

ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন রাজনৈতিক স্বমত সোচ্চারে প্রকাশ করার একটা ট্রেন্ড সেট করার দিকে যাচ্ছিলেন, দর্শক যখন ক্রমশ তাঁদের কথায়, মত প্রচারে প্রভাবিত হতে শুরু করেছিল, প্রায় বিনা যাচাইয়ে কঠিন সত্য গিলে ফেলার মতো গ্রহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল তাদের মন, ঠিক সেই সময়ে বাংলার ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে এই প্রবণতা ধরা পড়ার অভিযোগ একযোগে না সবাইকেই ঝাঁকের কই হিসেবে দাখিল করে বসে!
২০২৬-এর শুরুর মাস। তখনও এ বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নামের আগে ‘মাননীয়া’ বসত, রাস্তাঘাটে ছিল নীলসাদার পঞ্চদশবার্ষিকী পরিকল্পনা। ঠিক সেই সময় ফোনে ফোনে ছড়িয়ে পড়ছিল দুই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের দু’টি ভাইরাল ভিডিও। প্রথম জনের নাম সায়ক চক্রবর্তী, ‘অলি পাব’-এর বিফ কাণ্ড নিয়ে ভিডিও বানিয়ে এমন নাম কুড়িয়েছেন, যাকে মগনলাল মেঘরাজের ভাষায় বলতে হয় ‘নাম বোলছেন কেনো বদনাম বোলুন’! আর দ্বিতীয় জনকে লোকে চেনেন ‘ননসেন’ বলে, আসল নাম যার শমীক অধিকারী। তাঁর তৈরি সরকারবিরোধী শর্ট ভিডিও ‘বাটন’ শুধু ইন্সটাগ্রামেই ২০ লক্ষের বেশি ভিউ কুড়িয়েছিল কয়েক দিনেই, আর ফেসবুকে ছিল ছয় লক্ষাধিক রিয়্যাকশন! এমনকী, তখনও পর্যন্ত বিরোধী দল বিজেপি-র অফিশিয়াল ইন্সটাগ্রাম থেকেও এই ‘বাটন’ ভিডিও শেয়ার করে নির্বাচনী প্রচার চালানো হয়েছিল! সেই সময় এই দু’জন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিরুদ্ধেই প্রচুর মানুষ সরব হয়েছিলেন, বিশেষত সায়কের ভিডিওয় এক অলি পাবের মুসলিম ওয়েটারকে যেভাবে কোণঠাসা করা হয়েছিল মাটন স্টেকের পরিবর্তে বিফ স্টেক পরিবেশন করার অভিযোগে; তাতে সেই অভিযোগের সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন যেমন উঠছিল, তেমনই পরিকল্পিত জাতিবিভেদের ছক হিসেবে বিদ্বেষ ছড়ানোর পোড়া গন্ধও পাচ্ছিলেন অনেকেই।

কিন্তু আগাম নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তখনও ছিল চাপান-উতোর, গুজব, ফিসফাস। পাশা কি সত্যিই ওলটাবে, নাকি বটগাছের ঝুরিবাওয়া আলগোছ দোলনার মতো শুধু দোলনমায়াটুকুর রেশ রেখে দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যাবে স্থির স্থবির? এই প্রশ্ন, সন্দেহ আর গুজবের সংস্কৃতিকেই যে কীভাবে নির্বাচনী প্রচারের কাজে লাগানো যায়, তার নজির অবশ্য ক্রমশ পরে স্পষ্ট হল। এই দোলাচলে থাকা, গুজবে চট করে বিশ্বাস করে ফেলা, মুঠোফোনে একটা ভিডিও দেখে তার সত্যাসত্য যাচাই না করেই অন্ধ বিশ্বাসে তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার এই যে একটা সাধারণ প্রবণতা– এটাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারের একটা অন্যতম স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াল আমাদের চোখের সামনে।
…………………………………………………………..

…………………………………………………………..
পর্দা সরল সদ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর। সেখানে সামনে এসেছে দেশের শীর্ষ নির্বাচনী সংস্থার অভ্যন্তরে বহুদিন যাবৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এক তীব্র বিভেদের খবর, যার জেরে ভারতীয় গণমাধ্যম জুড়ে এক সর্বাত্মক রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। বলা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনারদের তিনজনের মধ্যে দু’জন, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী, তাঁদেরকে অন্ধকারে রেখে নির্বাচন সংক্রান্ত বিবিধ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রধান কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দশ মাসে মোট ১৪টি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন! এ খবর জানাজানি হওয়ার পরপরই বর্তমান সরকারের বিরোধী শিবির থেকে দাবি উঠেছে, শুধু এই অভিযোগই যে ধামাচাপা পড়েছে তা নয়; চোখের আড়ালে রয়ে গিয়েছে বিপুল টাকা ভাসানোর খেলা। প্রচুর ইউটিউবার এবং সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যাঁরা ভোটের বাজারে সরাসরি বিজেপি-র হয়ে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ বিকিয়ে গিয়েছেন টাকার জোরে। বিজেপির তরফে এবং নির্বাচন কমিশনের তরফেও প্রকাশিত বিজেপির একটি নির্বাচনী ব্যয়ের তালিকা সেই সঙ্গে প্রকাশ হয়ে পড়েছে বলে কিছু সূত্রের তরফে দাবি করা হচ্ছে এবং সেই দাবি বা তালিকা যদি সত্যি হয়, তাহলে সেখানে সায়ক চক্রবর্তীর নামের পাশে টাকার অঙ্কটা আড়াই লাখ, আর শমীক অধিকারী বিজেপির কাছ থেকে এই বাবদ পেয়েছেন ১৩ লক্ষ টাকা!

নির্বাচনী খরচের যে হিসেব এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-র বিনিয়োগ অনেক বেশি হয়েছে ‘গুগল’ আর ‘মেটা’-কে ঘিরে। তৃণমূল সেখানে বেশি ভরসা করেছে নিজেদের অফিশিয়াল পেজ বা সমর্থকদের দ্বারা চালিত পেজগুলোকে। গুগল অ্যাডভার্টাইজিংয়ে বিজেপি ১০,৬৯০টি বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় করেছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা, ২৯০টি বিজ্ঞাপনে কংগ্রেসের খরচ এক লক্ষ, ‘মেটা’-র ২৭৩৫টি বিজ্ঞাপনে বিজেপি দিয়েছে সাড়ে ছয় কোটি অর্থমূল্য আর ১০৯০টি ‘মেটা’ বিজ্ঞাপনে তৃণমূল খরচা করেছে ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা! ডিজিটাল ক্যাম্পেইন বাবদ এই খরচের ওপরে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জারি রাখার কথা যে নির্বাচন কমিশনের, তাদের পক্ষেও কিন্তু চাইলেও এই ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যয়ের স্পষ্ট, স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণ হিসেব আদায় করা অসম্ভব, কারণ এই ডিজিটাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনিং বহু ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ নয়।
…………………………………………………………..

…………………………………………………………..
আসলে সময়টাই এখন রিল আর শর্ট ভিডিওর। কনটেন্ট ক্রিয়েটররাই আজকাল এক-একজন চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল সেলেব। জনমানসে এঁদের অনেকেরই প্রভাব সাংঘাতিক। তার মূলত দুটো কারণ। এক, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় যে অধিকার, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অধিকার, প্রাইভেসির অধিকার– তা এঁরা হেলায় তুচ্ছ করেছেন ভিউয়ারসদের জন্য। আর এই যে, আমি দেখলে তবে তুমি টাকা পাবে, আমি ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’ করলে তবে তোমার রোজগার হবে– এই তুচ্ছ ক্ষমতার বোধই কিন্তু রোজের জীবনে হেরে-যাওয়া সাধারণ জনগণকে মনে মনে তুমুল ‘এমপাওয়ার’ করে। ফলে, যার জীবনে কোথাও কোনও স্বীকৃতি নেই, দাপট নেই, এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিওজোড়া দর্শক-অভ্যর্থনার মধ্যে প্রতিনিয়ত তারাও যে ‘ভ্যালিডেশন’ খুঁজে পায়, তার দাম আদতে অনেকখানি। আর দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই, সমান্তরাল মিডিয়া হিসেবে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের উত্থান। নিজের কথা, নিজের জোরে, নিজের সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে বলার এবং প্রচার করার মধ্যে এতদিনের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোর প্রতাপকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার এই যে আস্ফালন, তা তো আসলে প্রায় ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোমোশন’-এর কথাই বলে! কোনও মিডিয়ার মালিকপক্ষের দালালি ছাড়াই যে নিজের মত নিজের মতো করে বিপুল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, চারপাশের মিডিয়ানির্মিত মেকি ভাষ্যের বিরুদ্ধে গিয়েও যে নিজস্ব কণ্ঠস্বরের একটা জোরালো প্রতিষ্ঠা দেওয়া যায়– এই ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকেই তার এক-একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। স্বাভাবিকভাবেই, ‘জনগণপথপরিচায়ক’ হয়ে উঠতে এই একুশ শতকে তাঁদের যে খুব বেশি সময় লাগে না, তা বলাই বাহুল্য!

নিজের গলার জোরে আর বলার জোরে শুধু ইউটিউবের রাজনৈতিক বিশ্লেষণকেও যে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে আছেন ধ্রুব রাঠি। কুণাল কামরার মতো স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কিংবা আকাশ ব্যানার্জির মতো কমেন্টারি চ্যানেল চালানো ব্যক্তিত্বরাও একইভাবে সাধারণের ওপরে সাংঘাতিক প্রভাব ফেলেছেন। এমনকী, রীতিমতো সিরিয়াস রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিকরাও যে ক্রমশ এই বিকল্প ধারার জনসংযোগে ঝুঁকেছেন, তার নজির মেলে রবিশ কুমার, অজিত অঞ্জুম বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর ইউটিউব চ্যানেলে। কিন্তু ক্রমশ এই ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন রাজনৈতিক স্বমত সোচ্চারে প্রকাশ করার একটা ট্রেন্ড সেট করার দিকে যাচ্ছিলেন, দর্শক যখন ক্রমশ তাঁদের কথায়, মত প্রচারে প্রভাবিত হতে শুরু করেছিল, প্রায় বিনা যাচাইয়ে কঠিন সত্য গিলে ফেলার মতো গ্রহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল তাদের মন, ঠিক সেই সময়ে বাংলার ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে এই প্রবণতা ধরা পড়ার অভিযোগ একযোগে না সবাইকেই ঝাঁকের কই হিসেবে দাখিল করে বসে!
অভিযোগের পালটা প্রত্যুত্তরে অবশ্য বলা হয়েছে, ‘অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি’ বাবদ টাকা খরচ করাটা নির্বাচনী প্রচারের স্ট্র্যাটেজির মধ্যেই পড়ে। তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর। কিন্তু যাদের ভিডিও দেখে মানুষ হেসেছে কেঁদেছে ভেবেছে তর্ক করেছে, আজ তাদের নামের পাশে বিকিয়ে যাওয়া এই টাকার অঙ্ক কি আদতে যাবতীয় ইনফ্লুয়েন্সারদের গ্রহণযোগ্যতাকেই এক লহমায় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল না? আজ যে-কোনও পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের মুহূর্তে বা রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যে-কোনও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পক্ষে বা বিরোধিতার মুখের ওপরে কোনও ইনফ্লুয়েন্সার যদি একটি কথাও বলেন, একটি ভিডিও-ও প্রচার করতে চান নিজের মত হিসেবে, আর কি বিশ্বাসের পাথর অটল থাকবে? তাঁদের মত নিয়ে এই যে কেনাবেচার নথি আজ দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে শুধু বাংলাতেই বিজেপি কিংবা তৃণমূল নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল মিডিয়ার পিছনে খরচ করেছে কোটি কোটি টাকা, তাতে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ভাবমূর্তি আর স্বচ্ছ থাকছে কই?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved