short story saundarya by sebanti ghosh। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

সৌন্দর্য

বাঁধনের তখন হুশ নেই। খ্রিস্টান লাইনের পিছনে পুরনো গোরা কবরখানা। এদিকের সব বিখ্যাত বাগানই বহু প্রাচীন। ওই বাগানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মালিক ও ম্যানেজার টেলার আর স্মিথ সাহেবের সমাধি যেমন আছে, গালগপ্পও প্রচুর। বন্ধ চা বাগানের ভেঙে-পড়া শ্রমিক আবাসে জেসিন্তার বাবার নাম করে হোম-স্টে খুলেছে ওর মা রোসিন্তা। প্রাচীন মহল্লাগুলির মাঝে চকচকে টাইলসে মোড়া সরু একফালি বাড়িটার সামনে পাটকাঠির বেড়া। ঢোকার মুখে বাঁ-দিকে একটা গাছের তলার খাটিয়ায় জেসিন্তার কোমরভাঙা বাবা আধশোয়া। হাতে ফোন।

প্রচ্ছদ অলংকরণ: দীপঙ্কর ভৌমিক

Published by: Robbar Digital

Posted:February 28, 2026 9:00 pm | Updated:April 29, 2026 5:31 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

এবারে সালিশি সভায় যেভাবে হোক পার পেয়েছে। বেশি লোকজনকে ঘেঁষতে দেয়নি প্রধান। কিন্তু ‘আরবার এমনটা হইলে কেউ ছাইড়বে না’– বলে দিয়েছে মাধব মণ্ডল, খড়িয়া মাহাতো। বাঁধনকে বুঝিয়েছে অপরাধটা নেহাতই নাবালকের মতো ‘হইয়াছে’। যেখানে সে, যে-সে লোক নয়, ‘মাস্টোর’ বলে কথা! গর্হিত কাজই হয়েছে বলা যায়। জেসিন্তাকে সে প্রাইভেট দিত। বারো ক্লাসের পর নার্সিং পড়বে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পড়া এই অজ গাঁয়ে আর কে দেখাবে? টিউশনির পর এক-দু’বার বুড়িমারীর চিরে যাওয়া জঙ্গল পথে হাঁটতে গেছে। ছোট মাঞ্ঝার ক্ষীণতোয়া তীরে বসে পাথর ছুঁড়েছে। ঝোপ থেকে কাঁটা বেছে তাকে বুনো কুল খাইয়েছে জেসিন্তা। সে নানা নকশার ক্রুশের করা স্কার্ফ, টপ পরে আসে। বলে, তার মা রোসিন্তার তৈরি। তার দিদা ছোটবেলায় যে ম্যানেজারের বউ, মেমসাহেবের কাছে শিখেছিল, সেটাই ওরা শিখে রেখেছে। এখন অনেক সুবিধা হয়েছে। ফোন থেকে নকশা পাওয়া যায়।

গোলগাল জেসিন্তার হাত ও পায়ের আঙুল বড় সুছাঁদ, রক্তাভ। মসৃণ ত্বকে রোদ পড়লে লালচে হয়ে ওঠে। বাঁধন মুগ্ধ হয়ে বলে, তোদের বংশে কেউ সাহেব ছিল। এদিকের অনেক চা বাগানেই আছে।

জেসিন্তা এসবে আগ্রহী নয়। বলে, ‘আমার দিদার চোখগুলো বেড়ালের মতো আঁধারে জ্বলত। আর আমার আমার মাকে দেখলেও অবাক হয়ে যাবেন সার।’

এখন এদিকেও মাস্টারমশাইয়ের বদলে ‘সার’ চলে। বাঁধন উঠে পড়ে। বলে, চল তোর মার কাছে যাই। জেসিন্তার মুখে দ্বিগুণ রক্ত চলাচল করে। লাজুক স্বরে বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি?’ 

