

কারসন শুধুমাত্র স্যাফোর কবিতা অনুবাদই করেননি, তিনি কবিতাগুলির হারিয়ে যাওয়া অংশগুলির শূন্যস্থান নিজের মতো করে পূরণ করেছেন– তবে তা শব্দ দিয়ে নয়, শূন্যতা দিয়েই। এই অনুবাদের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের ১২ আগস্ট। বইটির নাম ‘ইফ নট, উইন্টার’। এই নামটি স্যাফোর কবিতা থেকেই তুলে নেওয়া একটি অসম্পূর্ণ বাক্য। এই অসম্পূর্ণতা বইটির অসম্পূর্ণতা এবং তাকে পূর্ণ করবার প্রচেষ্টার মূল ভাবধারার সঙ্গে একেবারেই মিলে যায়। এ যেন উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির মধ্যে একরকম কথোপকথনের সূচনা।
You will remember
For we in our youth
Did these things
Yes many and beautiful things
We live
The opposite daring.
হ্যাঁ, মনে রেখেছেন। মনে রাখা সহজ যে ছিল তা নয়। মনে রাখতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা ছিল, তাও নয়। বরং সময় এবং সমাজ চেয়ে ও না-চেয়ে আসলে স্মৃতি মুছে ফেলার কাজটাই সচেতন এবং অচেতনভাবে করে চলেছিল। সমাজ-রাজনীতির স্বার্থে, স্বার্থক্ষুণ্ণ হয় এমন ইতিহাস মুছে ফেলার প্রচেষ্টা এবং দৃষ্টান্ত বারবারই দেখা গিয়েছে যুগে-যুগান্তরে। কিন্তু তবুও কয়েক সহস্র পূর্বের এক নারী-কবিকে ঠিক মনে রেখেছেন বিশ শতকে লিখতে আসা এক নারী-কবি। শুধুমাত্র মনে রেখেছেন বললে চরম অন্যায় হয়। আর্কাইভ থেকে টেনে বের করেছেন সেই প্রাচীন কবির কবিতার প্রেতকে। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে মনে পড়ে? বিভিন্ন মৃতদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেলাই করে করে যে শরীর হয়ে উঠেছিল দানব ফ্রাঙ্কেনস্টাইন– সেইভাবেই টুকরো শব্দ, খণ্ডিত বাক্য নৈঃশব্দ্যের সুতো দিয়ে জুড়ে জুড়ে কবিতার সেই প্রাচীন আত্মাকে এই নবীন কবি দিলেন এক নতুন অবয়ব।

একথা কে না জানে, সমকামী সম্পর্ক কোনও কালেই সমাজে মানুষের স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। নারীদের ক্ষেত্রে সমকামিতা ছিল আরও গর্হিত। পুরুষতন্ত্র বরাবরই সমাজ সংস্কার এবং নিয়ন্ত্রণের নামে, হয় নারীর কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ করেছে অথবা তাদের হয়ে নিজেরা কথা বলেছে। তাই স্যাফোর মতো নারীকণ্ঠ যখন সমলিঙ্গ প্রেমের অথবা সমকামী যৌন-আকাঙ্ক্ষার কথা ঘোষণা করেছেন নিজের সাহিত্যে, সমপ্রেমকে দিয়েছেন স্বাধীন, স্বতন্ত্র ভাষা– তখন সেই কণ্ঠকে অস্বীকার করা এবং মুছে ফেলা ছাড়া পিতৃতন্ত্রের আর কোনও উপায়ই ছিল না। স্যাফো তাঁর কবিতায় সমলিঙ্গ যৌন-আকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে। তাঁর সাহিত্যকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করবার প্রয়োজন মনে করেনি সভ্যতা, কারণ স্যাফোর কবিতার গতিপ্রকৃতিকে পুরুষতন্ত্র মনে করেছে সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক এবং নারীদের চিন্তাভাবনাকে স্বাধীন পথে চালিত করবার পক্ষে উসকানিমূলক। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না। যেটুকু পাওয়া যায় তা টুকরো টুকরো শব্দ, বাক্যাংশ, অর্থপূর্ণ শূন্যস্থান। ভাঙা অসম্পূর্ণ শরীর নিয়ে আর্কাইভ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় স্যাফোর প্রেম-আকাঙ্ক্ষা-বিরহের বিদেহী আত্মা। সেই স্যাফোর কবিতার সঙ্গেই নীরব কথোপকথনে মগ্ন হন ১৯৫০ সালের ২১ জুন, কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণকারী, বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বল-স্থৈর্যে উদ্ভাসিত কবি-নক্ষত্র অ্যান কারসন। তিনি স্যাফোর কবিতার যতটুকু এখনও পাওয়া যায় প্রাচীন প্যাপিরাসের টিকে থাকা অক্ষত অংশ থেকে– সেই অংশগুলি গ্রিক ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হল কারসন শুধুমাত্র স্যাফোর কবিতা অনুবাদই করেননি, তিনি কবিতাগুলির হারিয়ে যাওয়া অংশগুলির শূন্যস্থান নিজের মতো করে পূরণ করেছেন– তবে তা শব্দ দিয়ে নয়, শূন্যতা দিয়েই। এই অনুবাদের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের ১২ আগস্ট। বইটির নাম ‘ইফ নট, উইন্টার’। এই নামটি স্যাফোর কবিতা থেকেই তুলে নেওয়া একটি অসম্পূর্ণ বাক্য। এই অসম্পূর্ণতা বইটির অসম্পূর্ণতা এবং তাকে পূর্ণ করবার প্রচেষ্টার মূল ভাবধারার সঙ্গে একেবারেই মিলে যায়। এ যেন উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির মধ্যে একরকম কথোপকথনের সূচনা। শীত যদি না হয় তাহলে কি বসন্ত? না কি বর্ষা? হেমন্ত হতেই বা দোষ কী? অসম্পূর্ণ যা, তাকে তো নানাভাবে সম্পূর্ণতা দেওয়া যায়। এই অসম্পূর্ণ বাক্য পাঠককে সুযোগ করে দেয় নতুন করে এই বাক্যবিন্যাস নিয়ে ভাবতে, সেই বাক্যে নতুন অর্থস্তর যোগ করতে। ঠিক এই কৌশল ব্যবহার করেই অ্যান কারসন সংরক্ষণ করেছেন স্যাফোর কবিতা। সংরক্ষণ করার অনন্য এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে এমন অভিনবত্ব, যা স্যাফোর সৃষ্টির কোনওরকম পুনর্গঠন সম্পন্ন করে না। হারিয়ে যাওয়া অংশগুলি তিনি নিজের চিন্তা বা কল্পনা দিয়ে পূর্ণ করেননি, বরং ব্যবহার করেছেন থার্ড ব্র্যাকেট, পৃষ্ঠার সাদা ফাঁকা অংশ। এই সমস্ত অংশে তিনি চেয়েছেন পাঠক তাঁদের নিজেদের কল্পনা অনুযায়ী শব্দ বা বাক্য বসিয়ে কবিতার অর্থ সম্পূর্ণ করে নিন। বা হয়তো বলতে চেয়েছেন যে ওই শূন্যতা কোনও শব্দ বসিয়ে পূরণ না করাও যেতে পারে। কারণ নির্দিষ্ট শব্দ বসিয়ে দিলে ওই শব্দের বাইরের যত রকম অর্থ-সম্ভাবনা সেগুলির মৃত্যু ঘটে। এইখানে মনে পড়ে যায় জন কিটসের কবিতা ‘দ্য গ্রেশিয়ান আর্ন’!
