Robbar

দ্বিধাই শহীদুল জহিরের আখ্যানের কেন্দ্র

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 23, 2026 9:16 am
  • Updated:March 23, 2026 4:41 pm  

জাহির স্পষ্ট বলেন না। কারণ স্পষ্ট বললে, বাস্তবের অতিসরলীকরণ হয়। বরং আড়াল করেন। কারণ আড়ালেই বাস্তবের সব জটিলতা বেরিয়ে আসে। জহিরের এই দ্বিধা কোনও দুর্বলতা নয়। বরং সচেতন ন্যারেটিভ কৌশল। লেখকের স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান। মার্কেসের যেমন মোকান্ডো ছিল, তেমনই জহিরের ছিল পুরনো ঢাকার ভূতের গলি। রাস্তাটার আসল নাম ভজহরি সাহা স্ট্রিট। এই রাস্তার বাসিন্দাদের কথাই বারবার উঠে এসেছে জহিরের গল্পে। তবে সেখানে কথক আখ্যানের চিরাচরিত নিয়ম মেনে এক বচনে নয়, বরং বহুবচনে। আমি নয়, আমরা। জহির যেন তার কথনের ভেতরে এক কৌম ধারণার কথা নিয়ে আসছেন। 

শমীক ঘোষ

লোকটা জাদুকর। খেলা দেখিয়ে বেড়ায় পথেঘাটে। ঠিক যেমন জাদুকরদের আমরা দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম বছর দশ পনেরো আগেও। জাদু যত না চমকপ্রদ, তার থেকে বেশি মন্ত্রমুগ্ধকর তার কথার বাঁধুনি। কথার টানেই সে বেঁধে ফেলতে পারে পথচলতি লোকেদের। বাধ্য করে তার সামনে এসে ভিড় জমাতে। 

জাদুকরের হাতে শুকিয়ে যাওয়া মানুষের হাড়। সে বলে, ওই হাড় তার স্ত্রী প্রীতিলতার। ভেলকি করে প্রীতিলতাকে জীবিতও করে দেয় সে। সত্যি জাদু না লোকঠকানো ম্যাজিক বোঝা যায় না। 

তবে জাদুকরের থেকেই বেশি সে ব্যবসাদার। তার আসল কাজ ফল বিক্রি করা। তবে আঙুর, আপেল, বেদানা কিংবা আলুবোখরা নয়। পাতি জাগডুমুর– বুনো ডুমুর, যার গাছ জন্মায় বাংলাদেশের আদাড়ে-বাদাড়ে। কর্কশ কষা স্বাদ। মানুষের খাদ্য নয়। 

জাদুকরের কথায় ভুলে সেই ফলই খায় কয়েকজন মানুষ। প্রথম ক’টা ফ্রি। তারপর কিনতে গেলেই দাম দিতে হবে। সেই দামও বাড়বে গুণোত্তর প্রগতিতে। প্রথমে দুই, তারপর চার, তারপর ১৬, ৩২, ৬৪। 

জাদুকরের কথার ভেলকিতে মজে সেই জাগডুমুরেই আসক্ত হয় কয়েকজন। জাদুকরকে খুঁজে খুঁজে ঠিক বেশি দাম দিয়ে কিনে নেয় ফলগুলো। তারপর সেই জাগডুমুর কিনে খাওয়া সাধ্যাতীত হয়ে ওঠে তাদের। 

কিন্তু ফলের নেশা যে সাংঘাতিক। তাই ফলের বদলে ফলের গাছ কিনতে চায় তারা জাদুকরের কাছ থেকে। এক হাজার টাকা দিয়ে। 

কিন্তু গাছ বিক্রি করতে নারাজ জাদুকর। ওই গাছ সে বিক্রি করে না। 

লোকগুলোও নাছোড়বান্দা। খুঁজে খুঁজে জাদুকরের বাড়ি চলে যায় তারা। তারপর ফল বিক্রি করতে রাজি না হওয়া জাদুকরকে খুন করে তারা। আর খুন করার পর দেখতে পায়, বাড়িটাও যেন দু’ টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে দু’ দিকে। 

লোকগুলোও ভ্যানিশ হয়ে যায় তারপরে। শুধু গায়ে ঢাকা দেওয়া চাদরের তলায় এক খণ্ড হাড় পড়ে থাকে। 

’৯২ সালে এই গল্পটা লিখেছিলেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক শহীদুল জাহির। গল্পের নাম– ‘ডুমুর খেকো মানুষ’। ’৯২ সাল। সে বছর বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে ভারতবর্ষে। দাঙ্গার আগুন ভারত থেকে ছড়িয়ে পড়েছে পড়শি বাংলাদেশেও। বীভৎস দাঙ্গার ছবি গোটা বাংলাদেশ জুড়ে। 

কিন্তু সেকথা কি উঠে আসছে শহীদুল জহিরের এই ছোটগল্পে? 

শহীদুল জহির

এপার হোক বা ওপার– বাঙালি পাঠকের এক প্রবণতা আছে। আখ্যানে বাস্তবের সঙ্গে মেলে না এমন কিছু ঘটলেই, তারা তাকে ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বলে দেগে দেয়। কিন্তু রিয়ালিজম ভাঙা মানেই জাদুবাস্তব নয়। বরং সেটা সুররিয়াল কিংবা হিপনোটিক রিয়ালিজম-এর মতো আরও অনেক কিছু হতে পারে।

জাদুবাস্তবতাকে প্রথম জনপ্রিয় করেছিল লাতিন আমেরিকার লেখকরা। বিশেষ করে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। সেখানে কাটা মুন্ডু ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়ায় অনায়াসে। কথা বলে, কাঁদে। অলৌকিক সেখানে দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক। প্রায় নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায়। এই নির্লিপ্তিই ম্যাজিক রিয়ালিজমের বৈশিষ্ট্য। সেখানে অলৌকিক আসলে বাস্তবকেই ব্যাখ্যা করে। তার ওপর নতুন এক মিথের কাঠামো তৈরি করে। 

জহিরের ‘ডুমুর খেকো মানুষ’-এও ম্যাজিক আছে। হাড় সেখানে জীবন্ত নারী হয়ে ওঠে। মানুষ অখাদ্য জাগডুমুরে আসক্ত হয়ে পড়ে। সেই জাগডুমুরের দাম বেড়ে যায় জিওমেট্রিক প্রোগ্রেশানে।      

কিন্তু এখানে অলৌকিক কি আসলে বাস্তবকে ব্যাখ্যা করে? না কি তাকে আরও বেশি সাংকেতিক, আরও বেশি অনিশ্চিত করে তোলে? 

ফরাসি তাত্ত্বিক জাঁক দেরিদা ‘ডিফাঁরেস’-এর কথা বলেছিলেন। সাধারণভাবে মনে করা হয় যে প্রতিটা শব্দের একটা নির্দিষ্ট অর্থ আছে। দেরিদার বক্তব্য এটা ঠিক নয়। আসলে আমরা শব্দের অর্থ বুঝি অন্য শব্দের সঙ্গে তার ফারাক থেকে। যেমন ‘দিন’ বললেই আমরা বুঝি সেটা ‘রাত’ নয়। কিন্তু ‘দিন’ শব্দটাকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে গেলে আমাদের আরও কিছু শব্দের সাহায্য নিতে হয়। আর সেই শব্দগুলোও অন্য শব্দ দিয়ে বুঝতে হয়। ফলে অর্থ এক শব্দ থেকে আরেক শব্দে সরে যেতে থাকে। 

দেরিদার ‘ডিফাঁরেস’-এর মধ্যে দুটো ধারণা আছে। এক. পার্থক্য– অর্থ, পার্থক্যের মাধ্যমে তৈরি হয়। দুই. দেরি– অর্থ সব সময়েই একটু দেরিতে ধরা পড়ে। তাই অর্থ কখনওই চূড়ান্ত নয়। তা প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে। এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে। 

১৯৯২ সালের মুসলমান-হিন্দু বৈরিতায় অশান্ত বাংলাদেশকেই যেন ডিকনস্ট্রাক্ট করছে জহিরের এই গল্প। ধূসর হাড়কে পূর্ণযুবতী নারীতে বদলে দেওয়ার কথা বলেছিল জাদুকর। যেমন রাজনীতি বলেছিল ভয়ংকর পাকিস্তান থেকে মনোরম স্বাধীনতার গল্প। কিন্তু আঙুর, আপেল, বেদানা ও আলুবোখরার মতোই মানুষের মনে সেই স্বাধীনতার অর্থ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। রাজনীতির ভেলকিবাজি সবাইকেই কষা জাগডুমুরে আসক্ত করেছিল। সেই জাগডুমুরেই আসক্ত হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু তারপরও তার দাম চোকানো হয়ে উঠল সাধ্যের অতীত। তখন জাদুকর অথবা সেই রাজনীতিকেই মেরে ফেলল তারা। কিন্তু সেই মেরে ফেলাও যেন দেশটাকেই দুটো আলাদা আলাদা ধারণায় ভাগ করে ফেলল। আর তারপর তারা নিজেরাও পরিণত হল ধূসর হাড়েই। ঠিক স্বাধীনতার আগের মতো।   

‘ডুমুর খেকো মানুষ’কে এই অতি সহজ রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় আটকে ফেলাও অতিসরলীকরণ। জাদুকর কেবল রাজনৈতিক নয়। জাগডুমুর কেবল মতাদর্শ নয়। এগুলো চিহ্ন মাত্র– যা ক্রমাগত অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট করে না। 

বরং আমরা এক চেনা কাঠামো খুঁজে পাই। আকাঙ্ক্ষার জন্ম, সেই আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে চাওয়ার মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং শেষে সহিংসতার মধ্যে দিয়ে দু’ ভাগ হয়ে যাওয়া। 

এই অবকাঠামো আমাদের সরাসরি বাস্তবকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তাকে কোনও মিথ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে না। 

আসলে জাহির স্পষ্ট বলেন না। কারণ স্পষ্ট বললে, বাস্তবের অতিসরলীকরণ হয়। বরং আড়াল করেন। কারণ আড়ালেই বাস্তবের সব জটিলতা বেরিয়ে আসে। জহিরের এই দ্বিধা কোনও দুর্বলতা নয়। বরং সচেতন ন্যারেটিভ কৌশল। লেখকের স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান।

মার্কেসের যেমন মোকান্ডো ছিল, তেমনই জহিরের ছিল পুরনো ঢাকার ভূতের গলি। রাস্তাটার আসল নাম ভজহরি সাহা স্ট্রিট। এই রাস্তার বাসিন্দাদের কথাই বারবার উঠে এসেছে জহিরের গল্পে। তবে সেখানে কথক আখ্যানের চিরাচরিত নিয়ম মেনে এক বচনে নয়, বরং বহুবচনে। আমি নয়, আমরা। জহির যেন তার কথনের ভেতরে এক কৌম ধারণার কথা নিয়ে আসছেন। 

১৯৯৫ সালে লেখা ‘কাঁটা’ গল্পটিও এমন। এই গল্পে এই গলির লোকেরা বিবৃত করে এক হিন্দু দম্পতি সুবোধচন্দ্র এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার কথা। আশির দশকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসনের সময় ভূতের গলিতে আবদুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে ভাড়া থাকতে আসে তারা। গোটা মহল্লা যেন আগে থেকেই জানত তাদের নাম। তারা স্থির নিশ্চিত ছিল আব্দুল আজিজের স্ত্রীর নাম সব সময়েই স্বপ্না হবে। এবং সুবোধচন্দ্রের ভাইয়ের নাম সব সময়েই পরান হবে।

আসলে সময় এই গল্পে একরৈখিক নয়। বরং অসম্পূর্ণ। তাই একই ঘটনা বারবার ফিরে আসে চক্রাকারে। ভূতের গলির লোকেরাও তাই সুবোধচন্দ্র এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এই গলিতে ভাড়া এসেছিল সুবোধচন্দ্ররা। সেই সময় রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচতে সুবোধচন্দ্র কলমা পড়া শিখেছিল। মুসলিম বেশভূষা নিয়েছিল। 

পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকাররা যখন ভূতের গলিতে থাকা হিন্দুদের খোঁজে এসেছিল, তখন সুবোধচন্দ্রকে কেউ দেখিয়ে দেয়নি। কেউ বলেনি তাদের কথা। কিন্তু শেষ অবধি রাজাকাররা ঠিক চিনে নিয়েছিল তাদের বাড়ি। কিন্তু মুসলমান বেশভূষা পরা সুবোধচন্দ্রকে আলাদা করতে পারেনি। কলমা জিজ্ঞাসা করেছিল রাজাকাররা। বাকি সবার মতো সুবোধচন্দ্রও কলমা বলেছিল নিখুঁত। কিন্তু বাড়ির উঠোনে লাগানো তুলসীগাছটা দেখে সন্দেহ যায়নি রাজাকারদের। তাই সবার শিশ্ন দেখতে চেয়েছিল তারা। আর শেষ পর্যন্ত সুবোধচন্দ্রকে রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচাতে তাকে কুয়োতে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল একজন। সুবোধচন্দ্র ডুবে মরেছিল। তার স্ত্রীও। 

তারপরেও এই পাড়ায় থাকতে এসেছিল সুবোধচন্দ্র। একদিন ঢাকা শহরে দাঙ্গা হয়েছিল। আর সেদিন কুয়োর ভেতরেই আবার পাওয়া যায় সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্নার লাশ। ভূতের গলির লোকেরা বলে, আসলে কুয়োর জলে পড়া পুর্ণিমার চাঁদ ধরতে গিয়েই ডুবে গিয়েছিল সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্না। 

১৯৯২-এর দাঙ্গার সময়েও এই গলিতেই থাকত সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্না। সেইবার বাবরি মসজিদ ভাঙার পর রটে গিয়েছিল সুবোধচন্দ্র আর তার বউ না কি দোকান থেকে মিষ্টি কিনে খেয়েছে। তাই তাদের বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছিল অনেকে। ধ্বনি দিয়েছিল আল্লাহু আকবর। সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্নাকে আবার পাওয়া গিয়েছিল কুয়োর মধ্যে। শুধু এবার আর তাদের লাশ নিতে গ্রাম থেকে সুবোধের কোনও ভাই আসেনি। বরং পুলিশ লাশ নিয়ে গিয়েছিল তাদের। 

সুবোধচন্দ্রদের নিয়ে প্রতিবারই চিন্তিত হয়ে পড়ে ভূতের গলির লোকেরা। প্রতিবারই চেষ্টা করে তাদের বাঁচানোর। অথচ প্রতিবারই সময় এগয় না। বরং একই জায়গায় ফিরে আসে। প্রতিবারই পুনরাবৃত্তি হয় মৃত্যুর। এই পুনরাবৃত্তিই যেন ট্রমার ভাষা। 

মার্কিন সাহিত্য-তাত্ত্বিক ক্যাথি ক্যারুথ দেখিয়েছিলেন, ট্রমা আসলে তা ঘটার সময় সরাসরি ভাবে ধরা পড়ে না। বরং তার অভিজ্ঞতা টুকরো টুকরো স্মৃতি হয়ে ফিরে ফিরে আসে। ‘কাঁটা’ গল্পের সুবোধচন্দ্রের পরিণতি যেন ভূতের গলির লোকেদের জীবনে কাঁটার মতো ফিরে ফিরে বেঁধে। 

শুধু ভূতের গলির লোকেদের নয়, সুবোধচন্দ্র এবং স্বপ্নাদের নিয়ে এই দ্বিধা যেন সমগ্র বাংলাদেশের, যাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলাও যায় না। আবার স্পষ্ট করে বলাও চলে না। 

বেশি লেখায় বিশ্বাস করতেন না জহির। ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ হৃদরোগে অকালেই মারা যান তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। ততদিনে তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা মাত্র ২৩। 

অথচ লেখা শুরু করেছিলেন খুব অল্প বয়সে। একুশ থেকে তেইশ, তিন বছর ধরে লেখা পাঁচটি গল্প নিয়ে তার প্রথম বই ‘পারাপার’। প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তখনও নিজের নাম লিখতে শহীদুল হক। এই বইয়ের গল্পগুলো সমাজের অন্তজ শ্রেণিকে নিয়ে। বাস্তবকে মেনে নিয়ে। হয়তো সেই জন্যই পরে বইটার পুনঃপ্রকাশে আর উৎসাহী হননি। 

তিরিশের শেষ কোঠায় পৌঁছে আবার গল্প লেখা শুরু করেন জহির। আর এই গল্পগুলো সবই বাংলা গল্পের চিরাচরিত বাস্তবতাকে ভেঙে। তার গদ্যভঙ্গিমাও সম্পূর্ণ আলাদা। ছোট বাক্য নয়। বরং খুব বড় বড় যৌগিক এবং জটিল বাক্য। অতিদীর্ঘ, কয়েক পাতা ব্যাপী অনুচ্ছেদ। ঠিক মূল স্প্যানিশে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গদ্যের মতো। 

শহীদুল জহিরের এই প্রবণতা সব থেকে বেশি দেখা যায় তাঁর ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ নামক গল্পে। প্রায় সাত হাজার শব্দের এই গল্পে অনুচ্ছেদ ভাগ নেই কোনও। দাঁড়ি নেই। শুধুমাত্র একটাই যতির ব্যবহার। সেটা কমা। 

‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটিও সেই পুরনো ঢাকা নিয়ে। এই গল্পের কোনও সহজ কাহিনি নেই। বরং গল্প জুড়ে আছে তরমুজ বিক্রেতা ও গলির লোকেদের তরমুজ খাওয়ার বৃত্তান্ত। যে তরমুজ এবং তার খাওয়ার ধরন– দুই-ই বদলে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। আর তার মাঝেমাঝেই গুঁজে দেওয়া এই এলাকায় লেদ মেশিন, বিস্কুট কারখানার মতো ছোট-ছোট কারখানার গড়ে ওঠার কথা। গল্পের শেষ হয় এলাকায় একটা তরমুজ প্রক্রিয়াকরণের কারখানা গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। 

এই গল্পের শেষও হয় দাঁড়িতে নয়। একটা কমায়।  

জহির যেন সময়ের অসম্পূর্ণতাকেই ধরতে চেয়েছেন কমার ব্যবহার দিয়ে। সময় এখানে শেষ হয় না– বরং বয়ে চলে অবিরাম। সব কিছুই ঘটছে, কিন্তু যেন কিছুই সম্পূর্ণভাবে ঘটছে না। মানুষ আর প্রশ্ন করে না, প্রতিক্রিয়া দেখায় না, প্রতিরোধও করে না– শুধু অংশ নেয়। সেই অংশ নেওয়াও যেন অর্থহীন।

এই অভ্যস্ত অথচ অর্থহীন জীবন থেকে বেরিয়ে না-আসাটাই এক ধরনের দ্বিধা। এই দ্বিধা মানুষকে থামায় না– বরং তাকে স্রোতের ভেতরেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর তাই যেন হয়ে ওঠে মানুষের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। 

শহীদুল জহিরের গল্পেও তাই কোনও চূড়ান্ত উচ্চারণ নেই। অর্থ বারবার সরে যায়, ঘটনা ফিরে আসে, পরিসমাপ্তি স্থগিত থাকে। এই স্থগিত করে রাখা, না-বলা, দ্বিধাই– শহীদুল জহিরের আখ্যানের কেন্দ্র, তাঁর গভীরতম রাজনৈতিক অবস্থান।