Robbar

তিন পাত্তর পেরলে…

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 19, 2026 7:10 pm
  • Updated:August 19, 2026 7:10 pm  

আমারই এক মিত্র-স্থানীয় পেশাগত অগ্রজকে আবার দেখেছি, তিনের সীমানা পেরোলে চেয়ারে হাঁটু মুড়ে বসে পড়তে‌। তারপর সে মায়ের হাতের শুক্তোর স্বাদ পায়‌। বাবার গলায় গান শুনতে পায়‌। বছর কয়েক হল, গত হয়েছেন‌ তাঁরা। ইহজগতে আর নেই। কিন্তু তিন পাত্তর তাঁদের ফিরিয়ে আনে ঠিক। অবলীলায়। রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনে ‘তিন পাত্তর’ নিয়ে বিশেষ লেখা। 

রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

একে চন্দ্র।
দুইয়ে পক্ষ।
তিনে নেত্র।

অ্যায়, নেত্র! নেত্র ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট, তাকে নিয়ে কোনও পাখোয়াজি চলবে না। এক পাত্তরে আমরা, অর্থাৎ কি না‌ সুরা-বর্দিরা, চন্দ্র-সুয্যি দেখলেও, দেখতে পারি। আদিম রাতের চাঁদিম হিম নিয়ে দু’-ছত্তর লিখেও দিতে পারি। দু’-পাত্তরে আমরা পক্ষ-টক্ষ নিই, উয়ো ভি সহি বাত। পক্ষ বলতে, আত্ম-পক্ষ! গোটা পৃথিবী কাকতাড়ুয়া, আমিই একা দিলদরিয়া! কিন্তু আসল হল তিন, ওরফে তিন পাত্তর, থ্রি ইকোয়ালস টু নেত্র!

সেরা পোস্টার-বয়, ক্যাপ্টেন হ্যাডক; শিল্পী: অ্যার্জে

কী বাওয়া, বুঝলে না? দুনিয়ার মালখোরদের জিজ্ঞেস করে দেখো, বুঝিয়ে দেবে তিন পাত্তর আর নেত্র কেমন ডায়রেক্টলি প্রোপোরশনাল টু ইচ আদার! তিন চলছে, নেত্র ঢুলছে, মণির লাল বাড়ছে। তন-মনকে পুরো ব্যোমকে দিয়ে।

তিন পাত্তরকে আমার কেন জানি না, বরাবর মাঝদরিয়ার বুড়ো নৌকো লাগে। ঢুলু-ঢুলু নেত্রে দেখতে পাই, সে নৌকোর গলুইয়ে বসে আছি। মাথায় আকাশের ছাদ, নিচে জলের নীল। মধ্যিখানে এক নিঃস্ব বৈঠার মতো আমি। একাকী বসে। ফোঁস করে শ্বাস পড়ে তখন, নেত্র বাবাজীবন ছোট হয়ে আসে, হাতছানি দিয়ে ডাকে ফেলে আসা ছেলেবেলা।

টিফিনের বেল। দার্জিলিং মেল। ফুটবলের মাঠ। গঙ্গার ঘাট। শরতের কাশ। বসন্তের মাস। প্রীতি জিন্টার টোল। দুর্গাপুজোর ‘বোল’।

অস্ট্রিয়ান শিল্পী গেওর্গ এমানুয়েল ওপিৎজের আঁকায় জনৈক মদ্যপায়ী (১৮০৪ )

বুকখানা হু-হু করে ওঠে বড়। দুটো আমির মধ্যে তফাতের ফাটলও বড় হয়। দু’-পাত্তরের ‘আমি’-র সঙ্গে কিছুতেই আর মিলেমিশে যায় না তিন পাত্তরের ‘আমি’। মুখে মারিতং জগতের পৃথিবীটা কেমন যেন বেমালুম হারিয়ে যায়‌। তখন আর মনেই হয় না, আমি না-থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত না! উদাসপুরের হাওয়া ডাক দেয় বরং। ছেলেবেলায় শোনা একটা গান ভেসে আসে, ‘কত কী পারিনি হতে…।’

পারিনি তো। পারিনি হোমরা-চোমরা হতে, বড় চাকরি করতে। পারিনি, গাড়ি-বাড়ি করতে। পারিনি, বাপ-মা’কে সুখ-শান্তি দিতে। পারিনি শ্লা, একখানা প্রেমের মতো প্রেম করতে। ধুলো উড়িয়ে দেওয়া প্রেম, ভুবন ভুলিয়ে দেওয়া প্রেম। কিস্যু পারিনি। চুমুর মতো একখানা চুমু পর্যন্ত খেতে পারিনি। ‘অভাগার স্বর্গ’ তাই হাতের গ্লাস, তাতে ভর্তি রাজ্যের ছাইপাঁশ। তিন পাত্তরের চুমুক, নিমীলিত নেত্র, ফিরিয়ে দিয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া এক খয়াটে ছবি। চুলে বিনুনি করা, স্কুল ইউনিফর্ম পরা। অক্ষমতার তুলিতে আঁকা আমার প্রথম সব কিছু-র এক বিষাদ-অবয়ব।

সুরার সঙ্গে সুরের সংযোগ বড়পর্দায় অমর করে রেখেছেন গুরু দত্ত

আমারই এক মিত্র-স্থানীয় পেশাগত অগ্রজকে আবার দেখেছি, তিনের সীমানা পেরলে চেয়ারে হাঁটু মুড়ে বসে পড়তে‌। তারপর সে মায়ের হাতের শুক্তোর স্বাদ পায়‌। বাবার গলায় গান শুনতে পায়‌। বছর কয়েক হল, গত হয়েছেন‌ তাঁরা। ইহজগতে আর নেই। কিন্তু তিন পাত্তর তাঁদের ফিরিয়ে আনে ঠিক। অবলীলায়। গলা ছেড়ে তখন গান ধরে সে দাদা। বাবারই গান। নিজের হেঁড়ে গলায়। শরম ভুলে। চোখ বুজে। গাল বেয়ে গড়িয়ে নামা অগণিত মুক্তবিন্দুকে তাচ্ছিল্য করে। খিস্তি শুকিয়ে সুর হয়ে যায় তখন, রাতে রাত বাড়ে, নেশা বড় হয়‌।

ঋত্বিক ঘটকের ভাবনা ছিল কিছু আলাদা

কোথাও গিয়ে তাই মনে হয়, তিন পাত্তর আমাদের মতো শুঁড়িখানার জমিদারদের কাছে আক্ষেপের আরশিনগর। শিব-নেত্রের পর্দায় যার ছায়াছবি চলে, হাহাকারের ডলবি সাউন্ডে, অসহায় চাওয়া-পাওয়া যথাক্রমে যার নায়ক ও নায়িকা! যে চলচ্চিত্রে সরষের খেত ধরে হাঁটে কারও হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা, কারও বা তুলসীমঞ্চের সন্ধ্যারতিতে নিভে যাওয়া মা। সে ছবিতে ‘খলনায়ক’-ও একজন আছে বটে। খুব কাছাকাছি থাকা একজন, হাতের ফোন! বলছি কী, শিভাস টানুন কিংবা ওল্ড মঙ্ক, তিন পাত্তর গিলে ফেললে, সর্বাগ্রে ওই চৌকো বস্তুটিকে ফুটিয়ে দেবেন। অমন সৃষ্টিছাড়া ‘বিভীষণ’ দুনিয়ায় দুটো নেই। সহস্রবার ওই হতচ্ছাড়া আমারই খেয়ে, আমারই পরে, আমারই পুরনো প্রেমিকাদের মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে, আঙুলের উপর বশীকরণ বিদ্যে ফলিয়ে! যে দাদার কথা পূর্বে লিখলাম, তাকে আবার দেখেছি, মাল টেনে পাগলের মতো দুটো নম্বরে ফোন করে যেতে। একবার। দু’-বার। বারবার। যদি ভুল করে তা ধরে ফেলে, ওঁর বাবা কিংবা মা! সে বদ্ধ মাতালকে কে বোঝাবে, ধুলো-জমা ফোন দুটো পড়ে রয়েছে বহুদিন, বিকল হয়ে, ড্রেসিং টেবিলের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।

এডওয়ার্ড হপারের আঁকা সুরানিলয়ের ছবি, নাইটহকস (১৯৪২)

ছাড়ুন, যান। বাদ দিন এ সমস্ত। মদ্যপায়ীদের আবার আবেগ, তাদের আবেগ নিয়ে আবার লেখা। তা না কি আবার পড়বে লোকে, ইয়ে… মানে আপনারা, রোববার ডট ইনের তিন বছরে! ফুর, পালংশাকের কি না ক্যাশমেমো! শুনুন, অফিসে একটা নাছোড়বান্দা অলপ্পেয়ে আছে, সাত দিন ধরে ঘ্যানরঘ্যানর করছে, লিখে দিলুম তাই একটা আবোল-তাবোল, অবিন্যস্ত শব্দ দিয়ে ছাইভস্ম! আপনারা বাবুলোগ, ফর্ক-নাইফ দিয়ে টুংটাং শব্দ তুলে ডিনার করেন, পড়লে পড়বেন, না পড়লে ফেলে দেবেন। বয়েই গেল। আপাতত ফুটুন। আমিও কাটি‌। ফ্রিজ খুলব। বরফ বের করব। তিনটে হয়ে গিয়েছে। এবার চার‌ নম্বরটা মারব।

চোখ বুজলেই সরষে খেতের বিনুনি চুলকে বেশ দেখতে পাচ্ছি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। একছুটে আজ তাকে একবারটি ছুঁয়ে দেখতেই হবে!