‘Heard melodies are sweet, but those unheard
Are sweete; therefore, ye soft pipes,
Play on;’

যে সুর, সুর হয়ে হাওয়ায় ভর করে কানে এসে পৌঁছেছে– তা অতি মধুর হতেই পারে, কিন্তু যে সুর শুধুমাত্র সুরস্রষ্টার কল্পনায় ঘোরাফেরা করছে, যার প্রকাশ ঘটেনি, সেই সুরের মাধুর্য সীমাহীন সময়ের জন্য থাকবে অক্ষত। তাই শূন্যস্থানে শব্দ বসিয়ে দিলে তা অতি সুন্দর অর্থ ধারণ করতেই পারে, কিন্তু শূন্যতাকে শব্দ দিয়ে বিব্রত না করলে একটি বাক্যই ধারণ করতে পারে বিচিত্র এবং বহুস্তরীয় অর্থ।
কারসনের এই অনুবাদ-কুশলতার ফলে যেটা হল– স্যাফোর কবিতাগুলি হয়ে উঠল ‘ওপেন টেক্সট’ অর্থাৎ বহুমাত্রিক অর্থ-উৎপাদনকারী টেক্সট। কারসন প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া স্যাফোর কবিতাগুলি সংরক্ষণের জন্য যে টেকনিক অবলম্বন করেছেন– তা শুধুমাত্র ভাষাগত নৈপুণ্যের নিদর্শন নয়, তা ভীষণরকমভাবে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন। তিনি ব্যাকরণগতভাবে একটি বাক্যকে সম্পূর্ণ করার কোনওরকম প্রচেষ্টা করেননি। বলা যেতে পারে কারসন একটি অসম্পূর্ণতাকেই তার সম্পূর্ণতম চেহারায় পাঠকের কাছে উপস্থিত করতে চেয়েছেন।
এই ব্র্যাকেট এবং হোয়াইট স্পেস ব্যবহারের কারণ হিসেবে কারসন যুক্তি দিয়েছেন:
‘I emphasize the distinction between brackets and no brackets because it will affect your reading experience, if you will allow it. Brackets are exciting. Even though you are approaching Sappho in translation, that is no reason you should miss the drama of trying to read a papyrus torn in half or riddled with holes or smaller than a postage stamp– brackets imply a free space of imaginal adventure.’

অনুবাদ করার সময় কিছু কিছু কবিতার ক্ষেত্রে কারসন খোলা থার্ড ব্র্যাকেট ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ সেই অংশগুলিতে তিনি মনে করেছেন, পাঠক তাঁর নিজের মতো করে বাক্যাংশ বা শব্দবন্ধ বসিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন কাঙ্ক্ষিত অর্থ বা সেগুলিকে শূন্যস্থান হিসেবেই দেখতে পারেন। শূন্যস্থানকেও তো পড়া যায় নিবিড়ভাবে। কারসন অনূদিত স্যাফোর কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায়– হান কাং তাঁর ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ বইতে লিখেছিলেন এক অনবদ্য মানব-উপলব্ধির কথা–
“A scant hour’s worth of silent despair, that was the last grace left to us as humans.”
বাক্যের মাঝে যেখানে শূন্যস্থান বোঝানোর জন্য ব্র্যাকেট ব্যবহার করেছেন কারসন– সেই শূন্যস্থানগুলি কি কবির ‘silent despair’ নয়? পড়তে গিয়ে মনে হয়, ওই ছেড়ে রাখা শূন্যস্থানগুলি আসলে কবিতাটির অসম্পূর্ণতা অনুধাবনের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কবিতার কয়েকটি স্তবক যদি আমরা খুব কাছ থেকে দেখি তাহলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়–
And with sweet oil
costly
you anointed yourself
and on a soft bed
delicate
you would let loose your longing
and neither any [ ] nor any
holy place nor
was there from which we were absent
no grove [ ] no dance[
] no sound
এই কবিতায় দু’টি বাক্যের মাঝখানে একটি করে থার্ড ব্র্যাকেট রয়েছে, যেগুলি বদ্ধ অর্থাৎ এই বাক্যগুলির মাঝের অংশ পাওয়া যায়নি। এই শূন্যস্থানগুলিতে ক্লোজড ব্র্যাকেট ব্যবহার করা হয়েছে কারণ এই অংশগুলি আশপাশের শব্দের অর্থ দ্বারা বদ্ধ। ওই শূন্যস্থানগুলিকে কোনও শব্দ দিয়ে পূর্ণ করলেও, পারিপার্শ্বিক শব্দগুলি সেই কল্পনাপ্রসূত শব্দের অর্থকে নিয়ন্ত্রণ করবে। শেষ স্তবকে ‘dance’ এবং ‘sound’ শব্দদু’টির মাঝে রয়েছে একটি ওপেন ব্র্যাকেট। ‘Sound’ কথাটির পরেও রয়েছে একটি ওপেন ব্র্যাকেট! কিন্তু দু’টি ওপেন ব্র্যাকেটের মধ্যেও আবার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রথমটি বাক্যের ভিতরের দিকে খোলা কিন্তু দ্বিতীয়টি বাক্যশেষে বাইরের দিকে উন্মুক্ত। প্রশ্ন হল সেই তো শব্দের অনুপস্থিতি। তাহলে এত রকমের ব্র্যাকেট ব্যবহার করার কারণ কী? ভাবা দরকার, ‘dance’ এবং ‘sound’-এর মাঝের শূন্যতা কি বহুলাংশে অর্থপূর্ণ নয়? ফ্রেডরিক নিৎজের কথাতেও রয়েছে অনুরূপ চিন্তার অনুরণন–
‘And those who were seen dancing were thought to be insane by those who could not hear the music.’

এই নাচ এবং শব্দের মধ্যেকার শূন্যতায় রয়েছে সেই অনস্বীকার্য নারী-আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি, যাকে উন্মাদ প্রবৃত্তি হিসেবে যুগে যুগে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু এই সমলিঙ্গ প্রেম এবং দেহজ আকাঙ্ক্ষা মুক্তি পেয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বিভিন্ন নারীর বিবিধ শিল্পকীর্তির মাধ্যমে। ‘Dance’ এমন এক শিল্প যেখানে শরীরের নানান অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ব্যবহার করতে হয়, যার প্রকাশ ঘটাতে হয় সম্পূর্ণ শরীর সঞ্চালনের মাধ্যমে, ঠিক যে উপায়ে সংঘটিত হয় দেহসঙ্গম। তাই এই শরীরী প্রবৃত্তিকে বন্ধ করা হয়েছে বাক্যের ভিতরে, খাঁচার ভিতরে, যেমন উন্মাদ মানুষদের বন্দি করা হয়ে থাকে। কিন্তু ‘sound’ অর্থাৎ সংগীত এমন এক সৃষ্টিরূপ যার জন্য শরীরী চঞ্চলতা দরকার হয় না। সংগীত আসলে তো কবিতা, অর্থাৎ কথা বলা– শব্দের দ্বারা অনুভূতির প্রকাশ। উন্মাদকেও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলে সে কথা বলতে পারে। মুখ বেঁধে রাখলে সে মনে মনে কথা বলে, শব্দ তৈরি করে। তাই কথাকে তো বন্দি করা যায় না। তাই বাক্য শেষে ওপেন ব্র্যাকেট। স্যাফো যা বলতে বলতে শেষ করতে পারেননি, আমি, আপনি বা অন্য যে কেউ সেই কথা সম্পূর্ণ করতে পারি বা রেখে দিতে পারি অসম্পূর্ণই– যে অসম্পূর্ণতা অন্য সময়ে, অন্য যুগে হয়ে উঠতে পারে এক ভিন্ন ন্যারেটিভ।
একইভাবে পাঠক অর্থ খুঁজে পেতে পারেন আরও একটি বিস্ময়কর কবিতার!
]not possible to happen
]to pray for a share
]
toward [
]
out of the unexpected.
কবি এখানে একজন নারী, আনাকতোরিয়াকে কামনা করছেন। তাঁর সঙ্গ চাইছেন– যা সম্ভব ছিল না, বলাই বাহুল্য। তা বাস্তবে হয়তো হবে না, কিন্তু কল্পনায় হতে পারে তো? তাই বাইরের দিকে ব্র্যাকেট বন্ধ হলেও ভিতর দিকে অর্থাৎ মনে মনে ব্র্যাকেট খোলা। নারী নিজের জন্য স্বাধীনতার, ভালোবাসার, প্রেমের একটি অংশ প্রার্থনা করছে– যা পাওয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু গোপনে তা পাওয়া যেতে পারে তো! তাই ব্র্যাকেট বাইরের দিকে বন্ধ হলেও ভিতরে খোলা৷ এরপর ‘toward’-এর পরে একটি বদ্ধ থার্ড ব্র্যাকেট। তার পরের লাইনে রয়েছে ‘out of the unexpected’। লক্ষ করতে হবে ‘toward’ এবং ‘out of the unexpected’-এর মাঝের বদ্ধ ব্র্যাকেটটি ভেঙে দু’টি লাইনে দেওয়া হয়েছে– যাতে দু’টিকেই ওপেন ব্র্যাকেট হিসেবে ভ্রম হয। অর্থাৎ, প্রার্থনা কার কাছে করা হচ্ছে, সেই প্রার্থনা তাদের কানে আদৌ পৌঁছচ্ছে কি না তা জানা নেই– তাই তৈরি হচ্ছে বিভ্রম। পরের লাইনের বন্ধ ব্র্যাকেট নিশ্চিত করছে যে, এক নারীমনের স্বাধীনতা-প্রাপ্তির প্রার্থনা বাস্তবে শেষ পর্যন্ত কোথাও গিয়ে পৌঁছয়নি। এই ব্র্যাকেটের অন্তর্বর্তী যে নীরবতা তার মধ্যেই বসবাস করছে কবির কল্পনা। তাই অপ্রত্যাশিত যা, তার ভিতর থেকেই শুধুমাত্র কল্পনার উপর নির্ভর করে কবি আকাঙ্ক্ষা করছেন প্রিয় নারীকে এবং বাস্তবে না হলেও নৈঃশব্দ্যের মধ্যে তাকে পেয়েও যাচ্ছেন।

