Rozina and the Agony of No Man's Land। Robbar
Robbar
  • ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বলো কোথায় তোমার দেশ

জন লেনন তাঁর ‘ইমাজিন’ গানে বলেছিলেন দেশহীন এক পৃথিবীর কথা। সমস্ত মানুষ নীল রঙের এই গ্রহটায় একদিন শান্তিতে থাকবে, যাবতীয় বিচ্ছেদ থেকে দূরে সরে গিয়ে। ‘ইমাজিন অল দ্য পিপল শেয়ারিং অল দ্য ওয়ার্ল্ড…’ স্বপ্নালু হতে আপত্তি ছিল না লেননের। ১৯৭১ সালে লেখা এই গান আজও স্বপ্নই হয়ে আছে। সভ্যতার বয়স বেড়েছে আরও। আমাদের চোখের সামনে পড়ে আছে বিশান সিং। আর তার পাশেই বসে আছে রোজিনা। দুই দেশ ছুঁয়ে থাকা এক দেশহীন ভূখণ্ডে।

শেষ আপডেট: জুন ১৯, ২০২৬, ১৬:২২   
Facebook WhatsApp Messenger

হাড়কাঁপানো শীত। গভীর রাত। খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে বিশান সিংয়ের লাশ! যে ভূখণ্ডে দেহটা পড়েছিল সেটা পাকিস্তানও নয়, ভারতও নয়, বলা যায় শূন্যরেখা। ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’! সাদাত হাসান মান্টোর মতে, ওটা আসলে টোবা টেক সিং। যেখানে ফিরতে চেয়েছিল বিশান। ফেরা হয়নি। কেবল মৃত্যুর নীলচে চাদরে ঢেকে গিয়েছিল শরীর।

zoom

৭০ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে গল্পটার। তবু আজও বিশান সিং পড়ে আছে। মাথার ওপরে খোলা আকাশ। শরীর স্পর্শ করে আছে শূন্যরেখার মাটি। আমাদের চোখের সামনে দেশভাগের দগদগে ঘায়ের মতো পড়ে আছে বিশান। ভুল, সে-ই আসলে টোবা টেক সিং! সে যেখানে ফিরতে চেয়েছিল, মৃত্যুর পরে সে আর সেই জায়গাটা যেন একীভূত হয়ে গিয়েছিল। বিশান সিংই টোবা টেক সিং! সে বুঝতেই পারল না তার বাড়ি এখন কোন দেশে! ১৫ বছর ধরে পাগলা গারদে থাকতে থাকতে তার জানা হয়নি, কারা যেন তার দেশটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ভাগ করে দিয়েছে। সেই রেখার কোন দিকে যে টোবা টেক সিং পড়ে আছে, সে কেমন করেই বা জানবে!

স্বাধীনতার পরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যেমন কয়েদি বিনিময় হয়েছিল, সেভাবেই পাগলদেরও হস্তান্তর হয়। সেই দলেরই একজন বিশান। ১৫ বছর ধরে সে আবোলতাবোল কথা বলে চলেছে। পায়চারি করে চলেছে। তাকে বসানো যায়নি। ঘুমও পাড়ানো যায়নি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ের গোড়ালি ফুলিয়ে ফেলেছে বিশান। দেখলে তাকে ভয় করে! কিন্তু সে কখনও কারও সঙ্গে হিংস্রতা দেখায়নি। শোনা যায়, সে না কি জমিদার ছিল। টোবা টেক সিংয়ের জমিদার! পরে মাথাটা আর কাজ করেনি। পরিবার তাকে এখানে রেখে গিয়েছে। কখনও-সখনও কেউ কেউ তাকে দেখতেও আসত। তার মেয়ে রূপ কাউর বালিকা থেকে কিশোরী হয়েও বারবার ফিরে এসেছে বিশানকে দেখতে। সেই দিনগুলোয় বিশান স্নান করত, চুল আঁচড়ে নিজেকে সাজিয়ে নিত নিজের মতো করে। এহেন বিশান তাকে দেখতে আসা বন্ধু ফজলকে প্রশ্ন করেছিল টোবা টেক সিং কোথায়? একই প্রশ্ন সে বারবার করেছে অন্য পাগলদেরও। ফজল উত্তর দিয়েছিল, ‘ভারতে… না, পাকিস্তানে।’ অর্থাৎ সেও নিশ্চিত জানে না! বিশান বলে ওঠে, ‘উপর দি গুড় গুড় দি আনেক্সে দি বে ধাইয়ানা দি মুং দি ডাল অফ দি পাকিস্তান অ্যান্ড হিন্দুস্তান দূর ফিট্টে মু।’

zoom

অসংলগ্ন, আবোল তাবোল, অর্থহীন এই সংলাপ আসলে বিশানের কাছে দেশভাগেরই সমতুল। তার ভাষা যেমন আমরা বুঝে উঠতে পারি না, সেও বোঝে না হঠাৎ এই দেশভাগ কেন। আর সেই দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া দেশের মধ্যে তার ‘দেশের বাড়ি’ কোথায়। তাই দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে সে আবার জানতে চেয়েছিল, কোথায় তার টোবা টেক সিং? উত্তর মেলেনি। সূর্যোদয়ের সামান্য আগে ১৫ বছর ধরে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা মাটিতে পড়ে যায়। সে মাটি ভারতেরও নয়, পাকিস্তানেরও নয়।

৭০ বছর পরে এক ছোট্ট মেয়ে রোজিনা, সেও বুঝতে পারছে না তার ‘দেশের বাড়ি’ কোথায়! মা-বাবা-ভাই-দিদিকে নিয়ে দিব্যি কাটছিল জীবন। হঠাৎই সব বদলে গেল। রোজিনা বিড়বিড় করে, ‘খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, গা ধোওয়া নেই, কিচ্ছু নেই… সারা দিন এভাবে পথেঘাটে বসে আছি। আর কতদিন থাকতে হবে জানি না।’

zoom
সীমান্তে নো ম্যানস ল্যান্ডে অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে অপেক্ষায় রোজিনা ও তার পরিবার

নেটভুবনে ভাসতে থাকা এক ছোট্ট ক্লিপ আমাদের সকলেরই ফোনে ভেসে এসেছে হয়তো। দৈনন্দিন যাপনের ফাঁকে আচমকাই আঙুল থমকে গিয়েছে রোগাটে মেয়েটার কান্নামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে। ছোট্ট রোজিনা ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু’ জানে! সে কেবল চায় মানুষের মৌলিক অধিকারটুকু। পেট ভরানো খাবার, পরিবারের জন্য নিশ্চিন্ত আশ্রয়। জন্মের পর থেকে যে পৃথিবী সে দেখেছে, সেই পৃথিবী যেন হঠাৎ ভেঙে পড়েছে। নিজেকে সে আবিষ্কার করেছে ভারত-বাংলাদেশ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে! বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে পাঠাতে চেয়েছিল। বিজিবি নেয়নি। বিএসএফও ফিরিয়ে নেয়নি। যতদূর জানা যাচ্ছে, এখনও দুই দেশের মধ্যবর্তী এক শূন্যস্থানে রোজিনা বসে আছে পরিবারকে নিয়ে। ঠিক যেভাবে বিশান লুটিয়ে পড়েছিল দুটো দেশের মাঝবরাবর, নো ম্যানস ল্যান্ডে!

৭০ বছরের এপার-ওপার মিলিয়ে দিচ্ছে রোজিন‌া ও টোবা টেক সিং-কে। তাকে নিয়ে কত কথা নেটপাড়ার ভার্চুয়াল দুনিয়ায়! কত আলোচনা! কিন্তু এই আশ্চর্য সময়ে সব কিছুই বড় ক্ষণস্থায়ী। নতুন ‘কনটেন্ট’ এসে আগের সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রোজিনাকে আমরা হয়তো ভুলে যাব। আমাদের হয়তো জানা হবে না, সে তার ‘দেশের বাড়ি’র সন্ধান পেয়েছিল কি না! কিন্তু কোনও ডিজিটা‌ল জাতিস্মরের মতো কোনওদিন ঠিক ফিরে আসবে পুরনো ক্লিপটা– ‘খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, গা ধোওয়া নেই, কিচ্ছু নেই…’। আমাদের সুখী, মোটামুটি নিশ্চিন্ত মধ্যবিত্ত জীবনের দিকে এই বালিকার আর্তি ফিরে ফিরে আসবে।

