতকাপড়ের দায়িত্ব নেওয়ার যে কুৎসিত অঙ্গীকারকে জড়িয়ে দেওয়া হয় ‘বিবাহ’ নামক আচারটির সঙ্গে, সেখানে অনুচ্চারিত ঘোষণা এটাই যে, একজন পুরুষ হবে সাংসারিক পুঁজির ‘প্রোভাইডার’ বা সরবরাহকারী, এবং মেয়েটি থাকবে সেই পুঁজির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। মুশকিল হল, পুরুষ যে শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে ‘প্রোভাইডার’ হয়ে ওঠে, সেই শ্রমের বিনিময়মূল্য সাংসারিক খাতে যখন ব্যয় হয়, তখন সেই মূল্য সরাসরি চোখে দেখা যায়, কড়কড়ে টাকার দাম টের পাওয়া যায়। ‘টাকা যার, ক্ষমতা তার’ নীতির অবিসংবাদিত হায়ারার্কি প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে গৃহকোণ থেকে শুরু করে প্রতিটি গার্হস্থ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার জোরের মধ্যে। কিন্তু মেয়েদের গার্হস্থ্য শ্রম চিরকালীন ভূতের বেগার, তার না-আছে কোনও পারিশ্রমিক, ফলে না-আছে টাকার মূল্যে তার নির্দিষ্ট দাম। ধরেই নেওয়া হয়, সংসারের গার্হস্থ্য কাজকর্ম সামলানোর দায় একান্তভাবে তারই, তা সে উপার্জনক্ষম হোক বা না-হোক।

………………………………………………………..

কিছুদিন আগে একটা কেজো প্রয়োজনে গিয়েছিলাম সৌরীন ভট্টাচার্যর বাড়িতে। বিকেলের আগমন, সৌরীনবাবু নিজেই চা করে, বাদাম-বিস্কিট সহযোগে আদর করে খেতে দিলেন। কথা বলতে বলতে সেসব শেষ করে, অভ্যেসবশতই বলে ফেলেছি, যাই, সিঙ্কে নামিয়ে দিয়ে আসি? অমনি একটা ধমক খেলাম। ‘আমি এইজন্যেই আমার ছাত্রীদের ওপরে রাগ করি। তোমরা বাইরে বড় বড় নারীস্বাধীনতার কথা বলে বেড়াবে, অথচ সবসময় আমার বাড়িতে আসা ছাত্রীরাই শশব্যস্ত হয়ে ওঠে, চায়ের কাপটা কোথায় রাখব, কোথায় মাজব? কই, ছেলেরা তো এমন করে না? এই অভ্যেস এবার ত্যাগ করো।’

………………………………………………………..

যে-বিশেষ মামলাটির প্রসঙ্গে এতগুলো কথার অবতারণা, সেখানেও কিন্তু মেয়েটি চাকুরিরত। পুরুষটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মেয়েটি কলেজের অধ্যাপিকা। কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও, গার্হস্থ্য শ্রমের দায়ই যে শুধু তার ওপরে চাপানো হয়েছে তা নয়, মেয়েটির আরও অভিযোগ, তার উপার্জিত অর্থ সংসারে ব্যয় করার জন্য তার ওপরে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে প্রতিনিয়ত। অর্থাৎ, মেয়েরা রোজগার করতেই পারে, কিন্তু সেই অর্থের বণ্টনব্যবস্থা কুক্ষিগত করে রাখতে হবে পুরুষের হাতেই। মেয়েদের চৌহদ্দি শুধু ঘরের কাজ পর্যন্ত। আর এই যে ‘ঘরের কাজ করতে না চাওয়া’টাকে ‘নিষ্ঠুরতা’ বলে দেগে দিতে চাওয়ার নোংরা প্রবণতা, এর নেপথ্যে দাঁড়িয়ে আছে দিনের পর দিন মুখ বুজে সংসারের জোয়াল ঠেলে যাওয়া মেয়েদের ইতিহাস। আর এই প্রতিটি মুখ বুজে থাকা, আত্মসম্মানের জন্য লড়াই না-করা, বিন্দুমাত্র নীতিবোধহীন মেয়েরা এতদিন গার্হস্থ্য শ্রমকে যেভাবে জীবনের মোক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে আঁকড়ে রইলেন নিজের পরিচিতির অংশ করে, শিকল ভাঙতে চাওয়া প্রতিটি মেয়ের পথে তাঁরাই বিছিয়ে রেখে গেলেন এক-একটি ভয়াবহ তীক্ষ্ণশীর্ষ কাঁকর।

লিঙ্গসাম্য আর সমানাধিকার নিয়ে জমায়েতে, সামাজিক পরিসরে, অ্যাকাডেমিক কচকচির মধ্যে যত বক্তব্য শুনি, তার ৮০ শতাংশ আমি নির্দ্বিধায় ঝুপ করে নিভে যেতে দেখেছি প্রতিটি বাড়ির ডাইনিং টেবিলে এসে। দীর্ঘদিনের রোজগেরে জাত, ফলে তাদের তোল্লাই পাওয়ার এবং দেওয়ার অভ্যেসও দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক স্মৃতির হাড়েমজ্জায় ঢুকে গিয়েছে। সুতরাং পাঁঠার মেটে, মুরগির ঠ্যাং, দইয়ের মাথা থেকে শুরু করে বাটিতে বাটিতে সাজানো আপ্যায়নের ব্যবস্থা সব তাদের জন্যই। আর মেয়েরা, চিরকাল রাঁধাবাড়া শেষে, ‘আগে  ছেলেদের খাইয়ে নিয়ে’ তারপরে বসবেন একথালায় সব বেড়ে, কোনওক্রমে। দিনকালের বদলে কোথাও কোথাও ছেলেরা যদি বা আজকাল হাতাখুন্তির অভ্যেস কিঞ্চিৎ গায়ে সইয়ে নিচ্ছে, কটা বাড়িতে আপনারা দেখেন ছেলেদের পরিবেশন করার দায়িত্ব নিতে? কটা বাড়িতে দেখেছেন যে, বাড়ির মেয়েদের ভাত বেড়ে, পরিবেশন করে খাওয়াচ্ছেন বাড়ির পুরুষরা?

zoom
শিল্পী: বিকাশ ভট্টাচার্য

কিছুদিন আগে একটা কেজো প্রয়োজনে গিয়েছিলাম সৌরীন ভট্টাচার্যর বাড়িতে। বিকেলের আগমন, সৌরীনবাবু নিজেই চা করে, বাদাম-বিস্কিট সহযোগে আদর করে খেতে দিলেন। কথা বলতে বলতে সেসব শেষ করে, অভ্যেসবশতই বলে ফেলেছি, যাই, সিঙ্কে নামিয়ে দিয়ে আসি? অমনি একটা ধমক খেলাম। ‘আমি এইজন্যেই আমার ছাত্রীদের ওপরে রাগ করি। তোমরা বাইরে বড় বড় নারীস্বাধীনতার কথা বলে বেড়াবে, অথচ সবসময় আমার বাড়িতে আসা ছাত্রীরাই শশব্যস্ত হয়ে ওঠে, চায়ের কাপটা কোথায় রাখব, কোথায় মাজব? কই, ছেলেরা তো এমন করে না? এই অভ্যেস এবার ত্যাগ করো।’ মুখ চুন করে বসে রইলাম সেদিন। এ-ও বুঝলাম, চিরকাল বাইরের সাহায্য না-নিয়েই নিজে চলতে চাওয়া একা মানুষটির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার এ এক কৌশল। আবার নিজে সেদিন হাড়ে হাড়ে এটাও বুঝলাম, সত্যিই তো, এই ভৃত্য-মানসিকতা আমার সমাজ আমার রক্তে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, মেয়ে বলেই বোধহয় এই চায়ের কাপ নামিয়ে দিয়ে আসতে চাওয়াটা আমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কী স্বাভাবিক ভদ্রতাবোধ হিসেবেই আমি ধরে নিয়ে এসেছি এতকাল! সেই এক ধমকে সেদিন নিজের সঙ্গে করে আসা এতদিনের ছলচাতুরিটা যখন ধরা পড়ল, বাড়ি ফিরে এসেও এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবা আর নিজের আসল চেহারাটা দেখতে পাওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই তো করার ছিল না!

 

সুপ্রিম কোর্ট যে-মতামত দিয়েছে এই বিশেষ মামলাটির প্রসঙ্গে, সেখানে একথা যেমন বলা আছে যে, বিয়ের বিনিময়ে মেয়েটির কাছ থেকে গৃহশ্রম দাবি করা চলে না, তেমন এ-ও বলা আছে, ‘গৃহশ্রম’ একটি যৌথ কর্তব্য। প্রভু-ভৃত্যের সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির পুরুষটিকেও সেই গার্হস্থ্য মজুরির দায় বহন করতেই হবে। কিন্তু কাঠগড়া থেকে চৌকাঠের তফাত বহুদূর। সত্যিই কি সেই দিন আসবে, যেদিন ‘পাত্র চাই’-এর বিজ্ঞাপনে নির্দ্বিধায় কেউ ‘গৃহকর্মনিপুণ’ সুপাত্রের দাবি করতে পারবেন? 

ChangingIndia DivorceInIndia DomesticLife GenderRoles InDepth IndianCooking IndianMarriage KitchenPolitics KitchenStories MarriageIssues ModernRelationships Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar SocietyAndCulture TrendingNow

Share this article on