Robbar

মহানগরের মধ্যবিত্তের তত্ত্বতালাশ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 4, 2026 5:18 pm
  • Updated:May 4, 2026 5:18 pm  

‘একটা ছোটো ঘটনা, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে অনেকগুলি মানুষ। তাদের ভিতরের চরিত্র দেখতে পেল সেই অদৃশ্য মানুষ … এই অদৃশ্য মানুষটি হলেন ঔপন্যাসিক। তাঁর দৃষ্টি চতুর্দিকে, এবং চতুর্দিক থেকে তিনি একজনকেই দেখেন … আমি ভিতরের মানুষকে বের করে আনতে চাই। গোটা মানুষটাকে।’ ১৯৮৫ সালে ‘আনন্দ’ থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘উপন্যাস সমগ্র’-এর ভূমিকায় রমাপদ চৌধুরীর এই কথাগুলির মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসে তাঁর প্রিয় রূপকও– ‘ডুবুরির মত সমুদ্রে ডুব দিয়ে রহস্যময় ভিতরের মানুষগুলোকে সে (ঔপন্যাসিক) বের করে আনলো অতল অন্ধকার থেকে।’

উমা চট্টোপাধ্যায়

কলকাতার এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় নিরুদ্দেশ হলেন অধ্যাপক শশাঙ্কশেখর, আর তাঁর পরিবারে এতদিনের আপাত-স্থিতি নষ্ট হয়ে শুরু হল অনুমান, সংশয় আর অবিশ্বাস মেলানো একটা আলোড়ন। রমাপদ চৌধুরীর ‘বীজ’ উপন্যাসটি (১৯৭১) ফিরে পড়তে গিয়ে ভাবছিলাম, সাতের দশকের সেই কলকাতা, আজকের মহানগরের সঙ্গে সবটা মেলাতে পারি না ঠিকই, তবে ওই নিখোঁজের উপলক্ষে মধ্যবিত্ত নগর-মানসেরই একটি তত্ত্বতালাশ সম্ভব হয়ে উঠছিল কাহিনির পরতে পরতে। আমাদের নাগরিক অস্তিত্ব যেন লেখকের আতশকাচের তলায়, তিনি দেখছিলেন কীভাবে স্বাচ্ছল্যের মোড়ককে আমরা ‘সুখ’ বলে চিনতে চেয়েছি, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছি আমাদের যাবতীয় ‘সামাজিক সম্মান’, আমাদের ‘ভালো-থাকা’। প্রায় ৫৫ বছর পরেও, এই উপন্যাস কি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আয়নার সামনে?

রমাপদ চৌধুরী

ইতিহাসের অধ্যাপক হারিয়ে গেলেন প্রথম পরিচ্ছেদেই, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শুরু হচ্ছে ‘শশাঙ্কশেখর আর ফিরে এলেন না’ দিয়ে; তিনি উপস্থিত থেকে আর না থেকেও (দ্বিতীয় থেকে দশম বা শেষ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত) মধ্যবিত্তের ‘সুখ’ নিয়ে প্রচলিত মিথের যেন একটা বিনির্মাণ সম্ভব করে দিলেন। ফ্ল্যাশব্যাকের সূত্রেই দেখে নিচ্ছি, স্ত্রী, তিন তরুণ সন্তান নিয়ে অধ্যাপকের পরিবার মধ্যবিত্তের মাপের মধ্যেই আরও একটু স্বচ্ছলতার আকাঙ্ক্ষায় বাঁচে, আরও একটু ‘স্মার্ট আর ঝকঝকে’ করে নিতে চায় জীবন, বাকিদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই। তাঁর নিজের মগ্নতা পুরনো ইতিহাসের চর্চায়, এই ভাবনা থেকে যে জ্ঞান আর বোধের যে অর্জন কোনও সভ্যতাকে চিহ্নিত করে, তার বিনাশের ‘বীজ’ সূচিত হয় যখন বস্তগত আড়ম্বর তার থেকেও বেশি ‘দামী’ হয়ে ওঠে সমাজের চোখে। সামান্য উপকরণের জীবনে তাঁর ‘সম্পদ’ পুরাতাত্বিক লিপির সংগ্রহ; তিনি পাঠ করে নিতে চান বিনষ্ট সভ্যতার সেই ইতিহাস, সংস্কৃতি, যা ভ্রুক্ষেপহীন মানুষের স্মৃতি থেকে তখনই হারিয়েছে, আর এখনও আমরা সেটাই উপেক্ষা করে বৈভবের জন্য ছুটছি। উপন্যাসটির প্রায় বছর চারেক আগের কবিতায় ব্যক্তিগত আর সমষ্টিগত মানুষের যা-কিছু কষ্টসাধ্য অর্জন, ইতিহাস থেকে যা-কিছু শিক্ষা, উপলব্ধি, সব নিয়ে উদাসীন, আত্মচিন্তায় ব্যস্ত এই আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্ব নিয়ে আক্ষেপ, বেদনায় শঙ্খ ঘোষ বলে উঠেছিলেন, ‘আর সব ধ্যান ধান নষ্ট হয়ে যায়।’ (‘ইট’: নিহিত পাতালছায়া, ১৯৬৭) ওই ‘ধ্যান’ আর ‘ধান’ উপেক্ষা-করা, বাইরের জৌলুসে ডুবে-থাকা দিশাহীন মধ্যবিত্ত সমাজকে চিহ্নিত করছিলেন অধ্যাপকও।

শঙ্খ ঘোষ

দুই স্বরের দ্বৈধ চিনে নিতে পাঁচ দশক পরেও অসুবিধা হয় না আমাদের। অধ্যাপক, তাঁর ইতিহাস-লগ্নতা নিয়ে, নগর-সভ্যতার বিনষ্টির পাঠ নিয়ে, চিন্তাগত ভাবেই থেকে যাচ্ছেন মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন, তিনি ‘অপর’। তাঁর আক্ষেপ ‘কোনটা দামী আর কোনটা দামী নয় আজ আর কেউ চিনতে পারছে না, ভাবছে এটাই বুঝি সভ্যতা’– নাগরিক পণ্যসংস্কৃতির একেবারে বিপরীত মুখ দেখায়। আদতে তাঁর দৃষ্টি অনাগত কালের দিকে, যখন বহিরঙ্গের সাজ নয়, মেধা-চর্চাই হয়ে উঠবে সভ্যতার সারসত্য। স্ত্রী সুধাময়ী, তিন সন্তান অমরেশ, রুমা, ঝুমার মধ্যে এই মুহূর্তের ‘ভালো-থাকা’ নিয়ে উদ্বেগ, ধনী আত্মীয়-প্রতিবেশীর পাশে অধ্যাপকের অনুজ্জ্বল উপস্থিতি নিয়ে, ভাড়া বাড়িতে শৌখিনতার অভাব নিয়ে তাদের ‘সামাজিক লজ্জা’। এই-যে মধ্যবিত্তের ইচ্ছা আর সাধ্যের মধ্যে টানাপোড়েন, বাকিদের সাপেক্ষে নিজের সামাজিক অবস্থান যাচিয়ে নেওয়ার ভাবনা, এর শিকড়ে আমাদের নিজেদেরই ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’ চিনে নিচ্ছি নির্ভুল। মনে পড়ে যাচ্ছে, বছর ২০ আগে দেখা টিভি কোম্পানির সেই ফোমো-ওসকানো বিজ্ঞাপন– ‘প্রতিবেশীর ঈর্ষা, মালিকের অহংকার’!

…………………………
স্ত্রী সুধাময়ী, তিন সন্তান অমরেশ, রুমা, ঝুমার মধ্যে এই মুহূর্তের ‘ভালো-থাকা’ নিয়ে উদ্বেগ, ধনী আত্মীয়-প্রতিবেশীর পাশে অধ্যাপকের অনুজ্জ্বল উপস্থিতি নিয়ে, ভাড়া বাড়িতে শৌখিনতার অভাব নিয়ে তাদের ‘সামাজিক লজ্জা’। এই-যে মধ্যবিত্তের ইচ্ছা আর সাধ্যের মধ্যে টানাপোড়েন, বাকিদের সাপেক্ষে নিজের সামাজিক অবস্থান যাচিয়ে নেওয়ার ভাবনা, এর শিকড়ে আমাদের নিজেদেরই ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’ চিনে নিচ্ছি নির্ভুল।
…………………………

শশাঙ্কশেখর যে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হলেন শহরের পথে, একে এই পণ্য-শাসিত ব্যবস্থায় একটা প্রত্যাঘাত হিসেবে দেখব কি না, আমরা ভাবতে থাকি; হয়তো এ-ও এক এসকেপ রুট, অন্য বিকল্প না পেয়েই। তবে মানতেই হবে, অধ্যাপকের নিরুদ্দেশই খুলে-মেলে দেখিয়ে দিচ্ছে নাগরিক জীবন-চর্যায় একদিকে বস্তুগত প্রাচুর্যের দিকে ঝোঁক, অন্যদিকে জ্ঞানের চর্চায় অনাগ্রহ, যা এক অর্থে কালের ক্ষয়-চিহ্ন। ’৭১ সালে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘অর্জুন’ যখন উদ্বাস্তু পরিবারে আত্মপরিচয়ের জন্য লড়াইয়ের কথা বলে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পারাপার’ ছুঁয়ে গিয়েছিল অপরাধবোধ, আধ্যাত্মিক উত্তরণ। ক্রমাগত বাইরের চটক বড় হয়ে উঠছে, ভোগ আর পণ্যের জন্য কাতরতা ভুলিয়ে দিচ্ছে সংস্কৃতির অর্জন– নাগরিক মধ্যবিত্তের এই ক্রাইসিস চিনিয়ে দিচ্ছিল রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস। সাতের দশকের শুরুর রাজনৈতিক উত্তাপ তাঁর লেখায় প্রায় নেই, তবে সেই ভাঙন আর ক্রান্তি মেলানো কাল-পর্বে মধ্যবিত্তের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানের যে অস্থির অদল-বদল, ‘সোশাল ক্লাইম্বিং’ অথবা ‘আপওয়ার্ড মোবিলিটি’-র দিকে যে ঝোঁক, তার সবটা ছেনে ছেনে দেখেছেন তিনি।

ভিতরে-বাইরে আমূল বদল নিয়ে, ৫৫ বছর আগের সেই কলকাতা এখন আবছা অ্যালবাম, রাস্তায় ডবলডেকার বাস অথবা দশ টাকায় ‘অনেক দূর চলে যাওয়া যায়’, সেই সময়টা ইতিহাস; তবে মধ্যবিত্ত নাগরিকের অস্তিত্ব ঘিরে যে-দ্বন্দ্বের পরিসর দেখছিলেন রমাপদ, তার দেশ-কাল নেই। একদিকে, ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিপার্শ্বের একটি অনিবার্য সংঘাত তৈরি হচ্ছে। তাঁর ‘লজ্জা’ উপন্যাসে রেণু নিজের গোপন ভালোবাসা লুকতে লুকতে মানসিক স্থিতি হারায়, আর মানসিক ‘অসুস্থতা’ নিয়ে প্রচলিত সামাজিক নির্মাণ, গোপন ভয়, ‘নেগেটিভ স্টিরিওটাইপস’ উঠে আসে। শশাঙ্কশেখরও তাঁর কঠিন শিলালিপির পাঠ নিয়ে হয়ে উঠছিলেন একা, নিজেই বাকিদের চোখে যেন দুর্বোধ্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন! অন্যদিকে, চরিত্রের অন্তঃশায়ী স্ববিরোধ। অমু জানত, অধ্যাপক তাঁর পুরাতত্ত্বের সাধনা নিয়ে ‘অন্যরকম’ মানুষ, ‘তিনি ঘরের কোণে বসে কী খুঁজে চলেছেন যা আগামী যুগের কাজে লাগবে’। তবে ‘আর পাঁচজনের মতো তো হতে হবে। তা না হলে কেউ তোমাকে দাম দেবে না। জ্ঞান কিম্বা গুণের কোন দাম নেই, যদি না টাকার অঙ্কে তোমার বিলাস বৈভবে প্রমাণ করতে পারো।’ আত্মদর্শনে আমরা কেঁপে উঠি প্রায়!

‘একটা ছোটো ঘটনা, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে অনেকগুলি মানুষ। তাদের ভিতরের চরিত্র দেখতে পেল সেই অদৃশ্য মানুষ … এই অদৃশ্য মানুষটি হলেন ঔপন্যাসিক। তাঁর দৃষ্টি চতুর্দিকে, এবং চতুর্দিক থেকে তিনি একজনকেই দেখেন … আমি ভিতরের মানুষকে বের করে আনতে চাই। গোটা মানুষটাকে।’ ১৯৮৫ সালে ‘আনন্দ’ থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘উপন্যাস সমগ্র’-এর ভূমিকায় রমাপদ চৌধুরীর এই কথাগুলির মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসে তাঁর প্রিয় রূপকও– ‘ডুবুরির মত সমুদ্রে ডুব দিয়ে রহস্যময় ভিতরের মানুষগুলোকে সে (ঔপন্যাসিক) বের করে আনলো অতল অন্ধকার থেকে।’ আশ্চর্য নয় যে শেষ পর্যন্ত অমুও যেন দেখতে পেয়ে যায় শশাঙ্কশেখরের ‘ভিতরের মানুষ’-কে– ‘বাবার ছিল একটা আইডেন্টিটি, একটা পরিচয়। ওই পোড়া মাটির বাই-লিঙ্গুয়াল সীলের মতোই, বাবার বুক-শেলফের খোপে যেটা ঠিক তেমনি ভাবেই মা সযত্নে রেখে দিয়েছে… এই স্মৃতি-ভ্রংশ সভ্যতাও বাবার মতো মানুষদের পড়তে পারে নি।’ সুধাময়ী এতদিন জেনেছেন একটা দামি ফ্ল্যাট না থাকলে সম্মান নেই, এখন বোঝেন ‘আসল দামী জিনিসটা না থাকলে এ-সব অর্থহীন হয়ে যায়’। এই স্বীকৃতি হয়তো অবধারিতই ছিল; শশাঙ্কশেখরই মনে করিয়ে দিলেন আমাদের জীবন এখন শিকড়ে অলগ্ন, বিপন্নতারও ‘বীজ’ সেইখানে।

‘মানুষ তো এই প্রথম সভ্য হয়ে ওঠেনি। অ্যাসিরিয়া, ঈজীপ্ট, ব্যাবিলন, এক একটা দেশ এক এক সময়ে সভ্যতার শিখরে উঠেছে এবং ধ্বংস হয়ে গেছে। কেন? কেন? কারণ, সভ্যতার বাইরের চেহারাটাই শেষে সমাজের চোখে বড় হয়ে উঠেছিল। তার মূল শক্তিটা কোথায়, তা জানতেও চায় নি। একটা শহর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েও কোন সভ্যতাকে কেউ ধ্বংস করতে পারে না, তার ধ্বংসের বীজ তার নিজেরই মধ্যে থাকে।’ অধ্যাপকের কথাগুলি আবার ভাবাচ্ছে− তাঁর এই বিশ্বাস যে বাইরের চমক, চটক নয়, কেবল জ্ঞান আর গুণের সমাদরই কোনও সভ্যতার বিনষ্টি রুখে দিতে পারে, আর প্রাচীন লিপির পাঠ উদ্ধার করে স্মৃতি আর শ্রুতি থেকে লুপ্ত জ্ঞান, গুণেরই উজ্জ্বল উদ্ধারের স্বপ্ন যে তিনি দেখেছেন, এই সবটার মধ্যে কি আমাদের প্রতিদিনের আত্মসন্তুষ্ট ‘ভালো-থাকা’ নিয়ে গূঢ় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে?

বৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়ে এই উপন্যাস বৃষ্টি দিয়ে শেষ হয়, যেন এক বৃত্তই সম্পূর্ণ হল। অধ্যাপকের আক্ষেপ ছিল, যা কিছু ‘দামী’ সব ফেলে দিয়ে যা মূল্যহীন, তাকেই জড়ো করে চলেছি আমরা, সেই আমাদের ‘সুখ’-এর উপকরণ অথবা উপকরণের ‘সুখ’, তারই জন্য আমাদের রুদ্ধশ্বাস ছোটা। বিজ্ঞাপন এখন আমাদের মুখ ঢেকেছে, জীবন পণ্য-তাড়িত, তাই আরও বেশি করে, প্রায় বেদনাদায়ক ভাবেই, তাঁর আক্ষেপ কি সত্য হয়ে উঠছে মনে হয়? ফিরে আসি শঙ্খ ঘোষের সেই ‘ইট’ কবিতায়− ‘নষ্ট হয়ে যায় প্রভু, নষ্ট হয়ে যায়!/ ছিল, নেই, মাত্র এই; ইটের পাঁজায়/ আগুন জ্বালায় রাত্রে দারুণ জ্বালায়/ আর সব ধ্যান ধান নষ্ট হয়ে যায়।’ অধ্যাপক যেন সেই লুপ্ত ধ্যান আর ধানের সন্ধান জাগিয়ে দিয়ে গেলেন।