আর আমাদের মনে পড়ে যাবে বিনুকে। ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’র সেই বালক। ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে ঈশ্বর ও বিনু ঘাটশিলা স্টেশনে পৌঁছয়। ততক্ষণে ঈশ্বর জেনে গিয়েছে, তার চাকরিটা আর নেই। অনাথ ভাগ্নেকে নিয়ে কোথায় যাবে সে? জানা নেই। তবু ভাগ্নেকে সে আশ্বাস দেয়, নতুন বাড়িতে যাচ্ছে তারা। বিনু আনন্দে ভেসে যায়। তার মাকেও এমনভাবেই ‘নতুন বাড়ি’র স্বপ্ন দেখিয়েছিল ফাউন্ড্রি ওয়ার্কশপের ফোরম্যান মুখুজ্জেবাবু। বলেছিল‌, ‘উই যে দূরে নীল নীল পাহাড় আকাশে পিঠটি মেলে দেঁইছে, তার পাশ দিয়ে নদীটি এঁকেবেঁকে চলে গেইছে। ঠিক উইখানটিতে তোমাদের নতুন বাড়ি। কত ফুল, কত পাখি, কত প্রজাপতি, কত বড় বড় সুন্দর ঘর, কত গান, কত বাজনা। সুবর্ণরেখা– সোনার রেখাটি, তার পাশেই তোমার বাড়িটি।’

zoom
ঋত্বিককুমার ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’র দৃশ্য

আমার মামাবাড়ির পাড়ায় এক পাগল ছিল। সে একটা জনশূন্য বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ত মাঝরাতে। চিৎকার করত দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কে তাকে দরজা খুলে দেবে! আশপাশের বাড়ির লোক বিরক্ত হত। কেন বাপু এভাবে হল্লা করছ? পাগলটা বলত, ‘বাড়িতে যাব না? তাহলে যাব কোথায়?’ কেন ওই বাড়িটাকেই তার নিজের বাড়ি বলে মনে হত, আদপে কি সম্পর্ক ছিল কোনও, সে উত্তর কোনওদিন মেলেনি। পাগলটা একটা সময়ের পর আসেনি আর। সে কি মারা গিয়েছি‌ল? না কি অন্য কোনও বাড়িতে এভাবেই কড়া নেড়ে নেড়ে অতিষ্ঠ করে তুলত আশপাশের সকলকে? জানা নেই। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারি, সে আসলে হিসেব গুলিয়ে ফে‌লা এক মানুষ। নিজের বাড়ির পথ, ঠিকানা হারিয়ে ফেলা এক মানুষ। ‘দেশের বাড়ি’ খুঁজে বেড়ানো এক মানুষ। তার বিপন্ন বিষণ্ণতাকে আমরা কোনওদিন বুঝতেই পারব না।

zoom

জন লেনন তাঁর ‘ইমাজিন’ গানে বলেছিলেন দেশহীন এক পৃথিবীর কথা। সমস্ত মানুষ নীল রঙের এই গ্রহটায় একদিন শান্তিতে থাকবে, যাবতীয় বিচ্ছেদ থেকে দূরে সরে গিয়ে। ‘ইমাজিন অল দ্য পিপল শেয়ারিং অল দ্য ওয়ার্ল্ড…’ স্বপ্নালু হতে আপত্তি ছিল না লেননের। আশা ছিল, তিনি একলা নন। একদিনে আপনি-আমি মিলেমিশে হয়ে যাবে একটাই পৃথিবী। ১৯৭১ সালে লেখা এই গান আজও স্বপ্নই হয়ে আছে। সভ্যতার বয়স বেড়েছে আরও। আমাদের চোখের সামনে পড়ে আছে বিশান সিং। আর তার পাশেই বসে আছে রোজিনা। দুই দেশ ছুঁয়ে থাকা এক দেশহীন ভূখণ্ডে।

………………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন বিশ্বদীপ দে-র অন্যান্য লেখা

………………………..

John Lennon No Man's Land partition partition history Ritwik Ghatak Saadat Hasan Manto Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Subarnarekha Toba Tek Singh

Share this article on