

১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর সিবিএস চ্যানেলে সম্প্রচারিত হল সিরিজের প্রথম পর্ব (টিভির পরিভাষায় যাকে বলে ‘পাইলট এপিসোড’) ‘হোয়্যার ইজ এভ্রিবডি?’ অচেনা, জনমানবহীন শহরে আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়ানো এক স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যক্তির অস্তিত্বসংকট চমকে দিল দর্শকদের; সবাই একবাক্যে স্বীকার করল– দূরদর্শনে এমন রোমাঞ্চকর অথচ অস্বস্তি জাগানো আখ্যান তারা আগে কোনওদিন দেখেনি।
বিমানযাত্রী রবার্ট উইলসন রাতের বেলা জানলার বাইরে দেখেন এক ভয়ংকর দৃশ্য– এক কদাকার, লোমশ জীব প্লেনের ডানায় চেপে ইঞ্জিন ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। মুখচোরা মানুষের সংস্রব এড়িয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতে চাওয়া হেনরি বেমিস একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করেন পারমাণবিক যুদ্ধে সবাই মারা গিয়েছে। পৃথিবীর বুকে তিনি একা বেঁচে আছেন। সুদূর মহাকাশে ভাসমান এক গ্রহাণুর বুকে নির্বাসনের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী জেমস করি তার রোবট-সঙ্গিনীর প্রেমে পড়ে যায়, ভাঙা জিনিসপত্র সারাই করে দিন গুজরান করা ফেরিওয়ালা লোউ বুকম্যান এক বাচ্চা মেয়ের জীবন বাঁচাতে সাক্ষাৎ মৃত্যুর বিরুদ্ধে বুদ্ধির লড়াইয়ে নামে। আর এসবই ঘটে এক আশ্চর্য কল্পলোকে, বাস্তব ও অলৌকিকের মধ্যবর্তী আলো-আঁধারি অঞ্চলে, যার নাম ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’।

১৯৫০-এর দশকে ‘রেকুইম ফর আ হেভিওয়েট’, ‘আ টাউন হ্যাজ টার্নড টু ডাস্ট’ প্রভৃতি সফল টেলিভিশন ড্রামা রচনার সুবাদে আমেরিকার মনোরঞ্জন দুনিয়ার পরিচিত নাম হয়ে উঠলেও, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রায়শই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল রড সার্লিং-কে। প্রযোজকদের গোঁড়ামি এবং দর্শকদের কী দেখানো যাবে আর কী যাবে না, তা নিয়ে বিধিনিষেধের বেড়াজাল তাঁর শিল্পীসত্তাকে খর্ব করছিল বারবার। একসময় বিরক্ত হয়ে ছোটপর্দায় মূলধারার বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা বাতিল করলেন তিনি, মন দিলেন ফ্যান্টাসি ও কল্পবিজ্ঞানধর্মী চিত্রনাট্য রচনায়। সার্লিং বুঝেছিলেন, সমসাময়িক জ্বলন্ত সমস্যাগুলো রূপকের মোড়কে পরিবেশন করতে পারলে ‘সেন্সরশিপ’-এর নির্মম কাঁচি থেকে বাঁচা সম্ভব। সেই উপলব্ধিই ক্রমশ ডালপালা বিস্তার করে ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’ টিভি সিরিজের রূপ নিল।

