Robbar

আমার প্রতিমা দর্শন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 29, 2026 7:02 pm
  • Updated:April 29, 2026 7:28 pm  
memoir of pratima ghosh by aveek majumder

প্রতিমাদির প্রধান বৈশিষ্ট‌্য ছিল তাঁর পড়ার মমতা। যখনই যেতাম, দেখতাম, তাঁর হাতে একটি বই। প্রধানত বাংলা। তবে বিচিত্র সাহিত‌্যবর্গের বই। ২০১৯ সাল থেকেই তাঁর চোখের দুরারোগ‌্য ব‌্যাধি শুরু হয়। তবু সেই চোখ নিয়েও বইপড়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ভালোবাসতেন খবরের কাগজের শব্দজব্দ করতে। গান শুনতে। কখনও কখনও অল্পবয়সের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। বহরমপুর গার্লস কলেজের গল্প, রেজাউল করিমের কথা, বাংলাদেশের নানা মানুষজনের কথা, চুনারে স‌্যরের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার গল্প, কলকাতা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের স্মৃতি।

অভীক মজুমদার

প্রথম দিন উল্টোডাঙার ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের তিনতলার ফ্ল‌্যাটে অর্থাৎ, A 1/6-এ আমাকে নিয়ে গিয়েছিল জয়দেব। জয়দেব বসু। আমি তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ‌্যালয়ে বাংলা অনার্স। সেকেন্ড ইয়ার। কয়েক মাস স‌্যরের ক্লাস করেছি। কেননা, ফার্স্ট ইয়ারের প্রায় পুরোটাই তিনি ছিলেন বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতনে। তখন, ‘স‌্যর’ অর্থাৎ, শঙ্খ ঘোষ ছিলেন বেশ গম্ভীর এবং রাশভারী। আমাদের বন্ধু প্রবীর দাশগুপ্তকে ডেকেছিলেন বাড়িতে, তার একটি কবিতার ছন্দ বিষয়ে কথা বলতে। কী কী ঘটল, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিল প্রবীর, আমরা হাঁ করে গোগ্রাসে শুনেছিলাম। জয়দেব সর্বদাই তুখোড়। সে তখন ওই বাড়ির নিয়মিত আড্ডাধারী। ফলে, তার স্বভাবসিদ্ধ সপ্রতিভতায় বলল, ‘তুই যাবি? চল পরশু!’

সন্ধে তখন। গিয়ে দেখি, স‌্যর তখনও বাড়ি ফেরেননি। আমরা বসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হাসিমুখে এসে বসলেন প্রতিমা ঘোষ। ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসে স‌্যরের আগে তাঁর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছিল। জয়দেবের দেখাদেখি আমিও তাঁকে ডাকতাম ‘প্রতিমাদি’। আমার বইপত্র বেরলে চিরকাল লিখে দিতাম– ‘স‌্যর, প্রতিমাদি– শ্রীচরণেষু’।

শঙ্খ ঘোষ ও প্রতিমা ঘোষ

সে-যুগ শেষে আজ স্মৃতির ভান্ডার হাতড়াই। নানা স্মৃতির এলোমেলো ছবি মনে ঢুকে পড়ে। সেই কবেকার ১৯৮৮ সাল। প্রায় ৩৩ বছর জুড়ে তাঁকে দেখেছি। বেশিরভাগ সময় যুগলে, আবার একেকটা সময়জুড়ে তিনি একক ঔজ্জ্বল‌্যে আমার স্মরণপথে এক চিলতে হাসি ঠোঁটে নিয়ে প্রসন্নময়ী, স্নেহশীলা, মাতৃপ্রতিমা। প্রসঙ্গত, বলে রাখি, আমার মায়ের নামও ছিল প্রতিমা। তিনিও প্রয়াত ২০২৩ সালের অক্টোবরে। মা অবশ‌্য প্রতিমাদির থেকে ছ’-বছরের ছোট। দু’জনের সখ‌্যও গড়ে উঠেছিল নানা সূত্রে।

জয়দেব আর আমি তখন ‘রাজনৈতিক’ অবস্থানে প্রবল প্রতিপক্ষ। ২০০৬ থেকে ২০১১। স‌্যরের বসার ঘরে প্রায়শই আমাদের তর্কাতর্কি সরগরম তো বটেই, প্রায় উচ্চনাদে উত্তেজনার পারদকে শিখরে পৌঁছে দিত। ভিতরের ঘর থেকে এসে সেই প্রবল কথাযুদ্ধে স‌্যরের পাশের সোফায় এসে বসতেন প্রতিমাদি। আমাদের ছেলেমানুষী দেখে স‌্যরের হাসিটা ছিল মুচকি, প্রতিমাদির হাসিটা ছিল একটু চওড়া। নানা উপাদেয় খাদ‌্য নিয়ে এসে রাখতেন সামনে, বারবার বলতেন, ‘খেয়ে নাও। যুক্তিতে জোর পাবে!’

ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসে আমার হানা দেওয়ার অবশ‌্য কোনও বাঁধাধরা সময় ছিল না। ভোর ছ’টায় গিয়েছি, সকাল ন’টা তো নস্যি, রাত ১১টা, সাড়ে ১২টা, দেড়টা– বেরিয়েছি। সদলে, দু’-তিনজনে, একেবারে একা– সব রকমের কম্বিনেশনই ছিল। এম.এ. পাশ করার আগে বেশ খানিকটা বিধিবদ্ধ রীতি মানতাম। ভয় পেতাম। প্রতিমাদিকে কম। স‌্যরকে বেশি। তারাপদ আচার্য, সব‌্যসাচী দেব, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, অশ্রুকুমার সিকদার– এঁরা তখন ওই বাড়িতে নিয়মিত। সুতপা ভট্টাচার্য, স্বপন মজুমদার, সুধীর চক্রবর্তী, আলপনা রায়, সুরজিৎ ঘোষ। ভাবতে অবাক লাগে, এঁদের প্রায় প্রত্যেকে আজ প্রয়াত। সবসময়েই গুরুগম্ভীর আলোচনা, গান, হাসি, আড্ডার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রতিমাদি। নিঃশব্দে আসতেন। বসতেন। ব্যক্তিত্বের মাধুর্যে‌ ভরে থাকত পরিমণ্ডল।

সস্ত্রীক শঙ্খ ঘোষ

নব্বইয়ের গোড়ার দিক-মাঝামাঝি থেকে স‌্যর-প্রতিমাদির প্রশ্রয়ে আমার সাহস বাড়তে থাকে। এ-সময় থেকেই টিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বেরও সূত্রপাত। আমার বোন মৌ, (অদিতি মজুমদার) সেসময় ‘দর্শন’ পড়তে যেত টিয়ার কাছে। ফলে, নানা পরিচয়ে আমি যখন-তখন পৌঁছে যেতাম। স‌্যর কাজেকর্মে শান্তিনিকেতন গেলে প্রতিমাদির খোঁজখবর নিতে আমি যেতাম নিয়মিত– সেই ধারা চালু ছিল ২০১৪-’১৫ পর্যন্ত। আমার প্রথম পাকা চাকরি হল তুলনামূলক সাহিত‌্য বিভাগে, ১৯৯৬ সালে। নিয়োগের চিঠি পেয়ে ওই ফ্ল‌্যাটে খুবই একপ্রস্থ হাসিখুশি হল। আমার ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রধান ছিলেন ড. শিশিরকুমার দাশ। আমি তখনও তাঁকে বইপত্রের বাইরে চিনি না। তারাপদদা হাজির ছিলেন। বললেন, ‘শিশিরদার হাতে চাকরি পেয়েছ! সাংঘাতিক ব‌্যাপার!’ প্রতিমাদি বললেন, ‘আমার অবশ‌্য তোমাকে নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই গেল।’ আমি বললাম, ‘চিন্তা? কেন?’ উনি বললেন, ‘ওই বিভাগে পড়ান যাঁরা, তাঁদের বিয়ে টেকে না।’ খুব খানিক হাসিরঙ্গ হল। দু’-বছরের মধ্যে কথাটা ফলেও গেল!

স‌্যরের সঙ্গে প্রতিমাদির রসায়নটি ছিল অতুলনীয়! সকালে কলেজে গিয়েছেন প্রতিমাদি (বিদ‌্যাসাগর কলেজ/মর্নিং) তারপর ঘেরাও হয়ে আছেন কমিটি মিটিংয়ে, সন্ধে গড়িয়ে রাত, স‌্যরও মুখে দেননি এককণা খাবার। কোনও অনুরোধেই টলানো গেল না তাঁকে! রবীন্দ্রভবনের অধ‌্যক্ষ হয়ে শান্তিনিকেতনে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শঙ্খবাবু। কলকাতায় চিকিৎসা চলছে। শয‌্যাশায়ী, গুরুতর অসুস্থ, তবু স‌্যর নানা ভবিষ‌্যৎ পরিকল্পনা করে যাচ্ছেন। একদিন বিকেলে পাশের ঘরে গিয়ে দেখি, প্রতিমাদি কিছু একটা লেখার কাজ করছেন। একথা-সেকথার পর গভীর, কঠিন স্বরে বললেন, ‘কোনও কথা শোনে না। শরীরের খুব খারাপ অবস্থা করেছে। ওকে আমি আর যেতে দেব না।’ স‌্যরের যাওয়া আর হয়নি।

মিষ্টিমুখ: শঙ্খ ঘোষকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন প্রতিমা ঘোষ, সঙ্গে দুই মেয়ে

স‌্যরের ব‌্যস্ততা অবশ‌্য ২০০৫-এর পরে তুঙ্গে ওঠে। একসময়, বানাতে হয় অ‌্যাপয়েন্টমেন্টের খাতা। তারপর ব‌্যক্তিগত সহায়ক হিসেবে আসেন স্নেহাশিসদা। স্নেহাশিস পাত্র। তারপর দু’-দু’টি ল‌্যান্ডফোন, বিকেল-সন্ধের বৈঠক, প্রুফ দেখা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে আলোচনা, লেখালেখি, সম্পাদনা, অন্যের বই বানানো, রবীন্দ্ররচনাবলির কাজ, ভাষণ, অনুষ্ঠান, ব‌্যক্তি সমস‌্যামোচন– একেবারে ধুন্ধুমার কাণ্ড! তখন স‌্যরকে দেখে আমারই কষ্ট হত। প্রতিমাদি কিন্তু স্বচ্ছ, ঠান্ডা, শ্বেতপাথরের মতো হাতে বই বা স‌্যরের জন‌্য জল। মৃদু হাসি। কোনও ত্বরা নেই। হাসতে হাসতে স‌্যর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘জানো তো, কানে একটা ফোনে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে নিপুণ প্রুফ দেখে আর তৃতীয় একটা চিন্তা মাথায় ভেবে চলে!’

স‌্যর সম্পর্কে ভালবাসা, স্নেহ আর সম্ভ্রম মিলেমিশে থাকত। একবার, বোধহয় ২০০৯ বা ২০১০ সালে প্রবল বৃষ্টিতে চুপ্পুড় ভিজে মানস কুণ্ডু, রাজীব চৌধুরী আর আমি পৌঁছলাম স‌্যরের বাড়ি। দরজা খুললেন প্রতিমাদি। ‘একেবারে ভিজে গেছ তো! জামা ছাড়ো শিগ্‌গির’। তিনজনেই ফিরলাম স‌্যরের পাঞ্জাবি পরে! প্রতিমাদি পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও আপত্তি-ওজর শুনলেন না। আমার বোনও পেয়েছে তাঁর অঢেল স্নেহচ্ছায়া। ২০১৭ সাল থেকে আমার পুত্র মাদল স‌্যরের প্রশ্রয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে অনায়াসে স‌্যরের সঙ্গে আড্ডা মারত। তার স‌্যরদাদুর কাছে একদিন জানতে চাইলাম– ‘কী বুঝছেন? কোনও ভবিষ‌্যৎ আছে?’ প্রতিমাদি বকুনি দিলেন, ‘এ কী কথা তোমার? ভবিষ‌্যৎ তোমার চেয়ে ভালো।’ সে-কথাও যেন ফলে!

শঙ্খ ঘোষ, সঙ্গে উৎপলকুমার বসু

২.
প্রতিমাদির প্রধান বৈশিষ্ট‌্য ছিল তাঁর পড়ার ক্ষমতা। যখনই যেতাম, দেখতাম, তাঁর হাতে একটি বই। প্রধানত বাংলা। তবে বিচিত্র সাহিত‌্যবর্গের বই। ২০১৯ সাল থেকেই তাঁর চোখের দুরারোগ‌্য ব‌্যাধি শুরু হয়। তবু সেই চোখ নিয়েও বইপড়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ভালোবাসতেন খবরের কাগজের শব্দজব্দ করতে। গান শুনতে। কখনও কখনও অল্পবয়সের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। বহরমপুর গার্লস কলেজের গল্প, রেজাউল করিমের কথা, বাংলাদেশের নানা মানুষজনের কথা, চুনারে স‌্যরের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার গল্প, কলকাতা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের স্মৃতি। কোথাও বেড়াতে গেলে ফেরার পর আমি উপহার পেতাম কলম, কবিতা লেখার খাতা, কখনও পুতুল বা অন‌্যকিছু। তাঁর বইপত্র প্রকাশিত হলে তো আমার জন‌্য এককপি তোলা থাকত। উপহার দিতেন লিখে।
স‌্যরের স্টাইলে মাথায় লেখা ‘শ্রী’।

এম.এ. পাশ করার পর খবরের কাগজ এবং অন‌্যান‌্য ক্ষেত্রে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছি। অনুবাদকের পদে পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ দিচ্ছি। শিক্ষকতা করার কোনও ইচ্ছেমাত্র নেই। যথারীতি ওঁদের সামনে বলছি সেসব। প্রতিমাদি খুব বিষণ্ণ গলায় বলেছিলেন, ‘আমরা তো ভেবেছিলাম, তুমি কোথাও পড়াবে…’।

কবিতার ভুবন: শঙ্খ ঘোষ-প্রতিমা ঘোষ

পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে এসেছিল কলম, দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের পর পেয়েছিলাম নোটবই, উত্তরবঙ্গ থেকে এনেছিলেন সুদৃশ‌্য খাতা, পুরী থেকে ঝিনুক আর ফেনার ডালপালা। সেসব নিয়ে বসে আছি। পুরনো দিন ফেরে না। একবার বইমেলা থেকে স‌্যরের জন‌্য নিয়ে গিয়েছি রামকিঙ্করের ‘মহাশয় আমি চাক্ষিক, রূপকারমাত্র’ আর প্রতিমাদির জন‌্য ‘বাংলাদেশের পিঠা’– ব‌্যস আর যাবে কোথায়! মুখরা টিয়ার তর্জনী– ‘মায়ের জন‌্য পিঠা আর বাবার জন‌্য রামকিঙ্কর? তোমার স্টেটমেন্টটা খুব গোলমেলে না?’ প্রতিমাদি বাঁচালেন। ‘ওভাবে দেখছ কেন? তোমার বাবা কি পিঠে বানাতে পারেন?’ বুঝলুম, আজ আমার পালে মন্দ-মধুর হাওয়া!

খাওয়াতে সত্যিই খুব ভালোবাসতেন। আর ভালোবাসতেন নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে। তাদের বড় করতে। বলতেন কম। শুনতেন বেশি। টুকরো-টুকরো কথায় বোঝা যেত সাহিত‌্য-সংস্কৃতির বিচিত্রক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞান এবং পর্যবেক্ষণ কত নিজস্ব আর অর্ন্তদৃষ্টিসম্পন্ন।

৩.
নিজেকে আড়ালে রাখার এই আশ্চর্য কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন। সেকথা মনে পড়ে তাঁর বই তিনটির দিকে তাকালে। প্রধানত গৌতম সেনগুপ্তের উদ্‌যোগে ২০০৯ সালে প্রকাশ পায় ‘নয় বোনের বাড়ি’। তারপর ‘পাঠক’ প্রকাশনা থেকে প্রথমে ‘‘আপনজন ক’জন কবি’’ (২০১৫) এবং ‘সেইসব কথা’ (২০১৬)। বইগুলি হাতে নিয়ে আজ মনে হয়, কত যত্নে লেখাগুলি তৈরি হয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। অথচ নিঃশব্দে। স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ, ব‌্যক্তি অবভাস, ভ্রমণ অভিজ্ঞতা– সব মিলেমিশে এক অভিনব সাহিত‌্যবর্গ তৈরি করেছে। গদ‌্যভাষা স্বতন্ত্র, প্রকাশ এবং পরিবেশনা একেবারেই ভিন্নধর্মী। শঙ্খ ঘোষ চরিত্র হিসেবে বারবার উপস্থিত আছেন বটে, তবে রচনাকল্পে নেই! বিশেষত কবিদের নিয়ে আলোচনায়। নির্ভার কিন্তু গভীর, অনুভবে ভাবুক অথচ বিশ্লেষণে প্রখর। একই সঙ্গে একাত্মতা আর নৈর্ব‌্যক্তিকতায় সেইসব কথা বহুবর্ণিল।

পাঠক হিসেবে আমি লক্ষ‌ করেছি যে, অনেক মুহূর্ত, ব‌্যক্তি, অভিজ্ঞতা কিংবা ঘটনা– শঙ্খ ঘোষ এবং প্রতিমা ঘোষ নিজস্ব জবানিতে প্রকাশ করেছেন। অথচ তারা সম্পূর্ণ আলাদা লেখা। এই স্বাতন্ত্র‌্য রক্ষা করে চলা বেশ কঠিন। প্রতিমা ঘোষের আরেকটি বিশেষত্ব হল, তিনি কবিদের নিয়ে লিখতে বসে সর্বদা তরুণদের কথাই ভেবেছেন। স্নেহ, ব‌্যক্তিসম্পর্ক আর মূল‌্যায়ন মিলেমিশে নতুন একটা ধারা তৈরি করেছে। উদ্ধৃতি দিলাম না। পাঠক/পাঠিকা নিজেরাই দেখে নেবেন। দুই আলাদা দূরবিন, আলাদা জরিপঘর, অথচ খুব ভিন্ন নয় অবস্থান, আবার আলাদাও। একটা দৃষ্টান্ত দিই। প্রতিমা ঘোষ লিখছেন, ১৯৬৮ সালের ভয়ংকর ব‌ন‌্যার অভিজ্ঞতা ‘জলপাইগুড়ির জলস্রোতে’ (সেইসব কথা)। ‘মরা মহিষটাকে দড়ি বেঁধে নেবার সময় লোকজনের একটু ইতস্তত ভাব দেখা গেল। শঙ্খই তখন হাত লাগালো। তারপর সবাই টেনে নিয়ে চলল বাড়ির বাইরে, কোথায় যে, কে জানে। তবে তারপরই শুরু হল বড় রাস্তার উপর দিয়ে ট্রাকভর্তি গরু-মহিষের শবযাত্রা। আর সেই সঙ্গে শহর ছাড়তে চাওয়া মানুষজনের মিছিল।’ আর একই অভিজ্ঞতার ভিন্ন প্রতিবেদন শঙ্খ ঘোষের কলমে, ‘কবিতার মুহূর্ত’ (১৯৮৭) গ্রন্থে, ‘হে নগর, দীপান্বিতা ভাস্বতী নগরী/ আকণ্ঠ নগরী/ মহিষের ধ্বস্ত দেহে যত লক্ষ‌্য রক্তবিন্দু জ্বালায় শকুন/ তোমার রাত্রির গায়ে তার চেয়ে বেশি ফুলঝুরি/ পোহালে শর্বরী/ তোমারই প্রভাতফেরি মেতে ওঠে ত্রাণমহোৎসবে।’ (আরুণি উদ্দালক) আর তাঁর ভাষ্যে– ‘… শহর-পরিক্রমায় বেরোই, ক্ষয়ের ধারণা নিই কিছু। ভেঙে গেছে করলার ব্রিজ। এখানে-ওখানে দেখতে পাই মৃত শরীর, পশুর, মানুষেরও কখনও বা, এক হয়ে আছে সব। কার দোষ? কার? শুনতে পাই চরের বসতি থেকে এক-লহমায় মিলিয়ে গেছে হাজার হাজার লোক।…’

এভাবে বহু সমান্তর তৈরি করা যায়। পাঠের পর পাঠে বোঝা যায়, দূরের-কাছের দৃশ‌্যগুলি নানা আকারে-প্রকারে নানা মানবিক মুখ তৈরি করে। সমাজ আর ব‌্যক্তিকে ঘিরে নানা প্রশ্নও তৈরি করে অনবরত।

৪.
প্রতিমা ঘোষের প্রয়াণের এক বছর পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে ডায়েরির এক অপ্রকাশিত পৃষ্ঠাও ছাপা আছে, নাতনিকে লেখা চিঠি। টুকরো টুকরো ছবিতে নানা অনুভূতি। জন্ম ১৯ অক্টোবর, ১৯৩২, প্রয়াণ ২৯ এপ্রিল, ২০২১। ভয়াবহ করোনাকাল তখন। আমার সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা স‌্যরের চলে যাওয়ার দিনে, ২১ এপ্রিলে।

ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের ওই ফ্ল‌্যাট, তার নানা অনুষঙ্গ, প্রতিমাদি আর স‌্যরের যুগল যাপন, হইচই, গানের রেশ এখনও আমার সঙ্গী। আপনজন সেই কবিদের অনেককেই আমি ওই বাড়িতে অহরহ দেখেছি, ফলে লেখাগুলি যেন জ‌্যান্ত একটা ধারাবিবরণী হয়ে ওঠে আমার কাছে। জয়দেব বসু তো বটেই, ভাস্কর চক্রবর্তী, জয় গোস্বামী, সুব্রত রুদ্র, সব‌্যসাচী দেব বা একরাম আলির সঙ্গে এই বাড়ির সন্ধ‌্যা-বিকেল মিশে আছে।

স্মৃতিচিহ্ন: প্রতিমা ঘোষের ঘর

এখনও মনে হয় যদি ‘মিঠি/টিয়া’ লেখা দরজার সামনে গিয়ে ঘণ্টি বাজাই, ভেতরে ঢুকে দেখব মুখে খুশি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রতিমাদি। স‌্যর যাঁকে ‘ইভা’ নামে উৎসর্গ করেছিলেন, ‘দিনগুলি-রাতগুলি’। মেধা-মনন-স্নেহ সব মিলেমিশে তাঁর অবয়ব। ‘সেইসব কথা’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন– ‘ব‌্যক্তিকে সরিয়ে রেখে যদি নিছক কালের চিহ্ন হিসেবে পাঠকেরা লেখাগুলিকে দেখেন তো ভাল হয়।’

আমি তাঁকে ব‌্যক্তি হিসেবেও দেখছি, কালের চিহ্ন হিসেবেও। স্থির আর অপরিবর্তনীয়।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন অভীক মজুমদার-এর অন্যান্য লেখা

……………………..