


টাঙ্গাইল শাড়ি শৌখিন, অনন্ত তার বৈচিত্র-পাড়, বুটির আকার-প্রকার, আঁচলের বৈভবে। তার মধ্যে আবার ফুলিয়ার শাড়ির পাড় তো open-ended– আমার বিশেষ পছন্দ। সাধারণত পাড়ের শেষে একটি রেখা বুনে, তার পাশে ছোট আকারে মন্দির মোটিভ বোনা থাকে। ফুলিয়ার শাড়িতে পাড়ের নক্শা অনায়াসে মিশে যায় জমিতে, শেষ বলে কিছু নেই, নেই কোনও সীমান্ত। সদ্যই প্রয়াত হয়েছেন বিদুষী সতী চট্টোপাধ্যায়। শাড়ি নিয়ে তাঁর একটি অপ্রকাশিত লেখা রইল রোববার.ইন-এর পাঠকদের জন্য।
ঘরেতে না এলেও মনে যার নিত্য আসা-যাওয়া, সিন্ধু বারোয়াঁর তানে যখন আকবর বাদশাহ আর হরিপদ কেরানির ফারাক ঘুচে যায়, তখন ধলেশ্বরী নদীতীরে কোনও এক গ্রামে, যে-কন্যা অবিরত অপেক্ষারত, তার পরিধান ঢাকাই শাড়ি।
মেঘের গর্জন আর শ্যামল দু’টি গাইয়ের ভয়ার্ত স্বর শুনে ময়নাপাড়ার মাঠে যে-মেয়ে ত্রস্তে বেরিয়ে আসে, লজ্জা পাওয়ার অবকাশ না-পেয়ে সে মাথার ওপরে তুলে দেয়নি যে বাস, সে ও তার আটপৌরে শাড়ির আঁচল। ঠিক যেমন গোষ্ঠে সন্ধ্যা নেমে আসার সময় শ্রান্ত দেহে টেনে না-দেওয়া উর্বশীর স্বর্ণাঞ্চলখানি।
আর মালতিবালা বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি আর শাড়ি তো সমার্থক।
বঙ্গচেতনায় অন্তঃস্থিত যে নারী-রূপকল্প, শাড়ি সেই প্রতিমায় বিগৃহীত, ইংরেজিতে যাকে বলি ‘Iconised’।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ৮৮-তে পৌঁছে, ফিরে তাকিয়ে দেখি, এই বিগ্রহণ প্রক্রিয়ার (Iconisation) গভীরতা আর ব্যাপকতা। সত্যিই তো সেই ১৯৪০ দশকের শেষে নবম শ্রেণিতে পৌঁছনো ছিল বড় হয়ে যাওয়ার চৌকাঠ। হাতে ম্যাট্রিকুলেশন-পাঠ্য পুথিপত্র আর পরনে শাড়ি।
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে এলাম ১৯৫০ সালে, ছেলেদের কলেজে আমরা গুটিকয়েক মেয়ে। অধ্যাপনায় কাজলদি আসেননি; তিনি তখন MA Class-এর ছাত্রী। তো সেই পুরুষ পরিমণ্ডলে আমরা মেয়ে ক’জনা– রিক্তা, মঞ্জুশ্রী চাকী (পরে চাকী সরকার)। মঞ্জুশ্রী ঘোষ, কৃষ্ণা রুদ্র, মঞ্জুলা বোস– কেউ তো কাউকে চিনতাম না; কিন্তু কোনও এক অ-ঘোষিত সিদ্ধান্তে আমরা প্রত্যেকে হাজির হয়েছিলাম কনুই ঢাকা ব্লাউজ আর শাদা জমির তাঁত শাড়ি– লম্বা আঁচল কোমরে গোঁজা, নিপাট কেজো পোশাকে। সে হয়তো ছিল কো-এডুকেশন কলেজে পড়তে যাওয়ার সপক্ষে সমাজের প্রতি এক আশ্বাস মুদ্রা, সেই পাঁচের দশকে।
কবেই কেটে গিয়েছে কালিদাসের কাল। তবে সেই, শাদা জমির তাঁত শাড়ি আমার পরিধান এই ৮৮ অবধি। যখন পড়াতে গিয়েছি, মনে পড়ে, এক বিশেষ অনুষ্ঠানে পরব বলে আমি আর মঞ্জুলিকা– বাংলা বিভাগে আমার সহকর্মী– ভালো শাড়ি কিনে এনেছিলাম। ২৩ টাকা দাম, ফিনফিনে টাঙ্গাইল শাড়ি। কাগজের মতো হালকা জমি, সুন্দর আকাশি রঙের মাঠা পাড়, পাশে জরির সরু একটু নকশা। সে শাড়িখানা ভুলব না।
সারা জীবনে পরলাম আটপৌরে ধনেখালি, টেকসই, কম দাম। তখন, সেই ১৯৬০-’৭০-এর সময়ে শাড়ির ভেতর-আঁচলে তাঁতিদের নাম লেখা থাকত– বট, কৃষ্ণ, নব ইত্যাদি। আমি তো পরতাম শাদা জমি অথবা অফ হোয়াইট । তার অনেক শেড: গঙ্গাজলি, চন্দন, কোরা– এইসব। প্লেন জমি অথবা খড়কে ডুরি (pinstripe)। একরকম পাড় ছিল– দু’পাশে কালো ভেলভেট, মাঝখানে সরু একটু লাল রেখা বোনা– তার নাম ছিল সিঁথিতে সিঁদুর। এখন ধনেখানি রফতানিযোগ্য করে ফেলেছে নিজেকে।

শান্তিপুর শাড়ি– অপূর্ব তার পাড়ের নকশা। জমিতে, আঁচলে বুটিও থাকত। এত সুন্দর সে নক্শি পাড়, মনে হত এ-তাঁতিদের হাত সোনায় বাঁধিয়ে রাখার মতো। তবে এ পাড় একটু ভারী। এখন আমার সেসব শাড়ি আলমারির পেছন দিকে ঘুময়।
টাঙ্গাইল শাড়ি শৌখিন, অনন্ত তার বৈচিত্র-পাড়, বুটির আকার-প্রকার, আঁচলের বৈভবে। তার মধ্যে আবার ফুলিয়ার শাড়ির পাড় তো ওপেন-এন্ডেড– আমার বিশেষ পছন্দ। সাধারণত পাড়ের শেষে একটি রেখা বুনে, তার পাশে ছোট আকারে মন্দির মোটিভ বোনা থাকে। ফুলিয়ার শাড়িতে পাড়ের নকশা অনায়াসে মিশে যায় জমিতে, শেষ বলে কিছু নেই, নেই কোনও সীমান্ত।
কে শিখিয়েছিল এত বৈচিত্র? তখন কম্পিউটার ডিজাইনিং ছিল না; অ্যাডভাইসরি বোর্ড গঠিত হয়নি। গাছ যেমন মাটির তলা থেকে সংগ্রহ করে আনে ফুলপাতার নানা অবয়ব, তেমনই এঁরা কি বুনতে বুনতে ভেবে চলেছিলেন, টানা আর পোড়েন-এ ফুটিয়ে তুলছিলেন?
আমাদের বয়ন-শিল্পী, আমাদের স্বর্ণকার, আমাদের মৃৎশিল্পী– এঁদের প্রতিভা আর শৈলী-বিভবের সম্যক মূল্য বুঝতে আর কত দেরি?

আমার এই শাড়ি অবলম্বনের পিছনে হয়তো একান্ত ব্যক্তিক এক প্রসঙ্গ আছে। আমার বাবা অনুশীলন সমিতিতে যুক্ত ছিলেন; আর বাংলার তাঁতিরা ছিলেন ইংরেজ উপনিবেশকদের হাতে অত্যাচারিত। তাঁতিদের আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছে দেশজ বয়নশিল্প ধ্বংস করে ম্যানচেস্টারেরর বস্ত্র বিপণন প্রসারের স্বার্থে। হয়তো পিতৃসূত্রে আমার শিরাধমনিতে মিশেছিল– প্রতিবাদে তাঁত শাড়ি বেছে নেওয়া। আমার মা তো পরে গিয়েছে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের দিশি কাপড়। সে ছিল মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নেওয়ার ব্রত। সে শাড়ি বোনা হত জোড়া হিসেবে; ধুতিও তাই। সামনের খানাতে ছাপানো থাকত–
বঙ্গলক্ষী কটন মিল
নিজ কলের সূতায় প্রস্তুত।
পাড়ের রং পাকা
আমার মায়ের ঢাকাই জামদানি ছিল– সে একেবারে ‘জলের মতো চিকন আর বাতাসের মতো ফুরফুরে’, সোনাজরির বুটিতে উজ্জ্বল। সেই বয়নশিল্প নষ্ট হয়ে গিয়ে জোলার তৈরি একরকম গামছা ইত্যাদিতে পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল তো।

শাড়ি আমার পরিধান হয়ে আছে ঘরে-বাইরে, শীতে গ্রীষ্মে। দিনে-রাতে। দেশে-বিদেশে। সুবিধার স্বার্থে রাতকাপড়ের আধুনিকতায় আমি নেই। আর বিদেশ বলতে আমার সীমিত পরিসরে আমেরিকা আর ইংল্যান্ডে শাড়িতে-শালেতে যে সম্মান পেয়ে এসেছি, মনে হয়েছে সে এক সহজ-প্রাপ্য স্বীকৃতি। অধুনাকালের চর্চায় যাকে ‘কালচার ক্যাপিটাল’ বলে, মূলত সেক্ষেত্রে আমরা তো ধনী– যদি ভুলে না যাই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved