will new language policy of govt help bengali language | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি, আ মরি বাংলাভাষা

বাংলার সরকারের কাজে বাংলা ভাষা প্রয়োগের শিলমোহর নিয়ে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, ঠিক তেমনই তার বিপরীতে আছে এক নিদারুণ নিস্তব্ধতা। বাংলা ভাষায় কাজ কোথায়? শেষ কবে বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছে– যেখানে বাংলা ভাষা জানা লোকের প্রয়োজন? বাংলায় বাংলা ভাষা ব্যবহার এবং প্রয়োগ নিয়ে আন্দোলন হলেও দীর্ঘদিন বাংলা ভাষায় কাজ নিয়ে শূন্যতা দেখা গিয়েছে। বাংলা নিয়ে পড়া ছেলেটির ভবিষ্যৎ নেই বলে দাগিয়ে দিয়েছে প্রতিবেশীরা। হয়ত প্রাইভেট টিউশনি নয়তো সরকারি স্কুলে বাংলার শিক্ষক ছাড়া, বাংলার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

শেষ আপডেট: জুলাই ২২, ২০২৬, ২০:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

‘মানুষ আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে আপনি কেন একটি মুমূর্ষু ভাষায় লেখেন? প্রথমত, আমি ভূতের গল্প লিখতে ভালোবাসি। আর একটি মুমূর্ষু ভাষার চেয়ে ভূতের জন্য উপযুক্ত আর কিছু হতে পারে না। ভাষা যত বেশি মৃতপ্রায়, ভূত ততই বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভূতেরা ইডিশ ভাষা ভালোবাসে, তারা সকলেই এই ভাষাতেই কথা বলে। আমি শুধু ভূতে বিশ্বাস করি না, পুনরুত্থানেও বিশ্বাস করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন লক্ষ লক্ষ ইডিশভাষী মৃতদেহ কবর থেকে উঠে আসবে এবং তাদের প্রথম প্রশ্ন হবে পড়ার মতো নতুন কোনও ইডিশ বই আছে কি? তাদের কাছে ইডিশ কখনওই মৃত ভাষা হবে না। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে হিব্রুকে মৃত ভাষা বলে মনে করা হত। অথচ হঠাৎ করেই তা আবার প্রবলভাবে জীবন্ত হয়ে উঠল। হিব্রুর সঙ্গে যা ঘটেছে, একদিন হয়তো ইডিশের সঙ্গেও তেমনটা ঘটতে পারে। যদিও এই অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটবে, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। আরও একটি ছোট্ট কারণ আছে, যার জন্য আমি ইডিশ ত্যাগ করতে পারি না। ইডিশ হয়তো একটি মুমূর্ষু ভাষা, কিন্তু এটিই একমাত্র ভাষা যা আমি সত্যিকারের ভালো জানি। ইডিশ আমার মাতৃভাষা, আর মা কখনওই মৃত হন না।’

আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় অত্যন্ত রসিকতার সঙ্গে কিছু কথা বলেছিলেন। সেই কথার বঙ্গানুবাদ করলে উপরের উদ্ধৃত অংশটুকু দাঁড়ায়। 

zoom
আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার

এই পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে গেলে সময়, পরিবেশ, মানুষের ভাষা বদলে যাবে। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কোনওদিন বদলাবে না। মাতৃভাষার প্রতি যে প্রেমটা আছে, সেটা তো চিরন্তন। যে কোনও ভাষাভাষী মানুষের মনের মধ্যে সেই প্রেমটা অমলিন। মাতৃভাষায় দিবারাত্রি কথা বলা, সেই ভাষাতে আড্ডা ইয়ার্কি হুল্লোড় এবং সেই ভাষাতেই কাজ করে উপার্জন করার মতো অবাধ স্বাধীনতা যেখানে আছে, সেটাই তো হোমল্যান্ড। সেটাই তো তেপান্তরের মাঠ। 

বাংলাতে থেকে বাংলা ভাষায় কাজ করে উপার্জনের মতো সুবিধা থাকলে একজন কেন সুদূর বিদেশে যাবে? দিনের পর দিন বাংলা ভাষা অবহেলিত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। বাসে, ট্রেনে, মেট্রোতে বাংলা ভাষা বলা নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। ট্রেনের টিকিটে কেন বাংলা থাকবে না? ব্যাঙ্কের কাজে কেন বাংলা ভাষার ব্যবহার হবে না? বিভিন্ন গ্রাহকসেবা ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার কেন হবে না– এই নিয়ে আন্দোলন দেখেছে তিলোত্তমা। বাসে, ট্রেনে, মেট্রোতে ছোট ছোট পোস্টার পড়েছে, বাংলায় থাকতে গেলে বাংলাতে কথা বলা আবশ্যক। এই নিয়ে জল গড়িয়েছে বহুদূর। দু’দলে ভাগ হয়েছে সমাজমাধ্যম। কলতলার ঝগড়া দেখেছে নবপ্রজন্ম। কিন্তু দিনের শেষে কী পেয়েছে বাংলা ভাষা? কী পেয়েছে আপামর বাঙালি? দু’ফালি সান্ত্বনা পুরস্কার ছাড়া বাংলা ভাষার কপালে কিছুই জোটেনি। গুরুজনেরা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে ইংরেজিটা শেখো, কী হবে ভালো বাংলা জেনে? বাংলা জানলে তো কেউ তোমাকে কাজ দেবে না! কাজের ক্ষেত্রে কিন্তু হিন্দি এবং ইংরেজির গুরুত্ব বেশি। এইভাবে প্রতিটা বাঙালির সন্ধে কেটেছে। বাংলা ভাষাকে বুকের মধ্যে রেখে, পেটের তাগিদে ইংরেজি এবং হিন্দি শিখতে হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষাকে ক্রমশ দ্বিতীয় ভাষায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বারবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে বাংলা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা। কলকাতার একটি নামকরা রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ল একটি পরিবার। ওয়েটার খাবারের নাম ইংরেজি এবং হিন্দিতে বলতে বললেন। কারণ ওই রেস্তোরাঁয় না কি এই দুই ভাষাতেই কথা বলা হয়! খোদ কলকাতার বুকে এহেন অনেক জায়গা আছে যেখানে বাংলা ভাষার প্রায় চল নেই। তবুও সিটি অফ জয়, পরাজয়ের শহরে দিব্যি বেঁচে থাকে বাংলা ভাষার ব্যাকুলতা। 

সাম্প্রতিক সময় রাজ্য সরকারের আদেশ অনুসারে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যে সরকারের সকল কাজের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, ‘আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরে আমরা বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করলাম। ভারত সরকার বা অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে আমরা বাংলা ভাষায় চিঠিপত্র লিখব, উত্তর দেব।’ রাজ্যে সরকারি কাজকর্মের ক্ষেত্রে বাংলাকেন্দ্রিক একটি ভাষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা অতীতেও হয়েছিল। বাম জমানায় বাংলা ভাষাকে প্রশাসনিক কাজে আরও বেশি ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়েছিল সরকার। জুতসই প্রতিশব্দ খুঁজে বার করার কাজও শুরু হয়েছিল। তবে সেই ব্যবস্থা বেশিদিন চলেনি। তৃণমূল সরকারও একসময়ে বলেছিল, বাংলায় চাকরি পেতে গেলে বাংলা ভাষা জানতেই হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও রাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্তরে বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষায় চিঠি লিখেছেন। তবে সার্বিকভাবে কোনও ভাষানীতি কার্যকর হয়নি। এবার রাজ্য সরকার বাংলাকেন্দ্রিক ভাষানীতি প্রণয়নে উদ্যোগী হল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে দিনের শেষে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে? রাজ্য সরকারের উঁচু পদে আসীন অধিকাংশ আমলাদের কাজের সুবিধার্থে কি ইংরেজি বা হিন্দি পরিভাষা খুঁজতে হবে? একজনকে রাখতে হবে যিনি বাংলা থেকে ইংরেজি বা হিন্দি বুঝিয়ে দেবেন! বাংলা লেখার পাশে কি ব্রাকেট দিয়ে লিখে দিতে হবে নির্দিষ্ট শব্দের মানে? সরকারের এই সাধু উদ্যোগ বিফলে যাবে না তো? 

বাংলার সরকারের কাজে বাংলা ভাষা প্রয়োগের শিলমোহর নিয়ে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, ঠিক তেমনই তার বিপরীতে আছে এক নিদারুণ নিস্তব্ধতা। বাংলা ভাষায় কাজ কোথায়? শেষ কবে বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছে– যেখানে বাংলা ভাষা জানা লোকের প্রয়োজন? বাংলায় বাংলা ভাষা ব্যবহার এবং প্রয়োগ নিয়ে আন্দোলন হলেও দীর্ঘদিন বাংলা ভাষায় কাজ নিয়ে শূন্যতা দেখা গিয়েছে। বাংলা নিয়ে পড়া ছেলেটির ভবিষ্যৎ নেই বলে দাগিয়ে দিয়েছে প্রতিবেশীরা। হয়ত প্রাইভেট টিউশনি নয়তো সরকারি স্কুলে বাংলার শিক্ষক ছাড়া, বাংলার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? যে ছেলেটা বাংলা ভাষা নিয়ে পড়েছে, বাংলা লিখতে জানে, বলতে জানে– সেই ছেলেটা কি বাংলা ভাষায় লিখে রোজগার করতে পারবে? বাংলা ভাষায় বিনিয়োগ কোথায়? বাংলা ভাষায় কাজ করার পরিকাঠামো কোথায়? সেই পরিকাঠামো নিয়ে কারওর হেলদোল নেই। সিটি অফ জয়, পরাজয়ের অলিন্দে প্রতিদিন দৌড়ে যায় অজস্র দ্বন্দ্ব! বাংলা জেনে হবেটা কী? কোন কাজে লাগবে আ-মরি বাংলা ভাষা?

বাংলা ভাষায় পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান ঠিক কত, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু বাস্তব বলছে, বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে কাজের পরিধি এখনও মূলত সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা, শিক্ষা, অনুবাদ এবং বিজ্ঞাপনের মতো কিছু ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। প্রেস রেজিস্ট্রার জেনারেলের ২০২২-২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের সংখ্যা সাড়ে চার হাজারেরও বেশি এবং বাংলা সংবাদপত্রের দৈনিক প্রচারসংখ্যা ৬৩ লক্ষেরও বেশি। অর্থাৎ পাঠকের অভাব নেই, কিন্তু সেই পাঠক লেখক, সাংবাদিক কিংবা অনুবাদকের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারেনি। বাংলা প্রকাশনা শিল্পে হাতে গোনা কয়েকজন জনপ্রিয় লেখক ছাড়া অধিকাংশের পক্ষেই শুধু বই লিখে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। সংবাদ মাধ্যমেও ডিজিটাল রূপান্তর, বিজ্ঞাপনী আয়ের পরিবর্তন এবং ব্যয় সংকোচনের ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ আগের তুলনায় কমেছে। অথচ বিশ্বজুড়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ডাবিং, সাবটাইটেলিং, সফটওয়্যার লোকালাইজেশন, ডিজিটাল কনটেন্ট, ভয়েস ওভার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাষা-প্রশিক্ষণের মতো নতুন শিল্পে মাতৃভাষাভিত্তিক দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বিনিয়োগ, নীতি বা পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, বাংলা ভাষাকে যদি সত্যিই প্রশাসনের ভাষা করতে হয়, তবে তাকে কি একইসঙ্গে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের অর্থনীতির ভাষা করে তোলার পরিকল্পনাও থাকবে, না কি বাংলা আবারও শুধু ভালোবাসার ভাষা হয়েই থেকে যাবে?

যে ভাষায় মানুষ কাজ পায় না, যে ভাষায় ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না, সে ভাষার প্রতি ভালোবাসা যত গভীরই হোক, একসময় সেই ভালোবাসাও অসহায় হয়ে পড়ে। তাই ভাষানীতির পাশাপাশি প্রয়োজন ভাষার অর্থনীতি। আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার বলেছিলেন, তাঁর মাতৃভাষা ইডিশ কখনও মরতে পারে না, কারণ মা কখনও মৃত হন না। বাংলার ক্ষেত্রেও কথাটা সমান সত্যি। বাংলা হয়তো কোনওদিন মরে যাবে না, কারণ কোটি কোটি মানুষের মুখে, স্মৃতিতে, গান, কবিতায়, ভালোবাসায় সে বেঁচে থাকবে। কিন্তু শুধু স্মৃতিতে বেঁচে থাকাই কি একটি ভাষার নিয়তি? ভাষা তো বাঁচে তার প্রতিদিনের ব্যবহারে, তার সৃষ্টিতে, তার বাজারে, তার কর্মক্ষেত্রে। আজও বাংলায় অজস্র উপন্যাস লেখা হচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য কবিতার বই, ইদানীং বাংলা ভাষায় প্রচুর ভূতের গল্পও লেখা হচ্ছে। হয়তো সেই গল্পগুলোর ভূতেরা এখনও নিখাদ বাংলাতেই কথা বলে। কিন্তু আগামী প্রজন্মের লেখক যদি নিজের মাতৃভাষায় লিখে সম্মানের সঙ্গে জীবনধারণ করতে না পারেন, তবে একদিন সেই ভূতদেরও হয়তো নতুন গল্পের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেদিন তারা যদি সিঙ্গারের কল্পনার সেই ইডিশ ভূতদের মতো ফিরে এসে প্রশ্ন করে, ‘পড়ার মতো নতুন কোনও বাংলা বই আছে?’– আমরা কি নিশ্চিন্তে বলতে পারব, ‘আছে, শুধু বই-ই নয়, বাংলা ভাষায় বেঁচে থাকারও পথ আছে’? 

Bengali bengali language isaac bashevis singer language policy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on