


মছলিবাবা এবং তার অনুসঙ্গে মাছ নিয়ে শব্দের কারিকুরি আছে বেশ কয়েকটি দৃশ্যের সংলাপে। সত্যজিৎ রায়ের এ-ও একটি প্রিয় বিষয়। মছলিবাবা যে ভণ্ড, এই সন্দেহ প্রথম থেকেই ফেলুদার মনে দানা বেঁধেছে। যখন শুনলেন যে– মগনলালের স্থান মছলিবাবার একদম সামনে, তখনই ফেলুদার মন্তব্য, ‘হ্যাঁ, অতি ভক্তি চোরাকারবারিদের একটা লক্ষণ বটে!’
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে মছলিবাবা সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে পারি ক্যালকাটা লজের মালিক নিবারণ চক্রবর্তীর কাছ থেকে। জটায়ু যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘এখানে কোনও রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছে কি না!’ উত্তরে নিবারণবাবু জানান, ‘রোমাঞ্চকর কি না, জানি না মশাই। তবে ইদানীং এখানে এক জাঁদরেল সাধুর আবির্ভাব ঘটেছে– মছলিবাবা! প্রয়াগ থেকে সাঁতরে সোজা এসেছেন কাশীতে। এই দ্বারভাঙ্গা ঘাটের কাছে দর্শন দেন। ভক্ত সমাগম হয়, উৎকৃষ্ট ভজন হয় আর বাবাজির যেদিন যাঁর উপর দয়া করেন, তাঁকে একটি করে মন্ত্রপূত শল্ক দেন।’

শল্ক ব্যাপারটা কী, জানতে চাইলে ফেলুদা বলেন, শল্ক হল মাছের আঁশ। কিন্তু ছবিতে পরিচালক সত্যজিৎ রায় মছলিবাবার প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন, বলা যেতে পারে প্রায় ছবির প্রথম দৃশ্যেই। ছবি শুরু হচ্ছে ঘোষালবাড়িতে, দুর্গাঠাকুরের সামনে প্রতিমা-শিল্পী শশীবাবু বালক রুকুকে দুর্গার মাহাত্ম্য শোনাচ্ছেন। ‘তখন দেবতারা বললেন সর্বনাশ! এই অসুরের সঙ্গে কিছুতেই পারা যাচ্ছে না। তখন বিষ্ণুর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো মহা তেজ… ইত্যাদি।’
ঠিক সেই সময়ে মগনলাল মেঘরাজ এসেছিলেন রুকুর বাবা উমানাথ ঘোষালের সঙ্গে দেখা করতে। কথাপ্রসঙ্গে মগনলাল জানান, ‘কাল তোমাকে দেখলাম মছলিবাবার দর্শনে। ভাবলাম, দেখা করে আসি।’

দর্শকদের মনে একটা কৌতূহল তৈরি করে দিয়ে, মছলিবাবার সম্বন্ধে মোটামুটি তথ্য জানার পর সত্যজিৎ আসল মছলিবাবাকে পর্দায় নিয়ে এসেছেন। সেই দৃশ্যে, মছলিবাবাকে দেখানোর আগে আমরা দেখেছিলাম মছলিবাবার অনুষঙ্গ, কানা-উঁচু থালায় রাখা মাছের আঁশ। পরিচালক সত্যজিৎ মাছের অনুষঙ্গে এনেছিলেন আঁশ আর ভক্তির অনুষঙ্গে উৎকৃষ্ট ভজন। আঁশ আর ভজন হাত ধরাধরি করে পর্দায় উপস্থিত হয়েছিল। তারপর আমরা দেখি সাধুবাবা, ভণ্ড মছলিবাবাকে।

এই মছলিবাবা এবং তার অনুসঙ্গে মাছ নিয়ে শব্দের কারিকুরি আছে বেশ কয়েকটি দৃশ্যের সংলাপে। সত্যজিৎ রায়ের এ-ও একটি প্রিয় বিষয়। মছলিবাবা যে ভণ্ড, এই সন্দেহ প্রথম থেকেই ফেলুদার মনে দানা বেঁধেছে। যখন শুনলেন যে– মগনলালের স্থান মছলিবাবার একদম সামনে, তখনই ফেলুদার মন্তব্য, ‘হ্যাঁ, অতি ভক্তি চোরাকারবারিদের একটা লক্ষণ বটে!’ এরপরেই বাইনোকুলার দিয়ে মছলিবাবাকে লক্ষ করার সময় ফেলুদার স্বগোতক্তি, ‘ভেরি ফিসি! বাবাজির হাতে বেমানান উল্কি।’
যদিও খেরোর খাতায় সংলাপটি লেখা ছিল, ‘ফিস-ফাদার, ভেরি ফিসি’ অতিরিক্ত মনে হওয়ায় ‘ফিস-ফাদার’ শব্দটি বাদ দেন। মছলিবাবার প্রেক্ষিতে ওই ‘ভেরি ফিসি’র ‘ফিসি’ শব্দটা খেয়াল করুন। শব্দটা কতটা অব্যর্থ, ছবিতেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম।

আবার দেখা যায় হোটেলে লাঞ্চের সময় নানারকমের পদ থাকতেও ফেলুদা শুধু মাছের কথাই বলে ওঠেন, ‘কাশীতে যে এত ভালো মাছ পাওয়া যায়, জানতাম না তো!’
শুধু তো মাছ পেলেই হয় না, তার সঙ্গে চাই উপযুক্ত রাঁধুনি। এই কথার প্রেক্ষিতে নিবারণবাবু জানান, ‘এই কুকটিকে অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি মশাই।’ বলার কারণ, মাছ বেনারসে সহজলভ্য, কিন্তু ভালো রাঁধুনি পাওয়া মুশকিল। বেনারসে কখনওই মাছের অভাব হত না, এখনও হয় না। শুধু বাঙালিদের ‘সেকেন্ড হোম’ বলে নয়, তখন আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্ব কাশীতে বড় হয়ে ওঠেনি। দুর্গাপুজোর দশেরা এবং শিবপুজোর সময় ছাড়া বেনারসে মাছ ভালোই বিক্রি হয়। রত্নাকর বাজার, রবীন্দ্রপুরা লেন, সুন্দরপুর, আলেষপুর, চিতাইপুর, আখারী বাইপাস, পারাও রোড-সাইড বাজার, রাজঘাট ব্রিজ-বাজার, মির্জাপুর বারাণসী রোড-বাজার ছাড়াও রামনগর ঘাটে পাওয়া যায় টাটকা রকমারি মাছ। তবে সবচেয়ে বড় মাছের বাজার মোঘলসরাইয়ের ফিস মার্কেট। বরুণা নদীর চৌকাঘাটেও পাওয়া যায় টাটকা মাছ। ফলে মছলিবাবাকে নিয়ে কারও সন্দেহ বা আপত্তি তোলার ভাবনাই মাথায় আসবে না। এখন হলে কী হত, জানি না।

