Robbar

তবুও মানব থেকে যায়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 26, 2026 11:51 am
  • Updated:March 26, 2026 11:51 am  

যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন সাধারণ কাশ্মীরী নাগরিকরা। লক্ষ্য একটাই– ইরানের বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। উদ্যোগে নগদ অর্থ, সোনা-রূপোর গয়না, তামার বাসন এমনকী, গবাদি পশুও। ইমামবাড়া ও স্থানীয় কেন্দ্রগুলিও হয়ে উঠেছে সহমর্মিতার মিলনস্থল। ইদের সময়কে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ পেয়েছে আরও দুর্বার গতি– উৎসবের আনন্দ, ভোরের আজান যেন আশ্বাস হয়ে বয়ে যাচ্ছে বহুদূরের এক শোকাহত, পীড়িত জনপদের দিকে।

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

পৃথিবীর মানচিত্রকে দুঃসময় যেন নতুন করে আঁকতে বসেছে। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, ভাঙন কেবলই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে নানা দেশ ও সেই দেশের মানুষদের। চারপাশে নিভে-আসা আলোর মতো গুমরে ওঠে শোক। তবু এই কান্নার ভিতরেই কখনও কখনও উঠে আসে অন্য এক সুর– এক অদৃশ্য বেপরোয়া আহ্বান, যা ভৌগোলিক সীমান্ত মানে না।

আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি

কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্ত আজ ভেসে যাচ্ছে সেই সুরে। নিজেদের জীবনও যেখানে অনিশ্চয়তার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই কাশ্মীরী মানুষরাই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বহু দূরের ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের দিকে। বুদগাম, বারামুল্লা– এইসব অঞ্চলে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত তহবিল সংগ্রহ। কেউ দিচ্ছেন নগদ অর্থ, কেউ গয়না, কেউ-বা বহুদিনের সঞ্চয়। এমনকী, ছোট ছোট শিশুও তাদের পিগি ব্যাঙ্ক ভেঙে তুলে দিচ্ছে সব কিছু। গরিবের সামান্য খুদকুঁড়োও যেন মুহূর্তে ঝিকিয়ে তুলছে সেই অমোঘ উচ্চারণ: ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’

কাশ্মীরে চলছে ত্রাণ সংগ্রহ

এ যেন অবলীলায় অনেক কিছু দেওয়ার সহজ পাঠ। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন সাধারণ কাশ্মীরী নাগরিকরা। লক্ষ্য একটাই– ইরানের বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। সম্প্রতি কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায়, শুরু হয়েছে এক অভিনব তহবিল সংগ্রহ অভিযান। এই উদ্যোগে নগদ অর্থ, সোনা-রূপোর গয়না, তামার বাসন এমনকী গবাদি পশুও অবলীলায় দিয়ে দিচ্ছে মানুষ। স্বেচ্ছাসেবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করছেন এই সাহায্য। ইমামবাড়া ও স্থানীয় কেন্দ্রগুলিও হয়ে উঠেছে সহমর্মিতার মিলনস্থল। ইদের সময়কে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ পেয়েছে আরও দুর্বার গতি– উৎসবের আনন্দ, ভোরের আজান যেন আশ্বাস হয়ে বয়ে যাচ্ছে বহুদূরের এক শোকাহত, পীড়িত জনপদের দিকে।

একদিকে ধর্মীয় সংহতি, অন্যদিকে নিছক মানবিক দায়বদ্ধতা

এই উদ্যোগের মধ্যে উঠে এসেছে হৃদয়স্পর্শী একাধিক গল্পও। এক বৃদ্ধা তাঁর প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে আগলে রাখা একটি সোনার স্মারক দান করেছেন। তাঁর কথায়, ‘যেখানে মানুষ এত কষ্টে আছে, সেখানে এই স্মৃতি আঁকড়ে রাখার চেয়ে তা কাজে লাগানোই ভালো।’ এই ঘটনার ভিতরে যে সুরটি সবচেয়ে গভীর, তা হল– যারা নিজেরাই প্রান্তিক, বিপন্মুখ– তারাই আজ অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ডান পাশে ধস, বাঁয়ে গিরিখাতের অহর্নিশ আশঙ্কা পেরিয়েও কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস হারায়নি মানবতার ওপর। তাই সারা বিশ্বের নজর এখন কাশ্মীরের দিকে।

ইরানের জন্য আশ্বাস

এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে একদিকে ধর্মীয় সংহতি, অন্যদিকে নিছক মানবিক দায়বদ্ধতা। অনেকেই মনে করছেন, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও মানুষের দুঃখ-কষ্টের কাছে সেই দূরত্ব তুচ্ছ। শ্রীনগরের বাসিন্দা আইজাজ আহমেদ মনে করেন, ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ আক্রমণে কোণঠাসা ইরানের এহেন দুর্দিনে, বিশ্বের যে কোনও সভ্য মানুষেরই উচিত ইরানকে সাধ্যমতো সাহায্য করা। সম্প্রতি তেহরান থেকেও ভারতের এই উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। ইরানের তরফে জানানো হয়েছে, কাশ্মীরের মানুষের এই সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ‘কখনও ভোলা যাবে না।’
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যে এই ঘটনা যেন অদ্ভুত আঁধারের মাঝে এক অন্য আলো। যেখানে রাষ্ট্রনীতি বিভক্ত, সেখানে মানবিকতাই এখনও গড়ে তুলতে পারে নিবিড় সংযোগের সাঁকো। ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’।

সহমর্মিতার মানচিত্রে কাশ্মীরের নাম থেকে যাবে আরও বহুদিন।