Robbar

ও আলোকচিত্রের পথযাত্রিনী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 7, 2026 9:39 pm
  • Updated:March 7, 2026 9:39 pm  

ছবি তোলা আজ শিল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রত্যহ অগুনতি ছবির ছড়াছড়ি, কতরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আজ ফোটোগ্রাফি নিয়ে। আজ তাই স্মৃতিমেদুর দীর্ঘ দৃষ্টিপাত সেই মানুষগুলোর যাপনের ওপর যাঁরা নিজস্ব প্রত্যয়ে ঘরের সঙ্গে সেতু বেঁধেছিলেন আরও অনেক ঘরের। নিজের অজান্তেই নাম লিখিয়েছিলেন সেই প্রথমাদের দলে, যারা নিঃশব্দে নীরবে লিখে যায় যুগবদলের খতিয়ান। একান্ত চারণে‌ আগামীর জন্য তুলে রাখে‌ সমকালের চালচিত্রখানি।

স্বাতী ভট্টাচার্য

‘ফটোগ্রাফী, অর্থাৎ আলোক সাহায্যে চিত্র করিবার পদ্ধতির আবিষ্কার হইয়া বৈজ্ঞানিক জগতে যে কিরূপ যুগান্তর হইয়াছে তাহা সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই অবগত আছেন। রসায়ন, জ্যোতিষ দেহতত্ত্ব, শিল্পকলা প্রভৃতি অতি আবশ্যকীয় বিষয়ের অনুসন্ধান করিবার পক্ষে এখন আর ফটোগ্রাফ ব্যতিরেকে কিছুই সম্ভব নহে।

ফটোগ্রাফীর আবিষ্কার হইলে, মানুষের যেন তৃতীয় নয়ন সৃষ্ট হইল। মানুষে যত প্রকার লিখিয়াছে, সূক্ষ্মতায় এবং সাদৃশ্যে কখনই ফটোর মত লিখিতে পারে নাই। এই লিখন পদ্ধতির লেখনী জ্যোতিঃ, এবং এই ফটোগ্রাফী অতি মনোহর শিল্প।’ 

‘ফটোগ্রাফী শিক্ষা’, আদিশ্বর ঘটক

 

‘চিত্রবিদ্যা’ বইয়ের আখ্যাপত্র

১৯১৬ সালে ইউরোপে ক্যামেরা আবিষ্কারের পর কেটে গিয়েছে অনেক দিন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশদের হাত ধরে এদেশে প্রচলন হল ক্যামেরার। সে অবশ্য মূলত এখানকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, দুর্গম বনজঙ্গল বা ভাঙাচোরা স্থাপত্য-কীর্তির ছবি তোলার জন্যই। ব্রিটিশ শাসনের সুবাদে সদ্য-ধনী পরিবারের তরুণরাও কৌতূহলী হয়ে উঠলেন এই যন্ত্রের ব্যবহার ও উপযোগিতা সম্বন্ধে। অনেকে কিনেও ফেললেন ক্যামেরা। তার করণ-কৌশল আয়ত্ত করে হাত পাকালেন‌, শখের তালিকায় জুড়ল আরও এক মনপসন্দ বিলাস। ফোটোগ্রাফি সেই প্রথম থেকেই ব্যয়সাধ্য, কিন্তু ছবি তুলতে কার-না ইচ্ছে করে! ছবির মধ্যে দিয়েই তো মানুষ অমরত্বের স্বাদ পেতে চায়। কাজেই সাহেবদের আবিষ্কার করা এই যন্ত্র– যা দিয়ে না কি অবিকল মানুষের মুখ কিংবা চেহারার ছবি তোলা যায়, আর সে ছবি সাজিয়েও রাখা যায়। এ যন্ত্র একইসঙ্গে বিস্মিত ও মুগ্ধ করল সাধারণ মধ্যবিত্তদেরও; আর সেই তাগিদে ঔপনিবেশিক ভারতে সাহেবদের দৌলতেই খোলা হল বেশ কয়েকটি স্টুডিও। যন্ত্রপাতি ঘাড়ে করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছবি তোলার জন্য ভারতীয় ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্যামেরাম্যানদের দেখা পাওয়া যেতে লাগল। বাঙালির ছবি তোলার হিড়িক যে কতদূর ছিল, তার জলজ্যান্ত (না কি স্থবির!) প্রমাণ তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পরের সেই ছবিটি, যেখানে তাঁর মৃতদেহটি বসানোর ভঙ্গিতে ধরে ছবি তোলা হয়েছে।

শ্মশানে তোলা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মরদেহের ছবি

তবে শুধু কি বাবুদেরই ছবি তোলা হত? এ প্রশ্ন স্বাভাবিক, কারণ এ সেই‌ সময়কার কথা যখন শিক্ষার আলো সবে প্রবেশ করছে অন্তঃপুরের অন্তঃস্থলে। এ সেই যুগের কথা যখন অন্তঃপুরে আলোছায়ার পর্দার ঘেরাটোপ, স্বামীকে দেখে তো বটেই (প্রথম মহিলা আত্মজীবনী-লেখিকা রাসসুন্দরী দাসীর লেখা থেকে যেমন জানা যায়), স্বামীর ঘোড়ার সামনেও গলা অবধি ঘোমটা টানাই ছিল দস্তুর। গঙ্গাস্নানে যেতে হলেও অভিজাত ঘরের মেয়ে-বউদের পালকি সমেত গঙ্গায় চুবিয়ে আনা হত পরপুরুষের দৃষ্টিপাতের আশঙ্কায়। তবু অল্প হলেও আলোকপ্রাপ্ত পরিবারগুলিতে স্ত্রীশিক্ষার চল বাড়ছে তখন, অন্দরের চিকে-ঢাকা খড়খড়ির মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়ছে খোলা আকাশ। বাবুদের সঙ্গে বিবিদের, অথবা ছেলেমেয়ে ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে তোলা পারিবারিক ছবির চাহিদা বাড়ছে ক্রমশ। কিন্তু আজকের এই বোতাম টিপে সেলফি তোলার যুগে, সেসময় কেমন করে তোলা হত সেইসব মহিলার ছবি, তা কল্পনা করা কঠিন। এবং সেই বিবরণ কিঞ্চিৎ হাস্যকরও বটে।

১৯২০ সালে অন্নপূর্ণা দত্ত-র তোলা ছবি। সিদ্ধার্থ ঘোষের সংগ্রহ থেকে

পর্দাঘেরা পালকিতে চড়ে ধনী-সম্ভ্রান্ত বংশের নারীরা স্টুডিওতে ছবি তুলতে যেতেন। সেই আবদ্ধ স্টুডিও-র আলোকচিত্রীও নারী। প্রথম দিকে সেই মহিলা ফোটোগ্রাফার পুরুষটিকে সাহায্য করতেন। কোনওমতে ছবিটি তুলেই পুরুষ ফোটোগ্রাফার বিদায় নিতেন। পালকির ঝাঁপ পড়ত, বিবি ফিরে যেতেন ঘরে। অন্তঃপুরের এই ধরনের ঘেরাটোপের জীবন নিছক বাঙালি অন্তঃপুরিকাদের ভাবলে ভুল‌ হবে, বরং একে সামগ্রিকভাবে ‘ভারতীয়’ অন্তঃপুরের চিত্র বললেই ঠিক হয়। কাজেই এই পরিপ্রেক্ষিতে নিরুচ্চারে প্রয়োজনের দাবি উঠল। মহিলা ফোটোগ্রাফারের দাবি। আশ্চর্য, সেই নীরব প্রত্যাশার আবেদনে সাড়া দিলেন বেশ কয়েকজন মহিলা ছবি-তুলিয়ে। আশ্চর্য এই কারণেই যে, তখনও বাল্যবিবাহ সমধিক প্রচলিত, পাছে লোকে কিছু বলে সেই জন্য শত গণ্ডির বলয় মেয়েদের চারদিকে। স্বাভাবিকভাবেই এই বাংলায় মূলত কিছু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলা এ ব্যাপারে পথিকৃতের ভূমিকা নিলেন। এঁদেরই‌ একজন মিসেস ই. মায়ার– তাঁকেই ভারতের প্রথম পেশাদার মহিলা ফোটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট কর্নারে নারীদের জন্য স্টুডিও খুলে ফেললেন তিনি। পালকির পর্দা ফেলে বাইরের পথটা পার হলেও, ভারতবর্ষের প্রথম জেনানা স্টুডিও-র চৌকাঠ পেরিয়ে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে হাঁফ ছাড়তে পারতেন তাঁরা।

অন্নপূর্ণা দত্ত-র তোলা সেল্ক-পোর্ট্রেট, ১৯২০

মেয়ারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ধীরে ধীরে বাঙালি মহিলারাও এগিয়ে এলেন, উৎসাহী হয়ে উঠলেন ফোটোগ্রাফি চর্চায়। সরোজিনী ঘোষ, অন্নপূর্ণা দত্ত, চঞ্চলাবালা দাসীর মতো সম্ভ্রান্ত কিংবা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরাও পেশা হিসেবে বেছে নিলেন ফোটোগ্রাফি। এঁরা শুধু ঘরের বাইরে দু’-পা ফেললেন না, এরকম একটি ব্যতিক্রমী পুরুষকেন্দ্রিক কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন; বা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয় দিলেন। 

১৮৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি অমৃতবাজার পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপন লক্ষ করার মতো, মিটার কোম্পানি ফটো আর্টিস্টস্‌ ১০৭ রাধাবাজার স্ট্রিট ক্যালকাটা পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন– 

‘Execute orders of every description with artistic neatness and elegance at a moderate rate. Ladies are photographed by accomplished female artists either in our studio or at their own houses. Outdoor and Mofussil orders are undertaken.’

এই বিজ্ঞাপনে দু’টি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা ছবি তোলাতে আসছেন নিঃসন্দেহে তাঁরা অভিজাত বংশীয় ভদ্রমহিলা (লেডিস)। কিন্তু যাঁরা ছবি তুলছেন, তাঁরা তো ঘরছাড়া, অর্থোপার্জনের জন্য কাজ করতে আসা, সমাজে খাপ না-খাওয়া মহিলা। অবশ্য ছবির মান যথেষ্ট উন্নত, এ জন্য তাঁদের নামের পাশে ‘আর্টিস্ট’ অভিধাটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের ‌তোলা ছবি‌ যে নিতান্তই অশিক্ষিতপটুত্বের নিদর্শন, সেকথা ভাবলে বোধহয় ভুল হবে। বিবি উইন্স এ ব্যাপারে পথিকৃৎ। তিনি তার স্টুডিওতে ছবি তোলা শেখাতেন মহিলাদের এবং সেজন্য খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনও দিতেন। সে বিজ্ঞাপনের বয়ান খানিক দেখে নেওয়া যাক–

Mrs Wince, practical photographer is prepared to give  lessons in the art of  photography to ladies and gentlemen at their own houses, or to  conduct  class either in town or mofussils.
Portraits taken  at ladies’ own houses.
Terms on application to Mrs. Wince,
care of Messrs W Newman & Co. 4 Dalhousie Square.

পরবর্তীতে ব্রাহ্মসমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘গ্রিনেন্স আর্ট ইনস্টিটিউট’ নামে একটি সংস্থায় মেয়েদের ফোটোগ্রাফি শেখানো হত। ৮৩ মানিকতলা স্ট্রিটে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের হোস্টেলে শুরু হল এই সংস্থার শিক্ষাদান। সদ্য জাপান থেকে ফিরে আসা নগেন্দ্রনাথ মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী মনোরমা দেবী এটির দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই সংস্থার চেয়ারম্যান। কৃষ্ণকুমার মিত্র ও বেঙ্গল পঠনের প্রতিষ্ঠাতা সত্যসুন্দর দেব ছিলেন কমিটির সদস্য। এছাড়াও সেখানে টাইপিং এবং ঘড়ি মেরামতির কাজও শেখানো হত।

আদ্যিকালের মহিলাদের ফোটোগ্রাফ

এ তো গেল শহর কলকাতার কাহিনি। কিন্তু শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে ত্রিপুরা রাজবাড়ির অন্তঃপুরের নিভৃতে বসে রাজা বীরচন্দ্রমাণিক্যের তৃতীয়া পত্নী খুমান চানু মনোমোহিনী দেবী, নিতান্ত কিশোরী বয়সেই রপ্ত করে ফেললেন ক্যামেরার কারিকুরি। বিয়ের সময় রানীসাহেবার বয়স ছিল মাত্র ১৩, বীরচন্দ্রমণিক্যের ৫০। মহারাজের ছিল ছবি তোলার অদম্য নেশা। ভারতবর্ষে আসা প্রথম দু’টি ক্যামেরার একটি সংগ্রহ করেছিলেন তিনি, শিখেছিলেন ছবি তোলা থেকে প্রিন্ট করা পর্যন্ত সবকিছুই। খুলেছিলেন ক্যামেরা ক্লাব, আর তাঁর এই শখের সঙ্গী ছিলেন মনোমোহিনী। তিনিও শিখেছিলেন করণকৌশল। তাঁদের দু’জনের সেলফিটি সে যুগের তুলনায় বেশ আধুনিক। ছবিটি অবশ্য রাজামশাইয়ের তোলা। তাঁর হাতে রয়েছে ক্যামেরা চালু করবার দণ্ডটি। 

ইন্ডিয়ান ফোটোগ্রাফিক সোসাইটিতে পাঠানো হয়েছিল তাঁদের দু’জনের কিছু ছবি। সেই সঙ্গে ছিল রাজসচিব রাধারমণ ঘোষের একটি চিঠি। ইংরেজিতে লেখা সেই চিঠির শেষে N. B. দিয়ে লেখা ছিল–

1. photos having a red coat of arms and bearing a pencil cross mark are printed by her highness from the Maharaja Bahadur negatives.
2. photos wearing quote of arms mark only are printed by her highness from her own negatives.

স্বাভাবিক কারণেই তাই মনোমোহিনীকে ভারতের প্রথম মহিলা ফোটোগ্রাফারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন শখের ফোটোগ্রাফার। রাজবাড়ির বাইরে গিয়ে ছবি তোলার স্বাধীনতা তাঁর ছিল না-বলেই তাঁর উত্তরপুরুষরা অনুমান করেন। যদিও তাঁর এক উত্তরসূরি প্রজ্ঞা দেবীর মতে, রাজবাড়ির দেউড়ির বাইরে কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে, এমন একটি ছবি ওঁরই তোলা। হতে পারে, হয়তো সেভাবে পর্দানশীন ছিলেন না তিনি। ছবির মাধ্যমে তিনি নিজস্ব একটি পরিচিতি সেযুগে গড়ে তুলেছিলেন। কারণ পুরোপুরি প্রফেশনাল না-হলেও, বিভিন্ন প্রদর্শনীতে ছবি পাঠানোর মধ্যে দিয়েও ফোটোগ্রাফির প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অবশ্যই লক্ষ করা যায়।

কিন্তু প্রথম পেশাদার বাঙালি মহিলা ফোটোগ্রাফার বললে সরোজিনী ঘোষের কথাই বলতে হয়। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে তাঁর ‘মহিলা আর্ট স্টুডিও’ সেকালের অভিজাত মহিলাদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। অমৃতবাজার পত্রিকার একটি সংখ্যায় সরোজিনী ঘোষ ও তাঁর মহিলা স্টুডিও সম্বন্ধে একটি রিপোর্টও পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর ছবি তোলার কুশলতার কথা বলা হয়েছে। সুদক্ষ শিল্পী। মুগ্ধ হওয়ার মতো কাজ। ফিনিশিং লক্ষ করলে ফোটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। তবু এই মহিলার জীবনকাহিনি শুনলে সমবেদনায় মন ভরে যায়। 

স্টুডিও-র পক্ষে সরোজিনীর এই রিপোর্টটি নিশ্চিতভাবে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু আজ তা পড়তে গিয়ে খটকা লাগে, কারণ তাঁর কাজের প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কথা যে উল্লেখ করা হয়েছে, সে কি নিছক সহানুভূতি আকর্ষণের জন্য? না ‘গৃহলক্ষ্মী’র এহেন পেশা বেছে নেওয়া যে নিতান্ত দায়ে পড়ে, সেকথা জানিয়ে এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি দানের প্রয়াসে? ১৮৯৯-এর ফেব্রুয়ারিতে ওই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘মহিলা আর্ট স্টুডিও অ্যান্ড ফোটোগ্রাফিক্স স্টোর’-এর বিজ্ঞাপনটিও লক্ষ করার মতো–

‘Shrimutee Sarojini deserves encouragement and patronage at the hands of her country men…
Bromide enlargements planotypes photographs on silks etc are executed in effective style and at moderate rates.
Photographic chemicals wholesale and retail.
Best quality guaranteed
Best value warranted.’

এই বিজ্ঞাপনটি তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ও নিষ্ঠা সম্পর্কে আমাদের অনেক কথা জানায়। তিনি অন্তঃপুরিকাদের কাছে গিয়ে তাঁদের ছবি তুলে আনতেন– এমন কথাও অমৃতবাজারের রিপোর্টটিতে জানা গিয়েছে। স্বদেশি পত্রিকা, দেশীয় মহিলা আলোকচিত্রীর কাজকে উৎসাহিত করছেন এবং অন্যদের তার কর্মকুশলতা সম্বন্ধে সচেতন করছেন– এর মধ্যে ক্ষীণ হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়।

সরোজিনীর থেকে বেশ কয়েক বছরের ছোট অন্নপূর্ণা দত্ত-র ভূমিকাও আলাদা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি ছিলেন অধ্যাপক-কন্যা। যদিও তাঁর বাল্যজীবনের সংবাদ তেমন কিছু জানা যায় না, তবু অনুমান করা যায় তিনি লেখাপড়া জানতেন। সেকালের প্রথা অনুসারে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় উপেন্দ্রনাথ দত্ত-র সঙ্গে। উপেন্দ্রনাথ পেশায় উকিল হলেও নেশায় ছিলেন ফোটোগ্রাফার। চিত্রশিল্পেও ঝোঁক ছিল তাঁর। সম্ভবত স্বামীর কাছেই ফোটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি হয়েছিল অন্নপূর্ণার। তিনি কিন্তু তাঁর শখকে পেশায় পরিণত করতে দ্বিধা করেননি। মনে রাখতে হবে, সময়কাল বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক। তখনও বাঙালি মেয়েরা পেশাদারি জগতে আসার কথা প্রায় ভাবতেই পারত না। অন্নপূর্ণা শুধু যে এমন একটি পেশাকে বেছে নিলেন তা-ই নয়, তিনি তাঁর শিক্ষা ও জ্ঞানকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে সেটিকে অর্থোপার্জনের মাধ্যম করে তুললেন। তিনি ছবি তুলতেন, পাশাপাশি ডার্করুমে প্রসেস করে তুলে দিতেন গ্রাহকদের হাতে। ভদ্রঘরের মহিলা হবার সুবাদে অনায়াসে তিনি পৌঁছে যেতেন অন্তঃপুরে। অন্তপুরের মহিলারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তাঁর সামনে। অন্যদিকে তখনও বাঙালি সমাজে জাতপাতের বিভাজন যথেষ্ট। ধর্মের গোঁড়ামিও নিতান্ত কম ছিল না, অন্নপূর্ণা কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা করতেন না। অনায়াসে প্রবেশ করতেন মুসলিমদের জেনানা মহলে। অবশ্যই সে দলে হাসান‌ সুরাওয়ার্দি বা গায়ক আব্বাসউদ্দীনের মতো শিক্ষিত, উন্মুক্ত মনের মানুষের পরিবারও ছিল। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের মেয়েরাও তাঁর আলোকচিত্রের আলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন না। যদিও সেসব ছবিতে তাঁদের হিজাব পরিহিত অবস্থায় দেখা যেত। হয়তো সেসব‌ ছবি জেনানা‌ মহলের চৌকাঠও পেরত‍‌ না। ঘোরাফেরা করত‌ পরিচিতজনদের মধ্যেই। তবু যুগের‌ প্রেক্ষিতে‌ তাই-বা‌ কম কীসে!

বাড়ির মহিলাদের নিয়ে সেকালের গ্রুপ ফোটো

সংসারের সব দায়িত্ব সামলেও, মাথার ওপর ঘোমটা তোলা সাধারণ বাঙালি ঢঙে শাড়ি পরা অন্নপূর্ণার নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে কতটা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল– সে ইতিহাস কালের গর্ভে, সময়ের স্রোতে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তথাপি সহজেই অনুমান করা যায়, পুরুষশাসিত সমাজে, পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াইটা মোটেই সহজ ছিল না। আপাত শান্ত চেহারার মধ্যে লুকিয়ে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং আত্মবিশ্বাস। গত শতাব্দীর তিন-চারের দশকে তাঁর ছবির কদর ছিল ঘরে ঘরে। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নিজের ঘরের সঙ্গে সেতুবন্ধন ঘটিয়েছিলেন সেইসব মেয়ে, যারা তখনও চার দেওয়ালের মধ্যে নানা দৃশ্যকে সাজিয়ে নিয়ে, বৃহত্তর বিশ্বের স্বাদ নিতে চাইছেন। অন্নপূর্ণা তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন সেই বহির্বিশ্বের একঝলক সোনালি আলো, হয়ে উঠেছিলেন শ্রদ্ধা এবং সম্মানের ‘ফটোগ্রাফার মাসিমা’। তাঁর ছবির চরিত্রদের তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে। যেহেতু তাঁরা বেশিরভাগই ছিলেন অভিজাত ঘরের মহিলা, তাদের পারিবারিক বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তোলার ওপর জোর দিতেন। ব্যবহার্য জিনিস, আসবাবপত্র এবং সামগ্রিক অন্দরসজ্জার মধ্যে দিয়ে সে যুগের সামাজিক প্রেক্ষিত তুলে ধরতে পারতেন। একজন নারীর স্বাভাবিক বোধ ও অভিজ্ঞার নিরিখে তিনি জানতেন গৃহের পরিবেশ বা অন্দরসজ্জার সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে থাকে মেয়েদের ভালোবাসা, কত গভীর সে সম্পর্ক, কত ভালোবাসার স্পর্শ লেগে থাকে তার ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসে। সেই সামগ্রিকতার ছবিটিই ধরতে চাইতেন। ছবিটি কম্পোজ করার সময় প্রতিটা ডিটেইলের প্রতি লক্ষ থাকত তাঁর। তাঁর তোলা যে-কয়েকটি ছবি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে নারকেল গাছের তলায় শায়িতা এক বৃদ্ধার ছবি, পাশে বসে তাঁর মধ্যবয়সি সঙ্গিনী বা দাসী। বৃদ্ধার জীবনবিমুখ অভিব্যক্তিটি সুন্দর ধরা পড়েছে ছবিটিতে। তাঁর পায়ের তলার দামি গালিচাটির উজ্জ্বল উপস্থিতি ফোটোগ্রাফটিকে অন্য একটি মাত্রা দিয়েছে।

……………………………………..

সেকালে অর্থাৎ থিয়েটারের প্রথম যুগে অনেক সময় এই অঞ্চলের অভিনেত্রীরা নারী চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন। যেহেতু মঞ্চে অভিনয় সেযুগে অর্থাৎ রবীন্দ্র-পূর্ব যুগে ভদ্র মহিলাদের কাছে নিতান্তই ব্রাত্য ছিল। কিন্তু এই অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কলকাতার ধনী জমিদার বা বাবুদের রক্ষিতা। তাঁদেরও তো ইচ্ছে করত, যে সামাজিক স্বীকৃতি তাঁরা পাননি– সেই স্বীকৃতির যে অভিনয়টুকু প্রতি রাত্রে হয়ে চলে সেইটুকু ধরে রাখার। চঞ্চলাবালা দাসীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল সমাজের এইসব উপেক্ষিতা মেয়ের জীবনের ছবি।

……………………………………..

সরোজিনী নাইডুর ছবিও তুলেছিলেন তিনি। গলায় ফুলের মালা, এলায়িত ভঙ্গিতে বসে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য কোনও অনুষ্ঠান থেকে ফিরেছেন। কংগ্রেস নেত্রীর অপর একটি আলোকচিত্রের কথাও এখানে উল্লেখ করা যায়। কংগ্রেসের কোনও এক অধিবেশনের পর সেখানকার নেতানেত্রীদের সমবেত একটি আলোকচিত্র। ছবির পিছনে সই করা আছে মিসেস এ. দত্ত। ছবিটিতে সরোজিনী নাইডু, নেলী সেনগুপ্ত, মিসেস সুরাওয়ার্দি এবং নেতাদের মধ্যে হাসান সুরাওয়ারদি এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্রকেও দেখা যাচ্ছে।

১৯৩৭ সালে সুহরাওয়ার্দি হাউসে নেতাজী সুভাষচন্দ্র ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সরোজিনী নাইডু ও মহিলা নেতৃস্থানীয়রা

তবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে আলোকচিত্রটি, সেটিকে আজকের ফোটোগ্রাফির ভাষায় বলা যায় ‘সেলফি’। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে একটি প্লেট-ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অন্নপূর্ণা দেবী। তাঁর হাতে লেন্সের ঢাকনা। পরনে গৃহবধূর সাজ। মুখে দমিত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসি। এ ছবিটি যেন তাঁর সমস্ত জীবনের লড়াইয়ের প্রতীকী।

এবার আসি এমন একজনের কথায় যিনি সব অর্থেই ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি ছিলেন অধুনা প্রমথের বর্ডার স্ট্রিটের বাসিন্দা, যা সেকালে ‘হাড়কাটা গলি’ নামে পরিচিত ছিল। কলকাতার পুরনো দিনের গল্প যারা জানেন, তারা এই রাস্তাটির নাম সম্বন্ধে অবহিত আছেন। এখনও এই অঞ্চল মূলত যৌনকর্মীদের বাসস্থান। সেকালে অর্থাৎ থিয়েটারের প্রথম যুগে অনেক সময় এই অঞ্চলের অভিনেত্রীরা নারী চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন। যেহেতু মঞ্চে অভিনয় সেযুগে অর্থাৎ রবীন্দ্র-পূর্ব যুগে ভদ্র মহিলাদের কাছে নিতান্তই ব্রাত্য ছিল। কিন্তু এই অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কলকাতার ধনী জমিদার বা বাবুদের রক্ষিতা। তাঁদেরও তো ইচ্ছে করত, যে সামাজিক স্বীকৃতি তাঁরা পাননি– সেই স্বীকৃতির যে অভিনয়টুকু প্রতি রাত্রে হয়ে চলে সেইটুকু ধরে রাখার। চঞ্চলাবালা দাসীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল সমাজের এইসব উপেক্ষিতা মেয়ের জীবনের ছবি। সিদ্ধার্থ ঘোষ তাঁর ‘ছবি তোলা/ বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চা’ বইতে খুশির সঙ্গে বিনোদিনীর একটি ছবি মুদ্রিত করেছেন। ছবিটি চঞ্চলাবালার তোলা কি না, জানা যায় না। কিন্তু তিনি যেমন বলছেন, ‘অনেকের মুখে শুনেছি বাংলা রঙ্গমঞ্চের সিনেমার প্রাচীন অভিনেত্রীদের অনেকের বাড়ির দেওয়ালে ঝুলত বিরাট ব্রোমাইড এনলার্জমেন্টে বাবুর সঙ্গে তাদের ছবি।’ ভিতু চঞ্চলাবালার স্টুডিও ছিল এই পাড়াতে। তাই সেখানে তথাকথিত ভদ্রমহিলাদের পদার্পণ ঘটেনি। হয়তো জীবিকার প্রয়োজনে তিনি এঁদের ছবি তুলতেন। হয়তো তিনিও দেহোপজীবিনীই ছিলেন। কিন্তু কোথা থেকে তিনি ক্যামেরা জোগাড় করেছিলেন, কোথায় শিখেছিলেন ছবি তোলা– সেইসব তথ্য চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে। তিনিও হয়তো ছিলেন ‘শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত’ গ্রন্থের মানদার মতো সুশিক্ষিত কেউ; ভাগ্য বিড়ম্বনায় যাঁকে এই অঞ্চলে বাসা নিতে হয়েছিল, আর জীবিকার প্রয়োজনে তথাকথিত নিষিদ্ধ পল্লির বাসিন্দাদের জন্যে খুলেছিলেন স্টুডিও। সে তথ্য জানা না থাকলেও তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। সেকালের সুখ্যাত থ্যাকারের ডিরেক্টরির পাতায় ১৯৩২ সালের তালিকায় তাঁর নাম পাওয়া যায়। তাঁর ছবিগুলি, যেগুলি এক অজানা, অর্ধজানা সামাজিক ইতিহাসের বিশ্বস্ত দলিল, তা এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ সে যুগে তাঁর পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন যে এডনা লরেঞ্জ তাঁর নাম আমাদের সকলেরই প্রায় জানা, ‘স্বর্ণযুগের’ সাদাকালো বাংলা সিনেমার পরিচিতি-পর্বে স্থিরচিত্রগ্রহণে ‘এডনা লরেঞ্জ’ নামটি দর্শকদের চোখে ও মনে ধরা আছে আজও। তাঁর স্টুডিওটি ছিল অভিজাত এলাকায়, পার্ক স্ট্রিটে। হয়তো সিনেমার ছবির স্থায়িত্ব দীর্ঘকালীন আর থিয়েটারের তাৎক্ষণিক বলেই সে যুগের নটীদের সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চলাবালাকেও আজ ভুলেছি আমরা।

নটি বিনোদিনী-র (দাসী) আলোকচিত্র

সরোজিনী ঘোষ বা অন্নপূর্ণা দত্তের নামও আজ আমরা মনে রাখিনি। মেয়েদের পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়া বা পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেওয়া আজ আর নতুন কথা নয়। ছবি তোলা আজ শিল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রত্যহ অগুনতি ছবির ছড়াছড়ি, কতরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আজ ফোটোগ্রাফি নিয়ে। আজ তাই স্মৃতিমেদুর দীর্ঘ দৃষ্টিপাত সেই মানুষগুলোর যাপনের ওপর যাঁরা নিজস্ব প্রত্যয়ে ঘরের সঙ্গে সেতু বেঁধেছিলেন আরও অনেক ঘরের। নিজের অজান্তেই নাম লিখিয়েছিলেন সেই প্রথমাদের দলে, যারা নিঃশব্দে নীরবে লিখে যায় যুগবদলের খতিয়ান। একান্ত চারণে‌ আগামীর জন্য তুলে রাখে‌ সমকালের চালচিত্রখানি। হয়তো সরোজিনী বা অন্নপূর্ণার‌ ক্ষেত্রে ছবি তোলা নিছক শখের খেয়াল ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল‌ দায়িত্বের দায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের কাজের গুণগত মান ছিল প্রশ্নাতীত। না-হলে কি এঁরা সেই বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে‌ তুলতে পারতেন, যা সে যুগের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। যুগ বদলালেও তাই কোনভাবেই ভুলে যাওয়া যায় না সরোজিনী বা অন্নপূর্ণাদের, বিশেষভাবে ভোলা যায় না চঞ্চলাবালাকে। কারণ এঁরাই নিজের মতো করে পালন করেছিলেন পথিকৃতের ভূমিকা।

গ্রন্থপঞ্জি:

১. ফটোগ্রাফী শিক্ষা, আদিশ্বর ঘটক
২. ছবি তোলা/ বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চা, সিদ্ধার্থ ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স