১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর সিবিএস চ্যানেলে সম্প্রচারিত হল সিরিজের প্রথম পর্ব (টিভির পরিভাষায় যাকে বলে ‘পাইলট এপিসোড’) ‘হোয়্যার ইজ এভরিবডি?’ অচেনা, জনমানবহীন শহরে আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়ানো এক স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যক্তির অস্তিত্বসংকট চমকে দিল দর্শকদের; সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল– দূরদর্শনে এমন রোমাঞ্চকর অথচ অস্বস্তি জাগানো আখ্যান তারা আগে কোনওদিন দেখেনি। শুরুর দিন থেকেই সার্লিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানবকেন্দ্রিক; মানুষের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, দোষ-গুণের খতিয়ানকে কল্পনার আতশকাচে ফেলে, কয়েকগুণ বিবর্ধিত আকারে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’ নির্দেশনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। শো-এর উপস্থাপক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনবদ্য; প্রতিটা এপিসোডের প্রাককথন যেন সম্মোহনী মায়ায় বেঁধে ফেলত দর্শকদের, পৌঁছে দিত সম্ভব ও অসম্ভবের সেই সীমারেখায় যেখানে প্রকৃতির নিয়মগুলো খাটে না।
মানব অন্তঃকরণের বিভিন্ন অনুভূতি, এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন-হওয়া মানুষের আচার-আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঁচ ও ছয়ের দশকের আমেরিকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার নির্মোহ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’, একইসঙ্গে সাহস দেখিয়েছিল মানবতার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সাবধানবাণী শোনানোরও। অতিরিক্ত লোভ, ক্ষমতার দম্ভ এবং সংকীর্ণমনস্কতা মানবসভ্যতাকে পিছিয়ে নিয়ে যাবে প্রস্তর যুগের অন্ধকারে– এমনটাই বিশ্বাস করতেন মুক্তচিন্তার ধারক ও বাহক রড সার্লিং। ‘দ্য মনস্টারস আর ডিউ অন মেপল স্ট্রিট’ পর্বে তাই তিনি দেখিয়েছেন, অপরকে অহেতুক সন্দেহ ও ঘৃণা করার প্রবণতা কীভাবে সমাজের স্থিতিশীলতাকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায়; নিরাপত্তাহীনতা থেকে জন্ম নেওয়া আতঙ্ক কীভাবে মানুষকে স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর বানায়, তার আভাস দিয়েছেন ‘দ্য শেল্টার’ এপিসোডে। অসহিষ্ণুতার উদ্ধত প্রতীক নাৎসি আমলের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো কেন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই প্রশ্নে সোচ্চার হওয়া ‘ডেথস-হেড রিভিজিটেড’ অথবা বর্ণবৈষম্যের অমানবিকতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো ‘আই অ্যাম দ্য নাইট– কালার মি ব্ল্যাক’ সার্লিংয়ের আপসহীন, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকেই প্রতিধ্বনিত করে।

সিরিজের সব পর্বই যে নৈরাশ্যে শেষ হয়, তা কিন্তু নয়, বেশ কিছু কাহিনি ‘ফিল গুড’ সুর বয়ে আনে, অবলীলায় ছুঁয়ে যায় বুকের বাঁদিক। ‘ওয়াকিং ডিসট্যান্স’ এমনই এক অবিস্মরণীয় এপিসোড, যেখানে মধ্যবয়সি মার্টিন স্লোয়ান কয়েক ঘণ্টার জন্য ফিরে যান তাঁর অতীতের জন্মভিটেয়, মুখোমুখি হন নিজের কিশোর সত্তার সঙ্গে। ‘আ স্টপ অ্যাট উইলোবি’-তে অফিসফেরত ট্রেনযাত্রী, ইঁদুরদৌড়ে ক্লান্ত গার্ট উইলিয়ামস নেমে পড়েন এক ছোট্ট জনপদে, যেখানে সময় বয়ে চলে ধীর লয়ে, যেখানে মানুষ চাইলেই প্রকৃতির কোলে দু’-দণ্ড অবসর কাটাতে পারে। ‘দ্য নাইট অফ দ্য মিক’ এপিসোডে মদ্যপ, দায়িত্বজ্ঞানহীন হেনরি করউইন বড়দিনের আগের রাতে সান্তা ক্লজ হয়ে উঠে গরিবদের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ পায়, ‘দ্য সিক্সটিন-মিলিমিটার শ্রাইন’-এ নিজের সেরা দিনগুলো পিছনে ফেলে আসা বৃদ্ধা অভিনেত্রী বারবারা ট্রেনটন অবসাদ থেকে মুক্তি খোঁজেন রুপোলি পর্দার আশ্রয়ে। অপ্রাপ্তি, বিষণ্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে, জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখানো এই পর্বগুলো আজও অনেকেরই মনের মণিকোঠায় অমলিন।

‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’-এর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্যই সার্লিং-সৃষ্ট চরিত্রদের বিশ্বাসযোগ্যতা। তারা অতিমানব নয়, নায়কোচিত নয়, নিতান্তই সাধারণ মানুষ; কেউ ব্যাঙ্কের ক্লার্ক, কেউ বা সেলসম্যান, কর্পোরেট সংস্থার কর্মী, গৃহবধূ। আচমকাই– কোনওরকম ব্যাখ্যার তোয়াক্কা না করে– তাদের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যায় চেনা পৃথিবী, তারা হাজির হয় অদ্ভুত এক সমান্তরাল জগতে। স্বপ্নেও ভাবা যায় না, এমন সব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার ফলে অথবা নিয়তির কৌতুকের শিকার হয়ে তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে, ভয় পায়, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, আবার কখনও দ্বিতীয় সুযোগ পেয়ে উত্তরণের সিঁড়িতে পা রাখে। দর্শকরা সহজেই একাত্মতা অনুভব করতে পারে এমন চরিত্রদের সঙ্গে; ভাঙা থেকে গড়ার পথে এগিয়ে চলা নায়কের জন্য সহানুভূতির ঝাঁপি উজাড় করে দেয়, আর কৃতকর্মের ফল পাওয়া খলনায়কের দুর্গতি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে।

আধ ঘণ্টার স্বল্প পরিসরে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্প বলা কখনওই সহজ নয়, অথচ সেই কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন রড সার্লিং, টানা পাঁচ বছর ধরে– ১৯৬৪ পর্যন্ত। সম্প্রচারিত ১৫৬-টি এপিসোডের মধ্যে ৯২-টির কাহিনিকার ছিলেন তিনি স্বয়ং, বাকিগুলোর জন্য কলম তুলে নিতে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন রিচার্ড ম্যাথেসন ও চার্লস ব্যোমোঁ-র মতো স্পেকুলেটিভ ফিকশন কিংবদন্তিদের। ১৯৭৫ সালে সার্লিং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পরেও একাধিকবার নবকলেবরে ফিরেছে ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’, শুধুমাত্র অনুরাগীদের চাহিদা পূরণ করতে। ‘দ্য আউটার লিমিটস’, ‘টেলস ফ্রম দ্য ডার্কসাইড’, ‘দ্য এক্স-ফাইলস’, ‘ব্ল্যাক মিরর’ জাতীয় কত বিখ্যাত টিভি শো যে অনুপ্রেরণা নিয়েছে সার্লিংয়ের ‘ম্যাগনাম ওপাস’ থেকে, তার ইয়ত্তা নেই।

গত ১৩ অক্টোবর, ২০২৬-এ প্রকাশ পেয়েছে অ্যালান সেপিনওয়াল রচিত রড সার্লিংয়ের পূর্ণাঙ্গ জীবনী ‘‘সার্লিং: আ জার্নি ইনটু দ্য টোয়াইলাইট জোন উইথ টিভি’স ফার্স্ট ভিশনারি’’। ফলে আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন সার্লিং, আধুনিকতার নিক্তিতে পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে তাঁর দর্শন, বিবিধ কর্মকাণ্ড। তবে ভক্তদের এতে কিছু আসে যায় না; তারা হয়তো ডিভিডি প্লেয়ারে চালিয়ে নিয়েছে তাদের প্রিয় ‘দ্য টোয়াইলাইট জোন’ এপিসোড, সাদা-কালো আমলের ম্যাজিক অনুভব করতে করতে ভেসে যাচ্ছে নস্টালজিয়ার স্রোতে। অনৈসর্গিক কোনও গোধূলির ওপার থেকে রড সার্লিং তাদের দেখছেন কি? কে জানে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved