
পুরো কোপেনহেগেন শহরের গড় একিউআই নাকি মাত্র ৬। সিয়াটল ও স্টকহোমের ক্ষেত্রে এই সূচকের মান যথাক্রমে ১৫ এবং ১৭। ডাবলিন ও অকল্যান্ডে ১৯। মেলবোর্নে ২০। বিদেশ ভ্রমণের শেষে দেশের মাটিতে ফিরি। আমার জন্মভূমি। বাতাসের গুণমানে দিল্লির সূচক প্রায়ই থাকে ৩০০-র উপরে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের বুলেটিন বলছে, আজ বিকেল চারটের সময় কলকাতার একিউআই ২৬৬। মুম্বই ১০৬। চেন্নাই ১৮৭। গাজিয়াবাদ ৩৪৩।
২২ লাখের গাড়ি কেনার পরে আমার অনেক উচ্চপদস্থ এক কর্তা সন্ধেবেলা বললেন, ‘চলো তোমাকে একটা লিফ্ট দিই।’ মিনমিন করে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। তাঁর আগেই উনি আমার কাঁধটা ধরে বললেন, ‘আরে চলো না। একটা রোমাঞ্চকর, অভূতপূর্ব, অসামান্য নির্মাণ দেখাব তোমায়।’ ফ্যাশন প্যারেডে সুপার মডেলের আগমনের মতো চালু হল গাড়ি। স্টিয়ারিংয়ের বাঁ-দিকে একটি বিশাল স্ক্রিন। লুকিয়ে থাকা কোনও ল্যাপটপের পর্দা ভেবে ভুল করেছিলাম প্রথমে। আমাদের মধ্যে এর পরের কথোপকথন ছিল অনেকটা এরকম।
–হাঁ করে তাকিয়ে আছো ড্যাশবোর্ডের দিকে। কী দেখছ?
–বিস্ময়ে প্রাণ জাগছে স্যর। আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। অসাধারণ গাড়ি আপনার।
–দু’বছরের মধ্যে আবার পালটাব। ড্যাশবোর্ডে কী দেখছ?
–যে রাস্তায় যাচ্ছি সেই রাস্তার ম্যাপ। নেভিগেশন।
–আর?
–ইউটিউব থেকে যে ঝিনচ্যাক বাজনা বাজছে গাড়িতে, সেই ট্র্যাকের নাম।
–ধুস। আর?
–ফোনের কল-লগ উঁকি মারছে স্ক্রিনের ডানদিক থেকে। গাড়ি চালানোর সময় এই পর্দাই আপনার ফোন।
–রাবিশ। এজন্যই তোমার কিছু হল না। আর?
–ওই নিচে বড় বড় করে ফুটে উঠেছে ২৩ ডিগ্রি টেম্পারেচর। বাইরে তো ৪০। বিতিকিচ্ছিরি গরমে মনে হচ্ছে ঢুকে পড়লাম ইগলুতে।
–হায় রে! কোথা থেকে আসে এরা সব? আসল জিনিসটাই তো বলছ না তুমি।
–আর যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না, স্যর!
–বকোয়াশ্! ওয়েট।

মুহূর্তের মধ্যে নেমে গেল গাড়ির কাচ। আর কাচের ওদিকে থাকা চলন্ত গাড়ির হর্ন এই গাড়িতে ঢুকতে শুরু করল হুড়মুড় করে। আওয়াজের সঙ্গে যোগ্য যুগলবন্দিতে গাড়ির মধ্যে ঢুকতে শুরু করল বাইরের হাওয়া, পেট্রোল-ডিজেলপোড়া গন্ধ। কী আশ্চর্য! মেগা সিরিয়ালের শো-তে ঝনঝন ধ্বনির মতো পুরো ড্যাশবোর্ডে উড়তে শুরু করল একটা লাল পতাকা। বাঁ-দিকের কোনায় একিউআই বলে একটা লেখা দুম করে বড় হতে শুরু করল। মুহূর্তে ছাড়িয়ে গেল ৪০০। আগে কত ছিল? দেখিনি। মনে করতে পারছিলাম না। ওয়াক তুলে রাস্তায় থুতু ফেললেন আমার স্যর। কাচ উঠে গেল দ্রুত। একিউআই ফের নামতে শুরু করল।
–তুমি একিউআইয়ের ব্যাপারটাই খেয়াল করলে না? এই তোমার অবজার্ভেশন পাওয়ার? তুমি জানো, এই গাড়ি কেনার অন্যতম কারণ, এর এক্সিলেন্ট ইন-কেবিন একিউআই? অবশ্য পাঁচ-ছ’ লাখ টাকার গাড়ি চড়লে এর মর্ম তুমি বুঝবে কী করে?
কয়েক নিটের মধ্যে একিউআই আবার তিনে এসে ঠেকল। ৪০০ পার করার সময় ওই অক্ষরগুলো আলতা রং ধারণ করেছিল। এখন দেখি চিরহরিৎ বৃক্ষের মতো গাঢ় সবুজ। ফের মুখ খুললেন উনি।
–এই যে তিন একিউআই-এর মধ্যে বসে রয়েছ, তোমার অবাক লাগছে না? আশ্চর্য হচ্ছ না এই অসামান্য প্রযুক্তিতে?
–না…মানে…আসলে…বাইরেই তো থাকি বেশিক্ষণ…
মানুষটা যতই ভালো হোক, দেখেছিলাম তাঁর লাল ক্রুদ্ধ চোখ।
–নেমে যাও।
–এখনই? আমার বাড়ি আসতে তো এখনও তিন-চার কিলোমিটার, স্যর। আপনি তো ওই পথেই যাবেন।
–আবার বলছি। নেমে যাও আমার গাড়ি থেকে। এই যে। পার্ক করছি। নামো। কুইক।

কী হইতে কী হইয়া গেল। দরজা খুললাম। বন্ধ করার আগে ফ্যালফ্যাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম সাহেবের দিকে।
–যে সিঙ্গল ডিজিট একিউআইয়ের মানে বোঝে না, রোমাঞ্চিত হয় না, অ্যাপ্রিসিয়েট করে না, তার এই গাড়িতে চড়ার কোনও অধিকার নেই। সরি। এই দ্যাখো। ডাকছে তোমায় ৪৫০ একিউআই।
গাড়ি এগিয়ে গেল, মিলিয়ে গেল হুশ করে। চেয়ে রইলাম আমি। তীব্র গতিতে, প্রায় গায়ের উপর উঠে, হর্ন দিতে দিতে ছুটে চলা বাসের ড্রাইভার আমার দিকে ছুঁড়ে দিল, সাইডে, সাইডে। ফালতু লোক কোথাকার!
শ্বাস নিয়েছিলাম গাড়িতে। শ্বাস নিলাম রাস্তায়। তফাত কিছু বুঝিনি। বুকের ধুকপুক তিনে যা ছিল, ৪৫০তেও তাই। এআই প্ল্যাটফর্মে আমার এই সমস্যার কথা জানানোর পরে পর্দায় ফুটে এল, এমন অনুভূতি হলে আপনার লোকেশনের দু’ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আমি পাঁচজন চিকিৎসকের সন্ধান দিতে পারি। আপনার ফুসফুসের চিকিৎসা জরুরি।
একিউআই নিয়ে চর্চা না-করা পর্যন্ত শূন্য লাগছিল জীবন। এর পুরো নাম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স। বাতাসের গুণমান সূচক। তিনটে অক্ষর লিখে এন্টার মারতেই সার্চ-ইঞ্জিন উপহার দিল রাজধানী দিল্লির কিছু ধোঁয়াছবি। ক্যাপশন দেখে বুঝলাম, সেগুলো তোলা হয়েছে দীপাবলির পরের দিন। ধূম্রলেপিত সেই শহরের রাস্তাঘাটের কোনও দৃশ্যমানতা নেই। পথচলতি লোকের মুখ লেপ্টে রয়েছে মাস্ক। সঙ্গে থাকা খবরের হেডিং বলছে ভয়ংকরভাবে নেমে গিয়েছে বাতাসের গুণমান। পর্দায় উঠে এল আরও কিছু খবরের শিরোনাম। পড়ে বুঝলাম, বাতাসের মানের নিরিখে ‘দিল্লি বহুত দূর হ্যায়’ বললে এই শহরের বাসিন্দাদের ডাহা মিথ্যে কথা বলা হবে। বাজে বাতাসের প্রতিযোগিতায় কলকাতাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বায়ুর গুণমান নিয়ে আমাদের খুঁতখুঁতে হওয়ার শুরু প্রায় বছর ষাটেক আগে। সেটা গত শতাব্দীর ছয়ের দশক। প্রযুক্তির কল্যাণে হু হু করে বাড়ছিল শিল্প, বিশ্ব জুড়ে। তৈরি হচ্ছিল একের পর এক কারখানা। অর্থনীতির এক পরিচিত অধ্যাপকের কথায়, শিল্পের ভালো দিকটা কী বল তো? তা হল গাড়ির কাচ তুলে দিয়ে, এসি চালিয়ে লম্বা ড্রাইভের মজার মতো। তবে এর খারাপ দিকটা বোঝো তো ভায়া? গাড়ির পশ্চাদ্দেশে লাগানো পাইপের কথা মনে পড়ে? ভুরভুর করে বেরতে থাকে পেট্রোল-পোড়া, ডিজেল-পোড়া কালো ধোঁয়া। গাড়িতে বসে সেই ধোঁয়া টের পাওয়া যায় না। কিন্তু তা আছে পুরোদমে, সূর্য পোড়া ছাইয়ের মতো।
ছয়ের দশক থেকেই বিভিন্ন দেশে তৈরি হতে থাকে বাতাসের দূষণ মাপার স্কেল। এর আরও দেড় দশক পরে, ১৯৭৬ সালে চালু হয় পলিউশন স্ট্যান্ডার্ড ইনডেক্স, সংক্ষেপে ‘পিএসআই’। কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড-সহ আরও কিছু ক্ষতিকর গ্যাসের গায়ে খলনায়কের উর্দি পরিয়ে চলতে থাকে বাতাসের শুদ্ধতা মাপার পরীক্ষা। প্রসঙ্গত, অধিকাংশ পদার্থেরই জনক তৈরি হওয়া শিল্প। ‘একিউআই’ কথাটি প্রথম চালু হয় ১৯৯৯ সালে। তৈরি করা হয় ০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত একটি স্কেল। ০ মানে দারুণ শুদ্ধ। ৫০০-র অর্থ বিচ্ছিরি রকমের খারাপ।
বেশি একিউআইয়ের অসুবিধা নিয়ে চিকিৎসকদের কিছু বয়ান পড়ার সুযোগ হল অন্তর্জালে। জানলাম, বাতাসের গুণমান খারাপ থাকলে তা জন্ম দিতে পারে ফুসফুস, চোখ ও হার্টের বিভিন্ন সমস্যার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে ক্রমশ, মাথা ধরবে, হাঁপানি হবে। দ্রুত বশ করে ফেলবে ক্লান্তি। বাড়তে পারে রক্তচাপও। আর এই প্রতিটি আপাত ক্ষুদ্র সমস্যা কান চিরে দেওয়া শঙ্খধ্বনি বাজিয়ে আবাহন করবে আরও বড় কোনও বিপদকে। তবে দিল্লির এক চিকিৎসক তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে লিখছেন– বাতাসের গুণমানজনিত শারীরিক সমস্যার কথা বলে যখন লোকজনদের জ্ঞান দিই, সেমিনার করি, তখন প্রবল হাসি পায়। আমাদের জীবন জুড়ে ম্যানহোল। আর এই পাঁকের মধ্যে সাঁতরাতে সাঁতরাতে, কিলবিল করতে করতে আমরা ভাবি নিজেদের স্টেরিলাইজ করার কথা। কর্দমাক্ত জল স্বচ্ছ হয় কখনও? এর থেকে বড় কৌতুক দুনিয়ায় আর দু’টি নেই।

পুরো কোপেনহেগেন শহরটাই কি ২২ লক্ষের ওই দামি গাড়ির মতো? ওই শহরের গড় একিউআই নাকি মাত্র ৬। সিয়াটল ও স্টকহোমের ক্ষেত্রে এই সূচকের মান যথাক্রমে ১৫ এবং ১৭। ডাবলিন ও অকল্যান্ডে ১৯। মেলবোর্নে ২০। বিদেশ ভ্রমণের শেষে দেশের মাটিতে ফিরি। আমার জন্মভূমি। বাতাসের গুণমানে দিল্লির সূচক প্রায়ই থাকে ৩০০-র ওপরে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের বুলেটিন বলছে, আজ বিকেল চারটের সময় কলকাতার একিউআই ২৬৬। মুম্বই ১০৬। চেন্নাই ১৮৭। গাজিয়াবাদ ৩৪৩। আরও একটি অদ্ভুত তথ্য পেলাম। সত্যতা যাচাই করতে ভয় লাগছিল। কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের একটি ওয়েবসাইট বলছে, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখটিতে বাতাসের গুণমান অনুসারে বিশ্বের দূষিততম ৪০টি শহরের মধ্যে সবক’টিই ভারতের। রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর নামক একটি শহরের ক্ষেত্রে এই সূচক ছিল ৮৩০। এই পরিসংখ্যান ভৌতিক হলে সুখ পাব বড়।
মোবাইল ফোনের ওয়ালপেপারে ঘড়ির নিচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা থাকে চলতি একিউআই। আঙুল ছোঁয়ালে তা বড় হয়ে ওঠে, সাবধানবাণী-সহ। ২৬৬-র তলায় লেখা রয়েছে, বাতাসের গুণমান অত্যন্ত খারাপ। এক্সট্রিমলি পুওর। ঘরের মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন। দরজা-জানালা বন্ধ করে দিন। পাশে রাখা অফিসের ল্যাপটপ ব্যাগ আমার দিকে তাকিয়ে তির্যকভাবে হাসে। প্রেশার কুকারের ভোঁ বলে, জলদি। আরও জলদি। দেরি হয়ে যাচ্ছে এবারে। আমি জানি, মোবাইল ফোন আগামিকালও আমায় একই জিনিস দেখাবে। পরশুও। তার পরের দিনও। অত্যন্ত খারাপ বায়ুকেই প্রাণবায়ু করে নেব আমি, হয়তো আর কোনও উপায় নেই বলেই।

শুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে কি না জানি না। খারাপ থেকে অত্যন্ত খারাপের মধ্যে শ্বাস নিয়ে, এই বেশ ভালো আছি। ল্যানসেটের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে এদেশে প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। তাতে কী বা এসে গেল! একিউআই বাজারে একটি বহুলচর্চিত গল্পের কথা উল্লেখ করে শেষ করা যাক। মুম্বইয়ের নামজাদা রিয়েল এস্টেট সংস্থা খবরের কাগজে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছে সমুদ্র দেখা যায়, অর্থাৎ সি-ভিউ ফ্ল্যাটের বিক্রির জন্য। এক ক্রেতা এসে, বহুক্ষণ ফ্ল্যাট জরিপ করার পরে বললেন, এই সাঙ্ঘাতিক শুদ্ধ বাতাসে সবই যে ক্যান্ট সি ভিউ। কিছুই যে দেখা যাচ্ছে না মশাই।
কী যে জ্বরা লাগল আমার বাতাসে, কে জানে!
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন অম্লানকুসুম চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved