
খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল একটা দেশের স্বপ্ন। কঠিন অঙ্কের হিজিবিজিতে আটকে পড়া এক কালান্তক সময়। সেই দমবন্ধ পরিবেশে ডুবুরির মতোই ফিরে এল টিম ইন্ডিয়ার। ফিরে আসা তো অভিষেক শর্মারও। ব্যর্থতার চোরাবালি ঠেলে রানের শক্ত জমি তাঁরও তো দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল সমালোচনায় ভারী হয়ে আসা ড্রয়িংরুমে মারকাটারি ব্যাটিংয়ে দমকা বাতাস বইয়ে দেওয়া। অভিষেক পেরেছেন। পেরেছে তাঁর ব্যাট রানের গঙ্গা-যমুনা বইয়ে দিতে।
ফেরা। এক ধরনের আবিষ্কার। ভিড়ে নিজেকে খুঁজে বের করার অব্যর্থ রোডম্যাপ, অন্তরের গোয়েন্দাগিরি। অনেক দিন গুম থাকার পর, অনেকদিন ঘুম থাকার পর, স্বপ্নের অলিগলি ঘুরে যে-দু’টি চোখ আচমকা ঘুম-চাদর সরিয়েছিল, তারা জানে ফেরার তাৎপর্য কত গভীর। কোমা থেকে কমা, সরিয়ে ফেলে যে নিরন্তর হু-হা, অনর্গল বাঁচা, যতিচিহ্নহীন– সেই ফেরায়, আসুন পাঠক, মন দিই।
চিতার আগুনে সঁপে দেওয়া মুখ চিরকাল নির্বাক, নিশ্চল। তবু সে সচল পৃথিবীর কাছে ফেরার দাবি রাখে। সেই ফেরা আসলে স্মৃতির ঢেউ, পরিজনের গাল ছুঁয়ে নামে। দেওয়াল-ছবিতে, ফ্রেমে রয়ে যায় পিতৃমাতৃসন্তানপোষ্য প্রেম। প্রেম, ঢেউয়ের মতো, আসে-যায়। গোনাগুনতি তেমন হয় কি? প্রথম প্রেম, অপূর্ব প্রথম প্রেমও ভেঙেচুরে গিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থতে ফেরা যায় ঠিক। প্রেমে ফেরা।

স্টেশন ছেড়ে যাওয়া বিকেলের ট্রেনে যে তেলেভাজা, ঠোঙাভরা প্রতিশ্রুতি, আশ্বাসের সুর, তাতেও তো মিশে থাকে ঘরে ফেরার ঘ্রাণ। সেই কাগুজে ঠোঙায় নিরুদ্দেশ সম্পর্কে যে ঘোষণা, সেও যেন ঘরে ফেরে। ডালবড়া, মুড়ি, আলুর চপ– আর একজন নিরুদ্দিষ্ট মানুষকে দেখতে দেখতে, তাঁর সম্পর্কে দু’চার কথা জানতে জানতে বাড়ি ফেরা।
অঙ্ক কষলে দেখা যাবে ফেরার সরণ শূন্য। আসলে ‘ফেরা’ মানে নিজের অতীতের কাছে ধরা দেওয়া। শিকড়ের টানে ফিরলে শৈশবের দাগ গাঢ় হয়। কে না জানে, শৈশবের স্মৃতি চিরকালই নিষ্পাপ। সহজে রেখাপাত করে।
মাঝরাতের ল্যাম্পপোস্ট– তার কাছে আছে ফেরার চাবিকাঠি। অথচ তার নিজের ফেরার কোনও রাস্তা নেই। গঙ্গার ঘাটে ক্ষয়ে আসা মাটির প্রতিমা, বরাভয়মুদ্রা ছাড়া যার আর কিছু নেই পড়ে, সে-ও ফেরার প্রহর গোনে। কাঠামোয় পুরনো মাটি নতুন অবয়ব পায়।

আলসেমি ভরা ভরদুপুর জানে, কলেজ-ফেরত লাজুক মনের ফেরার গল্প। এমন অনন্ত ফেরার অপেক্ষা নিয়েই কি পথ চেয়েছিল দুষ্মন্তের শকুন্তলা? রামায়ণের পুত্রহারা অন্ধমুনি? কিংবা আজকের অভয়ার বাবা-মা?
‘ফেরা’ আসলে মাস্তুলহীন। দিকশূন্যপুরের যাত্রীর মতো তার চলন। ফেরা তাই কখনও কষ্টের রূপক, কখনও আনন্দের। নাগরিকপঞ্জির আঁকাবাঁকা দীর্ঘ লাইন ঘোলাটে চশমার আড়ালে ফেরার গল্প বলে। গল্পের শেষে একটা নটেগাছ। সে গাছ মুড়িয়ে গজিয়ে ওঠে কাঁটাতার। সেই বাধা পেরতে পারলেই দেখা মিলবে স্বপ্নের দেশ। ফেরার ঠিকানা লেখা আছে সেই দেশের গায়ে।
থিতু জীবনে অসমাপ্ত প্রেম আচমকা কড়া নাড়লে ফেরার আফসোস ঘনিয়ে ওঠে। তখন চাইলেও দাম্পত্যের ইমারত ভেঙে ফেরা যায় না অতীত আয়নায় কাছে। সমঝোতার জটিল মারপ্যাঁচে ফেরার পথ আরও গুলিয়ে যায়। যেমন গুলিয়ে যায় পথভোলা ভবঘুরের। অথচ ‘ফেরা’ তো চিরকাল নিজেকে খুঁড়ে দেখা। শাশ্বত সেই অভিযান। দিনের প্রথম সূর্যকে তাই ফিরতে হয়, রাতের গভীর অন্ধকারে। রাতের চাঁদ-তারাকে বেছে নিতে হয় আলোর আবডাল। শিশিরবিন্দুকে ফিরে যেতে হয় মাটির গভীরে। নিয়ত সেই ফেরা আসলে এক আবিষ্কার, ক্লান্তিহীন প্রবাহ।
ফেরা তো আসলে প্রত্যাবর্তনও। হারিয়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ানো। যেমন করে ঘুরে দাঁড়ায় লড়াকু যোদ্ধা রঙ্গমঞ্চে নজর কেড়ে নেওয়া পার্শ্বচরিত্র। কিংবা নিঝুমপাড়ায় ফেরিওয়ালার ডাক।

খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল একটা দেশের স্বপ্ন। কঠিন অঙ্কের হিজিবিজিতে আটকে পড়া এক কালান্তক সময়। সেই দমবন্ধ পরিবেশে ডুবুরির মতোই ফিরে এল টিম ইন্ডিয়ার। ফিরে আসা তো অভিষেক শর্মারও। ব্যর্থতার চোরাবালি ঠেলে রানের শক্ত জমি তাঁরও তো দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল সমালোচনায় ভারী হয়ে আসা ড্রয়িংরুমে মারকাটারি ব্যাটিংয়ে দমকা বাতাস বইয়ে দেওয়া। অভিষেক পেরেছেন। পেরেছে তাঁর ব্যাট রানের গঙ্গা-যমুনা বইয়ে দিতে। যেমনভাবে ব্যর্থতার ঘা সয়ে সাফল্যের সিঁড়ি চড়তে শিখে যায় ট্রেন-বাসের বাদুড়ঝোলা মুখ। যেভাবে প্রিয়জন-হারানোর শোক সামলে বিয়োগ-ব্যথায় অভ্যস্ত হয় আটপৌরে জীবন। এই আসা-যাওয়ার আলো-আঁধারে জীবন খুঁজে নেয় ফেরার পথ।
আপনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন? নিজের কাছে ফিরেছেন তো আজ?
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved