Robbar

শংকর শুধুমাত্র বিয়েবাড়ির উপহার আর শয্যাপাশের উপন্যাস?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 21, 2026 8:23 pm
  • Updated:February 21, 2026 8:24 pm  

শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসে একটি ক্ষয়ে যেতে থাকা ঔপনিবেশিক পরিসরে যে স্যাটা বোস আর সুজাতার মধ্যে যে ঘর বাঁধার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা ভেঙে পড়ে একটি প্লেন ক্র্যাশে। যেন ভাসমান মানুষের কোনও ঘর নেই, বিশ্বযুদ্ধ উত্তর এ পরবাসে। এই যে ‘হোটেল’ আর ‘ঘর’-এর বাইনারি, এই যে ‘প্রমোদ’ আর ‘প্রণয়’-এর বিরোধাভাস, এই যে নিরাশ্রয়তা আর নিরাপত্তার মধ্যেকার নিরন্তর দোলাচল, বিশ শতকীয় আধুনিকতাবাদের এই সকল চিহ্ন রয়েছে শংকরের ‘চৌরঙ্গী’-তে।

শৈবাল বসু

আমি তখন নবম শ্রেণি। হাম উঠল গা ভরে, বিছানায় শুয়ে পাঁচ দিনে পড়ে শেষ করেছিলাম যে প্রবল বই, তার নাম ‘চৌরঙ্গী’। মায়ের বিয়েতে পাওয়া উপহার। সেকালে বিয়েতে বই দেওয়ার চল ছিল। ‘সঞ্চয়িতা’ ছাড়া আর যেসব বই গেরস্থবাড়ির বিয়েতে লাল ছাপা কাগজের মোড়কে সোনালি ফিতের ফুল বুকে হাজির হত, তার প্রথম সারিতে থাকত শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ আর আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’। আর হ্যাঁ, বিমল মিত্তিরও থাকতেন তাঁর ‘সাহেব বিবি গোলাম’ নিয়ে। মা-মাসি-মামিদের বিয়েতে কেউ ‘চোখের বালি’ বা ‘ঘুণপোকা’ উপহার দিয়েছেন, বউভাতের পরদিন গোল হয়ে বসে রঙিন মোড়ক খুলে এরকম দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বরং একরাতের বাসি রজনীগন্ধার বাস-মাখা হাতে উন্মুক্ত হত ‘সোনার সংসার’ অথবা ‘একদিন হঠাৎ’।

তরুণ বয়সে যাদবপুরের ইংরেজি বিভাগে পড়ার কালে শংকর, আশাপূর্ণা– এসব নাম উচ্চারণ করলে জাত যাওয়ার ভয় যে ছিল না, সেকথা মিথ্যে নয় পুরোপুরি। একথা কবুল করতে দ্বিধা নেই, আমরা যারা ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির টুটুল অথবা শর্মিলা ঠাকুরের মুখে ‘এটা ভালো না খারাপ’ সংলাপে রিলেটিভ মরালিজম কিংবা ‘জন-অরণ্য’ ছবিতে রেডিওতে খালি গলায় রবীন্দ্রসংগীত প্রচার দেখিয়ে সত্যজিৎ রায় বেঠিক কিছু করলেন কি না– এই নিয়ে লবিতে ফাটিয়ে আঁতলামো করেছি, কিন্তু কেউই তখনও শংকরের টেক্সট দু’টি ছুঁয়ে দেখিনি। সেই শংকর, যিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জির চেহারার বর্ণনায় গায়ের রং প্রসঙ্গে একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক শ্লেষ বুনে দিতে পারেন তাঁর আপাত আটপৌরে গদ্যের হালকা চলনে। কীরকম? ‘মাথার চুলগুলো শুকনো অথচ কেমন শাসনে রয়েছে। ফেরিস সাহেবের মতো ফর্সা না হলেও চ্যাটার্জী সাহেবকে কালো বলা চলে না।’ শংকরের টেক্সট পড়তে গিয়ে দেখছি, কীভাবে তিনি প্লটের গাঁথনিতে মিশিয়ে রাখছেন তাঁর শেক্সপিয়র ট্রাজেডির পাঠ: যে শ্যামলেন্দু ভালোবাসত শেক্সপিয়র পড়তে, সে যখন নিজের কর্পোরেট উচ্চাশার কাছে সমর্পণ করে ক্ষমতার নিষ্ঠুর নোনাজল মেখে ফেলে– তার গভীর আত্মগ্লানি যে ভাষায়, যে রূপকল্পে দেখান শংকর, তাতে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠক পেয়ে যান অমোঘ শেক্সপিরীয় ইশারা।

‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর এবং বরুণ চন্দ

‘অন্ধকারে ভি আই পি রোড ধরে বেশ জোরে গাড়ি চালাতে চালাতে সৃষ্টিধর দেখল তাঁর সাহেব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন…’ আর যখন আজ এই লাইনটা কোট করছি, দেখতে পাচ্ছি ‘ভি আই পি রোড’, ‘সৃষ্টিধর’– এই নামবাচক শব্দগুলি কী তীব্র প্রতীক হয়ে উঠছে নায়কের ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার পাশে। এই শেক্সপিরীয় আত্মমোক্ষণ থেকে দূরে রাখেন সত্যজিৎ তাঁর শ্যামলেন্দুকে। সত্যজিতের শ্যামলেন্দু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার একরোখা মুখ, এমনকী, টুটুলের (শর্মিলা ঠাকুর) হাতঘড়ি খুলে ফেলার মুহূর্তও তাকে কোনও গভীর ভাঙনের কাছাকাছি নিয়ে যায় না। 

‘সীমাবদ্ধ’, ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’ এবং ‘জন-অরণ্য’ এই উপন্যাসত্রয়ীর একত্র মুদ্রণের ভূমিকায় শংকর লিখছেন:

‘আমাদের এই সমাজ আদর্শের স্বর্গ থেকে ক্রমশ নরকে অধঃপতিত হচ্ছে, এমন নিরাশার কথা কেউ কেউ তুলছেন। কেউ কেউ আবার সাময়িকতার উত্তেজনায় অসত্যের স্লিপিং পিল খেয়ে স্বপ্ন দেখছেন আমরা সবাই স্বর্গলোকের সুখী বাসিন্দা। আমার মনে হয়, স্বর্গ মর্ত্য পাতালের সিঁড়ি বেয়ে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন দিকে গমনাগমন করছেন; এবং কেউ অচেনা পথের তেমাথায় এসে গন্তব্যস্থানের ঠিকানা হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে রয়েছেন। সত্যসন্ধানী পাঠক পাঠিকা এইসব পথভ্রষ্টদের জটিল জীবনে দৃষ্টিপাত করলে আমার এ চেষ্টা সফল মনে করব।’

‘জনঅরণ্য’ ছবির পোস্টার

এই বয়ান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাঁর গল্প বলার লক্ষ্য নিছক ‘বিনোদন’ দান নয়, তাঁর কথাশিল্পের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে নিয়েছেন এক গভীর আত্মিক দায়, যে দায়ের উৎসে হয়তো বা থাকে তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণ-লগ্নতা, পাঁকের মধ্যে ফুটে ওঠা পদ্মটির ইশারা। তাই হয়তো আকাশবাণীতে মাতৃভাষা দিবসে তাঁর শেষ আলাপচারিতায় (https://www.youtube.com/watch?si=GTLyrKcvGqDUffyB&v=plL3u_ldH4I&feature=youtu.be) এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন– তাঁর সামাজিক উপন্যাস, তাঁর ব্যক্তিগত লেখা ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’-এর জন্য তাঁর পৃথক কোনও ভাষাভঙ্গির প্রয়োজন হয় না, বুকের ভাষাতেই আছে তার লেখার ভাষার অভিন্ন উৎসার।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঘুণপোকা’ উপন্যাস বই হিসেবে প্রকাশ পাওয়ার ছ’-বছর আগে শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ বই হিসেবে বের হয়। ‘ঘুণপোকা’য় মানুষের অবনমনের, ক্ষয়কীটের মতো পরিণতির যে মডার্নিস্ট দৃষ্টিকোণ মননশীল পাঠককে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা হয়ে উঠেছিল সারস্বত পরিসরের আলোচনার পৌনঃপুনিক কেন্দ্র, সেই দৃষ্টিকোণের নিরিখে ছ’-বছর আগে শংকরের বই ‘চৌরঙ্গী’-তে কলকাতার কলোনিয়াল হোটেলের ডাকসাইটে ইতালীয় ম্যানেজারের রাতের জীবন এইরকম:

“সাহেব সুর করে গাইতে লাগলেন
To Wilson or Spence’s Hall
On Holiday stay;
With freedom call the mutton chops and billiards play all day
The server catches from after the human jaldi Lao…

তারপর মদে চুর হয়ে যাবেন মার্কপোলো সাহেব। গেঞ্জি আর অন্তর্বাস পরা ওই বিশাল দেহটা দু’জন চাকরের পক্ষে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে। সাহেব গেলাস ভাঙবেন, শূন্য মদের বোতল মেঝেতে ছুড়ে ফেলবেন। রাম সিংহকে বুকে জড়িয়ে ধরে নাচবেন আর গাইবেন। তারপর হঠাৎ যেন তাঁর জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হবে। ‘ডার্লিং, মাই সুইট ডার্লিং’ বলে রাম সিংহকে চুম্বন করতে গিয়ে চমকে উঠবেন।”

‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে অঞ্জনা ভৌমিক ও উত্তম কুমার

এই আধুনিক উন্মোচন, এই বিশ শতকীয় ইউরোপীয় মডার্নিজমের ছিন্নশিকড় অবসাদ, ভিতর-বাহির অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের তীব্রগহন দোলাচল, শুধুমাত্র বিয়েবাড়ির উপহার আর শয্যাপাশের উপন্যাস? এমনকী, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের সিলেবাসেও শংকরের ‘চৌরঙ্গী’র ঠাঁই ‘জনপ্রিয় কথাসাহিত্য’-র তালিকায়। প্রশ্ন আসে, সাহিত্যপাঠের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে ‘জনপ্রিয় টেক্সট’ তকমাটি কি একটি রাজনৈতিক নির্মাণ নয়? এ ‘বাণিজ্যিক ছবি’ আর ‘আর্ট ফিল্ম’-এর বিভাজনের মতো? কৃষিআশ্রিত গ্রামীণ শিকড় আর ছিন্নমূল নাগরিক জীবনের মদ– এই দুইয়ের টানাপোড়েনের ট্রাজেডি হিসেবে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’কে দেখার বদলে নিছক ‘ব্যর্থ প্রেমের আখ্যান’ হিসেবে দেখা হয়েছে। শরৎচন্দ্র বাঙালি ঘরের মেয়ে-বউদের আত্মীয় হয়ে উঠেছেন, তার একটা বড় রাজনৈতিক কারণ হল– শিকড় উপড়ে পরবাসী হওয়ার ব্যথা মেয়েদের একান্ত। শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসে একটি ক্ষয়ে যেতে থাকা ঔপনিবেশিক পরিসরে স্যাটা বোস আর সুজাতার মধ্যে যে ঘর বাঁধার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা ভেঙে পড়ে একটি প্লেন ক্র্যাশে। যেন ভাসমান মানুষের কোনও ঘর নেই, বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর এ পরবাসে। এই যে ‘হোটেল’ আর ‘ঘর’-এর বাইনারি, এই যে ‘প্রমোদ’ আর ‘প্রণয়’-এর বিরোধাভাস, এই যে নিরাশ্রয়তা আর নিরাপত্তার মধ্যেকার নিরন্তর দোলাচল, বিশ শতকীয় আধুনিকত্ববাদের এই সকল চিহ্ন রয়েছে শংকরের ‘চৌরঙ্গী’-তে।

‘চৌরঙ্গী’ ছবির দৃশ্যে উত্তম কুমার ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়

বহু ভাষায় তরজমা হয়েছে যে বই, ব্রিটেনে বিদ্বজ্জন সভায় আমন্ত্রিত লেখক শুনেছেন, যে বই বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে হোটেলজীবন নিয়ে প্রথম উপন্যাস, সেই বই কি কেবলই গেরস্থরঞ্জক ‘বেস্ট সেলার’? আবার এ-ও মনে হয়, ভাগ্যিস তাই। আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’কে রাষ্ট্রীয় সম্মান এনে দিতে জুরি বোর্ডে একা লড়েছিলেন নবনীতাদি। নবনীতাদি আমৃত্যু ঘরের মেয়ে-বউদের পাঠরুচির কদর করেছেন। আমাদের মা-মাসিদের মতোই, তাঁর ভালোবাসার মানুষ দক্ষিণেশ্বরের গদাধর চাটুজ্জের মতোই, শংকর তাঁর গভীর চলা গোপন রেখেছেন। তাই তো তিনি মণিশংকর!

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন শৈবাল বসু-র অন্যান্য লেখা

…………………..