অ্যান কারসন ক্লাসিকাল গ্রিক সাহিত্যের প্রতি শিশুকাল থেকেই ছিলেন অত্যন্ত অনুরক্ত। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ক্লাসিকাল সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরের লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। পরবর্তীকালে কানাডার ম্যাকগিল এবং মিচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘এরোস দ্য বিটারসুইট’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘গ্লাস আয়রনি অ্যান্ড গড’ (১৯৯৫), ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ (১৯৯৮), ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজব্যান্ড’ (২০০১), ‘ইফ নট উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অফ স্যাফো’ (২০০২), ‘ডিক্রিয়েশন: পোয়েট্রি, এসেইজ, ওপেরাস’ (২০০৫), ‘নক্স’ (২০১০), ‘রেড ডক’ (২০১৩), ‘ফ্লোট’ (২০১৬), ‘দ্য আলবের্টাইন ওয়ার্ক-আউট’ (২০১৪)। কারসনের সাহিত্যে গ্রিক পুরাণের বিভিন্ন চরিত্রের নারীবাদ-নির্ভর পুনর্লিখন বারবার পাওয়া গিয়েছে। তাঁর লেখায় রয়েছে নারীদের প্রেমাকাঙ্ক্ষা, তাদের সমকামী যৌন ইচ্ছের প্রতি সংবেদনশীলতা, অনুপস্থিতি এবং অনুচ্চারিত অনুভূতির অনুসন্ধান এবং তাদের যত্নে সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা। তিনি সমকালীন বিশ্ব সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ অনুবাদক, যিনি অনুবাদ সাহিত্যের পরিসর বিস্তৃত করেছেন নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে। তাঁর সাহিত্যকীর্তির মধ্যে দিয়ে বারবারই তিনি প্রমাণ করেছেন ক্লাসিকাল সাহিত্য কোনওভাবেই মৃত বা গুরুত্বহীন নয়। হাতেকলমে দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি যত্নশীল হলে দেখা যাবে– তা বর্তমান সময়ের সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্রে ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক।
কারসন, স্যাফোর কবিতা অনুবাদ করে আসলে বাঁচিয়ে তুলেছেন একটি সত্যকে– যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বারবার উপেক্ষা করতে চেয়েছে এবং সামাজিক বিধিনিষেধের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছে। শুধুমাত্র নারীর প্রতি নারীর আকাঙ্ক্ষাকে কারসন পুনরুজ্জীবিত করেছেন নিজের অনুবাদ-কুশলতার অভিনবত্বের মাধ্যমে– একথা বললে তাঁর কাজকে সম্পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। কারসন আসলে নৈঃশব্দ্য দিয়েই জাগিয়ে তুলেছেন এক বৃহত্তর নৈঃশব্দ্যকে। শূন্যস্থান দিয়ে দাগ কেটেছেন শূন্যস্থানের তলায়। ফলে শূন্যতা হয়ে উঠেছে বাঙ্ময়, হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ কথাদের অগ্ন্যুৎপাত। এই প্রসঙ্গে কারসনেরই একটি উক্তি দিয়ে এই আলোচনা শেষ করা সমীচীন বলে মনে করছি–
‘Note that the word “mute” is regarded by linguists as an onomatopoeic formation referring not to silence but to a certain fundamental opacity of human being, which likes to show the truth by allowing it to be seen hiding.’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved