


রঘু রাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতা জাদুঘরের একটা প্রদর্শনীতে। তখন চৌরঙ্গিতে ‘লতিফ’ নামে একটা দোকান ছিল। ক্যামেরা সারানোর দোকান। সেখানে একটা পুরনো ক্যামেরা সারাতে দিয়েছিলেন রঘু রাই। গিফট করেছিলেন একজনকে। ক্যামেরার এই বিবর্তনও, রঘু রাইয়ের খুব ভালো লাগত। অনেক কথাই হয়েছে ওঁর সঙ্গে, কাজের, অকাজের। আমার ফিল্মও দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু সেইসব নয়। রঘু রাইয়ের বলা একটা কথা মাথার মধ্যে থেকে যাবে। যে-কথা তিনি বারবার বলতেন– ভারত ফোটোগ্রাফারদের স্বর্গ।
রঘু রাই স্রেফ একজন ফোটোগ্রাফার নন। তিনি একজন সাধক-শিল্পী। অযুত-নিযুত ছবির ভিড়ে, তিনি একক প্রতিভা। আজকের অনায়াস, প্রচুর ছবি তোলার ভিড়। ছোট করে দেখছি না ব্যাপারটাকে, এ-ও আরেকটা ধরন। কিন্তু রঘু রাই এই ভিড়ের থেকে বহু দূরে একলা একজন শিল্পী। তাঁর দৃষ্টিকোণ অনেকটা ফরাসি চিত্রগ্রাহক অঁরি কাটিয়ের ব্রেসোঁর মতোই। যাঁর ছবি দেখলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সে-ছবি তাঁরই তোলা। তাঁর ফ্রেম, তাঁর দৃষ্টিকোণ। যাঁরা ছবি ভালোবাসেন, সামান্য চর্চা করেন, তাঁদেরকে বলে দিতে হয় না যে, এটা রঘু রাইয়েই। ছবি দেখেই চিনে নেওয়া যায়।

‘স্থিরচিত্র’ এমন এক জিনিস, যার কোনও অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই– শুধুমাত্র ওই মুহূর্তটুকু। যাঁরা বড় ফোটোগ্রাফার, তাঁরা জানেন কোন মুহূর্তটা তুলতে হবে, আর তুলতে হবে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে! এই ব্যাপারটায় রঘু রাইয়ের সাংঘাতিক সাধনা ছিল। কোন আলোয়, কোন দৃষ্টিকোণ– ছবির এই ব্যাকরণ শরীরে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। বেশিরভাগই সাদা-কালো ছবি। কিন্তু রঙিন ছবিতেও কোনটা ধূসর, কোনটা উজ্জ্বল– তার পরিকল্পনা অতিদ্রুত সেরে ফেলতে পারতেন তিনি। এছাড়া, রঘু রাইয়ের অন্তরে ছিল নানা শিল্পমাধ্যমের প্রতি সত্যিকারের টান। শুধু পলকা আকর্ষণ নয়, ওপর-ওপর জানা নয়, তথ্যটুকু নয়, বিষয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করা। তাঁর ছবি যদি ধারাবাহিকভাবে দেখি, দেখব ছবিগুলি একমাত্রিক নয়। তার কারণ তাঁর ক্যামেরা লেন্স বহুস্তরীয় শিল্পমাধ্যমের আলো পেয়ে এসেছে।

কলকাতা ওঁর খুব প্রিয় শহর। কলকাতার অগুনতি ছবি তুলেছেন রঘু রাই! অনেক আগে, নব্বই সালের আশপাশে ওঁর একটা কলকাতার ওপর বই বেরয়। পরে আবারও আরেকটা! তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আবার কলকাতা?’ বলেছিলেন, ‘কলকাতা আশ্চর্য শহর। সবার পরিবর্তন হয়। এ শহরের পরিবর্তন হয় না।’ আমি বুঝেছিলাম, এই শহর যেহেতু একরকম না, নানাবিধ, বৈচিত্রময়, তাই এই শহর রঘু রাইকে টানে। সে কারণেই বিভিন্ন সময় কলকাতায় ফিরে ফিরে আসা। বহু বহু ছবি তোলা। কলকাতার বিখ্যাত লোকজনের ছবিও তুলেছেন রঘু রাই– সত্যজিৎ রায় তো বটেই! আস্ত একটা বইও আছে ওঁর সত্যজিৎকে নিয়ে।

রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এক ফোটোগ্রাফার, একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন। যে-ছবি ভারতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। এ একটা আশ্চর্য মহাকাব্যিক ছবির যাত্রা!
রঘু রাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতা জাদুঘরের একটা প্রদর্শনীতে। তখন চৌরঙ্গিতে ‘লতিফ’ নামে একটা দোকান ছিল। ক্যামেরা সারানোর দোকান। সেখানে একটা পুরনো ক্যামেরা সারাতে দিয়েছিলেন রঘু রাই। গিফট করেছিলেন একজনকে। ক্যামেরার এই বিবর্তনও, রঘু রাইয়ের খুব ভালো লাগত। অনেক কথাই হয়েছে ওঁর সঙ্গে, কাজের, অকাজের। আমার ফিল্মও দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু সেইসব নয়। রঘু রাইয়ের বলা একটা কথা মাথার মধ্যে থেকে যাবে। যে-কথা তিনি বারবার বলতেন– ভারত ফোটোগ্রাফারদের স্বর্গ।

তাঁর স্বর্গ পড়ে রইল। ক্যামেরা পড়ে রইল। স্বর্গ ধূসর করে বিদায় নিলেন রঘু রাই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved