
মেলার প্রথম দিনে চিঁড়ে মহোৎসব। এদিন গোপালদাসের নামে ভক্তরা মালসা চড়ায়। পরের দিন মহামেলা। অন্ন মহোৎসব। এদিন গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষ চাল ডাল সবজি নিয়ে অন্ন মহোৎসবে মেতে ওঠেন মেলা প্রাঙ্গনে। প্রায় শতাধিক অন্নমহোৎসবের আখড়া বসে। মেলার চারপাশের মাঠে আখড়াগুলো বসে যায়। গোপালদাসের নামে হরি হরি বোল দিয়ে খেতে বসে যায় ধানকাটা জমির ওপরে হাজার হাজার মানুষ।
আলোকচিত্র: নির্মলেন্দু পাল
১৯.
জমে উঠেছে ৪৯-তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা; বিশ্বসাহিত্যের বিশ্বমিলন মেলা। অন্যদিকে মাঘমাসের সূচনা থেকে বাংলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ তেতে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নানা মেলায়। পয়লা মাঘের মকরমেলা থেকে শুরু করে মুড়িমেলা, মাছমেলা, ভাঙাচোরার মেলার পাশাপাশি বৈষ্ণবধর্মের বৈচিত্রময় মেলায় সরগরম গাঁ-বাংলার নানা জনপদ। তালিকায় সরস্বতী পুজোর পর মাকুরি সপ্তমী থেকে পূর্ব বর্ধমান জেলার দধিয়া বৈরাগ্যতলার রামায়েত বৈষ্ণব গোপালদাসের মেলা বিখ্যাত।

বর্ধমান জেলার বিভিন্ন ঋতুচক্রে প্রায় ৪৭০টি মতো মেলা বসে। এর মধ্যে শতাধিক মেলা বৈষ্ণব ঘরানার। বৈষ্ণবমেলা হলেও মকর সংক্রান্তির উদ্ধারণপুরের মেলার অন্যতম আকর্ষণ পিকনিক আর ছোলা মটরভাজার সস্তা পসার। বৈষ্ণব মহাজনদের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে আয়োজিত বৈষ্ণবমেলার ব্যাপ্তিকাল তিনদিনের। অনেক স্থানের মেলা ১৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। মেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভাঙামেলার বিকিকিনি; যেমন দধিয়া বৈরাগ্যতলার মেলা ভাঙামেলাতেই জমে বেশি।
যুগ যুগ ধরে আঞ্চলিক লোকশিল্পগুলির লালনভূমি এই অবহেলিত মেলাগুলি। কাটোয়া মহকুমার বা বর্ধমানের বৈষ্ণব মেলাগুলিকে কেন্দ্র করে নতুনগ্রামের দারুশিল্প কিংবা পাটুলির নাথ সম্প্রদায়ের বেলের মালাশিল্প কিংবা স্থানীয় মালাকার কুম্ভকারদের সৃজিত শিল্পসম্ভার প্রাচীনকাল থেকে আজও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

মেলাকে কেন্দ্র করে আজও বেঁচে আছে গ্রাম্য ছেলেপুলেরদের সস্তার খেলনাশিল্প। মেলায় আজও বিক্রি হয় পালেদের পুতুলশিল্প, স্থানীয় সূত্রধদের কাঠের তৈরি আসবাবপত্র থেকে খেলনা পালকি-গাড়ি-পুতুল আরও কত কী! মেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় কৃষিসম্পদের বিকিকিনি। বর্ধমানের শীতলগ্রামের ধনঞ্জয় পণ্ডিতের মেলায় কিংবা কাটোয়ার ফড়ে পঞ্চাননতলার মেলার অন্যতম আকর্ষণ শাঁখালু বিক্রি। কথায় আছে–
শীতলগ্রামের মেলা।
শাঁক আলুর ঠেলা।।
বাংলায় সরস্বতী পুজোর পরের দিন শীতলা বা সিজানো ষষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অখণ্ড বর্ধমান জেলার বৃহত্তম মেলা দধিয়া বৈরাগ্যতলার মেলাটি। লোকছড়ায় বলে,
সিজোনো খেয়ে উঠল ঢেউ
বরিগতলা যাবে কেউ?

মাকুরি সপ্তমী থেকে দেখা যায়, আশেপাশের গাঁ-গঞ্জ ভেঙে, যদ্দুর চোখ যায় ধান তুলে নেওয়া ফাঁকা মাঠের ধানগাছের লাড়ার বাধাকে থোড়াই কেয়ার করে, খালবিল পগার ডিঙিয়ে আট থেকে আশির যেন উদ্দাম জনস্রোত। বাস লরি ছোট হাতি ম্যাটাডোর ঘোড়গাড়ি অটো টোটো খটোমটো ভটভটি ভ্যান বাইক আর বাইসাইকেলে শুধু মানুষ আর মানুষ। সবার গন্তব্য দধিয়া বৈরাগ্যতলার মেলা।
চিঁড়ে মোচ্ছবের দিনে সকাল সকাল মেলার ব্যবসাদার থেকে শুরু করে গাঁ-গঞ্জের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বাবার নামে নতুন মালসায় ভোগ দেয় আর কাঁড়ি কাঁড়ি বাতাসা ছড়িয়ে হরির লুঠ দিয়ে সমবেত কণ্ঠে হাঁক পাড়ে– জয়! গোপালদাসের জয়! সে হাঁক ছড়িয়ে পড়ে মেলা থেকে মাঠে ময়দানে অগণিত মানুষের কানে।

কে এই গোপালদাস বাবাজি?
ইতিহাস তাঁর সম্পর্কে বড় নীরব। যে সব মাহাত্ম্য পুস্তিকাগুলি রচিত হয়েছে তার অধিকাংশই অলৌকিকতায় আচ্ছন্ন। ভক্তি আতিশয্য আর গালগল্পে বস্তু ইতিহাস উপেক্ষিত। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে মোটের উপর জানা যায় যে তিনি ছিলেন অবাঙালি রামায়েত বৈষ্ণব সাধক। কনৌজিয়া ব্রাহ্মণ। অনেকের মতে ১১৩৬ বঙ্গাব্দে গোপালদাসের জন্ম। অনেকেই আবার তাঁকে সপ্তদশ শতকের শেষার্ধের ব্যক্তি বলে দাবি করেছেন।
গোপাল না কি সন্তরাম আউলিয়ার কাছে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বৃন্দাবনবাসী। গোপালদাস গয়া প্রয়াগ এলাহাবাদ বৃন্দাবন ঘুরে শিষ্য ঠাকুরদাসকে নিয়ে বাংলায় চলে আসেন। প্রথম জীবনে গোপাল বীরভূমের পাকুরহাঁস মৈথুন পেঙো রানিহাটি প্রভৃতি গ্রামে বসবাস করেছিলেন। সাধারণ মানুষের মতো জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন। এই সময়ে তাঁর জীবনে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটতে থাকে।

যেমন পাকুড়হাঁস গ্রামে থাকাকালীন জনৈক পালমশাই নিজের বাড়িতে গুড়ের সামান্য পয়া অর্থাৎ মাটির জালা থেকে গোপালদাসের কৃপায় গাড়ি গাড়ি গুড় বিক্রি করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যান। সেই অলৌকিক পয়া গোপালদাসের নামে আজও পূজিত হয়।
গোপালের সাধন বিভূতি ছড়িয়ে পড়ার ফলে দলে দলে লোকজন আসতে শুরু করল। তিনি বিব্রত বোধ করেন। পাকুরহাঁস থেকে তিনি দধিয়াগ্রামের উত্তরে নিবিড় বনের মধ্যে গড়ে তুললেন পর্ণকুটির। ক্রমে বন কেটে রামায়েত বৈষ্ণবদের আখড়া বা মঠ প্রতিষ্ঠিত হয় স্থানটিতে। নতুন নামকরণ হয় বৈরাগ্যতলা মঠবাড়ি।

বর্ধমানের মহারাজা ত্রিলোকচাঁদ রায় মঠবাড়ির জন্য ৬৯ বিঘা জমি দান করেন। গোপালদাসের দেহান্তের পর আখড়ার মহান্ত হয়েছিলেন অবাঙালি শিষ্য ঠাকুর দাস। পরে লছমনিয়া রাজেশ্বর দাস প্রমুখেরা দায়িত্ব সামলেছিলেন মঠবাড়ির। তাঁদের সমাধি স্মারকগুলি মঠের প্রাঙ্গনে আজও দেখা যায়। গত শতকের শেষের দিকে অবাঙালি মহান্তদের আর দেখা যায় না দধিয়াবৈরাগ্যতলায়। এখন গ্রামের নবনিযুক্ত কমিটিই সারা বছর তদারকি করে গোপালদাসের আখড়া ও বিগ্রহাদির সেবাকার্য।
বর্ধমান বীরভূম সীমান্তে দধিয়া বৈরাগ্যতলা জনপদ। কাঁদরা থেকে পাঁচ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। সামনেই রতনপুর পিরতলা সংলগ্ন বাদশাহি সড়ক। মেলা প্রাঙ্গনটি কয়েক একর জমি জুড়ে বিস্তৃত। মঙ্গল ও শনিবারে হাট বসে। উত্তরদিকে এক কোণে গোপালদাসের সমাধি মন্দির আর রঘুনাথ জিউর দালান মন্দির।

গোপালদাসের সমাধি মন্দিরে খোদিত লিপি অনুসারে ২৩ কার্তিক গোপালের জন্মদিন। সময় সন নেই। এবং ১১২৬ সনে ২৭ পৌষ যোগমগ্ন অবস্থায় তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। প্রয়াণের দিনে তাঁর ইচ্ছানুসারে কেতুগ্রামের চরসুজাপুর থেকে এসেছিল দই আর নিকটবর্তী তিলডাঙা থেকে আখের গুড়। সেই ট্রাডিশন আজও সমানে বয়ে চলেছে। দু’টি দিনই ধূমধাম সহকারে সাড়ম্বরে পালিত হয়। প্রয়াণের আগেই তিনি তাঁর আরাধ্য রঘুনাথ সীতামাতাকে প্রতিষ্ঠা করেন আখড়ায়– মাঘী শুক্লা ষষ্ঠীতে তিথিতে।
পরবর্তীকালে এই দেববিগ্রহের সঙ্গে রাধাগোবিন্দ নাড়ুগোপাল এবং একশত আটটি শালগ্রাম শিলা পূজিত হতে থাকে। কথিত রয়েছে একাধিক বার চুরি হবার কারণে বর্তমানে বিগ্রহের সংখ্যা কমে গিয়েছে। বিগ্রহাদির প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই বৈরাগ্যতলার মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা।

মেলার প্রথম দিনে চিঁড়ে মহোৎসব। এদিন গোপালদাসের নামে ভক্তরা মালসা চড়ায়। পরের দিন মহামেলা। অন্ন মহোৎসব। এদিন গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষ চাল ডাল সবজি নিয়ে অন্ন মহোৎসবে মেতে ওঠেন মেলা প্রাঙ্গনে। প্রায় শতাধিক অন্নমহোৎসবের আখড়া বসে। মেলার চারপাশের মাঠে আখড়াগুলো বসে যায়। গোপালদাসের নামে হরি হরি বোল দিয়ে খেতে বসে যায় ধানকাটা জমির ওপরে হাজার হাজার মানুষ।
মেলা প্রাঙ্গনে জড়ো হয় আউল বাউল নেড়ানেড়ি সুফি দরবেশ ফকিরের দল। পরের দিন ধুলোট। হরিনাম আর হরির লুঠ দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। মেলা চলে আরও সপ্তাহ দুয়েক। মেলায় বাউল কীর্তন কবিগান যাত্রাপালার আসর বসে। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার লোকশিল্পের নানা ধরনের বস্তু সামগ্রী আসে ।

এক একটা বড় বড় পট্টি বসে– মিষ্টিপটি দোকানপট্টি জুতোপট্টি বাসনপট্টি জালপট্টি বাঁশ বেতের নানান সামগ্রী। কাঠের দরজা জানলা টেবিল খাট আলমারি ইত্যাদি। কৃষিজাত সামগ্রী লোহাপট্টি জাঁতা শিলনোড়া পাথরের দ্রব্যাদি মাছ ধরার সরঞ্জাম ইদানীং কম্পিউটার কুচিনা মেসিনপত্র ইত্যাদি।
পূর্বে স্টুডিওপট্টি হুকোপট্টি বসত। রাতে বসত জুয়োপট্টি। তাছাড়া পুতুলনাচ মরণকুয়ো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দশকর্মা সবজি এককথায় এলাহি কাণ্ড। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন বরিগতলার মেলা কী জিনিস।

বাংলা ১৩২৩ সালে ‘গৃহস্থ’ পত্রিকায় বৈরাগিতলার মেলা নিয়ে লিখেছিলেন ভোলানাথ ব্রহ্মচারী। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়– মিষ্টির দোকান ছ’-সাতশো, মনোহারি দু’শো, কাটা পোশাক একশো, পিতল-কাঁসার দোকান ৪০টি। এছাড়া শিল জাঁতা সার্কাস চিড়িয়াখানা থিয়েটার ইত্যাদি তো ছিলই। অন্ন মহোৎসব হত পাঁচ থেকে সাত মণ চালের। মেলা চলত মাসাধিক কালব্যাপী।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, মেলায় বারাঙ্গনা জমায়েতের কথা। কাটোয়া থেকে এক সময় নিয়মিত আসতেন জুনিয়ার কেরি সাহেব। মেলায় খ্রিস্টান ধর্মের কথা প্রচার করতেন।

বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলা যেন মেলার ক্লাইম্যাক্স। কিছুটা সস্তায় পাওয়া যায় বলে লোকে আরও ভিড় জমায়। মেলায় দোকানদারদের কথায় বাবা গোপালদাসের কৃপায় মেলার কোনও জিনিস অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকে না। বিশেষ করে এ অঞ্চলের একচেটিয়া নির্মীয়মান মাটির বাড়ির ঘরদোরের দরজা জানলা আসে বরিগতলার ভাঙামেলা থেকে।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে যেমন মেলার দোকানিরা আসেন, তেমনই ঝাড়খণ্ড বিহার উড়িষ্যা ছত্তিশগড় থেকেও অনেকেই নিয়মিত আসছেন বৈরাগ্যতলার মেলাতে।
………………..পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব………………..
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved