tagores raja indian classical music and kishori amonkar | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঈশ্বর আর কিশোরীর সংলাপ

কী গল্প করতেন মীরার সঙ্গে কিশোরী আমনকর? রাজার গল্পই বোধহয়। বিভিন্ন আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘আমার আর নিজের বলতে কী আছে! কিছু নেই। আমার গুরুরা ধনী বলেই নিজেকে এমন ধনী মনে হয়। যা হাতে নিই তা সোনা হয়ে ওঠে, কারণ তিনি তাই চান। সমস্তর মধ্যে তাঁরই ইচ্ছের জয়। অদৃশ্যের সখাটি আমাকে চালনা করে নিচ্ছেন– ঠিক জানি, মৃত্যুর আগে আলোয় ধরা দেবেন আমায়।’

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১০:১০   
Facebook WhatsApp Messenger

সুদর্শনা। তুমি আমাকে আলোয় দেখা দিচ্ছ না কেন?
রাজা। আলোয় তুমি হাজার হাজার জিনিসের সঙ্গে মিশিয়ে আমাকে দেখতে চাও। এই গভীর অন্ধকারে আমি তোমার একমাত্র হয়ে থাকি-না কেন।

[রাজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]

রানির মতো বসেছেন কিশোরী আমনকর– গৌরবর্ণা, তীক্ষ্ণনাসা, নিমীলিতচক্ষু, হাতে স্বরমণ্ডল। পরনে মেরুন শাড়ির আঁচল বেয়ে রোদের সরু ফালির মতো সোনালি জরির পাড়, কপালে কুমকুমের গোল টিপ, পরিমিত গয়না, সামান্য শৃঙ্গার। নিমগ্ন হয়ে গাইছেন অল্পবয়সের প্রিয় রাগ ‘ভূপ’– অর্থে ‘রাজা’। 

গাওয়ার আগে অন্ধকার করে দিতে বলছেন গোটা মঞ্চ। প্রদর্শনীর আলো মনঃসংযোগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর। থাকুক সামনে হল-ভরা দর্শক, আসুক দেশ-বিদেশের তামাম জ্ঞানীগুণী যাঁরা– কী আসে যায়! তিনি বিশ্বাস করেন, রাগ-রাগিনী শুনতেই আসে সবাই, কিশোরী আমনকরকে দেখার জন্য নয়। কিশোরীর মতে, “কেরামতি দেখানোর বিষয় নয় রাগ-রাগিনীরা। ‘আমি’ বলে কিছু নেই কোত্থাও। ‘আমার’ করে পেতে চাওয়ার থেকে মহোত্তর সাধনা হল রাগ-রাগিনীর মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারা, নিজে সেই রাগ বা রাগিনী হয়ে ওঠা।” 

zoom
কিশোরী আমনকর

মানুষের কথা মনে রেখে গান করেন না তিনি, ঈশ্বর-স্পর্শের জন্যই যত আয়োজন। সুরপথে ধরা দেন পরমব্রহ্ম– তাকে মেনে চলাই ধর্ম। অন্ধকারের গর্ভে বসে সুর দিয়ে তিনি ধরতে চান ‘সহেলা’ রাজাটিকে। কেমন সেই রাজার চরিত্র? কখনও বন্ধু, কখনও প্রেমিক, কখনও প্রভু, কখনও পিতা, কখনও প্রজাপালক। কঠিনে কোমলে মিশিয়ে তিনি সর্বেশ্বর। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকে সুরঙ্গমা রাজার বর্ণনাকালে বলছে, ‘উঃ, কী নিষ্ঠুর! কী নিষ্ঠুর! কী অবিচলিত নিষ্ঠুরতা!’ তারপর এ-ও বলছে, “এত অটল, এত কঠোর ব’লেই এত নির্ভর, এত ভরসা।” 

কিশোরী জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালে, মুম্বই শহরে। তার ২২ বছর আগে ১৯১০ সালে বাংলায় প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী নাটক– ‘রাজা’। কিশোরীকে দেখেননি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের নাটকটির কথা কিশোরী জানতেন কি না, জানি না। সময়ের আলাদা প্রান্তে নিজস্ব সাধনক্ষেত্রে বসে দু’জনে তবু ধরতে চান সমর্পণের উদ্ভাস, বুঝতে পারেন নিবেদনবিন্দুতে থিতু হতে পারলে আলো ও অন্ধকারের মধ্যে তারতম্য থাকে না।

সুরঙ্গমা। বড়ো দরজাটা খুলেছে– তিনি আসছেন, ভিতরে আসছেন।
সুদর্শনা। তুই কেমন করে টের পাস!
সুরঙ্গমা। কী জানি মা। আমার মনে হয় যেন আমার বুকের ভিতরে পায়ের শব্দ পাচ্ছি। আমি তাঁর এই অন্ধকার ঘরের সেবিকা কিনা, তাই আমার একটা বোধ জন্মে গেছে– আমার বোঝবার জন্যে কিছুই দেখবার দরকার হয় না।
সুদর্শনা। আমার যদি তোর মতো হয় তা হলে যে বেঁচে যাই।
সুরঙ্গমা। হবে মা, হবে। তুমি দেখব দেখব করে যে অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে রয়েছ সেইজন্যে কেবল দেখবার দিকেই তোমার সমস্ত মন পড়ে রয়েছে। সেইটে যখন ছেড়ে দেবে তখন সব আপনি সহজ হয়ে যাবে।
সুদর্শনা। দাসী হয়ে তোর এত সহজ হল কী করে? রানী হয়ে আমার হয় না কেন?
সুরঙ্গমা। আমি যে দাসী, সেইজন্যেই এত সহজ হল। আমাকে যেদিন তিনি এই অন্ধকার ঘরের ভার দিয়ে বললেন ‘সুরঙ্গমা, এই ঘরটা প্রতিদিন তুমি প্রস্তুত করে রেখো এই তোমার কাজ’ তখন আমি তাঁর আজ্ঞা মাথায় করে নিলুম– আমি মনে মনেও বলি নি, ‘যারা তোমার আলোর ঘরে আলো জ্বালে তাদের কাজটি আমাকে দাও।’ তাই যে কাজটি নিলুম তার শক্তি আপনি জেগে উঠল, কোনো বাধা পেল না। ঐ-যে তিনি আসছেন– ঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রভু!

[রাজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]

‘রাজা’ নাটক জুড়ে দেখতে পাই কেমন করে অন্ধকার কক্ষের আবরণ ছিন্ন করার জন্য অধীর হয়ে ওঠা রানি বাইরের বিস্তর আগুনপথ পার করে, নিজেকে নিরন্তর ভেঙেচুরে ধুলোবালি করতে করতে শেষ পর্যন্ত শিখে নিচ্ছে সত্যজ্ঞান। সেই মুহূর্ত থেকে অন্ধকারের পালা শেষ, রাজার সঙ্গে আলোর বোঝাপড়া। উপলব্ধির শেষ সীমায় পৌঁছনোর আগে অবধি হাজার গঞ্জনা সত্ত্বেও সুরঙ্গমা রানির সঙ্গ ছাড়ে না। সেইখানেই সুরঙ্গমার কাছে আমাদের ঋণ। আমিত্বভরা চঞ্চলহৃদয়ের পাশে স্থিরবিশ্বাসের জীবনযাপন করতে করতে নীরব বন্ধুর মতো সে শিখিয়ে দিতে পারে সমর্পণের গুণ, মুক্তির মানে, ‘অস্তি’র জাত্যর্থ।

‘অন্ধকারের মাঝে আমায় ধরেছ দুই হাতে।
কখন তুমি এলে, হে নাথ, মৃদুচরণপাতে।
ভেবেছিলেম, জীবনস্বামী
তোমায় বুঝি হারাই আমি–
আমায় তুমি হারাবে না বুঝেছি আজ রাতে।
যে নিশীথে আপন হাতে নিবিয়ে দিলেম আলো
তারই মাঝে তুমি তোমার ধ্রুবতারা জ্বালো
তোমার পথে চলা যখন
ঘুচে গেল, দেখি তখন–
আপনি তুমি আমার পথে লুকিয়ে চল সাথে॥’

[সুরঙ্গমার গান। রাজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]

কোন মন্ত্রবলে কিশোরীর সাধনপথ সুরঙ্গমার সমর্পণ-সংগীত শিখে নিল, তা ভেবে বিস্মিত হই! কিশোরী বলেন, ‘সুরই আমার দেবতা। লোকে পাগল বলবে, তবু বলব– আজও কোন কনসার্টে রাগের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে গেলে ভয়ে কাঁপি। রাগ-রাগিনীরা কৃপা না-করলে নশ্বর কণ্ঠের সাধ্য নেই সে বিশ্বরূপ স্পর্শ করার। তাই ঈশ্বরকে ডেকে বলি– প্রভু, আজ তুমি গাও। তিনি আমার মধ্যে বসে গান করেন। যদি কোনও দিন আসর মাত্রাছাড়া উচ্চতায় পৌঁছয়, নিজেকে বোঝাই– আমি কেউ নই, তিনি গেয়েছেন বলেই এত আনন্দ সবার। এক জীবনে আর কী চাই! আপদবিপদ, দুঃখকষ্টে ডাকি; অভীষ্ট না পেলে ঝগড়াঝাঁটিও করি– এমনিতে আমি খুব ঝগড়ুটে। কিন্তু ঈশ্বর মধুর, সুর বড় দয়ালু। পেছন পেছন যাও, হোঁচট খাও, মুখ থুবড়ে পড়ো– সে ঠিক পেছন ফিরে চায়, কোল দেয়। সুর খুব জ্যান্ত ব্যাপার। আমার সঙ্গে কতরকম বাক্যালাপ হয়– যখনই কথা বলে পথ দেখায়। কিন্তু যখন কিশোরী আমনকর হয়ে গাইতে বসি ধার মাড়ায় না আর। ওই সময়গুলোতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই। সুরকে ছেড়ে, ঈশ্বরকে ভুলে কেন নিজের দিকে তাকাতে গেলাম এই গ্লানি বিষণ্ণতা জাগায়।’ 

এমনি এমনি হয় না কিছু। নিজেকে সংহত করার শিক্ষা আয়ত্ত করতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, প্রত্যয়-প্রদীপ জাগিয়ে রাখতে হয় বুকের ভেতর। আমিত্বকে ভাঙতে হয় বারবার। শিল্পী-জীবনে দুঃখই কি সৃষ্টির সবচেয়ে জরুরি উপাদান? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে অন্তরের আলো ও অন্ধকার মন্থন করে কিশোরী বলেন, ‘আমরা আনন্দের সন্তান। জীবনের পাকেচক্রে সেই আনন্দবোধ থেকে ত্যক্ত হয়েছি। সুখ আর দুঃখ এই দুই মিলে জন্ম নেয় সৎ-চিৎ-আনন্দ। সুখ-দুঃখ দুটোই চেনা দরকার। সুখ কম সময়ের জন্য ধরা দেয় বলে দুঃখকে বেশি চিনতে পারে মানুষ। কিন্তু দুঃখ বা সুখ নয় আমি আনন্দের আবেশে গান গাই। সেই আনন্দ শ্রোতার আত্মায় ছায়া ফেলে, আলো দেয়। মানুষকে প্রীত করা উদ্দেশ্য নয়, তার উপকারে লাগাই আমার কাজ।’

zoom
আলোকচিত্র: প্রসাদ পাওয়ার

শিশুকালে মা ও গুরু মগুবাই কুর্দীকর চিনেতে পেরেছিলেন কিশোরীর কিন্নরীকণ্ঠের কাঁচামাল। পাঁচ বছর বয়স থেকে নিয়মিত তালিম দিয়ে গড়েপিটে নিয়েছিলেন কণ্ঠ ও কণ্ঠের অধিকারিণীকে। নিজস্ব জয়পুর ঘরানার বাইরেও অন্য গুরুদের পায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন সংগীতের ব্যাপ্তি জানার হেতু। শিখিয়েছিলেন সাধনা মানে লেগে থাকা– বিচ্যুতি বা গাফিলতির জায়গা নেই আমৃত্যু। 

খ্যাতির প্রথম দিকে এক মাসে আটটা কনসার্টে গাওয়ার ডাক এলে আহ্লাদভরে মাকে সুখবর দিতে গিয়ে মস্ত শিক্ষা পেয়েছিলেন কিশোরী। গুরু মগুবাই সব শুনে বললেন, ‘বাছা, প্রতি কনসার্ট পিছু চার দিন সময় ব্যয় হলে মোট ৩২ দিন খরচ হওয়ার কথা– এদিকে ৩০ দিনে মাস। রেওয়াজ করবে কখন? যার সাধনা নেই তাকে আমি শিষ্য বলে পরিচয় দিতে নারাজ। ভাবো কী করণীয় এখন তোমার।’ সেই থেকে নিজেকে শুধরে নিয়েছেন কিশোরী। মাসে চারটের বেশি কনসার্ট করতেন না। বিদেশ যেতে চাইতেন না। প্রতি পরিবেশনার আগে অভিনিবেশ সহকারে সেই রাগ-রাগিনীর একাগ্র রেওয়াজ ছিল বাধ্যতামূলক। এমনকী, স্বরমণ্ডল বাঁধা থেকে গান শুরুর আগে পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটার তোয়াক্কা না-করে নিতেন পর্যাপ্ত সময়। 

zoom
মগুবাই কুর্দীকর

১৭ বছর বয়সে গাওয়ার সবরকম দক্ষতা অর্জনের পরও ৩০ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত কিশোরীকে জনসমক্ষে গাওয়ার সম্মতি দেননি মগুবাই। সেই প্রসঙ্গে কিশোরীর বক্তব্য– ‘ছোটবেলায় স্টেজ পেয়ে গেলে, প্রশংসা পাওয়ার লোভ এমনভাবে মনে থাবা বসায় যে শিক্ষানবিশিতে ভাঁটা পড়ে। গুরু চাননি আমি শিক্ষা থেকে সরে যাই। ভাগ্যিস বেঁধে রেখেছিলেন, তাই আজ নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার দিকে এমন মনযোগী হতে পেরেছি। চিনতে শিখেছি সংগীত মানে কেবল পারফরম্যান্স নয়, সংগীত হল জ্ঞান– বিদ্যা। মা শিখিয়েছিলেন সংগীত entertainment নয়, enjoyment নয়, সংগীত আসলে ঈশ্বরলাভের পথ।’ 

সেই পথে মীরাবাই বন্ধু হয় কিশোরীর। তাঁর মতে, ‘মীরাকে আমাদের মধ্যেকার একজন বলে মনে হয়। কৃষ্ণকে স্বামীরূপে দেখা তো এ দেশে নতুন কিছু নয়, সে লোকাচারের অঙ্গ। কিন্তু মীরা পেরেছিলেন লোকবৃত্ত অতিক্রম করে যেতে। সেজন্য অবশ্য বহু ক্লেশ ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে ওঁকে– সেকথা ভাবলে দুঃখ হয়। এই বেদনাকে ধারণ করতে চেয়েছিলাম সংগীতের ভেতর– তাই মীরার ভজন গাই। মীরার সঙ্গে গল্প করা যায়।’

zoom
মীরাবাই, কাংড়া চিত্র

কী গল্প করতেন মীরার সঙ্গে কিশোরী আমনকর? রাজার গল্পই বোধহয়। বিভিন্ন আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘আমার আর নিজের বলতে কী আছে! কিছু নেই। আমার গুরুরা ধনী বলেই নিজেকে এমন ধনী মনে হয়। যা হাতে নিই তা সোনা হয়ে ওঠে, কারণ তিনি তাই চান। সমস্তর মধ্যে তাঁরই ইচ্ছের জয়। অদৃশ্যের সখাটি আমাকে চালনা করে নিচ্ছেন– ঠিক জানি, মৃত্যুর আগে আলোয় ধরা দেবেন আমায়।’

২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল ঘুমের ভেতর রাজার চিঠি যখন সত্যি সত্যি এল, তখন কৃতান্তকে রাজাধিরাজ বলে কি চিনতে পেরেছিলেন কিশোরী আমনকর? হয়তো আজীবনের সাধিত সুরের ঈশ্বর সত্যিই হাত ধরেছিল তাঁর– সপ্তক বেয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল অন্তরীক্ষের সেই ভূমায় যেখানে তিনি রূপ নন, ছায়া নন, কেবল অনাহত নাদ।

indian classical music indian music kishori amonkar magubai kurdikar Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on