


পাড়ে খান তিনেক গুমটি আছে। পান, সিগারেট, চা, ভাজা মাছ ইত্যাদি মেলে। আর রয়েছে বাঁশ আর চাঁচ দিয়ে তৈরি একটা ভাতের হোটেল। দিনের শেষ লঞ্চ বলে হোটেলে কোনও খদ্দের নেই। নদীর দিকে ফিরে দেখি সূর্য পাটে বসছে। লালচে-কমলা রং দিনপতির গায়ে। আকাশের পটেও লাল আর হলুদের ছোপ। তার ছায়া নদীর উপর। রঙিন তরঙ্গ বয়ে চলে।
২.
মাজুলি হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় নদী-কেন্দ্রিক দ্বীপ। অসমের এই দ্বীপটি বৈষ্ণব সংস্কৃতির কারণে দেশে-বিদেশে বিখ্যাত। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জনজাতির জীবনবৈচিত্র আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও মাজুলির অন্যতম আকর্ষণ। নয়ের দশকের শেষদিকে, মধ্যযুগের অসমিয়া ধর্মসংস্কারক শংকরদেবকে নিয়ে মাজুলিতে একটা আলোচনা-সভা করার কথা হয়েছিল, কিন্তু একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর সশস্ত্র কার্যকলাপের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি এখানেই গ্রাম-উন্নয়ন আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী সঞ্জয় ঘোষকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিল। মাজুলির অন্য এক সমস্যা হল বন্যা। বর্ষাকালে কোনও কোনও বছর দ্বীপের নানা অংশ ডুবে যায় আর খুবই ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসব মিলে সেখানে যেতে একুশ শতকের সাত-আট বছর কেটে গেল। শেষে এক গ্রীষ্মে যোরহাটের জগন্নাথ বরুয়া কলেজে একটা সভাতে গিয়ে মাজুলি যাওয়া পাকা করা গেল।

আমাদের দলটি জনা চারেকের। এর একজন হলেন মাজুলির ভূমিপুত্র দেবজিৎ বরা। কর্মসূত্রে গুয়াহাটিতে থাকেন, কিন্তু মাজুলির বাড়িতে যাতায়াত আছে। এক পড়ন্ত বেলায় ফেরিঘাটে হাজির হলাম। একটু পরেই লঞ্চে ওঠার ডাক শোনা গেল। দিনের শেষ জলযান বলে ভালোই ভিড়। সবাই উঠে যাচ্ছে শুধু যাদের সঙ্গে গাড়ি আছে তারা পরে উঠবে। ড্রাইভার সমেত আমাকে গাড়ির মধ্যে বসিয়ে রেখে আমার সঙ্গীরাও উঠে পড়ল। আমাদের গাড়ি সবার আগে লঞ্চে চড়ল। শুনলাম, গাড়িতে করেই ব্রহ্মপুত্র পার হব। বন্ধুরা নিজেদের আসনে গিয়ে বসল। হঠাৎ গাড়ির ভিতর থেকে উঁকি মেরে দেখি সামনেই অতল নদী। ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে লঞ্চের পাটাতনের উপর পায়চারি করতে লাগল। ভয় হল গাড়িও যদি পায়চারি শুরু করে! তরুণ ড্রাইভারকে ডেকে কথাটা বললাম। সে আমাকে বলল, কাঠের দুটো টুকরো সামনের চাকায় আটকানো আছে। টুকরো দুটোর চেহারা দেখে সাহস পেলাম না। গাড়ির পিছনের দরজা খুলে রাখলাম আপৎকালীন ঝাঁপের জন্য। তবে ঝাঁপ দিলে লঞ্চের উপরে পড়ব না নদীতে, সে ভিন্ন কথা।
লঞ্চ চলেছিল স্রোতের বিপরীতে। প্রায় একঘণ্টা যাওয়ার পরে মাজুলির তীর দেখা গেল। প্রথমে ধনুকের মতো বাঁকা সরু একটা রেখা, পরে তা মোটা ও সবুজ হয়ে উঠল। আর কিছুটা সময় পরে জেলেদের কুঁড়েঘর চোখে পড়ল। লঞ্চে বসে থাকা মানুষজনের নড়াচড়া শুরু হল। পশ্চিম আকাশে সূর্য তার তেজ কমিয়ে ফেলেছে। সকালে ঘরছাড়া আলোর রশ্মিরা ঘরে ফিরছে। লঞ্চটা পাড়ের গায়ে পৌঁছে থেমে গেল। পেতে দেওয়া কাঠের পাটার উপর দিয়ে মানুষজন নেমে তাড়াতাড়ি হাঁটা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাড় প্রায় ফাঁকা। গাড়িগুলোও একে একে নামানো হল। সে সঙ্গে বাকি মানুষজনও চলে গেল। আমাদের নিয়ে যেতে অসম সাহিত্য সভা থেকে একজনের আসার কথা। তাই পাড় ভেঙে উপরে উঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তাকিয়ে দেখি, পাড়ে খানতিনেক গুমটি আছে। পান, সিগারেট, চা, ভাজা মাছ ইত্যাদি মেলে। আর রয়েছে বাঁশ আর চাঁচ দিয়ে তৈরি একটা ভাতের হোটেল। দিনের শেষ লঞ্চ বলে হোটেলে কোনও খদ্দের নেই।

নদীর দিকে ফিরে দেখি সূর্য পাটে বসছে। লালচে-কমলা রং দিনপতির গায়ে। আকাশের পটেও লাল আর হলুদের ছোপ। তার ছায়া নদীর উপর। রঙিন তরঙ্গ বয়ে চলে। হঠাৎ পিছন থেকে কানে ভেসে এল অত্যন্ত সুরেলা গলায় একটা গান–
অথির ধনজন জীবন যৌবন
অথির এই সংসার।
পুত্র পরিবার সবহি অসার
করবো কা হেরি সার।।
এই জীবনের সবকিছুই অস্থির ও অনিত্য। কাকে আমি সার বলে গ্রহণ করব?
গান থেকে গায়কের দিকে ফিরে কিছুটা এগিয়ে যাই। দেখি হোটেলের বাঁশের খুঁটির গায়ে আটকানো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে মাঝবয়সি একজন মানুষ চোখ বন্ধ করে উঁচু গলায় গানটি গাইছে। তার হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করা আর বাঁশের গায়ের ফুটোতে আটকানো একটা ধূপ থেকে সরু একটা ধোঁয়ার রেখা উপরে উঠছে। সে সঙ্গে চড়ায় উঠছে গায়কের উদাত্ত কণ্ঠও–
কমল-দল-জল চিত্ত চঞ্চল
থির নোহে তিল এক।
নাহি ভবভয় ভোগে হরি হরি
পরম পদ পরতেক।।
গায়কের ভাতের হোটেল হয়ে উঠেছে মন্দির, বাঁশের খুঁটি হয়েছে বেদি, ইঞ্চি ছয়েকের ফ্রেমে বাঁধানো বিষ্ণু হয়েছেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আর ডুবন্ত লাল সূর্য পুজোর প্রদীপ। মধ্যযুগের নব-বৈষ্ণবধর্মের প্রাণপুরুষ শঙ্করদেবের প্রার্থনা সংগীত গোধূলির নদীতীরে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে–
জয়তু শংকর এ দুখ সাগর
পার করো হৃষীকেশ।
তুহু গতি মতি দেহু শ্রীপতি
তত্ত্ব পন্থ উপদেশ।।

আমরা যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেই যুবক এসে গিয়েছে। আমাকে তার গাড়িতে তুলল। এক সময় নদীর ধার ছেড়ে বড় রাস্তায় পড়লাম। তখনও মনের মধ্যে বরগীতের সুর জেগে আছে। ‘বরগীত’ শব্দের ‘বর’ শব্দটির অর্থ বড় বা লম্বা। শতকের নয়ের দশকের শুরু থেকে উজনি অসম ও নামনি অসমে নানা জায়গায় বরগীত শুনেছি; কিন্তু তা ঠিক কত বড়, তা আদিগন্ত বিস্তৃত ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ের ওই গান না-শুনলে বুঝতে পারতাম না।
অসম সাহিত্য সভা দফতরে দ্বীপের বন্ধুরা জানালেন শঙ্করদেবের জন্ম নগাঁও অঞ্চলের আলিপুখুরিতে আর টোলে পড়ার সময় সংস্কৃতে একটি সুন্দর কবিতা লেখার কারণে ‘দেব’ উপাধি পান। পারিবারিক পদবি ছিল ‘ভুঁইয়া’। শংকরদেব সংসারে জীবনে প্রবেশের পর বৈষ্ণবধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ভারত পরিক্রমায় যান। ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং অসমে ফিরে জাতপাতের সীমা অতিক্রম করে একস্মরণ ধর্মীর রীতির সূচনা। শ্রুতি ও স্মৃতির মাধ্যমে বিষ্ণুর কথা বলা ও শোনার মতো সহজপন্থা। বললেন, দাস্যভাবের মধ্য দিয়ে কীভাবে ঈশ্বরদর্শন ঘটে। কছারি রাজা হঠাৎ ভুঁইয়াদের উপর খড়্গহস্ত হন; আর শঙ্করদেব অনুগামীদের নিয়ে আনুমানিক ১৫২৪ সালে মাজুলি দ্বীপে আসেন, এবং প্রায় ২০ বছর থাকেন। এখানেই পরবর্তীকালে তাঁর প্রধান শিষ্য মাধবদেবের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় । শঙ্করদেবের ধর্মপ্রচারের কথা অহম রাজার কানে যায়। তাঁর রোষ থেকে রক্ষা পেতে শঙ্করদেব কোচ রাজার অধীনে থাকা বরপেটাতে যান। সেখান থেকে এক সময় কোচবিহারে চলে আসতে বাধ্য হন। তিন বছর পরে, আনুমানিক ১৫৬৮ সালে তোর্সা নদীর তীরে ভেলাডাঙায় তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

সন্ধের পরে কমলাবারি সত্রে গেলাম। এটা বৈষ্ণব মঠ। অসমে যে ৪৫০টি সত্র আছে তার মধ্যে ৩১টি মাজুলিতে। তার অন্যতম বড় সত্র কমলাবারিতে। মনে হয়, খানতিনেক বড় পাড়া নিয়ে তৈরি। টোল, নামঘর, সাধুদের ঘর, নাচগানের জায়গা, দুঃস্থ ছাত্রদের থাকার জায়গা থেকে বাগান, ধানজমি, পুকুর ইত্যাদি অনেক কিছুই আছে। সত্রের প্রধান হলেন নারায়ণচন্দ্র গোস্বামী। ছোট থেকে এখানে আছেন। পড়াশোনাও এখানে। সংস্কৃত, অসমিয়া, মৈথিলি ও ব্রজবুলি ভাষা জানেন। ব্রজবুলি ভাষা ও সাহিত্যের উপর একটি বই প্রকাশ করেছেন আর তখন শঙ্করদেবের উপর একটি বই লিখছেন। নারায়ণচন্দ্র গোস্বামীর সঙ্গে এই সাক্ষাতের কয়েক বছর পরে মধ্যযুগের ভাষা ও সাহিত্যের উপর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমির ভাষা সম্মানে সম্মানিত হন।

কমলাবারি থেকে নদীর ধার ধরে সামাগুরিতে চললাম যেখানের মুখোশ সারা দেশে বিখ্যাত। সারা রাস্তায় আলো বলতে গাড়ির আর উল্টোদিক থেকে আসা দু’-একটা মোটর বাইকের। আকাশে অবশ্য কাটা চাঁদ ছিল আর রাস্তার গায়ে মিসিং জনজাতির বাড়ির লণ্ঠনের আলো। প্রায় ঘণ্টাখানেক যাওয়ার পর দু’-সারি লম্বা গাছের মাঝে একটা হ্যাজাক লাইট দেখা গেল। জনাপাঁচেক তরুণ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা আমাদের কুশকান্ত দেব গোস্বামীর বসার ঘরে নিয়ে গেল। লম্বা, ফরসা আর ছিপছিপে একজন মানুষ। বয়স ৮৬ বছর। বললেন, কিছুদিন কানে কম শুনছেন। ঘরের চারদিকে মুখোশ ঝোলানো। রাবণ, পূতনা, জটায়ু, হনুমানের মতো রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের নানা চরিত্রের মুখোশ। শঙ্করদেব যে ভাওনা নাটক রচনা করেছিলেন সেখানে এই মুখোশের ব্যবহার হয়। লম্বা, মাঝারি ও ছোট মুখোশের মাঝে কুশকান্তের মুখ চোখে পড়ল। একটি বাঁধানো ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি সঙ্গীত-নাটক অকাদেমি পুরস্কার গ্রহণ করছেন। তাঁর কাছে অনেকেই শিখতে আসেন। মুখোশ তৈরির যে-ধারার সূচনা করেছিলেন শঙ্করদেব, তা তিনি প্রায় ৫০০ বছর পরেও বহন করে চলেছেন।

পরের দিন সকালে ফেরিঘাটে এসেছি যোরহাটে ফিরে যাব বলে। দেখলাম বেশ কিছু মানুষ লঞ্চ ধরার আগে খাওয়াদাওয়া করছে। চোখে পড়ল মাঝারি মাপের অক্ষরে লেখা একটি নাম– প্রভু হোটেল। মালিককেও দেখলাম। কাছে গিয়ে বললাম, গতকালের গান শুনেছি। খুব ভালো লেগেছে। নাম জিজ্ঞেস করলাম, আর সেইসঙ্গে সংসারের খবর নিলাম। বললেন, নাম বিরেচন দাস। বাড়ি হোটেলের পিছনের চাষের জমিগুলো ছেড়ে যে খোয়াহোলা গ্রাম, সেখানে। সংসারে বউ, বড় ছেলে ও তার বউ ও ছেলেমেয়ে আর ছোটছেলে আছে। সামান্য যা জমি আছে, তার চাষের কাজ বড় ছেলে করে। ছোট ছেলে পড়াশোনা করেছে কিন্তু সরকারি চাকরি পায়নি। হোটেলের কাজে হাত লাগায়। বিরেচন আমার খোঁজখবরও নিলেন। বললেন আবার মাজুলিতে আসতে। কয়েক বছর পর ২০১৬-তে দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম মাজুলিতে। সেবারও দেখা হয়েছিল বিরেচন দাসের সঙ্গে।
লঞ্চের হর্ন বেজে উঠল। ডাঙা ছেড়ে জলে ভাসলাম। লঞ্চ চলতে শুরু করল। প্রভু হোটেল চোখের বাইরে চলে গেল। এক সময় কমলাবারি ঘাটও ঝাপসা হয়ে গেল। চোখের সামনে শুধু জলস্রোত আর মাথার উপর দূরবিস্তৃত আকাশ। মাজুলির তিনজন মানুষের মুখ মনের চোখে ভাসতে লাগল। প্রথম মানুষটি হলেন নারায়ণচন্দ্র গোস্বামী– যিনি ছোট সংসার ছেড়ে এসে বড় সংসারে বসত করছেন। অসমের নানা অঞ্চলে ভাগবত পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শোনাতে যান। প্রচার করেন শঙ্করদেবের বৈষ্ণবধর্মের দাস্যভাব ও সমস্ত প্রাণের মধ্যে ঈশ্বরের স্থিতির কথা। কুশকান্ত সংসারী মানুষ আর মুখোশের মাধ্যমে প্রাচীন একটি নাট্যধারাকে বহমান রেখেছেন। বিরেচন দাস প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক নানা বিপর্যয় দেখেছেন, তবু শঙ্করদেবের একটি প্রার্থনা সংগীতকে অবলম্বন করে জীবনের নৌকা বেয়ে চলেছেন। আর এই তিনজনকেই ধারণ করছে মাজুলি দ্বীপ। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান আর সেইসঙ্গে মনের রসদের জোগানও দিচ্ছে।
…………… মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ১। রাজা নয়, টুনটুনির গল্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved