Robbar

দেশ দেখাচ্ছ কারাগারে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 9, 2026 7:25 pm
  • Updated:March 9, 2026 7:25 pm  

‘আমি কেবল উপস্থিত ছিলাম সেখানে, তথ্যচিত্রের কাজও করছিলাম না কিছু। মিনিট দশেক বাদে পুলিশ দ্যাখে যে ভিড়ের মধ্যে একজন সাদা চামড়ার মানুষ, ওরা এসে ঘিরে ধরে আমাকে।’ পুলিশ তাঁকে হোটেলে ফেরত নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে গ্রেফতার করে থানাতে নিয়ে আসে। বিজনেস ভিসা লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়ের হলেও ভ্যালন্তাইনোর মতে তাঁকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরিই ‘রাজনৈতিক’। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয়েছে গ্রেফতারের আসল লক্ষ্য ছিল গোরখপুরের বীর পুলিশ বাহিনী কীভাবে একজন বিপজ্জনক বিদেশিকে গ্রেফতার করেছে তা নিয়ে মিডিয়াতে একটু গুঞ্জন তৈরি করা, কারণ তাদের কাছে এমন কোনও আইনি যুক্তি ছিল না যার ভিত্তিতে আমাকে গ্রেফতার করতে পারে।’

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

২০২৩ সালে তাঁর স্বপ্নের কাজটি করার জন্য ভারতে আসেন তরুণ ফরাসি চলচ্চিত্রকার ভ্যালন্তাইনো (Valentin Hénault) এবং প্রায় বছরখানেক পর ফিরে যান তাঁর প্রথম বই– গোরখপুর জেলে বন্দিত্বের অভিজ্ঞতার পাণ্ডুলিপিটি সঙ্গে নিয়ে। ভারতীয় সমাজে দলিত মহিলাদের অবস্থান ও পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে এসে একমাস জেল খাটেন ভ্যালন্তাইনো। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ভারতে প্রকাশিত হয়েছে বছর বত্রিশের ভ্যালন্তাইনো-র সেই কারাযাপনের স্মৃতিকথা জ্যাভে আঁ রেভ দ্য আন্দিয়াঁ, দঁ ল্যঁফ্যার দ্য লা প্রিজঁ দ্য গোরখপুর (Javais un rêve indien: Dans lenfer de la prison de Gorakhpur)। বইটিতে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর জেলের অজানা সব কথাচিত্র, যা একইসঙ্গে বিস্ময়কর এবং ভয়াবহ। 

ফরাসি চলচ্চিত্রকার ভ্যালন্তাইনো

ভ্যালন্তাইনোর জন্ম প্যারিসে ১৯৯৪ সালে। ২০ বছর বয়সে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর মালডোভা এবং ইতালির নেপলসে সামাজিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন। ক্রমশ তথ্যচিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকে পড়েন ভ্যালন্তাইনো। ভর্তি হন প্যারিস দিদেরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ডকুমেন্টারি এবং সমসাময়িক ওয়ার্ল্ড রাইটিংয়ের মাস্টার্স প্রোগ্রামে। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র ল্যোম দ্যু স্যুস-সল (LHomme du sous-sol), প্যারিসের লা দেফ্রঁস বিজনেস ডিস্ট্রিক্টে এক গৃহহীন ব্যক্তির রহস্যময় বিচরণ বিষয়ক, নির্বাচিত হয় প্যারিসের আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র উৎসব সিনেমা দ্যু রিয়েল (Cinéma du Réel)-এ। পরবর্তী প্রকল্প ২০২০ সালে, মিশেল এ লা ভ্যাগ জোন (Michel et la vague jaune) ফ্রান্সের তৎকালীন সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। ২০২২ সালে ভ্যালন্তাইনো লিখেছিলেন এবং পরিচালনা করেছিলেন লা দেসেরশিওঁ (La Désertion), এক পরিত্যক্ত গ্রামে শিশুদের নিজস্ব পৃথিবী নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি সাদা-কালো কাহিনিচিত্র। প্যারিসের একটি বস্তিতে বসবাসকারী স্তেলিয়ঁ এবং তার স্ত্রী সোমনা-র জীবনকে অনুসরণ করে নির্মিত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র, লে রেপন্তি (Les Repentis) প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। দেড় ঘণ্টার এই চলচ্চিত্রটি শহুরে পরিবেশে তাদের বেঁচে থাকার লড়াইকে তুলে ধরে।

ফরাসি চলচ্চিত্রকার ভ্যালন্তাইনো-র প্রথম সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র ‘ল্যোম দ্যু স্যুস-সল’

I had an Indian dream like others had an American dream.’– এভাবেই নিজের বইটি শুরু করেছেন ভ্যালন্তাইনো, ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর জেলে কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে। বইটির শিরোনামের ইংরেজি অর্থ হলI Had an Indian Dream: In the Hell of Gorakhpur Prison’ তাঁর জীবনের স্বপ্ন বাস্তবে অবশ্য অচিরেই দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছিল। 

২০২৩ সালের ১০ অগস্ট এদেশের দলিত মহিলাদের অবস্থা নিয়ে তথ্যচিত্র করতে ব্যবসায়িক ভিসায় ভারতে আসেন ভ্যালন্তাইনো। যে-জাতিগত বিভেদের মধ্যে প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হয়, লড়াই করতে হয় প্রান্তিক নারীদের, তাঁর ইচ্ছে ছিল সেটাকে চলচ্চিত্রায়িত করা। তাঁর ভাষায়, এটা ছিল বেঁচে থাকার গল্প কীভাবে, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে, নিজেকে ঠিক রাখার, শক্তিশালী, উদ্যমী থাকার, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন সেইসব নারী।

বিহার ও ঝাড়খণ্ডের গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করার পর ভ্যালন্তাইনো উত্তরপ্রদেশে যান, ভারতের অস্পৃশ্য শ্রেণির লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করে তাঁদের জীবনকে সম্যকভাবে তুলে ধরতে। গোরখপুরে তথ্যচিত্রের কাজ চলাকালীন ১০ অক্টোবর আম্বেদকর জনমোর্চার ডাকে দলিত রমণীদের একটি প্রতিবাদ মিছিলে [Ambedkars Peoples March (Ghera Dalo, Dera Dalo protest)] যোগদান করার অভিযোগে স্থানীয় পুলিশ ভিসার নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে তাঁকে গ্রেফতার করে।

আমি কেবল উপস্থিত ছিলাম সেখানে, তথ্যচিত্রের কাজও করছিলাম না কিছু। মিনিট দশেক বাদে পুলিশ দ্যাখে যে ভিড়ের মধ্যে একজন সাদা চামড়ার মানুষ, ওরা এসে ঘিরে ধরে আমাকে। পুলিশ তাঁকে হোটেলে ফেরত নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে গ্রেফতার করে থানাতে নিয়ে আসে। বিজনেস ভিসা লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়ের হলেও ভ্যালন্তাইনোর মতে তাঁকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরিই ‘রাজনৈতিক’। তাঁর ভাষায়, আমার মনে হয়েছে গ্রেফতারের আসল লক্ষ্য ছিল গোরখপুরের বীর পুলিশ বাহিনী কীভাবে একজন বিপজ্জনক বিদেশিকে গ্রেফতার করেছে তা নিয়ে মিডিয়াতে একটু গুঞ্জন তৈরি করা, কারণ তাদের কাছে এমন কোনও আইনি যুক্তি ছিল না যার ভিত্তিতে আমাকে গ্রেফতার করতে পারে। এই আন্দোলনের পিছনে টাকা ঢেলেছেন এমন অভিযোগও আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। সেদিন তাঁর সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় দলিত অ্যাকটিভিস্ট সীমা গৌতমকেও। উত্তর ভারতের বিভিন্ন হিন্দি-ইংরেজি সংবাদপত্রে সেই সময় এই গ্রেফতার প্রসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

ভ্যালন্তাইনো ও সীমা গৌতম

গ্রেফতারির পর আদালত-ফেরত গোরখপুর জেলে ঢুকে ভ্যালন্তাইনোর এর পরের অভিজ্ঞতা আরওই তিক্ত, যা তিনি বর্ণনা করেছেন বইয়ের ১৬টি অধ্যায়ে। বিশাল এই কারাগারে বন্দির সংখ্যা প্রায় হাজার তিনেক। তবে নড়াচড়ার কোনও জায়গাই ছিল না প্রথম রাতের বর্ণনায় এমনটাই লিখেছেন তিনি। ছোট ছোট কুঠুরি নয়, বড় বড় ব্যারাক রয়েছে এই জেলে। কিন্তু একটা ব্যারাকেই বাসিন্দা প্রায় ২০০ জন। ঘুমানো দূরস্থান, পাশ ফিরে শোওয়ারও জায়গা ছিল না। খালি মেঝেতে একদিকে কাত হয়েই সেই রাতটা কাটান ভ্যালন্তাইনো অজস্র অচেনা মানুষের ভিড়ে। তবে প্রথম দিনেই খাবার বা জলের আগেই চেয়েছিলেন কাগজ-কলম, নিজের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য। তাঁর মনে হয়েছিল যে, এটাই প্রতিবাদের একমাত্র উপায়। এরপরে তাঁকে সেই ব্যারাক থেকে সরিয়ে নিয়ে মানসিকভাবে খানিক অপ্রকৃতিস্থদের মধ্যে রাখা হয়েছিল। কারাগারে বন্দি এই অসহায় মানুষগুলির কথাও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

জেলের ভেতর মানুষ মরে যাচ্ছে, আর গার্ডেরা দরজা খুলছে না অসম্ভব আঘাত পেয়েছিলেন ভ্যালন্তাইনো এই অমানবিকতায়। সেই অনুভব ফুটে উঠেছে তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে। সাদা চামড়ার জন্য অবশ্য পরে বেশ কিছুটা খাতির পেয়েছিলেন জেলে, তবে সেটাও তাঁর খারাপই লেগেছিল। দিন দুয়েক পরে সাংবাদিকরা তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা করেন।

তথ্যচিত্র বানানোর সময়ে ভ্যালন্তাইনো

গোরখপুর জেলের অভিজ্ঞতা তাঁকে শারীরিক-মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল যে, জেলের ভেতরের মানুষগুলো আদৌ জানে না কবে তাদের বিচার হবে কিংবা আদৌ হবে কি না, যা একরকম মানসিক অত্যাচারই। তাদের চুপ করিয়ে রাখার জন্য শারীরিক নিগ্রহও করা হত।

গোরখপুর জেলের আরেকটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছিলেন ভ্যালন্তাইনো। তা হল বর্ণগতভাবে উঁচু-নিচু বিচার। ব্রাহ্মণেরা তুলনায় মাঝখানের ভালো জায়গায় থাকার সুযোগ পায় আর বাথরুমের কাছে অন্ধকার কোনায় ঠেলে দেওয়া হয় নিচু বর্ণের লোকদের। মুসলমানদের একেবারে আলাদা একটা ব্যারাকে একত্রে রেখে দেওয়া হয়। 

খানিক ইংরেজি আর ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে ভ্যালন্তাইনো চেষ্টা করে যেতেন তাঁর বন্দিজীবনের সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, তাদের কাহিনি জেনে নিতে। সেইসব নিয়েই তাঁর এই স্মৃতিকথা। জেলবন্দি হওয়ার আগে ভারতে কয়েক মাস কাটানোর দৌলতে খানিক হিন্দি বুঝতে আর বলতেও শিখেছিলেন, সেই শিক্ষা কাজে লেগেছিল কারাবাসের দিনগুলোতে। 

মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের অভিযোগও আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। বেশ ভীতিপ্রদই হয়েছিল সেটা তাঁর কাছে। এমনকী, আদালতে খানিক নিজের দোষ স্বীকার করতেও বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর জামিনে ছাড়া পান ভ্যালন্তাইনো। কিন্তু তাঁর ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি দেশে ফিরতে পারেন। 

গোরক্ষপুর জেল

বইটি প্রকাশিত হওয়ামাত্র চমকে উঠেছিলেন ফরাসি পাঠকেরা। ভারত সম্পর্কে তাঁদের প্রচলিত ধারণাতে বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা লেগেছিল। ভারতীয় পাঠকেরাও নড়েচড়ে বসেছেন ভিনদেশি ভ্যালন্তাইনো এদেশের অন্ধকার দিকটাতে ঘা দিয়েছেন। তবে বইটি ফরাসি থেকে অন্যান্য ভাষাতে অনুবাদের আগ্রহও দেখাচ্ছেন অনেক প্রকাশকই।

ভারতকে এখনও ভালোবাসেন ভ্যালন্তাইনো, শুধু তাঁর এই দেশকে দেখার দৃষ্টিটা বদলে গিয়েছে রোমান্টিকতা থেকে বাস্তবে। নরেন্দ্র মোদি আর যোগী আদিত্যনাথের হিন্দুত্ববাদী ভারতকে তাঁর আর ‘গণতান্ত্রিক’ বলে মনে হয় নাতাঁর দৃষ্টিতে ভারত প্রবল বৈষম্যবাদী, হিংস্র এবং ফ্যাসিবাদী একটা দেশ।