বাঁধনের তখন হুশ নেই। খ্রিস্টান লাইনের পিছনে পুরনো গোরা কবরখানা। এদিকের সব বিখ্যাত বাগানই বহু প্রাচীন। ওই বাগানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মালিক ও ম্যানেজার টেলার আর স্মিথ সাহেবের সমাধি যেমন আছে, গালগপ্পও প্রচুর। বন্ধ চা বাগানের ভেঙে-পড়া শ্রমিক আবাসে জেসিন্তার বাবার নাম করে হোম-স্টে খুলেছে ওর মা রোসিন্তা। প্রাচীন মহল্লাগুলির মাঝে চকচকে টাইলসে মোড়া সরু একফালি বাড়িটার সামনে পাটকাঠির বেড়া। ঢোকার মুখে বাঁ-দিকে একটা গাছের তলার খাটিয়ায় জেসিন্তার কোমরভাঙা বাবা আধশোয়া। হাতে ফোন। রোসিন্তা সদ্য জন্মানো মুরগির বাচ্চাগুলোকে মন দিয়ে দেখছিল। তার সোনালি বাদামি চুল ঝাঁজালো সস্তা তেলের গন্ধে ভরপুর। পায়ে হাটে কেনা নকল ক্রকস। দেশি তাঁতে বোনা কাপড়, লুঙ্গির মতো করে পরা। পিছনে শুয়োরের খোঁয়াড়। সেখান থেকে ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে এক মাদি শুয়োর বেরিয়ে আসে। পিছনে পিলপিলে বাচ্চা। রোসিন্তা দেখভাল করার ছোকরাটার উদ্দেশ্যে হাঁক পেড়ে গাল দেয়। তার নীলচে সবুজ চোখে আলো পড়ে ঠিকরে যায়। ব্যস, কোথায় জেসিন্তা! তার নবীন আলো ঝলমল রূপ ছেড়ে মেদহীন, বাদামি চুলের মায়ের দিকে দৃষ্টি আটকে গেল বাঁধনের। 

zoom
ছবি-সূত্র: ইন্টারনেট

চা কারখানার তারে ঝুলে ঝুলে যাওয়া বস্তা কোমরে পড়ে লালু জোসেফ পঙ্গু। সারাদিন সামনের খাটিয়ায় শুয়ে থাকে। রোসিন্তা এনে শুইয়ে দেয়। লালু দূর থেকে বাঁধনকে লক্ষ করল। প্রথমে সে সঙ্গে কন্যাকে দেখে সম্পর্কের ভবিষ্যতে খুশি হয়েছিল, কিন্তু পরে জেসিন্তাকে ছাড়াই তাদের বাড়িতে বাঁধনের ঘন ঘন আসা যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। পঞ্চায়েতে নালিশ করল। মাস্টোর তাদের মেয়েকে বিয়ে করবে ভেবেছিল, কিন্তু তার এখন গতিক ভালো না। সে তাদের জাতিকে অপমান করছে। এমনকী একদিন মোবাইলে ভিডিও করেছে। বলতে বাধ্য করিয়েছে, তারা টেলার বা সিমিথ সাহেবের জারজ সন্তান।

পঞ্চায়েতের মণ্ডল বলল, এটা কি আর তেমন অপরাধ? মাস্টোর শিক্ষিত। লেখাপড়া করিছে। এদিকে দরিদ্র মানুষদের উপর সাহেবরা কেমন জোর-জবরদস্তি করত সে তো আমরাও শুন্যাছি। আমাদের তো কোনও দোষ নাই। গায়ের রংটা একটু ধলা হয়ে গেছে। ইটাকে বলে ইতিহাস সংরক্ষণ। যেমন জাতি সংরক্ষণ আছে তেমনই।

লালু সন্তুষ্ট হয় না। বলে, তা জেসিন্তাকে নিয়ে ভিডিও করতে পারত।

মাধব মণ্ডলের মেয়ে তনিমা, বাঁধনের ছাত্রী। বাঁধন তাকে কয়েকটা অঙ্ক করতে দিয়ে পঞ্চায়েতে এসে বসেছে।

মণ্ডল বলে, অ! তাইলে বেসিক সমস্যা জারজে নাই? সেটা তো আগে বলবা। পারসনে আছে। আর কিছু করছে না কি মাস্টোরে?

পঞ্চায়েতি সময়ে মণ্ডলের বাড়ির খোলা উঠোনে বসতে হয় বলে মাথার ওপরে একটা চাঁদোয়া টাঙানো হয়। একদা গভীর বনের ভিতরের বস্তি, এখন টাক পড়া জঙ্গল হলেও চারপাশে বৃক্ষ। অরণ্য কম, বস্তি বাড়ছে কিন্তু বন্যপ্রাণ সেসব বোঝে না। তাদের হাজার বছরের পথে চলাচল করে তারা। শামিয়ানার মাথায় পাতা খসে পড়ছে। শীত এখনও ছমছমে। নিচ থেকে দেখা যায়, পাতাগুলির লালচে হলুদ, কমলা সবুজ, বাদামি রঙের ছায়া অপূর্ব নকশা তুলেছে। 

বাঁধন বলে, মণ্ডলবাবু, এই কাজটা তাড়াতাড়ি সারুন। মাধ্যমিক আসছে। বন পুলিশের ওই মহাকাল ভ্যান এদিকেও যেন ঠিক সময় আসে, ওইটার ব্যবস্থা আগে দরকার। গত বছর নবীনবাবুর বাড়িতে যা হল। মেয়েটা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল। জঙ্গলের পথে হাতি আছড়ে মারল।

মুহূর্তে বিষয় বদলে গেল। তাই তো! মাস্টার বলে কথা! ঠিক কাজ ঠিক আগে। তারপর ওইসব ঘরের কাজিয়া মিটবে। খুব বেশি লোক ডাকেনি মণ্ডল। রোসিন্তা স্বামীর পিছনে একটা অন্ধকার আড়ালে বসেছে। মুখরা রোসিন্তা আজকে একেবারেই চুপচাপ। 

বাঁধন এসে থেকে ইস্তক খেয়াল করেছে এদিকের বাঙালিদের ভাষা মিশ্র। যাকে বলে বাঙালের ঘণ্টচচ্চড়ি! সে মন দিয়ে ভাষা শোনে। শব্দগুলোর কত ওজন, ডাইমেনশন! একেকটা টানেটোনে ভাব বদলে যায়।

মণ্ডল উপপ্রধান খড়িয়াকে বলে আপস মীমাংসা করে নিতে, আর বাঁধনকে একটু উঁচু গলায় বলে– দেখো, এসবের খেয়াল রাখবা। ঘর-গেরস্তিতে ঢুকবা না। মান-সম্মানের ব্যাপার। বউ মানুষ আছেন। ল্যাংড়া বরটাকে তো ওই দেখছেন। শুয়োর, মুর্গা আছে। হোম-স্টে করছেন। উনার কাছে অতো ঘুরঘুরার দরকার নেই। বয়স্ক মানুষ, কি দেখলা উনার মধ্যে?

বাঁধন অন্ধকারে আবছায়া মাখা রোসিন্তার অবয়বের দিকে একবার তাকিয়ে নিল। লালু, খড়িয়া আর মণ্ডলের উদ্দেশ্যে বলল, কথাটা বললেও মুশকিল, না বললেও।

খড়িয়ার ইচ্ছে মাস্টারকে আর একটু সহবত শেখানোর। সে নিজে বারো ক্লাস পাশ। তারপর আর পড়াশোনা হয়নি। মাস্টার বাগানিয়া নয়। কোনও চা-বাগান কর্মীর পরিবারের কেউ নয়, ফলে বাইরের লোককে তাদের সমাজে কেন ঢুকতে দেবে? এইসব শহুরে শিক্ষিত লোকগুলোর কথার মধ্যে বহুৎ মারপ্যাঁচ। কথা বলছে তবু বলছে না। শব্দগুলা বুঝা যায়, কিন্তু কথার ভেতরটা ঢোকা যায় না। সে তেমনই কোনও একটা ঘোরালো বাক্যের অপেক্ষা করছিল।

zoom
ছবি-সূত্র: ইন্টারনেট

তাকে অবাক করে বাঁধন বলল, রোসিন্তা এত সুন্দর! ওকে একবার দেখলে আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করবেই। আমি কল্পনায় দেখছিলাম টেলার সাহেবের রক্ত বইছে ওর শরীরে। চা-করদের একটা সাইট আছে, ওখানে টেলারের ছবি পাবেন। সেই একরকম লম্বাটে ছাঁদের মুখ। টেলারের বর্তমান বংশধর আছে। কবরখানায় ওর এক নাতনির নাতনি এসেছিল। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টাকা দেবে। রোসিন্তার মতো ওর পূর্ব নারীরাও ক্রুশের কাজ করত। পশুপালন করত। রোসিন্তাকে দেখলেই আমার ওইসব মনে পড়ে যায়। আমি অঙ্কের সঙ্গে ইতিহাসও পড়াই, মণ্ডলবাবু জানেন।

উপস্থিত লোকজন যা শোনে, তার অর্থ– যেমনটা বেপরোয়া প্রেমিকের বা শরীরী আকাঙ্ক্ষার হওয়ার কথা, তার ছিটেফোঁটাও কোথাও পেল না, অথচ বাঁধন আবার স্পষ্ট বলছিল– রোসিন্তা সুন্দরী! হাঁ করে এ-ওর দিকে তাকায়। একথা অস্বীকারের নাই যে, রোসিন্তা যৌবনকালে রূপুসী ছিল। ওকে নিয়ে লালু আর টিসি বাগানের হীরার মধ্যে লাঠালাঠি লেগে গেছিল। কিন্তু বাঁধনের বয়স তিরিশ। রোসিন্তা কম হলেও পঁয়তাল্লিশ। 

বাঁধন শামিয়ানার উপরে খসে পড়তে থাকা পাতাগুলো দেখায়। বলে, আপনারা একেবারে প্রকৃতির ঘরের মধ্যে থাকেন। আমি বাইরে থেকে এসেছি। আমার চোখে চারপাশ বড় সুন্দর। তখন থেকে পাতার রং দেখছি, আর ভাবছি, কী সম্পদ আমরা পেয়েছি! সৌন্দর্য! সব জায়গায় সে ছড়িয়ে আছে। একটা কিলবিলে মাগুর মাছের গায়ে যখন রোদ ঠিকরোয়, তখন তার কালো গায়ে নীলচে আভা দেখায় কৃষ্ণের গায়ের রঙের মতো। মাছরাঙা বা ময়ূরের গলার রং যেমন, সব একরকম। এই সৌন্দর্যের কাছে মানুষ থমকে দাঁড়াবে না? রোসিন্তাকে দেখব না? 

খড়িয়া দেখল, অবস্থা তার দিশার বাইরে যাচ্ছে। সে বুঝ পাওয়ার জন্যে মণ্ডলের মুখের দিকে চাইল।

মণ্ডল বুঝল, মাস্টার আরও বেফাঁস কথা বলে ছড়িয়ে দেবে। তার আগে তাকে থামাতে হবে। পড়ায় তুখোড়, কিন্তু মাথায় বেবাগ গোলমাল আছে। সে গলা ঝেড়ে ব্যক্তিত্ব এনে বলে, তাইলে এই কথাই রইল। মাস্টার জ্ঞানী মানুষ। একদিন গীতাপাঠ শুনাইয়ো। ভিডিও করে সদরে পাঠাইব। আর এসব ক্যাচাল ছাড়ান দাও এখন। মাধ্যমিক উইচ্চ মাধ্যমিক আসতিছে। ইদিকে মন দাও। কতদিন ধরে বলতেছি, একখান কোচিং খুলো। তা না করে বনে-বাদাড়ে নদী ঘাটে-মাঠে ঘুইরা মরো। এডা তোমার শহর না। নিয়ম-নীতি আছে। মেনে চলবা। লালু বৌমারে বলে দাও, মেয়েডার দিকি নজরে রাখতে। এখন পড়াশোনার বয়স। নার্সিং ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করছি। এবারের ক্যারেস্তান পরবের আগে সবাই আসবা। হ্যাপি নিউ ইয়ারের টাকা বন্দোবস্ত করব। খাওয়া দাওয়া হবে।

সভা আরও খানিক চলত। কিন্তু হুলাপার্টি, মানে হাতি খেদানো দলের হৈ চৈ শোনা গেল। 

তনিমা ফোন নিয়ে উঠোনে নেমে এসে বলল, স্যর এখন আর বেরবেন না। ভিডিও করছে রাধিকা, কুসমিরা। ওদের টোটোর সামনে হাতি এসে পড়ছিল। আপনার বাইক নিয়ে চলা আরও ঝামেলার। এই যে বাবা, আঙ্কেল, দেখেন সবাই। 

খড়িয়ার ছেলে মাধ্যমিক দেবে। সেই ভিডিও দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে। মাধব মণ্ডলের বউ আরেক টাইম চা, মুড়ি মাখার জোগাড় করে। বাঁধন অবশ্য এই সব মায়ায় পড়ে না। রোসিন্তাদের বাড়ির সীমানায় যাবে না এমন কড়ারে তার ছাড় হয়েছে। কিন্তু আজ আগাগোড়া চুপ করে থাকা রোসিন্তা কি এটাই চায়? কে জানে!

তার মন শামিয়ানার উপরে পড়া পাতাগুলোর দিকে ছুটে যায়। যত আকাশে আলো কমছে, পাতার রং ঘন হচ্ছে। আলো কমে আসছে বলে সবটুকু রং নিজের ভিতর শুষে নিচ্ছে যেন। রোসিন্তার ভিতরে এই ঘনত্ব আছে। মানুষ কেন সৌন্দর্যকে স্থায়িত্ব দিতে চায়? মন ভরে না বলেই তো? মন্দিরের গায়ে শিল্পীরা অপরূপ কারুকলায় সৌন্দর্যময়ী আর দৃপ্ত পুরুষদের খোদাই করে গেছে। ওই সৌন্দর্যকে চিরন্তনতায় ধরে রাখবে বলেই না? ধরে না রাখলে রূপ-রস-গন্ধের কি এমন ক্ষতি হত? সে থেকে যেত খাঁটি ও বিশুদ্ধ রূপে। স্থায়িত্ব থেকে অনুকরণের শুরু। নকল করা মানেই এক ভাবের পুনরাবৃত্তি।

রোসিন্তা বলেছিল বাঁধনকে নাকি যিশু ঠাকুরের মতো দেখতে। বাঁধন ওর ফোন খুলে দেখিয়েছিল, যেমনটা ওদের চার্চে দেখায়, যিশুকে মোটেও ওরকম দেখতে নয়। তিনি যে এলাকার লোক, সেখানে ওই সময় ছেলেরা ছোট চুল রাখত। আর মুখের গঠন, গায়ের রং রোসিন্তার পূর্বপুরুষ বা নারীর মতো ছিল না। ইউরোপীয়দের মতো দেখতেই ছিলেন না যিশু। রোসিন্তা তার নগ্ন বুকের ঘাসের মতো আচ্ছাদনে মুখ ঘষতে ঘষতে বলেছিল, তুমিই আমার যিশুবাবা..

ধীরে ধীরে তার বাইক চলে। জঙ্গলের ভিতরে এই পথে অজস্র পাতা আর গুঁড়ো ফুলের ওড়াওড়ি। বাঁকের পিছন দিক দেখা যায় না এমন গাছের জড়ামড়ি আর লতাগুল্ম ঝোপঝাড়। বাঁধন গাড়ি থামায়। বাঁকের পিছনে গাছ ভাঙার শব্দ। পাখির আওয়াজ নেই। ডানদিকে বৃষ্টির জমা জলের জলার ওপরে পদ্মপাতা। তার ওপরে মা ডাহুকের ত্রস্ত পা ফেলা দেখা যায়। পিছনে কেলেকুলো ছানাগুলো লাইন করে হেঁটে যায়।

zoom
ছবি-সূত্র: ইন্টারনেট

এই শান্ত দৃশ্যের মধ্যে শেষ বিকেলের আলোয় একাকী হাতি বনপথে উঠে আসে। ওর পিছন দিকটা কাদা ভেজা। সামনে ধুলোর জামা পরা যেন। একটা দাঁত ওপরে তোলা। অন্যটি নিচে। এখনও যতটা দূরত্ব আছে, তাতে বাইক না-থামিয়ে ব্যাক গিয়ারে চাপ দিয়ে পিছনে হঠতে হবে। একা হাতি বেশিরভাগ সময় মারাত্মক। কিন্তু বাঁধনের মন থাকে না সেদিকে। কী অপরূপ সৌন্দর্য! চলমান একটা ধূসর টিলার মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছে। অত ছোট চোখে তেমন কি কিছু দেখতে পায়? সেগুন পাতার মতো পতপত করা কানদু’টিতে কোনও কাটাফাটা নেই। চওড়া কাঁধ। সুদৃঢ় শরীর। বশ্য হাতির শৃঙ্খল নেই। পিঠে হাওদা কেটে বসার দাগ নেই। তেজ আর প্রাণ যেন সর্বাঙ্গে খেলা করছে। ওর গায়ে শিমুল গাছ থেকে টপ করে রক্ত লাল ফুল খসে পড়ে। গাছের ওপরে বসা পাখি খানিক ঠুকরে ফুল খেয়ে ফেলছে। শ্লেটরঙা গায়ে আলপিনের মতো লোম। বাঁধন অরণ্য-সংলগ্ন অঞ্চলে আসার পর থেকে দূর থেকে হাতি দেখেছে, কিন্তু মুখোমুখি প্রথম। দু’জনে দু’জনকে দেখে। দেখে যায়। মস্তি শুরু হবে। হাতিটা সঙ্গিনী খুঁজবে আর তারপর তার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠবে। সবে কানের পাশ দিয়ে কষ গড়াতে শুরু করেছে। 

দূরে আবার হুলাপার্টির বাজি ফাটা, কাঁসর-ঘণ্টা পেটার আওয়াজ আসে। হাতি ও তার মধ্যবর্তী নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ হয়। কান দুটো চালচিত্রের মতো দু’পাশে খাঁড়া হয়। ওর বোধহয় মনে হয়, যতই শান্ত থাক, মুখোমুখি ওই পোকার মতোটা একটা মানুষ। বিরক্তিকর মাছির মতো ভনভনে। সে এগিয়ে আসে। বাঁধন যেন সৌন্দর্যমুক্ত বশীকরণে মায়াবন্দি। সুন্দর এমনই বিপদজনক, অপার্থিব, অনিশ্চিত।

হাতিটা পা ওঠাবার ভঙ্গি করে। ধুলো ওড়ায়। একচুল দূরত্ব। ওর পেটের মধ্যে হজম হওয়ার গুড়ুম গুড়ুম শব্দ পাচ্ছে বাঁধন। ওর হুঁশ ফেরে কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। হাতি ওর দিকে তেড়ে আসে না। ধীরে এসে দাঁড়ায়। পিছনে বাসন বাজানোর আওয়াজ কানে এসে লাগে। হাতি পা তুলে জোরে নামায়। মোটর বাইক গোঁ-গোঁ করে উল্টে থেঁতলে যায়। বাঁধন জলার দিকে ছিটকে যায়। হাতি তাকে পোকামাকড় জ্ঞান করে বাইকটা তুলে আছড়ে ফেলে। অগভীর কাদায় ডুবে যাওয়া বাঁধন দেখে, পাশের বন থেকে ছেঁড়া লতাপাতা গায়ে মেখে এক হস্তিনী উঠে আসে। মহাকাল, একদাঁত পুরুষ হাতি তাণ্ডব থামায়। বাতাসে শুঁড় ভাসিয়ে দেয়। বৃংহনে বন চিরে যায়। হস্তিনী ছোটখাটো। চেহারা বেঢপ। কান ছেঁড়া। শুকনো স্তন ঝুলে আছে। গায়ে ছিটছিট শ্বেতীর মতো দাগ। ওর দিকে ফেরা চোখটি সম্ভবত কানা। হাতি কীভাবে হস্তিনীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়? তার সৌন্দর্য বিচারের মাপকাঠি কী? কীভাবে বিচার করে, কে হবে তার সাময়িক সঙ্গী? মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও প্রাণীর কাছে সঙ্গী নির্বাচনে সৌন্দর্যবোধ কাজ করে? যৌন সক্ষমতাই হয়তো তাদের একমাত্র বিচার্য।

তাকে বিন্দুমাত্র আহত না করে, প্রায় অবজ্ঞার ভঙ্গিতে তার পাশ দিয়ে কাদা জলায় নেমে পড়ে কুরূপা হস্তিনীর পিছনে অপরূপ হস্তী-পুরুষ।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন সেবন্তী ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

……………………

Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar short story সৌন্দর্য

Share this article on