
পয়লা এপ্রিল সেই ক্যাবলা মানুষদের দিন, যারা ক্যাব না-ধরে ট্যাক্সি ধরে। পৃথিবীর গতির চেয়ে সেই ক্যাবলাকাটিংদের গতি বেশ খানিকটা ধীর। যারা একই মানুষের প্রেমে বছর-বছর আটকে থাকে। বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখে কবেকার শুকনো ফুল। চট করে ‘মুভ অন’ করতে পারে না, তাদের ব্যথা কোনও মুভ-এর মলমে সারে না, তা সে-পিছুটান প্রেম হোক বা পোষ্যের মৃত্যু।
এপ্রিল পয়লা বস্তুত ক্যাবলাদিন। তারাই ক্যাবলা, যারা ক্যাব না-ধরে ট্যাক্সি ধরে এখনও। পৃথিবীর বাঁইবাঁই গতির চেয়ে সেই ক্যাবলাকাটিংদের গতি খানিকটা আলগা, ইতস্তত দুলকি চালের। যাদের একই মানুষের প্রেমে বছর-বছর মনের ভেতর পথ অবরোধ। বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখে কবেকার শুকনো প্রেমের পোড়া ফুল। চট করে ‘মুভ অন’ করতে পারে না, তাদের ব্যথা কোনও মুভ-এর মলমেও সারে না, তা সে পিছুটান প্রেম হোক বা পোষ্যের মৃত্যু। বারবার বিশ্বাস করে ফেলে বোকা মানুষ, শত্রুকেও বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের বন্ধুহাত। তাগড়া মাইনের চাকরি ছেড়ে সুখতলা খইয়ে ঘুরে ঘুরে শেষমেশ ভবঘুরের জীবন বেছে নেয়। ক্ষয়ক্ষতি তারা বোঝে না, এমন নয়। কিন্তু ভাবতে ভালোবাসে, এখনও সময় আছে নতুন করে গড়ে তোলার। ধসে পড়া বিষণ্ণ পৃথিবীর ঘোলাটে বুকে তাদের চোখ থমকে যায় প্রজাপতির ডানার আঁকিবুঁকিতে।

বোকামি হয়ে গেল না তো? শ্বাপদের এই মহাসমারোহে দাঁড়িয়ে, কম-বেশি প্রত্যেককেই তাড়িয়ে বেড়ায় এই প্রশ্ন, এই ভয়। কেউ যদি খারাপ মানুষ ভাবে, তাতে বুঝি তবু কিছু ভরসা থেকে যায়। কিন্তু পাছে কেউ বোকা ভেবে ফেলে, তা নিয়ে সবসময় ডাহা সচেতন। আর সমাজ যেন ‘ডান্স’ (dunce) লেখা টুপি হাতে ওঁত পেতেই রয়েছে। একচুল ভুল হলেই চাপিয়ে দেবে মাথার ওপর। চাইনিজ রেস্তরাঁয় গিয়ে চপস্টিকেই খেতে হবে খাবার, তাতে হাত যতই কেঁপে যাক। অফিসের পার্টিতে আপন-পছন্দের পাঞ্জাবি-পাজামা পরে হাজির হওয়ার চাইতে বড় বোকামি আর কী-ই বা হতে পারে?
বোকা মানুষ চিনে নেওয়ার সহজ উপায় সিনেমা শিখিয়ে দিয়েছে একঝলকেই। ঢিলে জামা, উঁচু দাঁত, তেল-চুপচুপে চুল কিংবা সটান টং বেণী, চোখে ভারী কাচের চশমা। এরকম মানুষকেই বাতিল করে নায়ক বা নায়িকা বেছে নেয় তার পছন্দের সঙ্গী। নয়তো-বা তারা আঁটসাঁট পোশাক পরে ফিরে আসে সকলকে তাক লাগানোর জন্য। গা থেকে সযত্নে ঝেড়ে ফেলে আসে বোকামির ট্যাগ। ছোটবেলায় ভাত গরাস পাকিয়ে মুখে তুলে দিতে দিতে মা ‘টেনিদা’ পড়ে শোনাত। বলত, নিজেকেই নাকি সবার চাইতে সাদামাটা-বোকাসোকা দেখিয়েছেন লেখক। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করাই সবথেকে কঠিন! আমি জানলার কাচে রোদের খেলাধুলো দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবতাম, নিজেকে গোয়েন্দা ভেবে জটিল রহস্যের সমাধান করার চাইতেও কঠিন? ময়দানে নেমে যুদ্ধ জয় করার চাইতেও কঠিন?

আমার তখন সদ্য ক্লাস টুয়েলভ। ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে টিউশন, ফোনে ফোনে গান চালান করার তুমুল হিড়িক। সে সময়েই এক বন্ধুর দেওয়া মিউজিক ফাইল চালাতে, কানে বেজে উঠেছিল ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়– ‘‘৪ঠা অক্টোবর তাদের দু’জনের প্রথম দেখা হল’’। বোকা ছেলেটির ভালোবাসা না-বুঝে শেষমেশ অন্য পুরুষকে বেছে নেয় মেয়েটি। ছেলেটা মারা যায় হাসপাতালে। সে-কবিতা যে শুভ দাশগুপ্ত-র ‘প্রেম’, তা জেনেছি অনেক, অনেক পরে।
বোকা মানুষ যদি মেনে নিতে পারে নিজের খামতি, তাহলে সে সুখই পায়। নিরন্তর না-ছুটে, খানিক বিশ্রাম নিতে পারেন। কী এমন মন্দ ধীরগতির জীবনে? না-ই বা তাতে গিলে নেওয়া গেল হুড়োতাড়ার যাপনের সবটুকু নির্যাস! এ উপলব্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয় কি আর? প্রেয়সী আপাত স্মার্ট কাউকে বেছে নিলে, কান্না পায় বইকি। বোকারা তখন নিজের ভাগেও চেয়ে ফেলে ওপরচালাকিটুকু। গা ঘষে ছাড়িয়ে ফেলতে চায় বোকামির শেষতম চিহ্ন। যদিও, বোকামি ধুয়ে ফেলা সহজ নয় মোটে। একবারমাত্র পাশের মানুষকে হাত ধরে এসক্যালেটরে তুলে দিতে পারলে, সে আনন্দের রেশ থেকে যায় অযুত-নিযুত বছর। মনে রয়ে যায়, ১০ বছর আগে দেখা জলের ওপর ভাসমান হলুদ পাপড়ি। শুভ দাশগুপ্ত যখন বলেন ‘স্বপ্ন দেখে কেবল বোকারা’, তখন দু’দণ্ড শান্তি পাওয়া যায় ঠিকই। মনে হয়, দলে ভারী হওয়া গেল। কিন্তু খেয়াল হয় তারপরই, গল্প শেষে মরে না-গেলে বুঝি জয় আসবে না বোকাদের নাগালে।

অনন্ত ব্যস্ততাই যা খানিক বাঁচাতে পারে বোকাদের। ট্রেনে-বাসে বৃদ্ধ অথবা গর্ভবতী মহিলাকে সিট ছেড়ে দিলে তা ‘শিভ্যালরি’ হলেও হতে পারে। কিন্তু বুদ্ধির আসল পরিচয়, ট্রেনের চাকা থামা মাত্র হামলে পড়ে নিজের জায়গা দখল করে নেওয়ায়। তাতে ভিড়ের তলায় চেপ্টে যাক পিছিয়ে পড়ার দল! সংবেদনশীলতা মানেই তো বোকামি। চালাক হলে, গরমে ঘেমেনেয়ে আসা ক্লান্ত ডেলিভারি পারসনকে দেখে মায়া লাগার কথা নয়। রেস্টুরেন্টে খেতে বসে, প্লেটের পাশে ছিবড়ে-হাড়-কাঁটার ঢিবি ফেলে যেতে দ্বিধাবোধ হওয়ার কথা নয়। গলির মুখে যে-প্রাচীন বটগাছ হেলে পড়েছে বৃদ্ধ মানুষের মতো, এক দুপুরে তার কোমর বরাবর করাত চললে সে-ব্যথা নিজের শরীরে অনুভব করার কথা নয়। চালাক মানুষকে আশপাশের কোনও ঘটনাই টলাতে পারে না। জীবন, মৃত্যু, মৃত্যুর চেয়েও খারাপ জীবন, সব কিছুকেই ডার্ক হিউমার ভেবে নির্দ্বিধায় চিবিয়ে খেতে পারে সে।
চালাকি স্মার্টফোনের আপডেট। একটা মিস হলেও বোকা হয়ে থেকে যেতে হয়। তা না-চাইলে, সর্বক্ষণ জেনে নিতে হবে শেষতম ‘ভাইরাল’ খবর। আর জেনেও নির্লিপ্ত থাকতে হবে। মৃত্যু হোক, যুদ্ধ হোক, বা অন্য যা কিছু– সব জানতে হবে তথ্য হিসেবে। গভীরভাবে প্রভাবিত হলে চলবে না কিছুতেই। বোকা কি না, তা প্রমাণ করার পরীক্ষাও তো শুরু হয়ে যায় জন্মানো মাত্রই। অন্নপ্রাশনে পেন ছেড়ে পয়সা ধরা শিশুটির উদ্দেশে উপস্থিত সক্কলে মিলে বলে ওঠেন, ‘এখনই কী চালাক, দেখেছ!’ প্লে-স্কুলে অন্যান্য সঙ্গী টিফিন কেড়ে খেয়ে নিচ্ছে, বা পরীক্ষায় বাকি সব্বাই টুকলি করছে জেনে, কত শিশুর অভিভাবকই তো বলেন বিরক্ত হয়ে, তার চালাকি না-পারা সন্তান আসলে বোকা মানুষ– ভালো মানুষ নয়!

তবে যা নিয়ে কথা বলে না তেমন কেউ, চালাকেরাও সবার আড়ালে বোকাই ভাবে নিজেদের। কী একটা না-হতে পারার আক্ষেপ তাড়িয়ে বেড়ায় সুযোগ পেলেই। বোকামি যেন সকলেরই ভিতরে থাকা কুৎসিত কঙ্কাল, যার ওপরের রক্তমাংসের গ্রহণযোগ্য মোড়কটি সরে যেতে দেওয়া চলে না কোনও মূল্যেই। দিনের শেষে, আয়নায়, ভিতরের আদ্যোপান্ত বোকা সত্তা এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। ভিতরে ভিতরে হেরে যায় চালাকেরা আর পকেটে গুঁজে নেয় কলার খোসা। লোকসমাজে এলেই তা ছুড়ে দেয় অস্ত্রের মতো। বোকা মানুষ তাতে মুখ থুবড়ে পড়লে, হাসে সেই চালাক।
এপ্রিলের প্রথম দিন হাত বাড়ায় সেই মুখ-থুবড়ে পড়া মানুষের দিকে। আপনি কী হতে চান? এপ্রিলের পয়লা তারিখ– বোকা, না কি এক্কেবারে চালাক মানুষ?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved