Robbar

অপারেশনের নারীজন্মে আপত্তি অলিম্পিকের?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 30, 2026 9:10 pm
  • Updated:March 31, 2026 7:46 pm  
Poulami Ghosh on sex determining test is mandatory for female in Olympic

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট কার্স্ট্রি কভেন্ট্রি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণের শর্ত ‘আবশ্যিক লিঙ্গ পরীক্ষা’। এক্ষেত্রে ‘সেক্স ডিটারমাইনিং রিজিয়ন ওয়াই প্রোটিন জিন স্ক্রিনিং’ বাধ্যতামূলক। এবং এই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে দুই বছর বা একটি অলিম্পিয়াড নয়, তিনি আর কখনওই অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। আগামী ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্স থেকে কার্যকরী হবে এই সিদ্ধান্ত। জন্মগত নারীত্বের অধিকারীরাই শুধুমাত্র অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণ করবেন। 

পৌলমী ঘোষ

‘#NoGoingBack’। বিগত কয়েক দিন ধরে দেশ জুড়ে রামধনু রঙা গর্বের পতাকায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় সদ্য পাশ হয়েছে রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল ২০২৬। নিজের লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে জন্মগত লিঙ্গ চিহ্নকেই মান্যতা দেওয়া হচ্ছে। স্বেচ্ছায় লিঙ্গ পরিচয় তৈরি করতে হলে সম্মতি লাগবে মেডিক্যাল বোর্ডের। আইনের। রাষ্ট্রপতির সই হলেই বিল আইন হয়ে যাবে। ২০১৪ সালের নালসা মামলার রায়ের সূত্র ধরে আবারও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছে বিষয়টিতে। রূপান্তরকামীদের মানবাধিকারের পক্ষে। প্রতিবাদ জোরতর হলে হয়তো জয় হবে ব্যক্তি ইচ্ছার। কিন্তু প্রায় একইসঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রবণতা দেখা গেল আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সিদ্ধান্তে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা জারি হল রূপান্তরিত প্রতিযোগীদের ক্রীড়া শৈলী উপস্থাপনায়। অলিম্পিক্সে আর স্বেচ্ছায় মানবী সেজে তুরিয়ান তুঙ্গিয়ান বা বলিয়ান হওয়া যাবে না। 

রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল ২০২৬ বিরোধী বৈঠক

‘খোদার উপর খোদকারি’ করে রূপান্তরিত হওয়া যায়। ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার সাফল্যে তৃপ্তি আসে ভরপুর। তবে আত্মপূরণের এই তৃপ্তি ব্যতিক্রমের অভিজ্ঞান নয়। বিকল্পের প্রতিষ্ঠাতাও নয়। অন্যকে অস্বীকার করে ছলে-বলে-কৌশলে জিতে যাওয়াকে মানবাধিকার বলে না। মানবতাও বলে না।

ক্রীড়া মানুষকে বিশাল করে। মানবতাকে সমৃদ্ধ করে। তবু যশলোভী সাফল্যকামী এক শ্রেণির মানুষই ক্রীড়াক্ষেত্রকে দূষিত করছে বারবার। প্রায় ১০০ বছর ধরে দলগত এবং জাতীয় সাফল্যের আশায় আন্তঃলিঙ্গ ক্রীড়াবিদদের রীতিমতো শোষণ করা শুরু হল অলিম্পিক্সের ট্র্যাকে। শুধুই জয়ের নেশা নয়, এও ছিল আধিপত্য বিস্তারের একটি পরোক্ষ উপায়। এই উদ্বেগ আয়োজকদের সচেতন করেছিল। ‘সন্দেহভিত্তিক’ লিঙ্গ পরীক্ষার উদ্দেশ্যে অলিম্পিক উৎসবে তৈরি হল অ্যাড-হক কমিটি। ‘শারীরিক পরীক্ষা’য় প্রতিযোগীর লিঙ্গ পরিচয় যাচাই করা হত। এই প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত আটকাতে ১৯৩৬ সাল থেকে অলিম্পিক্সে ‘মহিলা বিভাগের সন্দেহজনক ক্রীড়াবিদদের লিঙ্গ পরীক্ষা’ অংশগ্রহণের অন্যতম শর্ত হিসাবে জানানো হল।

২০২৮ অলিম্পিকের লোগো

যদিও অলিম্পিক কমিটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরীক্ষা ‘বাধ্যতামূলক’ করেছে ১৯৬৮ সাল থেকে। ‘শরীরি পরীক্ষা’ পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। শুরু হয়েছে ‘X-ক্রোমাটিন টেস্ট’ বা ‘ব্যার বডি টেস্ট’। বিজ্ঞানের নতুনত্বের প্রয়োগ অলিম্পিকে বারবার হয়েছে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ‘বাধ্যতামূলক’ ভাবে মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণের জন্য ‘SRY টেস্টিং’ শুরু হয়। সেক্স ডিটারমাইনিং ফ্যাক্টর টেস্টিং। অর্থাৎ ‘Y’ ক্রোমোজোমের উপস্থিতি যাচাই করা। তবে সেই সময় অলিম্পিক কমিটি রূপান্তরিত মহিলা ক্রীড়াবিদদের রূপান্তরিত হওয়ার দুই বছর পরে শর্তসাপেক্ষে অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিল। অলিম্পিক কমিটি প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা রক্ষার জন্যই লিঙ্গ নিশ্চিতকরণের বন্দোবস্তকে ‘আবশ্যিক’ করেছিল। বিষয়টি নারীত্বের প্রতি ছিল অসম্মানজনক। অনেক ক্ষেত্রেই মানবাধিকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তাই নতুন শতকে বাধ্যবাধকতার থেকে সরে এসে আবারও শুধুমাত্র লিঙ্গগত ‘অনিশ্চয়তা’কেই পরীক্ষার আওতায় আনা হল। 

যদিও বিভিন্ন দেশের নানা সামাজিক সংগঠন, মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-সহ আইএএএফ ও অন্যান্য স্পোর্টস ফেডারেশনগুলি লিঙ্গ পরীক্ষার যে কোনও পদ্ধতি এবং নীতিতে বারবার বিরোধিতা করে এসেছে। একুশ শতকের প্রথমদিকে তাই আইওসি ‘ক্রোমোজোম স্ক্রিনিং’ বন্ধ করে দেয়। বিকল্প হিসাবে বেছে নেয় ‘টেস্টোস্টেরন লেভেল টেস্টিং’। অ্যান্ড্রোজেন। প্রধান পুরুষ হরমোন। নারী শরীরেও নিঃসৃত হয়। তবে প্রতি লিটার রক্তে তিন ন্যানোমোলের মাত্রা পার করলে সে আর বিশুদ্ধ নারী থাকে না। টেস্টোস্টেরন মিশ্রিত ভেজালে নারী হয়ে যায়। 

ভারতীয় অ্যাথলিট দ্যুতি চন্দ

বরাবরই ভারতীয়দের শরীরী শৈলী অপেক্ষা বৌদ্ধিক মাধুর্য নজর কাড়া। অলিম্পিক্সেও ভারতের সাফল্য হাতে গোনা। কিন্তু অলিম্পিক্সের সংবেদনশীল লিঙ্গ পরীক্ষার নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণে ভারতীয় অ্যাথলিটের বুদ্ধিদীপ্ত আবেদন এবং সযৌক্তিক বিশ্লেষণকে খণ্ডন করা অসম্ভব ছিল। ২০১৫ সাল। কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে মামলা করেন ভারতীয় অ্যাথলিট দ্যুতি চন্দ। হাইপারঅ্যান্ড্রোজেনিজমে আক্রান্ত যে কোনও মহিলার রক্তে টেস্টোস্টেরন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্ষতির হয়। আইওসি থতমত খেয়ে লিঙ্গ পরীক্ষার পদ্ধতি হিসেবে ‘হরমোনাল লেভেল টেস্টিং’ আপাতত স্থগিত করে দেয়। একইভাবে বিড়ম্বিত হতে হয়েছিল ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান রানার কাস্টার সেমেনিয়াকে।

১৯৩২ সাল। লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক্সের দ্রুততমা স্টানিস্লাভা ওয়ালসিভিচ। স্টেলা ওয়েলশ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিক্সেও আসে তাঁর রুপোলি সাফল্য। সারা জীবন মেয়েদের ক্রীড়া বিকাশে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুটি বড় দুঃখজনক। একদল ডাকাতের গুলিতে মারা যান। এখানেই শেষ না। বরং ক্রীড়াবিশ্ব শুরু করল নতুন করে ভাবতে। কারণ স্টেলার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তে জানা যায় তাঁর শরীরে ছিল পুরুষ জননতন্ত্র। নারী যৌনাঙ্গের নিখুঁত উপস্থিতি ছিল না তাঁর দেহে। তাঁকে কোনও দেশ বা রাষ্ট্র অলিম্পিক্সে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য করেনি। তিনি সাধনা করেছিলেন ক্রীড়ার। নিজের সামর্থকে উজাড় করে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ট্র্যাকে। যদিও গত শতকের তিনের দশকে তাঁর লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু তাঁর নারীত্বকে অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি সমকালীন বিজ্ঞানের এবং আইনের। আজও তাঁর লিঙ্গ পরিচয় রহস্যে ঢাকা। না তিনি তৃতীয় লিঙ্গের, না রূপান্তরিত। তিনি ছিলেন বিরল রোগের স্বীকার। 

স্টানিস্লাভা ওয়ালসিভিচ ওরফে স্টেলা ওয়েলশ

হাইপারঅ্যান্ড্রোজেনিজম একটি নিরীহ হরমোনাল ডিসঅর্ডার। হরমোনাল, ক্রোমোজমাল, গোনাডাল, আনাটমিক্যাল আরও নানা রকমের লিঙ্গগত ত্রুটি থাকে মানুষের মধ্যে। অনেক ডিএসডি আক্রান্ত মানুষ জানেনই না তাঁদের শরীরে কোন ক্রোমোজোম রয়েছে। ‘Y’-এর উপস্থিতিতেও দিব্যি আচরণ করেন ‘X’-এর মতো। কারও ক্রোমোজোমের সঙ্গে জননতন্ত্রের বিস্তর পার্থক্য। কারও আবার জননতন্ত্রের সঙ্গে মেলে না হরমোনের রসায়ন। শুধু স্টেলা ওয়ালশ, হেলেন স্টিফেন, কাস্টার সেমেনিয়া, দ্যুতি চন্দ, সিমন্স বিলস বা প্যারালেম্পিয়ান অলিভিয়া ব্রিন নয়। হয়তো আইনি জটিলতায় বা সামাজিক সংকটে পড়েছিলেন বলেই এঁদের লিঙ্গ পরিচয়ের চোরা কুঠুরিগুলি খুলে গেছে। শোনা যায়, তামারা প্রেস ইরিনা প্রেসের মতো দাপুটে অ্যাথলিট তড়িঘড়ি অবসর নিয়েছিলেন বিতর্ক এড়াতে। অনিশ্চয়তার আবেশেই আগলে রেখেছিলেন নিজেদের নারীত্বকে। 

অলিভিয়া ব্রিন

সামাজিক দিক থেকে, আইন বা সংবিধানের দিক থেকে লিঙ্গ বিভাজন অযৌক্তিক। তবে একটা বিষয় মানতেই হবে শারীরিক গঠন ও ক্ষমতায় লিঙ্গ-পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের দৈহিক শক্তি নারীর তুলনায় বেশি। ক্রীড়া বিষয়টি শারীরিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। তাই সেখানে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন অতি প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি। অলিম্পিকের বিভিন্ন গেমসের জন্য মূলত দু’টি বিভাগ রয়েছে। মহিলাদের ও পুরুষদের। এখন কথা হল, কে কোন বিভাগে প্রতিযোগিতা করবেন তার জন্য কেবলমাত্র মহিলা প্রতিযোগীদেরই কেন লিঙ্গ পরিচয়ের শংসাপত্র দেখাতে হবে বা তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে? নিঃসন্দেহে বিষয়টি একপেশে। কিন্তু অনীতি বা দুর্নীতি রুখতে মহিলাদের উপর লিঙ্গ পরীক্ষাই ভরসাযোগ্য। কারণ ইচ্ছাকৃত বিভাগ পরিবর্তন করে মানুষ অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিভাগেই অংশগ্রহণ করতে চাইবে। এক্ষেত্রে রূপান্তরিত মহিলা ক্রীড়াবিদকে শনাক্ত করার জন্য মহিলা ক্রীড়াবিদদের উপরই এই পরীক্ষা হওয়া সমীচীন। আর যদি কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অজান্তে নারী হওয়া সত্ত্বেও রোগ বা অন্য কোনও কারণবশত পুরুষ বিভাগে অংশগ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে আর লিঙ্গ শনাক্তকরণ আবশ্যিক থাকে না। কারণ সেই ক্রীড়াবিদ বিভাগগত কোনও অতিরিক্ত সুবিধা উপভোগ করতে পারেন না। 

বক্তব্য রাখছেন অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট কার্স্ট্রি কভেন্ট্রি

তাই আবারও সাত-পাঁচ ভেবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট কার্স্ট্রি কভেন্ট্রি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণের শর্ত ‘আবশ্যিক লিঙ্গ পরীক্ষা’। এক্ষেত্রে ‘সেক্স ডিটারমাইনিং রিজিয়ন ওয়াই প্রোটিন জিন স্ক্রিনিং’ বাধ্যতামূলক। এবং এই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে দুই বছর বা একটি অলিম্পিয়াড নয়, তিনি আর কখনওই অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। আগামী ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্স থেকে কার্যকরী হবে এই সিদ্ধান্ত। জন্মগত নারীত্বের অধিকারীরাই শুধুমাত্র অলিম্পিক্সের মহিলা বিভাগে অংশগ্রহণ করবেন। 

অলিম্পিক্স শুরুর মুহূর্তে জ্বলন্ত আগুনের সামনে অলিম্পিক্সের সমস্ত নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অঙ্গীকার করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আনুগত্য বজায় রাখতেই হবে ‘বাধ্যতামূলক লিঙ্গ পরীক্ষা’য়। কিন্তু আইন থাকবে আর আইনের ফাঁকফোকর থাকবে না, সে হয় না কি? অলিম্পিক্সের মহামারিকালীন মানবিক মোটোটি বলছে– ‘আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি’। ‘সিটিয়াস, অলটিয়াস, ফোরটিয়াস’ এবং নবতম সংযোজিত শব্দটি হল ‘কমিউনিটার’। তাহলে কীভাবে অস্বীকার করব আমরা তৃতীয় লিঙ্গকে অথবা রূপান্তরিতদের?