Football Challenges Discrimination and Promotes Equality। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৈষম্যের পৃথিবীতে ফুটবল আজও প্রতিরোধ

দিনশেষে ফুটবল মাঠ আসলে ইউটোপিয়াই। সে দেশ কাঁটাতারে ঘেরা ভূ-খণ্ড বোঝে না। বোঝে মানুষ। মানুষহীন দেশ হতে পারে না। দেশহীন মানুষ যদিও দিব্যি হয়। বিশ্বকাপ মিটে গেলে তাই ফুটবল খুব একা। নিঃসঙ্গ। মানুষের ইতিহাসে তাকে নিয়ে কেবল একথাটুকুই লেখা থাকবে, যে বৈষম্যের আবহমান ইতিহাসে এই খেলাই সেই প্রতিরোধ, যা বারেবারে শুরু হয়েছে দুই দলকে এক উচ্চতায় রেখে।

শেষ আপডেট: জুন ১৬, ২০২৬, ১৭:২৫   
Facebook WhatsApp Messenger

বিশ্বকাপ। আফ্রিকা। ২০১০। সোমালিয়ান রিফিউজি কে’নান গাইলেন– ‘Unify us, make us feel proud’– সারাবিশ্ব আসলে এক। ফুটবলের মাঠ ছেড়ে সে গান ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রের মতো। টেলিভিশন পর্দার এপার থেকে ওপার ছুটছে আদুল গায়ের আফ্রিকান বাচ্চারা। পায়ে ফুটবল। একেকটা শট পেরিয়ে যাচ্ছে কাঁটাতার। কে’নান-কে ঘিরে সবাই নাচছে। রঙিন পোশাক। ভুভুজেলার শব্দ। এর বহু আগেই আসলে জন্মেছে গানখানা। সোমালিয়ান সিভিল ওয়ার। কে’নানের চোখের সামনে রাষ্ট্রের বুলেটে নিথর হয়ে গেল তাঁর প্রাণপ্রিয় তিন বন্ধু। কৃষ্ণাঙ্গ শরীরের ওপর খসখসে তিনজোড়া ঠোঁট। জল পায়নি। কে’নান জানেন। ফুটবল আসলে কী– এ-প্রশ্নের বহুমাত্রিক উত্তরে কেবল ওয়েভিং ফ্ল্যাগ গানখানাই ছিল তার জবাব। আজীবনের মতো। আমাদের সকলের জবাব। বিশ্বজুড়ে সারবছর কত খেলা! কত ফুটবল! তবু বিশ্বকাপ আলাদা। স্বতন্ত্র। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’!

zoom
কে’নান

কেন? কারণ, দেশ। দেশ ভাবনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রভাবনা। এই যে ভাবনার ওপর ভাবনার প্রলেপ– এ নতুন নয়। ফ্যাসিবাদের ধর্ম আমাদের অতিপরিচিত। বিশ্বকাপে কে খেলে? দেশ না রাষ্ট্র? এবারের বিশ্বকাপে বোধ হয়, ইতিহাসে প্রথম সবকিছু ছাপিয়ে এ-প্রশ্নই জোরালো হয়ে উঠেছে। আমরা যদি ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘সেপিয়েন্স’ বইয়ে ফিরে যাই, দেখব তিনি আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন এক গোড়ার কথায়। উঁচু এবং নিচুর যে ভাবনা, এই যে ডিসটিংশন, সে ভাবনার সপক্ষে যুক্তি উঁচুর কাছে সর্বদা তৈরি থাকে।

zoom
ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘সেপিয়েন্স’

ক্যাপিটালিস্টরা যেমন সমাজে অর্থনৈতিক অসাম্যকে নানা যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করবেন, হোয়াইটরা যেমন ‘সুপিরিয়র জিন’ তত্ত্বকে মান্যতা দেবেন, হিন্দুরা যেমন কাস্ট সিস্টেমকে সমর্থন করতে গিয়ে বলবেন– কোনও কসমিক শক্তি এই উঁচু ও নিচুজাতের উদ্ভাবক। তাই, সংখ্যাগুরুর কাছে এ-প্রশ্নের যথাযথ উত্তর আশা করা মূর্খামি। অসাম্যের এক ও একমাত্র কারণ মানুষের মন। এই শতকের তৃতীয় দশকে এই মন বাম ও ডানপন্থাকে আরও পোলারাইজড করে দিয়েছে। সারাবিশ্বের দিকে তাকালে দেখব, গোটা দুনিয়াই যেন আড়াআড়ি ভেঙে যাচ্ছে বাম ও ডান-এ। অসাম্যকে ‘এনজয়’ করে চলা সুবিধাবাদীরা অনায়াসে সমর্থন করছে ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার সিকিউরিটির নাম করে পুশব্যাকের মতো অশ্লীলতাকে। সমর্থন করছেন অভিবাসন নীতির নামে একটা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে আতসকাচের নিচে ফেলে দেওয়ার অসভ্যতাকে। সমর্থন করছেন সংখ্যালঘুর ওপর কেবলমাত্র সন্দেহের বশে অত্যাচারের অমানবিকতাকে।

zoom
ফুটবল গ্যালারিতে প্যালেস্তাইন পতাকা

কিন্তু ফুটবল এখানে কই? সে তো খেলামাত্র। আজ্ঞে না। আছে। মার্কিন মুলুকে বিশ্বকাপ হবে। গত কয়েক বছর ধরেই সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কট্টর অভিবাসন নীতি নিয়ে তাড়িয়ে চলেছেন ইমিগ্র‍্যান্টদের।ইউএসএ-এর ইমিগ্র‍্যান্ট কারা? মূলত দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অতি দারিদ্র্যে ধুঁকতে থাকা দেশ থেকে কাজের খোঁজে, বাঁচার তাগিদে কোনওক্রমে পালিয়ে আসা মানুষ। হাইতি-নিকারাগুয়া-কুরাসাও-ভেনেজুয়েলা সহ প্রায় খানপনেরো দেশ থেকে অসংখ্য অভিবাসী এসে থাকেন আমেরিকায়। আমেরিকার অর্থনীতির একটা বড় অংশের নিয়ন্ত্রকও এরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফতোয়া– গড়ে ফেলো ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’!

এই এনফোর্সমেন্ট অফিসাররা নির্বিচারে মার্কিন নাগরিকদের গায়ের রং-ভাষা-হাঁটাচলা দেখে চিনে চিনে ডিপোর্ট করছেন। সমীক্ষা বলছে, গত তিন বছরে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষকে বিভিন্ন দেশে পুশব্যাক করেছে মার্কিন সরকার। এনফোর্সমেন্ট কাস্টডিতে মারা যাচ্ছেন মানুষ। ভারতীয়দের কাছে এ-টেমপ্লেট আজকাল খুব চেনা। শুধু ভারতীয় নয়, সারা বিশ্বজুড়েই অতিদক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থানে এই মডেল সুপরিচিত। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা একাধিক দেশের নাগরিকদের ভিসার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। সমর্থকদের মেক্সিকো-কানাডা ও ইউএসএ-তে যাতায়াতের জন্য ট্রেন ও ফ্লাইট-ভাড়া আকাশছোঁয়া করা হয়েছে।

খেলার টিকিটের দাম অত্যধিক বেশি, যে দাম দিয়ে উচ্চবিত্ত বাদে টিকিট কেটে সাধারণ জনতা মাঠেই যেতে পারবে না। ফিফার উচ্চপদস্থ কর্তারা বলছেন– ‘আনওয়েলকামিং বিশ্বকাপ’, প্রাক্তন ফুটবলাররা বলছেন, এবারের বিশ্বকাপ, ফুটবলের মূল স্পিরিটের থেকেই আলাদা– ইনক্লুসিভ কাঠামোটিকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছে আমেরিকা। ইরান বিশ্বকাপে যোগ্যতার পরীক্ষায় পাশ করে কোয়ালিফাই করা স্বত্ত্বেও ট্রাম্প বলছেন আমেরিকায় ইরানিদের সিকিউরিটির দায়িত্ব তিনি নেবেন না। মার্কিন দূতাবাস ইরানের টিম ম্যানেজমেন্টের বেশিরভাগ মানুষের ভিসার অনুমোদনই দেয়নি!

zoom
বিশ্বকাপ খেলতে মেক্সিকোতে ইরানের জাতীয় ফুটবল টিম

এত কিছু কেন? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন- ‘MAGA– মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’-এর কথা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন জাতীয়বাদী উগ্রতায় ঘি ঢেলে বারেবারে বলেন- ‘বিকশিত ভারত’-এর কথা। যেমনভাবে এককালে বলতেন ব্রাজিলের বলসোনারো। কিন্তু এই যে রাষ্ট্রশক্তিকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বানানোর ইঁদুর দৌড়ের সঙ্গে সংখ্যালঘু ও গরিব মানুষের নিপীড়ন কীভাবে সম্পর্কিত? এখানে আবার ফিরে আসবে হারারির কথাটিই। অসাম্যকে দু’ভাবে মুছে ফেলা যায়। এক, পিছিয়ে থাকা দুর্বলকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তুলে এনে। দুই, তাকে পাকাপাকিভাবে শেষ করে দিয়ে। দক্ষিণপন্থা এই দ্বিতীয় কাজটিই করে থাকে।

ঠিক যেভাবে হিটলার মনে করতেন দুর্বল মানুষ জাতির পক্ষে ক্ষতিকারক। দুর্বল জার্মানদের জন্য রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিত মৃত্যুর নিয়তি, ঠিক যেভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে এ-দেশের দক্ষিণপন্থী নেতারা সবার আগে দুর্বল ও গরিবদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন, যে সাপ ছোবল মারার ক্ষমতা রাখে না, তাকে আঙুলে পেঁচিয়ে দেওয়ালে ছুড়ে মেরে খুন করার মধ্যে এক পৈশাচিক আনন্দ আছে। ক্ষমতা এই আনন্দ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে।

zoom
১৯৩৬-এর অলিম্পিক্সে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছেন অ্যাডলফ হিটলার

ফুটবল এই দক্ষিণপন্থার উর্বর জমিতে কীভাবে আসবে এবার? আমেরিকার মেটলাইফ (নিউ জার্সি), সোফি (লস আঞ্জেলস), লুমেন (সিয়াটেল)-সহ যে স্টেডিয়ামগুলিতে খেলা– সেইসব স্টেডিয়ামের সাফাইকর্মীদের সিংহভাগই রিফিউজি। ইমিগ্র‍্যান্টস! অর্থাৎ, বড়লোক দেশে মূলত ব্লু-কলার্ড কাজের জন্য থাকবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সংখ্যালঘুরা, যেমন উচ্চমধ্যবিত্তের বাড়িতে ড্রাইভার আর হাউসকিপিংয়ের কাজটুকু মিটে গেলে গরিব মানুষের জীবনের আর তেমন দাম নেই, উপরন্তু দামি জিনিস খোয়া গেলে সন্দেহদৃষ্টি আছড়ে ফেলার আরাম আছে, মাঝরাতে অতর্কিতে বুলডোজারে গুড়িয়ে যাওয়া দোকান কিংবা বর্ডার সিকিউরিটির বন্দুকের সামনে খোলা মাঠে এককাপড়ে বসে থাকা অসহায় মানুষের দিকে ছুড়ে দেওয়া শ্লেষ আছে।

এই দুনিয়ায়ই ফের একটা বিশ্বকাপ আসছে। এই দুনিয়ায়, যেখানে ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকার ডেটা পরিষ্কার বলে দিচ্ছে– গত কয়েক বছরে গরিব আর বড়লোকের মধ্যে ব্যবধান অর্থনৈতিক অসাম্য হু হু করে বেড়েছে, সেখানে একটা বিশ্বকাপ আসছে। অভিবাসী যদি কিলিয়ান এমবাপে হন, কিংবা মাইকেল ওলিসে বা লামিন ইয়ামাল, তাহলে তাঁরা উন্নত দেশের পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন। অন্যথায় সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন।

zoom
ফ্রান্সের জার্সিতে কিলিয়ান এমবাপে

আজ সকালের একটি ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। একটি মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে, বসে আছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। জল নেই। খাবার নেই। কিস্যু নেই। ভারত তাকে পুশব্যাক করেছে বাংলাদেশে আর বাংলাদেশ তাকে গ্রহণ করছে না। বিশ্বজুড়ে এক কাগুজে আইন আছে রাষ্ট্রপুঞ্জের। নাম– ‘রাইট টু অ্যাসাইলম’। অর্থাৎ, একজন মানুষ তিনি নিজের বেঁচে থাকার অধিকারটুকু চাইতে পৃথিবীর যেকোনও দেশে শরণার্থী হিসেবে থাকতে পারেন। সেই কাগজ কার্যত মুড়ে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিচ্ছে দক্ষিণপন্থা। গরিবের বেঁচে থাকার অধিকার? সোনার পাথরবাটি।

তাই দিনশেষে ফুটবল মাঠ আসলে ইউটোপিয়াই। সে দেশ কাঁটাতারে ঘেরা ভূ-খণ্ড বোঝে না। বোঝে মানুষ। মানুষহীন দেশ হতে পারে না। দেশহীন মানুষ যদিও দিব্যি হয়। বিশ্বকাপ মিটে গেলে তাই ফুটবল খুব একা। নিঃসঙ্গ। মানুষের ইতিহাসে তাকে নিয়ে কেবল একথাটুকুই লেখা থাকবে, যে বৈষম্যের আবহমান ইতিহাসে এই খেলাই সেই প্রতিরোধ, যা বারেবারে শুরু হয়েছে দুই দলকে এক উচ্চতায় রেখে। বাংলাদেশ বর্ডারে বসে থাকা সেই মেয়েটি– যাকে এক দেশ তাড়িয়ে দিয়েছে, অন্য দেশ গ্রহণ করছে না, যার দিকে তাকিয়ে কুৎসিত ও কদর্য হাসি উপহার দিচ্ছে একদল মানুষ, তার আবহমান অশ্রুধারাটিকে পৃথিবীর বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শেষ অবধি একটা ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল। পুঁজিবাদের অন্তিম শ্বাস যদি কোনওদিন মাটিতে পড়ে, তবে সে অশ্রুবিন্দুটির সঙ্গে তার মোলাকাত হবে। হবেই!

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন অর্পণ গুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

……………………

Fascist Culture Fascist States FIFAWorldCup2026 Football Immigration Issue Iran Football Team Kylian Mbappé Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Utopia

Share this article on