যে-কথা বলছিলাম, সংলাপে মাছের প্রসঙ্গ। মনে পড়ে, বিকাশ সিংহের গ্রেফতারের দৃশ্য! মানমন্দিরে ফেলুদা বিকাশকে পুলিশ ইন্সপেক্টর তেওয়ারির হাতে তুলে দেওয়ার সময়, তাঁকে বলেন, ‘ইনি চুনোপুঁটি, রাঘব বোয়ালের জন্যে অন্য ব্যবস্থা।’
আবার মগনলাল মেঘরাজকে গ্রেফতারের ঠিক আগের মুহূর্তে, রিভলবার হাতে ফেলুদার সংলাপ, ‘আপনার সাজানো বাবাজির এখন আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে কোতোয়ালিতে।’ ছবিতে আর একটি বিষয় সবিশেষ উল্লেখ্য, সেটি হল,মছলিবাবার মুখনিঃসৃত অমৃত বাণী। সে বাণীর কোনও মাথামুণ্ডু নেই! মছলিবাবা মুখে একবারই সংলাপ শোনা গিয়েছিল। ভজন গানের পর হঠাৎ তিনি চোখ খুলে হিন্দিতে বলতে শুরু করেন, ‘এক হি ব্রহ্ম, এক হি সূর্য, এক হি চন্দ্র; দো হাত, দো পা ইত্যাদি বলে দশ-এ দশাবতার বলে শেষ করেন। তারপরেই দশাবতারের দশটি আলাদা অবয়বের কথা বলতে শুরু করেন। আমরা জানি পৃথিবীর অত্যন্ত সংকট সময়ে ভগবান বিষ্ণু দশটি ভিন্ন অবতার রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই দশ অবতারের সঙ্গে অনেকে বিবর্তনবাদের মিল খুঁজে পান। পৃথিবীতে জলেই প্রাণের শুরু। সে-কারণেই মৎস্য দিয়েই দশাবতার শুরু। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ ইত্যাদি হয়ে শেষ হয়েছে কল্কিতে। কিন্তু মছলিবাবা, নিজেকে অবতারের রূপ বলে, দশাবতারের ক্রমটা পালটে বলে যান– কূর্ম, বরাহ, নরসিং, বামন, পরশুরাম, রামচন্দ্র, বলরাম, ভগবান বুদ্ধ, কল্কি আউর মৎস্য।

অর্থাৎ শেষে নিজেকে ‘মৎস্য অবতার’ বলে উল্লেখ করা। ভণ্ড বাবা জানেনই না, মহাপ্রলয়ের সময় ভগবান বিষ্ণু সমস্ত জীবকে রক্ষা করতে নিজেই মাছ হয়ে নৌকাটিকে রক্ষা করে নতুন সৃষ্টির সূচনা করেন। মৎস্য অবতার কখনই মানুষরূপী ‘মছলিবাবা’ হতে পারেন না।

উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে পরিবর্তন করার সময় সত্যজিৎ অসাধারণভাবে মছলিবাবার কয়েকটি অবশ্যম্ভাবী বদল এনেছিলেন। উপন্যাসে মছলিবাবার খোঁজ মেলে কলকাতা থাকতেই সংবাদপত্র থেকে। ফেলুদা ও জটায়ু মছলিবাবার খোঁজ পান। সত্যি বলতে, মছলিবাবার প্রতি জটায়ুর তীব্র আকর্ষণেই ফেলুদা অ্যান্ড কোম্পানির বারাণসী আগমন। উপন্যাসের মছলিবাবা আর পর্দার মছলিবাবার মধ্যে বিস্তর তফাত। সাহিত্যে মছলিবাবার আর এক নাম ‘আবলুস বাবা’। নামটা বেনারসের ক্যালকাটা লজের মালিক, নিরঞ্জনবাবুর দেওয়া। তোপসের কথায়, ‘আমি নিজে জীবনে এত মিশকালো লোক দেখিনি। শুধু কালো নয়, এমন মসৃণ কালো যে হঠাৎ দেখলে মনে হয় গায়ে বুঝি সাপের খোলসের মতো একটা কিছু পরে আছেন। তার উপরে কাঁধ-অবধি ঢেউ খেলানো চুল, আর বুক-অবধি ঢেউ খেলানো দাড়ি– দুটোই কুচকুচে কালো।’ সাধুবাবা জোয়ান লোক, বয়স ৩০-৩৫-এর মধ্যেই। বাবার চেহারা আরও খোলতাই হয়েছে তার গায়ে টকটকে লাল সিল্কের চাদর আর লুঙ্গির জন্য। মছলিবাবা আর মগনলালের সঙ্গে যে একটা আঁতাঁত আছে, তা আগেই আমরা জেনে গিয়েছিলাম। তুলনায় ফিল্মে একবারের জন্যও এই সম্পর্কটা জানানো হয়নি।

একবার সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মছলিবাবা চরিত্রে কেন মনু মুখোপাধ্যায়কে নির্বাচন করেছিলন? উত্তরে তিনি জানান, চেহারার বহিরাঙ্গ ছাড়াও গোঁফ-দাড়ি লাগালে মনু মুখোপাধ্যায় আর সৌমিত্রের মধ্যে তফাত করা মুশকিল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved