Robbar

বাঙালির বাড়ির মৎস্যেন্দ্রিয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 29, 2026 8:16 pm
  • Updated:April 29, 2026 8:22 pm  

মাছের কথা বললে অবধারিতভাবে আঁশটে গন্ধের কথাও উঠবে। মাছ ছাড়া ভাত রোচে না, কিন্তু মাছের বাজারে ঢুকলে নাকে চাপা দেন– এমন মানুষ নিশ্চয়ই দেখেছেন। আবার মাছ নিয়ে যাঁদের কাজকারবার, মানে জেলে বা মাছ বিক্রেতা, তাঁদের কাছে নাকি ওই কটু গন্ধই সুগন্ধি-সমান। জাত-মেছোর শুনেছি ঘুমই আসে না মাছের ঝুড়িতে মাথা দিয়ে না-শুলে।

কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্ত

–‘কাকু একটু দেখবে?’ বছর পনেরোর কচি গোঁফ-দাড়ি পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায়।
–‘কী দেখব?’ শোভন ডাক্তার চেম্বারে বসে ঢুলছিল, চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখে পাড়ারই ছেলে। চেনা মুখ। ঘরে ঢুকে ধপ করে চেয়ারে বসেই বিশ্বরূপ দেখানোর মতো হাঁ-করে আঙুল দিয়ে নিজের গলাটা দেখিয়ে বলে, ‘কাঁ-আ’।
–‘অ। কাঁটা।’ শোভন আড়মোড়া ভেঙে উঠে এসে তার মুখগহ্বরে আলো ফেলে। ‘আরিব্বাস! ওরকম দু’দিকে দুটো মার্বেল-সাইজের টনসিলের পিন-কুশন বানিয়ে রাখলে কাঁটা তো ফুটবেই। তা কী মাছ খেয়েছিলি? ইলিশ?’
–‘নাঃ, বাটা।’ ছেলেটা ব্যাজার মুখে বলে।
–‘ধুর ব্যাটা, বাটাই ম্যানেজ করতে পারলি না? লম্বা করে জিভ বের কর দেখি। বাড়িতে কে বাঙাল– বাবা না মা?’
জিভ বের করা কণ্টক-ক্লিষ্ট কিশোরের কণ্ঠে শুধু দু’টি স্বরবর্ণ উঠে আসে– ‘আ-আ।’ বাবা।
–‘বলিস কী রে, বাঙাল বাড়িতে বড় হয়েও মেছো হতে পারলি না? ওয়াই-ক্রোমোজোমটা তো বৃথাই গেল।’ শোভন ডাক্তার কাঁটা তুলে বেসিনে হাত ধুতে যায়। ছেলেটি ইতস্তত করে, ‘কাকু কিছু কি–’
–‘হুঁ, দিবি বইকি। আমি তো আর সারস নই, যে বিনি পয়সার সার্ভিস দেব। ১০০ দে। পার কাঁটা ৫০।’ ছেলেটা ঢোঁক গিলে দেখছিল কাঁটা গিয়েছে না আছে, ‘একেবারে ১০০! একটু কনসেশন হবে না? এখনও কিন্তু খচখচ করছে।’
–‘কাঁটা গেলেই কি আর ব্যথা যায় রে–’ শোভন উদাস হয়ে যায়। ‘আর মাছের বাজারের মতো দরাদরিই যদি করবি, তবে বাপু আসার দরকার কী ছিল? এই সামান্য কাজটা তো বাড়িতে সন্না দিয়েই সেরে নেওয়া যেত।’
–‘সন্না থাকলে তো! আজকাল পাকাচুলই যে নেই গো, সব ডাই করে নিচ্ছে না?’ ছেলেটা ফিক করে হেসে ৫০ টাকার একটা চকচকে নোট টেবিলের ওপর রেখে ধাঁ হয়ে যায়। কোচিং থেকে ফেরার পথে বান্ধবীকে ফুচকা খাওয়ানোর পয়সাটা অন্তত বাঁচাতে পেরে মন একটু অন্তত ভালো এখন তার। কলেজটা কামাই হল ফালতু। মা-কে কতবার বলেছে, সকালে বেরনোর আগে কোনও মাছই দিও না। তা কে শোনে কার কথা! প্রোটিনে নাকি ঘাটতি পড়ে যাবে। যত্তসব! এই মা জাতটার বোধহয় ঘটি-বাঙাল হয় না।

বাটা মাছ

আবার অন্যরকমও আছে। অফিসটাইমের বাজারে সেদিন থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে মাছের দোকানির সামনে উবু হয়ে বসে পড়েছেন এক মহিলা। রোদ-পিছলানো মেক-আপ, মাথার ওপরে তোলা কালো-চশমা, আর জাঙ্ক-জুয়েলারিতে তাঁকে আর যা-ই হোক দাপুটে বাজারু মনে হওয়ার জো নেই। বহুক্ষণ ধরে মাছের টুকরো-টাকরা, তেল, নাড়িভুঁড়ি, কাঁটাকুটো বেছে চলেছেন নিবিষ্ট মনে। এক ভদ্রলোক অধৈর্য হয়ে বলে ফেললেন, ‘ম্যাডাম একটু জলদি করুন, প্লিজ।’ মহিলা স্নেহমাখা হাসি নিয়ে তাকালেন, ‘কী করি বলুন, বাচ্চাদের যে মাছ ছাড়া রোচেনা।’ পাশ থেকে কেউ ফুট কাটে, ‘আপনি তো ভাগ্যবান, দিদি। আজকালকার ছেলেপুলে মাছের নাম শুনলে নাক-সিঁটকোয়।’ ভদ্রমহিলা এবার সগর্বে বলেন, ‘আমার চারপেয়ে ছানাপোনারা কিন্তু মাছ বলতে অজ্ঞান। এত বাধ্য আর এত মিষ্টি, যে না-দেখলে বিশ্বাস করবেন না। এই যে দেখুন না, আমার বড়ছেলে, মার্জারপ্রতিম মজুমদার।’ স্নেহের চোটে গলা বুজে আসে তাঁর। স্ক্রিন সেভারে একটি কেঁদো হুলোর ছবি দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু যাঁকে দেখাচ্ছিলেন, তিনি ততক্ষণে ‘আদিখ্যেতা’ বলে পাশ কাটিয়ে অন্য দোকানের দিকে পা-চালিয়েছেন। মহিলা অবাক হয়ে সেদিকে খানিকটা তাকিয়ে বলেন, ‘স্ট্রেঞ্জ!’ আর তারপরই হাসিহাসি মুখে মাছের দোকানকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ক্যামেরা তুলে ধরেন জয়ধ্বজার মতো। আদুরে গলায় দোকানিকে বলেন, ‘এদিকে একটু তাকাও না ভাই। স্মা-ই-ল! আর এই মাছগুলোকে একটু পাশ ফিরিয়ে দাও, যেন ওদেরও চোখ থাকে ক্যামেরার দিকে। মরা তো কী হয়েছে? অর্জুন এই মরা মাছের চোখে তাক করেই দ্রৌপদীকে পেয়েছিলেন কি না? ইন্সটায় পোস্ট করে দেব এক্ষুনি। দেশে-বিদেশে সব বন্ধু আমাদের কলকাতার কাতলা দেখে হিংসেয় জ্বলে যাবে।’ একটা সেলফি তুলে নিয়ে লিপস্টিক-লাগা দাঁত বের করে ‘থ্যাঙ্কিউ’ বলে দামি পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে গজেন্দ্রগমনে দিদিমণি এবার নিজের গাড়ির দিকে রওনা হলেন। দোকানি, খরিদ্দার (বোধহয় রুই, ভেটকি, চারাপোনার দলও) সবাই স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলে, ‘উউফ!’

কালীঘাট পটচিত্র

নতুন বউ শ্বশুরবাড়িতে ঢোকার পরেই শুরু হয়ে যায় কিছু স্ত্রী-আচার। তার একটা হল হাতে জ্যান্ত ল্যাটা মাছ ধরিয়ে দেওয়া। পিছল মাছকে পাকড়ে ধরে রাখতে পারলে বুঝতে হবে বউমা শক্ত হাতে সংসারটাকেও বেঁধে বেঁধে রাখতে পারবে। বহুপ্রসবিনী মৎস্য আবার প্রাচুর্য আর সুপ্রজননেরও প্রতীক। বিয়ের আগের দিন অবধি মা বেছে না-দিলে যে-মেয়ে মাছ খেতে পারেনি, তার কাছে এটা একটা দুঃস্বপ্ন বইকি! তাই দিনক্ষণ ঠিক হওয়া ইস্তক ঋভুকে তার হবু বউ সকাতরে বলেছে, ‘দেখিস, যেন মাছ-টাছ ধরতে না হয় !’ ঠামার কাছ থেকে জেনে এসে রিভু যেদিন তাকে আশ্বস্ত করল, ‘ওসব তোদের এদেশিদের নিয়ম, আমাদের নয়’– বলে; সেদিন এর অন্তঃসলিলা ঠেসটুকু বুঝেও সে মেয়ে মোটে গায়েই মাখল না।

ফাঁড়াটা সেদিনকার মতো কাটল বটে, কিন্তু এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে একদিন শাশুড়িমা বললেন মাছে নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখতে। রান্নাটা অবশ্য বউমাকে করতে হবেনা, তিনিই করবেন। ফ্রিজ থেকে বের করা কাটা মাছের ঠান্ডা গা-টা ছুঁতেই কেমন যেন শিরশিরিয়ে উঠল শরীর। ওই মৃত মাছের গায়ে সে হাত দেয় কী করে! শাশুড়ি সাড়াশব্দ না-পেয়ে পিছন ফেরেন, একহাত ওপর থেকে মাছের ওপর তখন আড়ষ্ট আঙুলে নুন-হলুদ বর্ষণ হচ্ছে। দৃশ্য দেখে তিনি হেসেই সারা, ‘ও কী রে! ঝারি থেকে ফুলগাছে জল ছেটাচ্ছিস নাকি তুই?’ অবশ্য সহনশীলতার পরীক্ষায় তিনি সেদিনই ডিস্টিঙ্কশনে পাশ করে গেছেন, যেদিন চাল ধুয়ে আনতে বলায় পুত্রবধূ অত্যন্ত সপ্রতিভভাবে জিজ্ঞেস করেছে, ‘চালটা কতক্ষণ পর্যন্ত ধোব, মা?’ এপর্যন্ত সে জীবনানন্দের কবিতায় কিশোরীর চাল ধোয়া হাতের গন্ধের কথা পড়েছে, ভাত খেয়েওছে প্রতিদিন, কিন্তু সে তো ভার্চুয়াল, প্রতিদিনের খাবার পাতে চাল থেকে ভাত হবার জরুরি প্রক্রিয়াটা জানা হয়ে ওঠেনি। সর্বংসহা শাশুড়ি সেদিনও বিচলিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় বলেছেন, ‘যতক্ষণ না জলটা একেবারে ট্রান্সপারেন্ট হয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ।’ মাসখানেকের মধ্যেই কট্টর ঘটিবাড়ির মেয়ে শিখে গেল তাদের এপারের তুলনায় ওপারের মাছের তালিকা কত বেশি দীর্ঘ। এতদিন মাছ বলতে তার পরিচয় ছিল শুধু কাটা-পোনা, কই, ভেটকি, ট্যাংরা,পারশে, তোপসে কি বড়জোর পুঁটি, মৌরলা; ভিআইপি গোত্রের মধ্যে চিংড়ি, ইলিশ আর পেট খারাপ হলে মাটির হাঁড়িতে জিয়োনো শিঙি-মাগুরের বিস্বাদ ট্যালকা ঝোলের সঙ্গে। এখন তার জিভে মশলাদার মাগুরের রসার কালোয়াতি স্বাদ, সর্ষেবাটা ইলিশের গুরুপাক একঘেয়েমি পেরিয়ে আলু-বেগুনের সাদাসিধে হালকা ঝোলে মাছের রাজার স্নিগ্ধ ঘরোয়া আঘ্রাণ।

ছবি: তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে পড়ে, ইশকুলবেলায় একবার ইলিশের কাঁটাতঙ্কে বিচলিত হয়ে প্রস্তাব দিয়েছিল, মাছটাকে ভিনিগারে ভিজিয়ে রাখলে কিছু সুরাহা হতে পারে হয়তো। কলেজপড়ুয়া মেজকা নির্বিকার মুখে বলেছিল, ‘হবেই তো। তোকে রাতভর দই আর আদা-পেঁয়াজবাটা দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখলে যেমন হবে, ঠিক ততটাই।’ মাছ-বিমুখ সেই মেয়ে এখন অফিস যাওয়ার আগেও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাঁটা বেছে চারাপোনার ঝোল সোনামুখ করে খায়। সমবয়সি ননদ, বউদিরা ঠাট্টা করে, ‘বাঙাল বাড়ির বউ হতে গেলে মৎস্যেন্দ্রিয়টি যে যথেষ্ট পোক্ত হওয়া দরকার এটা তো অনেক আগেই তোমার ভাবা উচিত ছিল, ভাই।’ বাপের বাড়িতে গিয়ে সে গল্প করে, ‘কতরকমের মাছ খায় গো ওরা! চিতল, আড়, শোল, মৃগেল, খয়রা, ফলুই, খলসে– এসব মাছ নাহয় খাই না-খাই শুনেছি, তা বলে ভ্যাদা মাছ কিংবা ন্যাদোশ– জন্মেও নাম শুনেছ এদের!’

–‘ওমা, ন্যাদোশ তো সেই মহাশ্বেতা দেবীর গল্পের গরুটা, যে চাঁদ দেখতে ছাদে উঠত! হ্যাঁ ছোড়দি, ওরা কি তাহলে তিমি মাছও খায় নাকি রে?’ ক্লাস এইটে পড়া ভাইটাও যে হাঁ-করে বসে গল্প গিলছে, সেটা কেউ খেয়াল করেনি।

ছোড়দি টের পায়, এসব আলোচনা তাকে একটু বিরক্তই করছে, কারণ কখন অজ্ঞাতে সে নিজেও যেন জার্সি বদলে ‘ওরা’-র দলে নাম লিখিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। মাছ রান্নার রকমফের আর স্বাদবৈচিত্রের ‘লা-লিগা’য় ঘটি বাঙাল কে যে কাকে কত গোলে গো-হারান হারাতে পারে, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হতে পারে। সত্যি যদি তেমন একটা ‘মেছো অ্যাপ’ বানানো যেত, বাঙালির এপার-ওপার বোঝা যেত এক নিমেষে। এত এসআইআর-এর ঝকমারির দরকারই হত না মোটে।

মাছের কথা বললে অবধারিতভাবে আঁশটে গন্ধের কথাও উঠবে। মাছ ছাড়া ভাত রোচে না, কিন্তু মাছের বাজারে ঢুকলে নাকে চাপা দেন– এমন মানুষ নিশ্চয়ই দেখেছেন। আবার মাছ নিয়ে যাঁদের কাজকারবার, মানে জেলে বা মাছ বিক্রেতা, তাঁদের কাছে নাকি ওই কটু গন্ধই সুগন্ধি-সমান। জাত-মেছোর শুনেছি ঘুমই আসে না মাছের ঝুড়িতে মাথা দিয়ে না-শুলে। সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের বাবা ছিলেন বিখ্যাত সার্ভেয়ার প্রমদারঞ্জন রায়। তাঁর লেখায় এক বিচিত্র ঘটনার কথা আছে। বর্মা, অর্থাৎ এখনকার মায়ানমারে জরিপের সময়ে কোনও একবার সকলের খাওয়ার জন্য লুচি ভাজা হচ্ছিল। স্থানীয় মানুষ এসে অভিযোগ করেন এই বিশ্রী গন্ধের উৎপাতে তাঁরা টিকতে পারছেন না। যে-ঘিয়েভাজা লুচির মনোরম সুবাসে বাঙালিমাত্রেরই চোখ নিমীলিত হয়ে আসে, তার কি না এমন বদনাম! আর সেটা করছেন কারা? সেই স্থানীয়রা, যাঁরা নাকি ঙাপ্পি মাছ মাটিতে পুঁতে রেখে পচিয়ে খেয়ে থাকেন। সে পচা মাছের গন্ধে যে ভূত পালায়, সে আর বলে দিতে হবে না। তাহলে বলতে হবে, গন্ধ জিনিসটাও আপেক্ষিক।

বাঙালির মাছ খাওয়া আর গন্ধবিচারের কথা একসঙ্গে উঠলে শুঁটকিকে ঠেকায় কার সাধ্যি! সমুদ্রের তীর ধরে যেতে যেতে বিটকেল মেছো গন্ধে অন্তরাত্মা ঘুলিয়ে উঠলে নিশ্চিত জানবেন ধারেকাছে কোথাও লম্বা দড়িতে মাছ রোদে শুকনো হচ্ছে। যেসব জায়গায় চাহিদার তুলনায় মাছের জোগান বেশি, সেখানেই এভাবে মাছ শুকিয়ে রাখা হয়। এই শুকনো মাছ বা শুঁটকি বিভিন্ন জায়গায় চালান যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া চলে। মাছের পচা গন্ধ ঢাকতে খুব বেশি তেল-মশলা দিয়ে গরগরে করে শুঁটকি রাঁধা হয়। অবিভক্ত বঙ্গের চট্টগ্রাম ইত্যাদি বেশ কিছু জায়গায় শুঁটকি খাওয়ার চল আছে। পুব-পশ্চিম নির্বিশেষে একদল যেমন শুঁটকি-প্রেমী আছেন, তুলনায় একটি বড় দল আছেন শুঁটকি-বিরোধী। আমাদের জামশেদপুরের সেজপিসে এই প্রথম দলের সদস্য। একবার কলকাতা থেকে হাওড়া-বারবিল এক্সপ্রেসে পিসি আর পিসেমশাই বাড়ি ফিরছেন। সঙ্গে লেকমার্কেট থেকে কেনা, অত্যন্ত সাবধানে মোড়কের মধ্যে নেওয়া শুঁটকি। সেই পুঁটলি যে-ব্যাগের মধ্যে আছে, তার আষ্টেপৃষ্ঠে কাপড়জামার ক্যামোফ্লেজ। তবু যৌবন জলতরঙ্গের মতো সে উৎকট গন্ধ কতক্ষণই বা রোধ করা যায়! ট্রেন বেশ কিছুটা যাওয়ার পর অনেকেই, বিশেষত এক মাঝবয়সি বাঙালি মহিলা নাক-টানছেন আর ভুরু কোঁচকাচ্ছেন দেখে পিসি পিসেমশাইকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিচ্ছে, আর ফিসফিস করে বলছে, ‘তখনই বলেছিলাম, কথা শুনলে না। এবার ম্যাও সামলাও।’ পিসেমশাই অনুদ্বিগ্নমনা হয়ে কিছুক্ষণ ছদ্মঘুমে রইলেন, তারপর হঠাৎ যেন ধড়মড় করে উঠে বসে ‘উঃ, কীঁ গন্ধ রেঁ বাঁ-বাঁ’– বলে মহা শোরগোল জুড়ে দিলেন। তারপর পিসিকে নিয়ে ‘আমরা বরং পাশের কামরায় চলে যাই’ বলে উঠে সত্যিই একদম পিছনের দিকে গিয়ে বসলেন। খুব ভিড় ছিলনা, তবু কেউ বড় খেয়াল করল না। লোকের নামাওঠার মাঝে ব্যাপারটা ধামাচাপাও পড়ে গেল। জামশেদপুর স্টেশনে ব্যাগ নিয়ে নেমে পিসে দাঁড়িয়ে রইলেন একটু। তারপর যেই না ট্রেনটা ছেড়েছে, কামরার জানলার কাছে এসে মহিলার নাকের সামনে ব্যাগটা তুলে ধরে বললেন, ‘শুঁটকিটা যে সরেস কিনেছি এ আপনাকে মানতেই হবে।’ ভদ্রমহিলার দাঁত কিড়মিড়ের শব্দ নাকি প্ল্যাটফর্ম থেকে শোনা গিয়েছিল।

ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে, মেছো বাঙালি তেমনি বাংলার, মায় দেশের বাইরে গেলেও মাছের জন্যে ছোঁকছোঁক করবে। তাই জন্যেই ইলিশের অভাব শ্যাড মাছে মেটান অমল-বিমল-কমলেরা, আর সুদূর জার্মানিতে বাসবীদি কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বেগুন আর বেলপেপার সহযোগে আমাদের জার্মান জামাইবাবুকে রেঁধে খাওয়ান Lachs মাছের গাদা। টোকিও শহর থেকে বন্ধু চিকা মুরাকামি ছবি পাঠিয়েছেন সেখানকার আরাকাওয়া সিটিতে হিরোআকি এবং সঞ্চিতা নাগাগাতার বাঙালি রেস্তোরাঁ ‘পূজা’র। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে এই দম্পতি খাইয়ে আসছেন শুক্তো, ডাব-ইলিশ, মুড়িঘন্ট। প্রায় ১০০ বছর আগে এই শহরেই ভারতীয় ‘রাইস কারি’র রেস্তোরাঁ ‘নাকামুরায়া ক্যাফে’ খুলেছিলেন ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু।

ল্যাচস মাছের রান্না

‘কে বলেছে প্রবাসী বাঙালিকে খুঁজেপেতে বাংলার মাছের ভায়রাভাই ধরে আনতে হয়!’ আমেরিকা-ফেরত বিদিশা শোনাল মেছো বাঙালির বঞ্চনার কথা– ‘‘বরং রুই, ইলিশ, চিংড়ির যে রাজকীয় আকার প্রকার বাঙালিরা ভুলে গেছেন, সেইসব দেবভোগ্য মাছই বাংলাদেশ থেকে সিধে ‘ফ্রোজেন’ অবতারে পৌঁছে যায় ট্রাম্প সাহেবের দেশে। দুই/আড়াই/ তিন কিলোর এইসব হিমায়িত মাছেদের বঁটি নয়, বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কেটে বিক্রি করা হয়। সেইসঙ্গে ফরসা ফরসা বিলিতি মাছ স্যামন, হ্যালিবার্ট, চিলি অ্যান্ড সিব্যাসও আছে। সাহেব বন্ধু, যাঁরা সোনালি গোঁফে মাছের ঝোল মাখাতে রাজি নন, তাঁদের বেক করে খাওয়াবার জন্য।’

চিংড়ি মাছের ঝালচচ্চড়ি

ইলিশভক্ত মুজতবা আলী বলেছিলেন, স্বর্গের (বেহেস্ত) বর্ণনায় যেহেতু ইলিশের উল্লেখ নেই, তাই সেখানে যাওয়ার কোনও বাসনাও তাঁর নেই। যদিও সময়ের ফারাক অনেকটাই, তবু যেন মাছ নিয়ে আলীসাহেবের এই নির্ভেজাল রহস্যালাপের পাশেই হাঁটু মুড়ে কাঁচা তেঁতুল, কাঁচালঙ্কা আর চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়ে পান্তা খেতে বসে পড়েন রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের বরদাসুন্দরী। ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’য় গুরুচরণের দ্বিতীয়পক্ষ এই সাধারণ গ্রাম্য রমণী বুঝেছিলেন তাঁর বৃদ্ধ স্বামীর প্রাণবায়ুটি বেরিয়ে গেল বলে। আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ঘটনাটা ঘটে তাঁর মাছ খাওয়া বন্ধ হওয়ার আগে সব ভুলে শেষবারের মতো মাছ খেয়ে নেওয়ার আকুতি বরদাসুন্দরীর বসার ভঙ্গিটিতে স্পষ্ট। তা যেন সমাজ, প্রবৃত্তি আর বিচিত্র মানবচরিত্রের মুখের ওপর একটি যথাযোগ্য চপেটাঘাত। সেটি নিয়ে গল্পে আর বাক্যব্যয় করার সুযোগ ছিল না লেখকের। কিন্তু পাঠক (কিংবা বলা ভালো ‘পাঠিকা’) এই শুরুর বর্ণনাটি পড়ে একসময়ে কাঠ হয়ে যেতেন। আজকের মুক্ত সমাজে স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্যের হিসেবগুলো যখন অনেক সহজ এবং সংস্কারমুক্ত তখন খাদ্যরুচিকেও অনাবশ্যক শুচিবায়ুর চাপে আর যেন মুখ লুকোতে না-হয়।