


স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল– তিনটে ইনসুইং-আউটসুইং-ইনসুইং-এ দোলা লাগে আমাদের পৃথিবীতে। এমন দোলা দিয়েছিলেন মেসি। এল ক্লাসিকো– এক-দুই-তিন। গোল! প্রতিপক্ষের কফিনের ওপর তৃতীয় পেরেকের পৈশাচিক আনন্দই কিন্তু হ্যাটট্রিকের একমাত্র দ্যোতনা নয়। বরং, আমাদের কাছে জীবন একেবারে অন্য আঙ্গিকে নিয়ে এসেছে হ্যাটট্রিক– একাধিক প্রেম-বিচ্ছেদ-প্রেম পেরিয়ে এসে যাওয়া কোনও ব্রাহ্মমুহূর্ত। হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণতাকে ঈর্ষা করতে শেখায়, সম্পূর্ণের সৌন্দর্যের দিকে ছুড়ে দেয় সম্ভ্রম। আবার একইভাবে ভালোবাসতে শেখায় অসম্পূর্ণতাকে।
জেলা স্কুলের নতুন বিল্ডিং। মিলেনিয়ালের কৈশোর পেরনো ক্লাসরুম। অবসন্ন বিকেলে ছুটি হওয়ার খানিক আগে লাস্ট পিরিয়ড। বি.কে.এম. স্যরের ক্লাস। জ্যামিতি-সমবাহু-সমদ্বিবাহু-সমকোণী ত্রিভুজের জন্য জ্যামিতি বাক্স খোলার আগেই স্যর বলেছিলেন সেই মোক্ষম কথাখানা! ন্যূনতম তিনটি সরলরেখা ছাড়া কোনও বহুভুজ গঠন করা অসম্ভব! চ্যালেঞ্জ বলতে মোক্ষম। আমরা অনেকে ভেবেছিলাম– এ বেদবাক্য ভুল প্রমাণ করবই!
আমার পাশে সৌরভ– দেখেছিলাম সরলরেখার নামে বঙ্কিমসেতুর মতো বাঁক নেওয়া দুটো বৃত্তচাপ জুড়ে এঁকে ফেলেছিল বহুভুজ। দ্রুতই নাকচ হয়ে যায় সে চেষ্টা। আমরা অনেকেই চেষ্টা করেছি বটে! কেউ কেউ এখনও সে ক্লাসরুমে বসে এঁকে চলেছি– চেষ্টা করছি তিনের কম কিছু একটা দিয়ে যদি জুড়ে ফেলা যায়। আমাদের সামনে ইরফান পাঠান। আমাদের সামনে সেই ঝাঁকড়া চুল– ‘অন আ হ্যাটট্রিক’ থেকে তৃতীয় বলের ইনসুইং আছড়ে পড়ে প্যাডে– হ্যাটট্রিক! তিন ছাড়া যে কেবল বহুভুজ না, বৃত্তও সম্পূর্ণ হয় না আমাদের বুঝিয়েছিলেন তিনিই।

স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল– তিনটে ইনসুইং-আউটসুইং-ইনসুইং-এ দোলা লাগে আমাদের পৃথিবীতে! এমন দোলা দিয়েছিলেন মেসি। এল ক্লাসিকো-এক-দুই-তিন। গোল! প্রতিপক্ষের কফিনের ওপর তৃতীয় পেরেকের পৈশাচিক আনন্দই কিন্তু হ্যাটট্রিকের একমাত্র দ্যোতনা নয়। বরং, আমাদের কাছে জীবন একেবারে অন্য আঙ্গিকে নিয়ে এসেছে হ্যাটট্রিক– একাধিক প্রেম-বিচ্ছেদ-প্রেম পেরিয়ে এসে যাওয়া কোনও ব্রাহ্মমুহূর্ত। যারা সেকালে, একটু ডেপো-পাকা হিসেবে স্কুলে সুনাম অর্জন করেছিল, যাদের হাতে আর ঠোঁটে আমাদের বহু আগেই উঠে এসেছিল সাদা জাদুকাঠি। যাদের বাবা-মায়েরা তেমন বকাঝকা করেও লাভ হয়নি এবং যাদের সঙ্গে মিশতে আমাদের বাবা-মা চিরকাল মানা করে এসেছে– তেমন দাদারাই আসলে চিনেছিল জীবনকে ঢের বেশি। প্রথম প্রেমের ‘সব পেয়েছি’-র ভিতর সেই অমোঘ সত্যিখানা তুলে ধরেছিলেন তারাই। প্রথম প্রেম এক পেগ– দ্বিতীয় প্রেম আড়াই পেগ আর তৃতীয় প্রেমের কাছেই আসবে নিঃশর্ত সমর্পণ– এমন ফিলোজফি সেসময়ে অসহ্য লাগলেও পরে বুঝেছি এর মাহাত্ম্য।
সেইসব দাদা চলে গিয়েছে কবেই, কে কোথায় কিচ্ছু জানি না! শুধু জানি, হ্যাটট্রিক আমাদের জীবনে এসেছিল ইরফান পাঠানের মতো, মেসির মতো আর তাকে জীবনের সঙ্গে বেঁধে দিতে পেরেছিল এই দাদারা। তৃতীয় প্রেমের কাছে নতজানু হতে পারার মধ্যে যে ‘অন আ হ্যাটট্রিক’ থেকে হ্যাটট্রিক হয়ে যাওয়ার শেষ চুমুকের তৃপ্তি তাঁকে চিনতে আমাদের লেগে গিয়েছে অনেকগুলো বছর।

কম্পিউটার আমাদের যেভাবে গিলে ফেলল বিগত দেড় দশকে, যেভাবে পাসওয়ার্ডের মধ্যে আটকে থাকল কুঠুরিতে জমানো স্মৃতি, আমরা শিখলাম– প্রথমবার ভুল পাসওয়ার্ড বেখেয়ালে, দ্বিতীয়বার ওভার কনফিডেন্সে কিন্তু তৃতীয়বার ভুলের আগে দেওয়া সেই সতর্কবাণী: আর ভুল করলেই বিপদ! তাকে উপেক্ষা করে এগনো মুশকিল। তাই হ্যাটট্রিকের আগের মুহূর্ত চিরকাল মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়ার, নিজেকেই নিজে সন্দেহদৃষ্টিতে প্রশ্ন করার। শেন ওয়ার্ন মেলবোর্নে হ্যাটট্রিকের তৃতীয় উইকেটের আগে ঠিক কী ভাবছিলেন? লেগস্পিন না গুগলি? না কি অন্য কিছু? না কি নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছিলেন? ‘শেষ করতে পারবে তো?’-র মতো অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্পিনারকে। শেষ করে ফেলার তৃপ্তির চেয়ে ঢের বেশি আফসোস জমা আছে হ্যাটট্রিকের গায়ে। ‘একটুর জন্য কতকিছু হয়নি’-র মায়া লেগে আছে কত! পরপর দুই অবধি দেখে ফেললে তিনের যে প্রত্যাশা তা পূরণ হয় কালেভদ্রে। টেলিভিশন স্ক্রিনের নিচে ‘অন আ হ্যাটট্রিক’ দেখে প্রাণপণে যতবার চেয়েছি একটা হ্যাটট্রিক, তার বেশিরভাগ সময়ই পূরণ হয়নি এ চাওয়া। লুডোর বোর্ডে আবার দুই-ছক্কার পর যখন চেয়েছি পাঁচ, তখন বে-আক্কেলে কপাল এনে দিয়েছে তৃতীয় ছক্কা-ফক্কা!

জীবনের কাছে যে চিরকালীন আক্ষেপ, যত হয়েছে তার ঢের বেশি হয়নি– যত পেয়েছি তার ঢের বেশি পাইনির যে অভিমান, হ্যাটট্রিক কেবল তা দৃশ্যমান করে দেয়। মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কেরিয়ারে ২৩৩ বার একম্যাচে জোড়া গোল করেছেন, আর এই ২৩৩ বারই তিনি মিস করেছেন হ্যাটট্রিক! আবার মুত্থাইয়া মুরলিধরনের কথা ধরা যাক। বিশ্বের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি কেরিয়ারে ১৪ বার হ্যাটট্রিক মিস করেছেন। পরপর দুটো অবিশ্বাস্য উইকেট-শিকারের পর তৃতীয় বল– মিস! মুরলি সাক্ষাৎকারে বলেন, জীবনে কেউ যত হ্যাটট্রিক করে তার কয়েকগুণ বেশি হ্যাটট্রিক মিস করে। মানুষের জীবনের এ অমোঘ সত্যের সামনে দাঁড় করায় হ্যাটট্রিক।

সফল প্রেমের চেয়ে ব্যর্থ প্রেমের সংখ্যা দুনিয়ায় চিরকাল বেশি, সারাজীবনের চালচিত্রে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাও চিরকাল বেশি, জীবনের সেই সব মুহূর্তে, যেখানে এই একটুর জন্য না-হওয়ার আক্ষেপ– হ্যাটট্রিক সেখানে বন্ধুতার ভরসা। বারেবারে বুঝিয়ে দেয়া সারসত্য: ব্যর্থতার সংখ্যা বেশি হলেও সাফল্যের গুরুত্ব বেশি। তাই মুত্থাইয়া মুরলিধরনের হ্যাটট্রিক মিসের সংখ্যা বেশি হলেও জনমানসে থাকে তাঁর সফল হ্যাটট্রিকগুলিই, ইউটিউবে রোনাল্ডোর হ্যাটট্রিকের ভিডিও ঘোরে, মিসড হ্যাটট্রিকের নয়। বিভূতিভূষণের জীবনচেতনা যে পথকে দৃশ্যমান করে, পথের দেবতা যে-পথ দেখায় অপুকে, যেখানে যন্ত্রণার ঘাসজমির মাঝে এক-আধটা মাথা তুলে থাকা ঘাসফুল সুখ– সে পথ পেরতে হয় সকলকেই।

দুই সরলরেখায় বৃত্ত-জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা আজও করি। সেই ক্লাসরুমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আসে, যায় থেকে যায় এ চেষ্টা। তিন নম্বরটিকে ছাড়াই সম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা চলে নিরন্তর। হয় না কিছুতেই। এ সত্যটুকু যাঁরা অনুধাবন করেছেন, তাঁরা ক্লাসরুম ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আমরা বসে আছি, মেনে নিতে পারছি না অসম্পূর্ণতাকে।
হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণতাকে ঈর্ষা করতে শেখায়, সম্পূর্ণের সৌন্দর্যের দিকে ছুড়ে দেয় সম্ভ্রম। আবার একইভাবে ভালোবাসতে শেখায় অসম্পূর্ণতাকে। ইরফান পাঠানের ওই ম্যাজিকাল হ্যাটট্রিকের তৃতীয় বলটা হতেই পারত ওয়াইড বল, হতেই পারত একটা ফুলটস আবার মুরলিধরনের ব্যর্থ হ্যাটট্রিকের কোনও একটায় তৃতীয় বল ছিটকে দিতে পারত ব্যাটারের মিডলস্টাম্প– কিন্তু হয়নি।
জীবনের এই অমোঘ না-হওয়াটুকুর কাছে চিরঋণী করে রাখে হ্যাটট্রিক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved