আমি বাড়ি ছাড়লাম। সেখান থেকে হৃষীকেশ রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে হেঁটে হেঁটে এখানে আসতে দুই বছর লেগেছিল। তবু একধ্যানে চলেছি। থেমেছি। আবার চলেছি। একদিন পৌঁছলাম। চারিদিকে ফাঁকা জায়গার মধ্যে দেখতে পেলাম আমার গুরুকে।
১৯৭২-এর শুরু থেকে সে বাড়িছাড়া। তার কথার আভাস থেকে বাহাত্তরের কলকাতার ত্রাস গোপন রইল না। কলকাতা থেকে সে কোনও রকমে চেন্নাই, সেখান থেকে ভাগ্যের সঙ্গে ভেসে পড়ে পোর্ট ব্লেয়ার। গত সাত বছরে সে মায়ের কোনও খোঁজ জানে না। মাকে সে জানাতে চায় যে সে বেঁচে আছে, ভালো আছে।
চোখের জলের, রক্তের, অহৈতুকী ভালোবাসার, শুধু মানুষকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ ভালোবাসার, কত কাহিনি দেশের সমাজ-ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে রাখা আছে, কে সেইসব কথা বলবে? কোন স্মৃতিতে ঘর খুঁজে পাবে সেই কথাগুলো?
স্কুলে সরস্বতী পুজো পাইনি বলে কলেজে, তার ওপর হস্টেলে থাকার সুযোগে সেই অভাব উসুল করার সুযোগ ঘটত। গেটের ভেতরে বাগানের সামনে গাড়ি ঢোকার রাস্তার ওপর রাত্রি দুটো পর্যন্ত দল বেঁধে আলপনা দেওয়াও বারণ ছিল না। দেবীকে সাজানো শেষ করে ভোর চারটেয় ঘুমতে যাওয়া, সকালে উঠে অঞ্জলি না দেওয়া। ভগবান বলে কিছু নেই। অঞ্জলি দেব কাকে?
এমন আনন্দময় একটি অস্তিত্ব ছিল বাজার হেমব্রমের। কথা বলছেন, কাজ করছেন, গান করছেন। অমন মাপের শিল্পী, তবু দারিদ্র ছিলই ঘরে।
বয়েস হয়তো বছর সাতেক। পিঠের বোতাম ছেঁড়া জামার ওপরে পুরনো রং ওঠা সোয়েটার, দিনের মধ্যে বারতিনেক ওয়ার্ডে হইচই বাঁধে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। প্রতিবারই পাওয়া যায়, সে পালিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালের পাশে রাস্তার ওপরে বসা বাজারে।
ক্ষমতাকেন্দ্র না হয়ে ওঠার আদর্শকে মানবতার সঠিক চেহারা বলে নন্দিতা আজও বিশ্বাস করে। এইজন্য নিজের মতবাদ নিয়ে কোনও গোঁড়ামি নেই নন্দিতার মধ্যে, চারিপাশকে দেখতে দেখতে এক বিশ্বাসে স্থির থাকার জন্য বারে বারে নিজের বোঝাকে সে নমনীয় রেখেছে আজীবন। সত্যের চেয়ে নিজের ইমেজকে প্রধান করে তোলার পথ কখনও তার ছিল না।
এই জগতের প্রবেশদ্বার খুলে দিয়েছিলেন সেই দু’জন মানুষ– জীবনে একমাত্র যাঁকে আমি মাস্টারমশাই বলেছি, যদিও প্রত্যক্ষ ছাত্রী ছিলাম না তাঁর, আর অমলদা, পুরুলিয়া জেলা গ্রন্থাগারের অমলদা। কোনও দিন জানার কথা মনেও পড়েনি অমলদার পদাধিকার। কোনও দিন জানতে পারিনি যে আমার নিজের কার্ডে আমি বই পাই একটা আর মায়ের কার্ড থাকলে আরও একটা। বাকিগুলো অমলদা নিজের কার্ডে ইস্যু করে দেন!
প্রায় কিশোরী বয়সে ‘বেঙ্গল ফেমিন’-এর মানুষদের মুখ কি সারাজীবন রয়ে গিয়েছিল তাঁর মনে? নিজের জীবনে মেয়েদের স্থান আর মেয়েদের শক্তির বোধ থেকে? তাই যখন যেখানে মানুষকে অপমানিত লাঞ্ছিত হতে দেখেছেন, অমন তীব্রভাবে গর্জে উঠেছে তাঁর কলম? ভালোবাসায়? হ্যাঁ, তার মূলে ছিল আপ্রাণ ভালোবাসা।
ভূতযজ্ঞে গৃহস্থের ধর্ম তাই প্রতিদিন না-মানুষ কোনও একজনকে অন্নে প্রতিপালন করা। তাই গৃহস্থনিবাসে আসা ভিখারিরা, বৃত্তিজীবীরা, সন্ন্যাসী, পথিক– সকলের অন্নের যে কোনও ব্যবস্থা গৃহস্থেরই ধর্ম। তাই তো পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved