united states india at wto mc14 export politics| Robbar
Robbar
  • ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে কি ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা হবে?

​ভারত আজ খাদ্যে স্বনির্ভর, বিশেষ করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে। এটিই উন্নত দেশগুলোর প্রধান মাথাব্যথার কারণ। যদি ভারত সরকার তার চাষিদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেয়, তবে ভারতের কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়বে। তখন বাধ্য হয়ে ভারতকে ১৪০ কোটি মানুষের পেট ভরানোর জন্য বিদেশ থেকে চাল, গম, ভুট্টা বা ডাল আমদানি করতে হবে। যখন কোনো দেশ খাদ্যের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও রপ্তানিকারক দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একেই বলা হয় ‘ফুড ডমিনেন্স’ বা খাদ্যের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার।

Published by: Robbar Digital

Posted:March 19, 2026 8:09 pm | Updated:March 19, 2026 8:25 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষে ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডেতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ১৪-তম মন্ত্রী-পর্যায়ের সম্মেলন (MC14)। এক চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুরু হতে চলেছে এই সম্মেলন। একদিকে আমেরিকার অস্থির বাণিজ্যনীতি ও ট্রাম্পের ট্যারিফ-চুক্তি, সঙ্গে ডব্লিউটিও-র প্রতি উন্নত দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অনীহা। মূলত এই উন্নত দেশগুলো নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। অন্যদিকে, গ্লোবাল সাউথের কোটি কোটি কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই বৈঠকটি এক অদৃশ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে।

আমেরিকা ও অন্যান্য ধনী দেশগুলো এখন দোহা বা বালি রাউন্ডের পুরনো প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নমূলক ম্যান্ডেট ভুলে গিয়ে বাজার দখলের জন্য ‘নতুন পদ্ধতি’-র ওপর জোর দিচ্ছে। এমতাবস্থায় ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল– উন্নত দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া নীতি রুখে দিয়ে নিজেদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও প্রান্তিক মানুষের অন্নসংস্থানের অধিকার রক্ষা করা। পাশাপাশি দেশের ক্ষুদ্র কৃষকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।

zoom
ডাব্লিউটিও-র অধিবেশনের পোস্টার

​ভারত আজও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাজে দু’টি পুরনো অঙ্গীকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। কী সেই পুরোনো অঙ্গীকার?

প্রথমত, ​২০০১ সালের দোহা রাউন্ডের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাণিজ্যের নিয়মগুলোকে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশের অনুকূল করা। এখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, উন্নত দেশগুলো (যেমন আমেরিকা) তাদের কৃষকদের দেওয়া আকাশছোঁয়া ভরতুকি কমাবে, যাতে ভারতের মতো দেশের কৃষকরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। আরও বলা হয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজার উন্নত দেশগুলোর মতো একই গতিতে খুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তারা নিজেদের কৃষি ও শিল্পকে বাঁচাতে বাড়তি সময় ও সুরক্ষা পাবে। ভারত আজও সেই ‘দোহা ম্যান্ডেট’ আঁকড়ে আছে৷

দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের বালি চুক্তি ভারতের রেশন ব্যবস্থা এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (এমএসপি) চালু রাখার রক্ষাকবচ। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, ভারত তার কৃষিপণ্যের মোট উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের বেশি ভরতুকি বা সরকারি সাহায্য দিতে পারে না। ভারত যখন ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন’ চালু করে, তখন একটা আশঙ্কা ছিল যে গরিব মানুষকে সস্তায় খাবার দিতে গিয়ে ভারতের এই ভরতুকির পরিমাণ নির্ধারিত ওই ১০ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই সংকট কাটাতে বালি চুক্তিতে ভারত একটি ঐতিহাসিক ‘পিস ক্লজ’ বা শান্তি রক্ষাকবচ আদায় করে নেয়। এর ফলে, ভরতুকির সীমা পার হয়ে গেলেও কোনও দেশ ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি, উন্নত দেশগুলো কথা দিয়েছিল যে তারা ২০১৭ সালের মধ্যেই ‘খাদ্য মজুত’ নিয়ে একটি স্থায়ী ও আইনসম্মত সমাধান খুঁজে বের করবে।

zoom
জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন

কিন্তু আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নত দেশগুলো এখন বলছে, পৃথিবী বদলে গেছে ‘দোহা বা বালির পুরনো নিয়ম বাদ দাও’। তারা এখন পরিবেশের স্থায়িত্ব এবং ই-কমার্সের মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনে ‘New Approaches’ বা নতুন আলোচনার দাবি তুলছে। তবে এই দাবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বাণিজ্যিক চাল। নতুন আলোচনা শুরু হলে ভারত আর দোহা রাউন্ডের সেই ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ‘পিস ক্লজ’-এর রক্ষাকবচ দাবি করতে পারবে না। উন্নত দেশগুলোর মূল লক্ষ্য হল ভারতের এমএসপি-র মতো জনমুখী কর্মসূচিগুলোকে পুরোপুরি বন্ধ করা অথবা এমন কঠিন নিয়মের বেড়াজালে আটকানো যাতে ভারতের কৃষি ও ডেয়ারির বাজারে তারা অনায়াসে নিজেদের পণ্য ঢুকিয়ে দিতে পারে। এটি সফল হলে ভারতের কোটি কোটি প্রান্তিক চাষির জীবিকা চূড়ান্ত সংকটের মুখে পড়বে।

এই দোহা ম্যান্ডেট এবং বালি চুক্তির রক্ষাকবচ থাকা সত্ত্বেও ভারতের লড়াইটা সহজ হয়নি। উন্নত দেশগুলো প্রতি পদক্ষেপে এই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন নতুন বাণিজ্যিক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে বিশ্ববাণিজ্যের এই জটিল দাবার বোর্ডে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিরোধের ক্ষেত্রগুলো আরও গভীর হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের জীবন রক্ষা করার লড়াইয়ে ‘বিরোধের মূল কারণ’গুলো হল–

পাবলিক স্টকহোল্ডিং ও এমএসপি সংকট: ​ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি নির্ধারণ নিয়ে নিজের দেশের মধ্যে বিতর্ক যাই থাক, ভারত সরকার দেশের রেশন ব্যবস্থা চালু রাখতে এমএসপিতে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও গম কিনে তা মজুত করে । কিন্তু WTO-র চোখে এটি একটি ‘বাণিজ্য নষ্টকারী ভরতুকি’ (Trade-Distorting Subsidy)। উন্নত দেশগুলোর দাবি, এই মজুত বিশ্ববাজারে ফসলের দাম কমিয়ে দেয়, যা তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি করে। ভারত এখানে একটি স্থায়ী আইনি সমাধান চায়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই রেশন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।

স্পেশাল সেফগার্ড মেকানিজম: ​উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষকরা প্রায়ই উন্নত দেশ থেকে আসা সস্তা আমদানির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত এমন একটি অধিকার চায় যাতে বিদেশ থেকে হঠাৎ সস্তায় প্রচুর ফসল ঢুকে পড়লে দেশি চাষিদের বাঁচাতে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়া যায়। উন্নত দেশগুলো এই সুরক্ষাকবচ দিতে নারাজ।

তুলোর রাজনীতি: ​আমেরিকা তাদের তুলো চাষিদের বিপুল ভরতুকি দেয়, এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলোর দাম কৃত্রিমভাবে কমে যায়, যা ভারতের মতো রপ্তানিকারক দেশকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে ভারতীয় তুলো ন্যায্য মূল্য পায় না এবং দেশের রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় ভারতের অভ্যন্তরীণ টেক্সটাইল মিলগুলো সস্তা বিদেশি তুলো আমদানিতে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে দেশি তুলোর চাহিদা কমে যায় এবং ভারতের প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদন খরচ না ওঠায় তাঁরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত চাষিদের বাঁচাতে ভারত সরকারকে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে তুলো কিনতে বাধ্য হয়। নয় চাষিদের বাঁচাতে ভরতুকি দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় আমেরিকা তখন এই ভরতুকির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। অথচ তারা নিজেরা বিশাল ভরতুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। একেই বলা হয় ‘ভরতুকির রাজনীতি’। ২০ বছর ধরে এই সমস্যার কোনও সুরাহা হয়নি।

zoom
ডাব্লিউটিও-র দোহা রাউন্ড (২০০১)

​আমেরিকা বা ইইউ এর মতো উন্নত দেশগুলো, ভারতের এমএসপি এবং রেশন ব্যবস্থাকে ‘বাণিজ্য নষ্টকারী’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছে। ​তাদের প্রধান অভিযোগ হল: ভারত সরকারের এমএসপি ব্যবস্থা বিশ্ববাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। WTO-র মতে, কৃষিকাজ হওয়া উচিত বাজারের চাহিদা অনুযায়ী। তাদের বক্তব্য, ভারত সরকার যখন ধান বা গমের জন্য এমএসপি ঘোষণা করে এবং সেই এমএসপিতে সরকার যখন চাষিদের কাছ থেকে তা কেনে, তখন কৃষকরা বাজারের চাহিদার তোয়াক্কা না করে শুধু ধান ও গমই ফলায়। একে তারা ক্ষতিকর বলছে? তাদের যুক্তি, এর ফলে ভারত প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধান ও গম উৎপাদন করছে। এই বাড়তি উৎপাদন বিশ্ববাজারে ফসলের জোগান বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যায়। এতে উন্নত দেশগুলোর বড় বড় কৃষি-কর্পোরেট সংস্থাগুলো লোকসানের মুখে পড়ে। তবে ​ভারতের পাল্টা যুক্তি হল দেশের প্রান্তিক চাষিদের জন্য এমএসপি কোনো ‘বিলাসিতা’ নয়, বরং এটি তাদের ফসলের ন্যূনতম খরচের গ্যারান্টি। ভারতের কৃষকরা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তাই সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের বাঁচানো সম্ভব নয়।

উন্নত দেশগুলো ​’ডাম্পিং’-এর আশঙ্কাও করছে ৷ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘ডাম্পিং’ একটি নেতিবাচক শব্দ, যেখানে কোনও দেশ নিজের উদ্বৃত্ত পণ্য অন্য দেশের বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে ছেড়ে দেয়। ​ভারত সরকার প্রতি বছর প্রায় ৬০০-৮০০ লক্ষ টন ধান ও গম মজুত করে, উন্নত দেশগুলোর ভয়, ভারত যদি তার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মিটিয়ে বাড়তি মজুত হঠাৎ করে বিশ্ববাজারে খুব কম দামে বিক্রি করে দেয়। ​সেক্ষেত্রে আমেরিকা বা ভিয়েতনামের মতো রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের বাজার হারাবে। তাই তারা চায় ভারতের এই মজুত বা Public Stockholding ব্যবস্থাকে শুরুতেই আইনি জালে আটকে দিতে। ​বাস্তবতা হল, ভারত এই মজুত মূলত তার ৮০ কোটি গরিব মানুষকে রেশন দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে, ব্যবসার জন্য নয়। কিন্তু WTO-তে ‘মানবিকতা’র চেয়ে ‘বাণিজ্যিক লাভ’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ৷

zoom
গত ৪০ বছরে কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ

ভরতুকি নিয়ে WTO-তে এক হাস্যকর নিয়ম চালু আছে। নিয়ম অনুযায়ী, ভারত তার মোট কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের ১০%-এর বেশি ভরতুকি দিতে পারবে না। কিন্তু এই ভরতুকি গণনার ক্ষেত্রে যে ‘এক্সটার্নাল রেফারেন্স প্রাইস’ ব্যবহার করা হয়, তা চরম অবাস্তব। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভারতের দেওয়া বর্তমান ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে তুলনা করা হচ্ছে ১৯৮৬-৮৮ সালের উৎপাদন ব্যয় কী ছিল তার সাপেক্ষে। অথচ গত ৪০ বছরে কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি এবং যন্ত্রপাতির খরচ আকাশছোঁয়া হওয়ার কারণে বর্তমানে ১ কুইন্টাল ধান উৎপাদনে কৃষকের যে প্রকৃত ব্যয় হয়, ১৯৮৬ সালের বিশ্ববাজারের দাম তার চেয়ে অনেক কম ছিল। ভারত আজ কৃষকের থেকে যে দামে ফসল কেনে, তা আসলে কৃষকের এই বর্ধিত উৎপাদন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার একটি ন্যূনতম চেষ্টা মাত্র। মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের এই আকাশপাতাল ফারাককে হিসেবে না ধরে, পুরনো দামকে মাপকাঠি ধরায় ভারত নামমাত্র সাহায্য দিলেও কাগজে কলমে মনে হয় ভারত ১০% ভরতুকির সীমালঙ্ঘন করে ফেলেছে। উন্নত দেশগুলো জেনেশুনেই এই গাণিতিক জালিয়াতি বা ‘Accounting Trap’ জিইয়ে রেখেছে, যাতে ভারতীয় কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের নিরাপত্তা দেওয়ার এই প্রচেষ্টাকে ‘আইনভঙ্গ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায়।

ভরতুকি নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কড়াকড়ি থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কৃষকদের সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ দিয়ে থাকে (Direct Income Support)। তাদের যুক্তি হল, এই অর্থ কোনও নির্দিষ্ট ফসলের দাম বাড়াচ্ছে না বা উৎপাদনের পরিমাণ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে না; তাই এটি ‘বাণিজ্য নষ্টকারী’ (Trade Distorting) নয়। ফলে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভরতুকি দিয়েও কোনও জবাবদিহির মুখে পড়ে না। WTO-ও এই ধরনের সাহায্যকে ‘সবুজ বাক্স’ নামে নির্দোষ ভরতুকি হিসেবে ছাড় দিয়ে রেখেছে। ​অন্যদিকে, ভারত যখন ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (Price Support) নির্ধারণ করে কৃষকদের সুরক্ষা দেয়, তখন WTO-এর নিয়মে সেটি সরাসরি বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব ফেলে বলে গণ্য হয়। এই ভরতুকিকে ‘হলুদ বাক্স’ নাম দিয়ে ‘বাণিজ্য নষ্টকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উন্নত দেশগুলোর এই দ্বিচারিতাই বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

zoom
​উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত ভুট্টা উৎপাদিত হয়

​আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মঞ্চে উন্নত দেশগুলো (আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া) যে নীতি চালু করতে চাইছে, তার উদ্দেশ্য হল ভারতের মতো কৃষিপ্রধান দেশকে ‘খাদ্য আমদানিকারক’ রাষ্ট্রে পরিণত করা৷ ​এদের প্রথম লক্ষ্য, ভারতের এমএসপি এবং সার-বিদ্যুৎ-বীজ ভরতুকি বন্ধ করা। তারা দাবি করে ভারত সরকার চাষিদের সাহায্য দিয়ে বিশ্ববাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ভারত যদি এমএসপি দেওয়া বন্ধ করে, তবে চাষিরা ফসলের ন্যায্য দাম পাবে না। ফলে চাষবাস হবে অলাভজনক এবং কোটি কোটি প্রান্তিক চাষি কৃষি ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

​ভারত আজ খাদ্যে স্বনির্ভর, বিশেষ করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে। এটিই উন্নত দেশগুলোর প্রধান মাথাব্যথার কারণ। যদি ভারত সরকার তার চাষিদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেয়, তবে ভারতের কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়বে। তখন বাধ্য হয়ে ভারতকে ১৪০ কোটি মানুষের পেট ভরানোর জন্য বিদেশ থেকে চাল, গম, ভুট্টা বা ডাল আমদানি করতে হবে। যখন কোনও দেশ খাদ্যের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও রপ্তানিকারক দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একেই বলা হয় ‘ফুড ডমিনেন্স’ বা খাদ্যের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার।

​উন্নত দেশগুলোতে শিল্পভিত্তিক বৃহৎ কৃষি খামারে প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত ভুট্টা, সয়াবিন, গম এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। তাদের নিজেদের বাজারে এই বিপুল পণ্যের চাহিদা নেই। তাই তারা এমন একটি বড় বাজার খোঁজে যেখানে এই সস্তা পণ্যগুলো ‘ডাম্প’ বা ফেলে দেওয়া যায়। ভারত যদি নিজের কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়, তবে সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে আমেরিকার সস্তা ভুট্টা বা নিউজিল্যান্ডের গুঁড়ো দুধ। ভারতের বাজার তখন হয়ে উঠবে তাদের উদ্বৃত্ত ফেলার এক বিশাল ডাম্পিং গ্রাউন্ড। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ডেয়ারি শিল্প এবং পোল্ট্রি শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।

zoom
​ভারত আজ খাদ্যে স্বনির্ভর, বিশেষ করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে

​চাষিদের সাহায্য বন্ধ করার পরের ধাপ হল কৃষি ব্যবস্থাকে গুটিকয়েক বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া। উন্নত দেশগুলো চায় ভারতের চাষিরা যেন নিজেদের বীজ ব্যবহার না করে প্রতি বছর তাদের কাছ থেকে দামি ‘পেটেন্ট করা’ বীজ এবং কীটনাশক কিনতে বাধ্য হয়। এতে ভারতীয় কৃষকের ‘ইনপুট কস্ট’ বা চাষের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে এবং লাভের গুড় খাবে বিদেশি কোম্পানিগুলো।

​এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ক্যামেরুনের এই সম্মেলন থেকে বড় কোনও সুরাহা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। এর পেছনে কাজ করছে কয়েকটি গভীর সংকট।

zoom
তথ্যসূত্র: ইউএসডিএ

​প্রথমত, আমেরিকার একগুঁয়েমি মনোভাব আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কোনও গঠনমূলক কৃষিচুক্তিতে সই করতে নারাজ। তারা চাইছে দোহা বা বালির মতো পুরনো ম্যান্ডেটগুলো পুরোপুরি বাতিল করে একদম নতুনভাবে আলোচনা শুরু করতে, যেখানে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংরক্ষিত অধিকারগুলোর কোনও স্থান থাকবে না। আমেরিকার এই অনমনীয় মনোভাব আলোচনার টেবিলকে শুরুতেই উত্তপ্ত করে তুলেছে।

​দ্বিতীয়ত, বিশ্ব বাণিজ্যের মঞ্চে স্বার্থের এক কঠিন সংঘাত তৈরি হয়েছে। ভারত তার অবস্থানে অনড় থেকে দাবি করছে যে, আগে খাদ্য মজুতের স্থায়ী আইনি সমাধান দিতে হবে, তবেই অন্য কোনও বিষয়ে কথা হবে। অন্যদিকে, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মতো লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ভারতের সঙ্গে G20-ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও পাল্টা চাপ দিচ্ছে যাতে ভারত তার কৃষিবাজার আমদানির জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের মাঝে সমঝোতা করানোর মতো কোনও শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে নেই।

​সর্বোপরি, বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো খুব কঠিন। ২০২৫ সালে আমেরিকার অস্থির বাণিজ্য নীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতগুলোর কারণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের চরম সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশগুলো কোনও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে চাইছে না, বরং আলোচনার এই অমীমাংসিত বোঝা পরবর্তী সম্মেলন অর্থাৎ MC15-এর দিকে ঠেলে দেওয়াকেই নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে। ফলে ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডে সম্মেলন সম্ভবত কোনও সুনির্দিষ্ট দিশা দেখানোর বদলে স্রেফ অমীমাংসিত দাবিগুলোর এক দীর্ঘ তালিকা তৈরি করতে চলেছে– যা ভারতীয় কৃষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই ঠেলে দেওয়ার ইঙ্গিত ।

Agriculture Doha Round Geopolitics Global Trade Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar United States WTO

Share this article on