
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে চলার সুযোগ নিয়ে ইরান স্নায়ুযুদ্ধের খেলায় নেমে ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। বিশ্বের বৃহত্তম সব তেল ভান্ডারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের একমাত্র যোগসূত্র এই হরমুজ প্রণালী। চলতি যুদ্ধের জেরে ইরান তো হরমুজ প্রণালী দিয়ে শত্রু দেশগুলির সমস্ত জাহাজ চলাচল রুখে দিয়েছে। সেই পন্থাই বা কতটুকু সফল হবে তা সময় বলবে।
ইরান যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার গাল-গল্প শুনিয়ে তলে তলে আরও সর্বনাশা স্থলযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ইজরায়েল ঘোষণা করেছে, হরমুজ অবরোধের মূল কান্ডারি ইরানের নৌ-সেনা প্রধান আলিরেজা টাংসিরিকে খতম করা হয়েছে। আর তারপরেই ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সরকারিভাবেই জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ ‘বন্ধ’ করা হল। মার্কিন-ইজরায়েল কোনও জাহাজ হরমুজের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে একেবারে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। বেশ কিছু দেশের জাহাজও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের হিসেব অনুযায়ী যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে রোজ দু’ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হত, সেখানে এখন শুধু কয়েকটি বন্ধু দেশের হাতে গোনা জাহাজ পেরোতে দেওয়া হচ্ছে– কখনও কূটনৈতিক দৌত্যের মাধ্যমে, কখনও জাহাজ পিছু ২৮ লাখ ডলারের সমমূল্যের চিনা মুদ্রা ইউয়ান ‘টোল’ হিসেবে আদায়ের মাধ্যমে। আমেরিকার পেট্রোডলারের আধিপত্য ধ্বংস করাও ইরানের লক্ষ্য।

ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে দুনিয়া জুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালী। দক্ষিণে গালফ অফ ওমানের সঙ্গে পারস্য উপসাগর এবং আরব সাগরের সংযোগ ঘটিয়ে ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ। হরমুজ প্রণালী দৈর্ঘে ১০৪ মাইল বা ১৬৭ কিমি। আর প্রস্থে প্রায় ৬০ মাইল থেকে কোথাও আবার আরও সংকীর্ণ হয়ে মাত্র ২৪ মাইল। জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষ এড়াতে সেখান দিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জাহাজ চালাতে হয়। ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম (টিএসএস) অনুযায়ী, একটি লেন দিয়ে আসার জাহাজ, আর একটি লেন দিয়ে বেরনোর জাহাজ চলে। প্রতিটি জাহাজ চলাচলের পরিসর মাত্র দুই মাইল বা তিন কিমি প্রশস্ত। দু’টি লেনের মাঝে আবার একটি দুই মাইলের বিভাজন রেখা। ভৌগোলিক অবস্থান ও এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ইরানকে অভিনব ক্ষমতা জুগিয়েছে। কাজেই এই সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে। হরমুজের দখলদারি ঘুচিয়ে নিজস্ব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে আমেরিকা লড়ছে ইরানের সঙ্গে। আর তার জেরে বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ও সংকট হু হু করে বেড়ে চলেছে। তবে তীব্র সংকটের মাঝেও বিরাট স্বস্তির খবর, ভারতকে ‘বন্ধু’ স্বীকার করে ইরান ভারতীয় জাহাজগুলিকে বিনা বাধায় হরমুজ পেরনোর ছাড়পত্র দিয়েছে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই সংঘর্ষ আজকের তো নয়ই, বরং শত শত বছর ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের মধ্যে চলেছে এই সাংঘাতিক লড়াই।

হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রাচীন পারস্যের ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস। ‘হরমুজ’ শব্দটির মূলে রয়েছে পারসিদের আরাধ্য জোরস্ট্রিয়ান দেবতা আহুরা মাজদা। আবার পারসি শব্দ ‘হুর-মোঘ’ বা খেজুরের দেশ থেকেও হরমুজ শব্দের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। একেবারে খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে রচিত নাবিকদের নির্দেশিকা ‘পেরিপ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি’-তেও নির্দিষ্টভাবে হরমুজ প্রণালীর নামোল্লেখ না করেও তার চমৎকার বিবরণ রয়েছে। তখন সাগরের জলতল থেকে মুক্তোরাশি তুলে আনার জন্যে ডুব দিত নাবিকেরা। দশম থেকে সপ্তদশ শতকে এটি ছিল সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। ‘অরমাস’ বা হরমুজ দেশের রাজধানী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কল্পনাই করতে পারেননি, ইরানের মোল্লাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ বাঘা বাঘা সরকারি পদাধিকারী ও সেনা কমান্ডারদের খতম করার পরেও সেই দেশটা যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহ পার করেও, পারস্য মহাসাগরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখবে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ থামাতে শান্তি আলোচনা কি আদৌ হতে পারে চলতি পরিস্থিতিতে? ১৫ দফার মার্কিন প্রস্তাব ইতিমধ্যেই নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইজরায়েল ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী আরব দেশগুলির ওপর আঘাত হেনে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নই ওঠে না। ইরানও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মারফত নিজস্ব দাবিদাওয়া প্রকাশ করেছে। সব মিলিয়ে একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার– আমেরিকা চায় হরমুজ প্রণালী খুলতে আর ইরান চায় হরমুজের ওপর সার্বভৌমত্ব। লড়াই যে আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা বোঝা যাচ্ছে কারণ পেন্টাগন নতুন করে হাজার দুয়েক প্যারাট্রুপার সেনা পাঠাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। সুতরাং উপসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা।

ট্রাম্পের আগেও কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রনেতারা হরমুজের সঙ্গে ইরানের অবস্থানগত নৈকট্যের বিপদ সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। প্রাচীন পারস্যের যুগ থেকে শুরু করে গ্রিক, অটোমান ও পর্তুগিজ-সহ একের পর এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। একসময় এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম ধনী ও সম্পদশালী অঞ্চল। ভারত থেকে নানারকম মশলাপাতি, রেশম ও মহার্ঘ অলংকার হরমুজ প্রণালী পেরিয়েই বাগদাদ ও ইউরোপের নানা বাজারে পৌঁছত। পঞ্চদশ শতকের চিনা নাবিক ঝেঙ হে যেমন এই পথে এসেছিলেন, তেমনই বিখ্যাত ভূ-পর্যটক মার্কো পোলো তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত ‘দ্য বুক অব মার্ভেলস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ লিখেছেন এই পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় নাবিকদের বিপদসংকুল অভিজ্ঞতার কাহিনি।

সাম্প্রতিককালে হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগর মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে হয়ে উঠেছে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের আমলে ইতালির সেই ছোট্ট নদী রুবিকনের মতো। জুলিয়াস সিজারের নেতৃত্বাধীন বাহিনী রুবিকন পেরিয়ে ইতালিতে ঢোকার ফলেই রোমান সেনেটের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক যুদ্ধের সূচনা এবং তিন বছরের গৃহযুদ্ধের শেষে রোমান সম্রাট হিসেবে সিজারের উত্থান। একবার রুবিকন পেরলে আর ফেরার পথ নেই। তখন হয় এসপার, নয় ওসপার। সেই থেকে ইংরেজি বাগধারায় ‘ক্রসিং দ্য রুবিকন’ বহু প্রচলিত। আধুনিককালে আমেরিকার বিদেশনীতিতে হরমুজ এবং পারস্য উপসাগরের বিরাট গুরুত্ব। মার্কিন সমরশক্তি যাচাই করার ক্ষেত্রও বটে। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের কয়েক দশক আগে ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আমেরিকা তার ‘মেরুদণ্ড’ প্রদর্শন করুক।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে চলার সুযোগ নিয়ে ইরান স্নায়ুযুদ্ধের খেলায় নেমে ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। বিশ্বের বৃহত্তম সব তেল ভাণ্ডারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের একমাত্র যোগসূত্র এই হরমুজ প্রণালী। সারা দুনিয়ার মোট চাহিদার ২০ শতাংশ খনিজ তেলের সরবরাহ হয় এই পথে। ওপেক সদস্যভুক্ত দেশ সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত এবং ইরাক অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। আবার বিশ্বের বৃহত্তম তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদক দেশ কাতারও এই জলপথেই গ্যাস-বোঝাই জাহাজ পাঠায় বাইরের দুনিয়ায়। হরমুজের উত্তরপ্রান্তে ইরানের অবস্থান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই ইরান, আশপাশের বন্দর এবং পারস্য উপসাগরে ভাসমান তেল ও মালবাহী বিভিন্ন জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হানা চালাতে থাকে, যাতে জাহাজগুলি হরমুজ প্রণালীর দিকে এগনোর সাহস না পায়।
এ হল প্রাচীন কৌশল। হরমুজ বরাবর গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদ, বিত্ত এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সংকীর্ণ জলপথে যাতায়াত যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সেই তো রাজা! হরমুজ দখলের ভীষণ লড়াই হয়েছিল ষোড়শ শতকের গোড়ায় যখন পর্তুগিজরা ১৫১০ সালে গোয়ায় বসতি স্থাপন করে বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়ে উঠল। হরমুজের কেল্লা দখলে তখন সবার নজর। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের পথই নয়, সামরিক ঘাঁটি স্থাপনেও সেই অঞ্চল ছিল আদর্শ। ১৫১৫ সালে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে আসে হরমুজ। আর অটোমানরা তখন চেষ্টা চালাতে থাকে ভারত মহাসাগরে অবাধ যাতায়াতের মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের লোভনীয় বাজার ধরতে। অ্যাডমিরাল পিরি রেইসের নেতৃত্বে তারা ১৫৫২ সালে হরমুজ দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু পর্তুগিজ সেনা কমান্ডার ডম অ্যালফনসো দ্য নরোনহা অটোমানদের একেবারে ঘায়েল করেন। ফলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে ১৫৫০-এর দশকে উভয়পক্ষে নৌ-সংঘর্ষ চলতে থাকে। অবশেষে পর্তুগিজ ও অটোমানরা একটা রফায় এসে গুরুত্বপূর্ণ ওই করিডোরটি দু’-তরফেই ব্যবহার করার সমঝোতা গড়ে তোলে। আবার উনিশ শতকের ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা এই এলাকার নাম দিয়েছিলেন ‘পাইরেট কোস্ট’। হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ প্রান্তে যেখানে এখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সেখান থেকে জলদস্যু ও গুন্ডারা জাহাজে হানা দিয়ে লুটপাট চালাত।

হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়ে গেল প্রায় শতবর্ষ আগে, যখন ১৯৩০ সাল নাগাদ সৌদি আরব ও বাহরিনে প্রচুর তেলের সন্ধান মিলল। তখনই সেই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আন্তর্জাতিক হিসেবেনিকেশ শুরু হয়ে গেল। গোড়ার দিকে কয়েক দশক পর্যন্ত আমেরিকা কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের দখল নিতে এগিয়ে আসেনি। প্রাথমিকভাবে সেখানে আধিপত্য ছিল ব্রিটিশদের এবং তারপরে আমেরিকার বিশেষ বন্ধু ইরানের শাহ সবকিছুর ওপর নজর রাখতেন। কিন্তু পুরো জিনিসটাই বদলে গেল ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের সঙ্গে। মার্কিন কূটনীতিকদের অপহরণকে কেন্দ্র করে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক বিষিয়ে গেল। তবে তারও কিছুদিন আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) ইসলামিক বিপ্লবের ফলে অন্য এক বিপদের প্রতি সতর্ক করে দিয়েছিল। সেই রিপোর্টের শিরোনাম– ‘দ্য স্ট্রেট অব হরমুজ: আ ভালনারেবল লাইফলাইন’। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তেলবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সমুদ্রে মাইন পোঁতা থেকে শুরু করে, ছোট ছোট কাঠের নৌকা– ‘ঢৌ’ থেকে অন্তর্ঘাতমূলক আক্রমণ চালানোর আশঙ্কার কথাও তাতে উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইএ রিপোর্টে স্পষ্ট লিখেছে, নিজেদের কল্পনাশক্তি ও নানা ধরনের হাতিয়ার কাজে লাগিয়ে উগ্রপন্থীরা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর নানাভাবে হানা দিতে পারে।

পারস্য উপসাগরে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কথা প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করলেন ১৯৮০ সালে তাঁর স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল তাঁর কথাতেই। কার্টার বললেন, ‘পারস্য উপসাগরের নিয়ন্ত্রণ দখলের যে কোনও চেষ্টাকে দেখা হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে।’ তারপর থেকে বাহরিনে মোতায়েন রয়েছে মার্কিন পঞ্চম নৌ বহর। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দপ্তর। সংশ্লিষ্ট অঞ্চল দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে বের করার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মুহূর্তে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। কার্টারের পরবর্তী প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল অবাধ রাখতে ইরানের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। তবে আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ১৯৮০-র দশকের শেষদিকে রোনাল্ড রেগনের জমানায় ট্যাঙ্কার যুদ্ধের সঙ্গে। সেই সময় ইরান ও ইরাক যৌথভাবে তেলের পরিকাঠামো আক্রমণ করার পর, বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহন সচল রাখতে, প্রেসিডেন্ট রেগনকে নৌ বাহিনীর পাহারার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তখনই হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি ট্রাম্পের নজর কেড়েছিল। তখন তিনি ছিলেন ৪১ বছর বয়স্ক এক প্রপার্টি ডেভেলপার। খবরের কাগজে পুরো পাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি খোলা চিঠি লিখেছিলেন মার্কিন প্রশাসনের প্রতি। তাতে স্পষ্ট লিখেছিলেন, উপসাগরে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আমেরিকা দেখাক তার ‘শিরদাঁড়াটি’। আজ সেই ট্রাম্পের ঘাড়েই হরমুজ সমস্যা মেটানোর দায়।

চলতি যুদ্ধের জেরে ইরান তো হরমুজ প্রণালী দিয়ে শত্রু দেশগুলির সমস্ত জাহাজ চলাচল রুখে দিয়েছে। অবিকল টোল গেট বসানোর মতো হরমুজ প্রণালী পারাপারের জন্য জাহাজের নথিপত্র দেখিয়ে এবং চড়া হারে অর্থ আদায়ের বিনিময়ে ইরান ছাড়পত্র দিচ্ছে। অবশ্য ঘুরপথে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ যাওয়ার পথ এখনও আটকায়নি। তবে খার্গ দ্বীপ দখল করতে মার্কিন-ইজরায়েলি সেনা নামানো হলে, ইরান সেই পথও আটকে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে। ইরানের ইঙ্গিত পেলেই ইয়েমেনের হুথি জঙ্গিরা লোহিত সাগরে ভাসমান জাহাজ আক্রমণ করতে শুরু করবে। হুথিদের অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ যোগায় ইরান। স্মরণ করা যেতে পারে ২০২৩ সালের শেষের দিকে এই হুথি জলদস্যুরা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্পিডবোট ব্যবহার করে মারাত্মক আক্রমণ চালিয়ে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় দু’বছর ধরে পঙ্গু করে দিয়েছিল।

বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে বা আক্রমণের পরিধি বাড়িয়ে ইরান যদি সৌদি আরব এবং জিবুটিতে অবস্থিত ঘাঁটি-সহ আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন মার্কিন সম্পদকে এবার নিশানা করতে চায় তাহলে রণাঙ্গনে নেমে পড়বে সশস্ত্র হুথিরাও। গাজার যুদ্ধের সময়েও হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হানার ফলে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল পেরনো দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলি তখন আরও লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে চলাচলে বাধ্য হয়েছিল। ইরানের অবরোধ আংশিক এড়াতে সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইন রয়েছে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানাবু পর্যন্ত। হুথি নিয়ন্ত্রিত উপকূল রেখা এড়িয়ে বেরতে হলে জাহাজগুলিকে কয়েকশ মাইল ঘুরে হরমুজের মতো আর একটি সংকীর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব অভিমুখে যেতে হবে। আরবি ভাষায় তার অর্থ ‘অশ্রুর দ্বারপথ’। সেটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী প্রণালী। ইরান ও হুথিদের কবল থেকে বাঁচতে সেই পন্থাই বা কতটুকু সফল হবে তা সময় বলবে। তবে যেদিক দিয়েই জাহাজ চলাচল হোক না কেন, ঝুঁকি এবং ঘুরপথ– এই জোড়া ফলায় পরিবহন খরচ হবে আকাশছোঁয়া। আর তাতেও বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিরই নাভিশ্বাস উঠবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved