Robbar

ধুলোবালির পর বালিধুলো

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 16, 2026 11:02 am
  • Updated:March 16, 2026 11:02 am  

যেখানে এক সময় ছিল ঘন জঙ্গল, পরে জঙ্গলের সেই গাছগুলো দীর্ঘদিন জলে ডুবে তারপরে মাটির তলায় চাপা পড়ে পাথর হয়েছিল। পরে আবার মাটি সরে গিয়ে, ওপরের ধুলো উড়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে আবার সেই গাছের ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের অংশ। সোনালি বালির বিশাল অঞ্চল জুড়ে পিনাক্‌ল ডেজার্ট। হাজার হাজার বছরের পুরনো গাছের জীবাশ্মগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেন আধুনিক বিমূর্ত ভাস্কর্যের ঝাঁক।

সমীর মণ্ডল

২৫.

গ্রহান্তরের বৃহস্পতি, প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসর, গার্হস্থ্য চড়াই পাখি আর শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি যদি ধুলোর কথা তুলি, তাহলে সেটা এক ভয়ানক বিমূর্ততা অথবা হযবরল-র দিকে মোড় নিতে পারে। এইখানেই আবার আধুনিক কবিতা কিংবা কনসেপচুয়াল আর্টের প্রসঙ্গও এসে পড়তে পারে। তবে পাঠকদের পক্ষে সেটা প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে। অতএব সরলভাবে বলতে চাই, জগতে যা কিছু আছে, তা আছে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পর্কও আছে। মহাবিশ্বের যাবতীয় কিছু আসলে সবাইকে নিয়ে, সবাই মিলে। 

কিছুদিন আগে পর্যন্ত লোকশিল্প নয়, আধুনিক চিত্রকলাতেও শিল্পীরা নিজের মতো করে রং বানিয়ে নিতেন, মেশাতেন আঠা ইত্যাদি নিজের পছন্দের জিনিস। রামানন্দদা রং বানাতেন নিজের হাতে। সে গল্প উনিই আমাকে গুছিয়ে বলেছিলেন একদিন।

বড় বড় গামলা নিয়েছেন কয়েকটা। তার মধ্যে ধুলোবালি মাটি পাথরের গুঁড়ো গুলছেন জলে। আমরা যাকে বলি আর্থ কালার। আসলে এগুলো রঙিন পাথরের গুঁড়ো বা ধুলো। গুলে গুলে যখন ঘন রঙের জল তৈরি হল, তখন কিছুক্ষণ রেখে দিলেন। ভারী পাথরের বেশ কিছু বড় বড় টুকরো থিতিয়ে গেল গামলার নিচে। ওপর থেকে রঙিন জল আর একটা গামলায় ঢাললেন রামানন্দদা। 

শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন গামলায় রঙের গুঁড়ো মেশানো জলটা অনেক ভালো, একরঙা। আরও অনেকটা পরিষ্কার জল মেশানো হল। উনি সেটাতে হাত দিয়ে বেশ করে গুলে রেখে দিলেন অনেকক্ষণ। এরই মধ্যে আরও কিছু ভারী রঙের কণা থিতিয়ে গেল গামলার নিচে। ঘণ্টাখানেক পরে উনি ওপরের রং-জল আবার আর একটা গামলায় নিলেন। এই সময়ে কাপড়ে ছেঁকে নিলেন রংয়ের জলটা, কারণ জলে কিছু ভাসমান হালকা কণা থাকতে পারে, যেগুলো রং নয়। এবারে হয়তো উনি রাখলেন কয়েক ঘণ্টা। তারপরেও থিতিয়ে গেল অনেক রঙের কণা গামলার নিচে, তবু উপরে এখনও লাল জল, নীল জল, বাদামি কিংবা গেরুয়া। এইবারে উপর থেকে সাবধানে সেই জল ঢাললেন অন্য পাত্রে আর ঢাকনা দিয়ে ঘরের এক পাশে রেখে দিলেন। ঢেকে রাখলেন, যাতে অন্য কিছু এই জলে আর মিশতে না পারে। এখন রঙিন জলের বিশ্রাম, একটানা একাধিক দিন। দরকার হলে অনেক দিন, কারণ সমস্ত রংয়ের বস্তুকণা একই রকম ওজনের হয় না।

ঢাকনা খুলে দেখলেন একদিন, অদ্ভুতভাবে জল এখন আর রঙিন নেই। উপরের জল স্বচ্ছ পরিষ্কার। সমস্ত কণা ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব ওজনের সময় নিয়ে এলিয়ে পড়েছে পাত্রের তলায়। এবারে পাত্রের জল রেখে দেওয়া নয়, বরং পরিশ্রুত জল সন্তর্পণে ফেলে দিয়ে তলার নদীর পলির মতো জমে থাকা রঙিন কাদা নিয়ে শেষ পাত্রে তুলে রাখার পালা।

হাতের বুড়ো আঙুলটা অন্য চারটে আঙুলের ওপর গোল করে আস্তে আস্তে ঘোরাতে ঘোরাতে রামানন্দদা বলছিলেন, কী নরম, কী মোলায়েম, মাখনের মতো অনুভূতি। বলছিলেন, সে রঙের কাদা কাগজের পটে লেপন করার অনুভূতির কথা আর রঙের সঙ্গে পছন্দমতো আঠা মিশিয়ে শুকনো শক্ত কাদার মতো হলে, বড়ি বানিয়ে সেগুলোকে রেখে দেওয়ার গল্প।

প্রাকৃতিক আর্থ কালার তৈরির প্রস্তুতি

এই যে এতক্ষণ গামলার জলে জলে, পাত্র থেকে পাত্রে স্থানান্তর ঘটল মাটি-পাথর, ধুলোবালি, তা শুনে আমার মন চলে যাচ্ছে অন্য জায়গায়। ঘাঁটাঘাটি, দাপাদাপি, জলের ধাক্কায় পাথরের রঙের কণার, ঘোলাজলের চলাচল, সে তো সমুদ্র মন্থনের সামিল। কিংবা নদীপথে দূরদূরান্তে ভেসে যাওয়া জমির মাটি বয়ে নিয়ে স্থানান্তরে পলি জমিয়ে তৈরি করছে– যেন অন্য জনপদ, অন্য নগর। গড়ে উঠছে অন্য সভ্যতা।

কৌটোবন্দি রঙিন মাটি, পাথরের গুঁড়ো যে শিল্প সরঞ্জামের দোকান হয়ে শিল্পীদের স্টুডিওতে এসেছে, আসলে তা এসেছে কোত্থেকে? হয়তো সুদূর আফ্রিকার কোনও আগ্নেয়গিরির ছাই মেখে, কিংবা হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর গেরিমাটি মিশে এসেছে এখানে। অথবা একান্তই ঘরের কাছে রামানন্দবাবুর দীর্ঘ বসবাসের প্রাণের জায়গা পুরুলিয়ার রাঙামাটির গুঁড়ো। কে বলতে পারে তাতে গ্রিক বা রোমান যুদ্ধের ঘোড়ার খুরে খুরে উড়ে আসা পাথরের ধুলো নেই! কে বলতে পারে এই গামলার মধ্যে জলের সঙ্গে মিশে নেই ডাইনোসরের হাড়ের গুঁড়ো কিংবা মহাসাগরের ঝিনুকের শরীর কণা!

আমরা ভবিষ্যৎ পর্বে দেখছি, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতের সেই রং জলে মিশিয়ে কাগজের উপরে আবার থিতিয়ে তৈরি চিত্রকলা পৌঁছে যাচ্ছে আধুনিক সভ্যতার মানুষের কাছে। শুধু পৌঁছে যাচ্ছে হাতের কাছে, পড়শি শহরে, তা নয়। পৌঁছে যাচ্ছে সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে সুদূর ইউরোপ, আমেরিকায়। হয়তো বা জঙ্গল পাহাড় পেরিয়ে চিন ও জাপান। কোথা থেকে আসছে আর কোথায় যাচ্ছে তার হিসেব আমরা ক’জন জানতে পারি! এই আসা-যাওয়া, এই মেলামেশা অনন্ত।

রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি

‘গার্হস্থ্য চড়াই পাখি’, শুরুতে বলেছিলাম। হয়তো এমনিই। পশুপাখিদের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা চড়াই পাখির দুটো তো রোজ দেখি আমাদের বাড়ির জানালায়, বারান্দায়। নিচে, মাঠে, ধুলোতে স্নান করতেও দেখি কখনও। ধুলোর কথা হয়তো বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরে অবাক হলাম চড়াই পাখি সম্পর্কে অন্য খবরটা শুনে। আপনাদেরও জানিয়ে রাখি। জীববিজ্ঞানীদের অধিকাংশের মতে চড়াই (পাসের ডোমেস্টিকাস) পাখিকে প্রায়শই ডাইনোসরিয়া বিভাগের আধুনিক প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয়। পাখিদের ডাইনোসর থেকে বিবর্তিত একটা আলাদা শ্রেণি বলে মনে করা হত। বর্তমানে ডাইনোসরদের একমাত্র জীবিত বংশধররূপে গণ্য করা হয়। পাখিরা তাই ডাইনোসর; আর সেই সূত্রেই ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত নয়, এখনও জীবিত। 

এতক্ষণে ইনিয়ে-বিনিয়ে যে দীর্ঘ আলোচনা করা হল সেটা ভূমিকা। এ পর্বের বিষয়টা আসলে সরল সোজা। ছোট্ট একটা প্রশ্ন– এই বালি, ধুলো আর কাদামাটি এগুলো আসলে কী? আরও পরিষ্কার করে বললে, বালি কী? প্রশ্নটা খুব ছোট্ট আর উত্তরটাও প্রায় এক লাইনেই বলে দেওয়া যায়। বিশাল সাইজের কোনও জড়বস্তু ভাঙতে ভাঙতে, ক্ষয়ে যেতে যেতে, ছোট হতে হতে বালিতে পরিণত হয়। মানে পাহাড় ভেঙে ভেঙে পাথর, পাথর ভেঙে ভেঙে পাথরকুচি, পাথরকুচির চেয়ে আরও ছোট দানার অংশ, হয়ে দাঁড়াল বালি। বালি আরও ছোট হয়ে গেলে হয় ধুলো। সমুদ্রের বয়ে বেড়ানো জলজ প্রাণীর খোলস, মৃত প্রাণীর হাড়গোড় ইত্যাদি নানা বস্তু সমুদ্রে ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙতে ভাঙতে জলের সঙ্গে চলতে চলতে, ঘষাঘষিতেও তৈরি হয়ে যায় বালি।

বালি অনেক স্থান, উৎস এবং পরিবেশ থেকে আসে। হাজার হাজার এমনকী লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আবহাওয়ার কারণে এবং ক্ষয়ের কারণে শিলা ভেঙে গেলে বালি তৈরি হয়। আবার প্রায়শই সমুদ্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, শিলাগুলি ধীরে ধীরে নদী এবং স্রোতের মধ্য দিয়ে যখন ভ্রমণ করে, তখন পথে ক্রমাগত ভেঙে যায়। একবার তারা সমুদ্রে পৌঁছলে, ঢেউ এবং জোয়ারের শক্তিতে আরও ক্ষয়ে যেতে থাকে।

শিলাকে ক্ষয় করে চলে জলরাশি

ছোটবেলা থেকে জলে-কাদায় মানুষ আমি, চড়া পড়ে যাওয়া, মজে যাওয়া নদীর বুকে বালি কেটে কেটে নৌকো ভরে নিয়ে যেতে দেখেছি কত। আর বিশেষ করে দেখেছি মরুভূমিতে। আলাদা আলাদা মরুভূমি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই মরুভূমি দর্শন, আকাশ দেখা বা সমুদ্র দেখার মতোই বিশাল। বিশাল জিনিস দেখে শুধু অবাক হওয়া তো নয়, নিজেকে ক্ষুদ্র হয়ে অথবা একেবারে হারিয়ে যাওয়াটা একটা নেশার মতো জিনিস। 

সমস্ত বড় থেকে ছোট হওয়ার গোপন কাহিনি একদিকে, অন্যদিকে এই মাটির চলে বেড়ানো আর ধুলোর উড়ে বেড়ানোর পরিসরের ব্যাপ্তি আমাদের চিন্তার বাইরে। আপনি হয়তো বলবেন, এত কিছু? বিজ্ঞানীরা বলছেন আগ্নেয়গিরির ছাই সারা পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ায়, মরুভূমির ধুলো ঝড়ের সঙ্গে আকাশে উঁচুতে উঠে সমুদ্র পেরিয়ে চলে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে– এ তো আকছারই হচ্ছে। আগের এক পর্বে বলেছিলাম, জাভা এবং সুমাত্রার মাঝামাঝি ‘ক্রাকাটোয়া’ দ্বীপের আগ্নেয়গিরি থেকে উৎপন্ন তাপ এবং যে প্রচুর পরিমাণে ছাই উঠেছিল আকাশে, দীর্ঘদিন ধরে তা পরিবেশের দৃশ্য বদলে দিয়েছিল। সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের রং বদলে দিয়েছিল সেই ছাই।

সাহারা মরুভূমির ধূলিকণা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকা মহাদেশ পর্যন্ত পৌঁছয়। এমনকী বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, অন্য গ্রহের ধুলোও আমাদের পৃথিবীতে রোজ জমা হচ্ছে কত। পৃথিবীতে দিনে দিনে ধুলোর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। মরুভূমির পরিধিও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ের একটি গবেষণা বলছে, প্রতি বছর পৃথিবীতে মহাকাশ থেকে উড়ে আসা ৪৭.১৭ লক্ষ কেজি ধুলা মিশে যায় আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। রিপোর্ট বলছে তার মধ্যে ৮০ শতাংশই আসে বৃহস্পতি গ্রহের উল্কা থেকে।

শামুক, ঝিনুকের খোল মিশে রয়েছে বালির সঙ্গে

বালি দেখলেই এক মুঠো হাতে তুলে নিয়ে, আঙুল আলগা করে ফাঁক দিয়ে ঝুরঝুর করে সেটা আবার মাটিতে ফেলে দেওয়ার অভ্যেস অনেকের। আমারও। ছোটবেলায় মজে যাওয়া ইছামতীর বুকে বালির নৌকো তো রোজ দেখতাম, পরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখেছি দামোদরের বালি। শুধু বালি দেখব বলেই গিয়েছিলাম মেদিনীপুরের কাঁথিতে। সেইখানে প্রথম দেখেছিলাম বালিয়াড়ির বিভিন্ন ঢিবির উপরে হেলানো কাজুবাদামের গাছ। আসামে চড়া পড়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের বুকের বালির দৃশ্য, ছবির মতো। তারপর কাজিরাঙ্গা পেরিয়ে একটা নিরিবিলি সুন্দর জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে একদিন উঁচু ঘাস বিছানো ঢিবির ওপরে বসে সামনে ব্রহ্মপুত্রের এক ছোট্ট উপনদী থেকে ধরা চাঁদা-পুঁটি-মৌরলার মতো ছোট ছোট মাছ ভাজা খেয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে দেখেছিলাম ছোট নৌকো নিয়ে লোকেরা বালি তুলছে নদীর বুকে। জীবনানন্দের কথা মনে পড়ছিল খুব। নদীটার নাম ধানসিড়ি।

পৃথিবীর বেশ কয়েকটা বিখ্যাত মরুভূমির বালি হাতে নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। হাতে করে বালির দানা দেখেছি কাছ থেকে, দূর থেকে মরুভূমির বালির রং। বাড়ির পাশে আরব সাগরের ওপারে দুবাই। ওখানে বালি দেখতে যাওয়া এবং বালিয়াড়িতে গাড়ি নিয়ে ঢিবির ওপরে ওঠানামা করা, একটা খেলা। আমরাও করেছি। যাওয়ার পথে বালির রং দেখেছিলাম। প্রথমে শহরের কাছে অনেকটা ফর্সা, তারপরে হলুদাভ এবং বাদামি হয়ে লালচে, শেষ পর্যন্ত ঘন তামাটে রং। হাওয়ায় হাওয়ায় বালি উড়িয়ে পাহাড়ের মতো ঢিবিগুলো কেমন জায়গা পরিবর্তন করে ক’দিন বাদে বাদে। যেদিক দিয়ে হাওয়া বয় সেদিক অনেকটাই হেলানো ঢিবিগুলো, উল্টোদিকে বেশিটা খাড়াই। বালির পাহাড়ের মাথায় চড়তে মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ে বালি, গাড়ি ডুবে যায়। আমরা শিল্পীরা মিলে যেবার গেছিলাম সেবারে আমাদের দলের একটা গাড়ি পড়ে গিয়ে ডুবে গিয়েছিল। সেখানে ছিলেন যোগেনদা, শিল্পী যোগেন চৌধুরী। তাঁর জামা-প্যান্টের পকেটে শুধু নয়, ক্যামেরার ব্যাগ এবং ক্যামেরার মধ্যেও ঢুকে গিয়েছিল প্রচুর বালি।

মরোক্কোর অতিদীর্ঘ ভ্রমণপথে বেশিরভাগটাই মরুভূমি। মরুযাত্রার সবচেয়ে বড় শিহরণ ছিল, সাহারা। অস্পষ্ট সবুজ আর মরুভূমির জমির প্যাটার্ন দেখেছি চোখ ভরে। জর্ডনের মরুভূমির হাইওয়েতে সাঁই সাঁই পথ চলার মেজাজই আলাদা। আর দেখেছিলাম ঐতিহাসিক পেত্রা সিটি। পাহাড়ি শহর, পাথর খোদাই, যা কিছু কারুকাজ, চোখের সামনে কেমন গোলাপি ধুলো হয়ে যাচ্ছে। 

চিনের প্রাচীর

চিনের পাঁচিলের পাথরের টেক্সচারও ভোঁতা হয়ে গেছে আজকাল। পাথরের দেওয়ালে কুরে কুরে ছেলেমেয়েদের লেখা নামগুলোও অস্পষ্ট হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। অন্য দেশের পাথর খোদাই করা গুহাচিত্রগুলো ধুলো হয়ে গেছে অনেক। পৃথিবীর বিখ্যাত সব শিলালিপিগুলো পড়ার চেষ্টা করতে চশমা মুছছি বারবার।

মিশরে দেখেছিলাম অন্য মরুভূমির আবহ। আমার চিরকালের রহস্যময় জায়গা মিশর। সেখানে যখন ধু-ধু মরুভূমির মাঝে পিরামিডের তলায় দাঁড়িয়েছি, তার ধ্বংসাবশেষ দেখে খুব অবাক হইনি প্রথমে। ছবির মতো দেখাচ্ছিল। কারণ ছবিতে, টেলিভিশনে, সিনেমায় আগে থেকে দেখে ফেলেছি। নিজের মধ্যে একটা বিস্ময় জাগানোর চেষ্টা করছি যখন, ঠিক তখনই আচমকা কোথা থেকে এল ধুলোঝড় প্রচণ্ড। ছোট-বড় বালিকণার মতন পাথরখণ্ডের ধুলোয় আমাদের পোশাক-আশাক আচ্ছন্ন করল। আঁচড় কেটে দিল চশমার কাচে। তখনই মুহূর্তে মিশর রহস্যময় হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে। পরে বিশাল ‘স্ফিংস’-এর নিচে দাঁড়িয়ে দেখেছি তার ক্ষয়ে যাওয়ার বিষন্নতা। অসহায় স্ফিংসের চোখ থেকে জল নয়, আলতো করে নিঃশব্দে খসে পড়ছে বালি।

‘স্ফিংস’

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশটাই পুরোটা একটা মরুভূমি। বিশাল মহাসাগর, আকাশ আর মরুভূমি দেখার অভিজ্ঞতা সেখানেই। সেই অভিজ্ঞতার কথা, এ জীবনে মন থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ঘটনাচক্রে অতি দীর্ঘ সময়, মানে গ্রীস্ম, বর্ষা, শীত, বসন্ত সমস্তটাই কাটালাম সেই মরুভূমিতে। দূর দেখলাম, কাছ দেখলাম, বালিও হাতে করে তুলেছি বারবার। বিভিন্ন জায়গায় কণাতে কণাতে অণুতে অণুতে দেখেছি জীবন। দেখেছি বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দেখেছি ইতিহাস। মরুভূমির বুকে হাজার হাজার মাইল জুড়ে আধুনিক হাইওয়ে। পথের দু’ ধারে মরুভূমি। বিভিন্ন মরশুমে বিভিন্ন আবহাওয়ায় তাদের বিচিত্র রূপ। কখনও মরুভূমিতে মাইলের পর মাইল জুড়ে বুনোফুলের বাহার, কখনও বা মরুভূমির কীটপতঙ্গের অতি গরমে জীবনের বাঁচার সংগ্রাম। বিশাল পাহাড়, জমি, লক্ষ লক্ষ বছরে ক্ষয়ে নানান রকম রূপ নিয়ে হয়েছে অপূর্ব সব মূর্তিকলা। আকাশ-বাতাস জুড়ে যেন শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। 

উপলব্ধি হল, যেখানে এক সময় ছিল ঘন জঙ্গল, পরে জঙ্গলের সেই গাছগুলো দীর্ঘদিন জলে ডুবে তারপরে মাটির তলায় চাপা পড়ে পাথর হয়েছিল। পরে আবার মাটি সরে গিয়ে, ওপরের ধুলো উড়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে আবার সেই গাছের ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের অংশ। সোনালি বালির বিশাল অঞ্চল জুড়ে পিনাক্‌ল ডেজার্ট। হাজার হাজার বছরের পুরনো গাছের জীবাশ্মগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেন আধুনিক বিমূর্ত ভাস্কর্যের ঝাঁক।

পিনাক্‌ল ডেজার্ট

দুধসাদা বালি। পরিষ্কার ধারণা হয়, বুঝতে পারি এই অঞ্চলে ছিল জলাভূমি, বিশাল জলাশয়। জলজ উদ্ভিদ, জলজ প্রাণীদের হাড়গোড়, তাদের খোলা খোলস থেকে কুচি কুচি হয়ে কণাগুলো মিলে এখন তৈরি হয়েছে সাদা বালির মরুভূমি। যেমন দেখেছিলাম মরিশাস দ্বীপের সি-বিচে। সমুদ্রতটে দুধ সাদা বালির স্তর। সেগুলো আসলে সমুদ্রের প্রাণীদের হাড়গোড়, শেল বা খোলস আর প্রবালের ক্ষুদ্রতম অংশগুলো মিলে তৈরি হয়েছে। একেবারে দুধ-সাদা সমুদ্রতট, সবুজ ঘন নীল জল আর রঙিন আকাশের মাঝখানে পাথরে জমির মধ্যে এই দুধ-সাদা বালির বিচ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

একদিন এক পরিষ্কার আবহাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ান ডেজার্ট হাইওয়ের মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে দেখছিলাম ছোট-ছোট ক্ষুদে তরমুজের মতো এক একটা লতানো ঝাড়। পাশাপাশি কয়েকটা। কাছ থেকে ক্যামেরায় ছবি তুলছিলাম। এই তরমুজ দেখতে গিয়ে তার পাশের এক মুঠো চকচকে বালি, একটু মোটা দানার, হাতে করে তুলে নিয়ে এসে কালো রাস্তার উপরে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। কাচের টুকরোর মতো ঝকঝক করছিল সূর্যের আলোয়। ছবি তুলেছিলাম সেই বালি ছড়ানো রাস্তার অংশটার। পরে বাড়িতে এসে দানাগুলো বড় করে দেখছিলাম। বড় করে দেখতে গিয়ে অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার হল। সেগুলো মিছরির টুকরোর মতো দেখতে। সেই প্রথম বুঝলাম, বালিকণাগুলো একা নয়। এমনকী তারা কেউ মৌলিক কোনও কিছু নয়, নানা জিনিসের সমষ্টি। একসঙ্গে আমরা একটা একরঙা মরুভূমি দেখি, কিন্তু তার কণায় কণায় নানা রং, নানা গল্প লুকিয়ে আছে।

দুধ-সাদা বালির প্রান্তরে বসে লেখক

এখন হাতের নাগালে, আমার বসতির কাছে, আরব সাগর। জুহু বিচে যাই মাঝেমধ্যে। বিচের বালির উপরে বিচ টাওয়েল না পেতে এমনিই বসে পড়ি। উঠে পড়লে হাত দিয়ে শুধু প্যান্টটাকে ঝেড়ে নিলেই হল। এই আরব সাগরের তীর জুড়ে গোয়া থেকে গুজরাট। নানা বিচের বালির নানা রং, মানে আলাদা আলাদা বস্তুকণা। 

গোয়ায় আছে পাহাড় আর সমুদ্র একসঙ্গে। সেখানে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রতিনিয়তই ভাঙছে ঝিনুকের, শামুকের খোল। আমরাও কুড়িয়েছি কত নানা ডিজাইনের, নানা আকারের সি-শেল। ওখানে বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল, ‘সিদাদে দে গোয়া’ তৈরি করেছে অন্য জায়গা থেকে বালি বয়ে এনে নিজেদের পছন্দের বিচ। মহারাষ্ট্রের ‘আম্বিভেলি’, সুব্রত রায়ের হাতে তৈরি সাধের বিলাসবহুল শহরের মধ্যে দেখলাম নদীটাই তৈরি করা হয়েছে নকল। আর তার পাশাপাশি বালির নকল বিচ। 

ড. সুবোধ কেরকারের বিচ ইনস্টলেশন

গোয়ার কথা উঠলে থামতে পারি না। চাঁদনি রাতে দুধ-সাদা বালির উপরে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে আর হাওয়া খেতে খেতে বারবিকিউ, ভাবা যায় না। আবার তাও যদি হয় ‘লীলা প্যালেস’ হোটেলের বিচ। বিচে যেখানেই বাঁক নিয়েছে, সে অংশগুলোতে রাশি রাশি জমা হয়ে থাকে জলে ভেসে আসা শামুক-ঝিনুকের খোলা। আর হাজার হাজার অক্ষত ঝিনুকগুলো কুড়িয়ে, সেগুলো দিয়ে দূরে সমুদ্রতটে বালির উপরে সাজিয়ে সাজিয়ে একমনে যে তৈরি করছে বিশাল দৃশ্যকলা– সে মানুষটি আমার বন্ধু, ড. সুবোধ কেরকার। বানাচ্ছে বিচ ইনস্টলেশন । সমুদ্র তীরে বিশাল বালির বুকে আঁকছে আধুনিক কবিতা। তৈরি হচ্ছে, কনসেপচুয়াল আর্ট।