


আমি ফোন করলাম। উনি বলতে শুরু করলেন, ‘তোমরা এত সংখ্যা করছ, এত ভালো ভালো কাজ করছ, তোমরা কেন গুড় নিয়ে সংখ্যা করবে না?’ গুড় নিয়ে সংখ্যা হয়েছিল আমাদের, সামনের জানুয়ারি মাসেই। আইডিয়া ছিল সম্পূর্ণ টুটুবাবুর। সংখ্যার নাম ‘নলেন’। তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা খেজুড় রস পাড়ার ছবি ছিল রোববার-এর সেই প্রচ্ছদে।
আমি বড় হয়েছি উত্তর কলকাতায়। টিপিকাল মোহনবাগান সাপোর্টার বলতে যা বোঝেন, আমি ঠিক তাই। ফলে, টুটুবাবুর সঙ্গে সমগ্র বাঙালির যেভাবে পরিচয়, আমার পরিচয়ও সেই একই পথ ধরে। ‘ময়দান’ বলতে তখন তো একটা লোকেরই নাম বুঝতাম। ময়দানে বয়স কিছু কম হল না, কিন্তু আজ অবধি যেসব বর্ণময় চরিত্র এসেছেন, টুটুবাবুর মতো আর কখনও কাউকে দেখিনি।

বলতে দ্বিধা নেই, তিনি আমাদের কাছে ‘মসিহা’। জানতাম, দলবদলের পর কোনও প্রতিভাবান ফুটবলার যদি আমরা না-পাই, টুটুবাবু তাঁকে ঠিক মোহনবাগানে নিয়ে আসবেন। এই মোহনবাগানের নিয়ে আসার যে পদ্ধতি, তা এতই নিখুঁত, এত আকর্ষণীয় যে, সেই সংবাদপত্র খুলে সবার আগে সেই খবরগুলোই পড়তাম।
ইস্টবেঙ্গলে সেসময় ছিল জীবন-পল্টু। একসঙ্গে যাঁদের বলা হত ‘জীপ’। আর মোহনবাগানে ছিলেন এই একজনই, সবথেকে তুখড় অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার– টুটু বোস! ফলে কাগুজে ‘খবর’ পড়তে পড়তেই, টুটুবাবুকে সামনাসামনি না-চিনলেও একরকমের আলাপ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা কট্টর ইস্টবেঙ্গল সমর্থক– মোহনবাগানকে নিয়ে নানা টোন-টিটকিরি, কটু কথা বা গালিগালাজ করতেন– তাঁরাও কিন্তু একবাক্যে মেনে নিতেন যে, এই ভদ্রলোকের একটা ক্যারিশমা আছে– তিনি না-থাকলে মোহনবাগান করতেই পারত না কিছু!

ছেলেবেলার খেলাগুলো এখনও স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে। খেলোয়াড়দের ছবি কেটে দেওয়ালে লাগাতাম। ফলে খেলার একটা ইতিহাসের সঞ্চয় দেওয়াল জুড়ে গড়ে উঠেছিল। সেই সূত্রেই মনে হয় যে, যদি কোনও ‘মাস্টার-স্ট্রোক’ খেলে থাকেন টুটু বোস, তা হল চিমা ওকেরিকে নিয়ে আসা। চিমা ওকেরি কলকাতার ময়দানে আসার পর বাংলার ফুটবলের চালচিত্রটাই গেল বদলে! বিদেশি খেলোয়াড়দের আসা, তাঁদের খেলাধুলো, ট্রেনিং– খেলার দুনিয়ায় এই আন্দোলনটাই শুরু হয় চিমা ওকেরি আসার পর। প্রথম কিছুদিন মহামেডানে, তারপর ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলেছিলেন চিমা। কিছুদিন পরই টুটুবাবু তাঁর নিজস্ব দক্ষতায় মোহনবাগানে ডেকে নিলেন তাঁকে। মোহনবাগান সমর্থকরা প্রত্যেকেই জানতেন, মোহনবাগানের ‘বাধা’ বলে কিচ্ছু নেই। টুটুবাবু আমাদের ‘মুশকিল আসান’। মোহনবাগান সমর্থক হিসেবে আমারও এই ভরসা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
একটা সময় এল, খেলা থেকে যখন অনেকটাই দূরে চলে এসেছি। কাজ করছি ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রে। কিন্তু যুগান্তরের বহু সমস্যা! কিছুটা অর্থনৈতিক, কিছুটা ম্যানেজমেন্টের। সেই সময় সংবাদপত্রের জগতে খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল ‘সংবাদ প্রতিদিন’। সংবাদ প্রতিদিন বাজারে আসার পর, যুগান্তরের কর্মচারীদের একটা বড় অংশ সংবাদ প্রতিদিনে এসে পড়ে টুটুবাবুর হাত ধরে। তখন কাগজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন টুটুবাবু। খেলার মাঠের দরাজদিল মানুষ, হাসিঠাট্টায় মাতিয়ে রাখেন চারপাশ, তিনি যে সংবাদপত্রের জগতে এসে পড়বেন, কেউ বুঝতেই পারেনি! খেলার মাঠেও তিনি যেরকম একমেবদ্বিতীয়ম ব্যবস্থাপক, সংবাদপত্রের জগতেও কিন্তু টুটুবাবু সাংবাদিকতার একটা দুরন্ত সময়কে তৈরি করেছিলেন।

তখন সংবাদ প্রতিদিনের অফিস রাধানাথ চৌধুরী লেনে। গুটি গুটি পায়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। ‘ট্রেনি জার্নালিস্ট’ হিসেবে যদি কোনও কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এ-ব্যাপারে কথা হয়েছিল জয়ন্ত চক্রবর্তীর সঙ্গে। জয়ন্তদা বলেছিলেন, ‘এক্ষুনি কোনও রিকোয়্যারমেন্ট নেই।’ ব্যাজার মুখ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম আমি। অনেক বছর বাদে, ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর দফতরে আলাপ হল সৃঞ্জয় বোস ও নীলাঞ্জনা বোসের সঙ্গে। ভেতর ভেতর তখন একটাই মাথায় ঘুরছে– টুটু বোস! সংবাদ প্রতিদিনে যখন কাজ করতে এলাম, তখন এই সবক’টা স্মৃতিই খুব জ্যান্ত।
‘রোববার’ পত্রিকা শুরু হয় যখন, তখন পুরোটা দেখত সৃঞ্জয়ই। সঙ্গে অবশ্যই ঋতুদা– ঋতুপর্ণ ঘোষ। আমাদের ছোট্ট টিম। কিন্তু অলক্ষে যাঁর একটা স্পষ্ট প্রশ্রয় ছিল, যাঁর নাম ঘন ঘন আলোচনায় উঠে আসত, তিনি টুটু বোস।

রোববার-এর কিছু সময় গড়িয়ে গিয়েছে। লোকজন ভালো-টালোও বলছে। সেসময় একদিন টুটুবাবু আমাদের খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘মেনল্যান্ড চায়না’য়। লাঞ্চে। সৃঞ্জয় ছিল, রোববারের ছোট্ট টিমটা তো ছিলই। সেই দুপুরে রোববার সম্পর্কে যা বলেছিলেন টুটুবাবু, তা শুনে সকলেই বিস্মিত হয়েছিলাম। স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনার জন্য উৎসাহ তো দিয়েছিলেনই, পাশাপাশি ওঁর কথা শুনেই বুঝতে পারা যাচ্ছিল খুব মন দিয়ে পত্রিকাটা ধারাবাহিকভাবে পড়েন। শুধু উনি নয়, ওঁর স্ত্রী-ও ছিলেন রোববার-এর নিয়মিত পাঠক।
অফিসের হরেক কাজের মধ্যে, মাঝে মাঝে টুম্পাইয়ের (সৃঞ্জয় বোস) ডাক পড়ত। বলত, ‘বাবা একটা স্টোরির জন্য তোমার সঙ্গে কথা বলবে। তুমি একটা ফোন করো।’ আমার সঙ্গে কথা বলবেন নাকি টুটুবাবু! একথা ভেবেই কেমন একটা টেনশন শুরু হত। কিন্তু আমি নিরুপায়। ফোন করলাম। উনি বলতে শুরু করলেন, ‘তোমরা এত চমৎকার সব সংখ্যা করছ, তোমরা গুড় নিয়ে সংখ্যা করবে না কেন?’ গুড় নিয়ে আস্ত একটা সংখ্যা হয়েছিল আমাদের, পরের জানুয়ারি মাসেই। টুটুবাবুর আইডিয়ায়। সংখ্যার নাম ‘নলেন’। তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা খেজুর রস পাড়ার ছবি ছিল রোববার-এর সেই প্রচ্ছদে।

টুকরো টুকরো এমন কত স্মৃতি। পয়লা বৈশাখের দুপুরে, লি রোডের অফিসে বিস্তর খাওয়াদাওয়া হত ক’বছর আগেও। মধ্যমণি ছিলেন টুটুবাবুই। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সক্কলকে খাওয়াতেন। যদিও আমার মতো পেটরোগা বাঙালির জন্য ব্যাপারখানা একটু চাপেরই! নিরন্তর ‘ওটা নাও’, ‘এটা কেন কম খেয়েছ’– এইসব বলে-টলে খাইয়ে ছাড়তেন! অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ানোর রীতিটাই আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। সত্যি বলতে কী, যে প্রজন্ম এখন বেঁচে আছে, তারা আলগাভাবেই বাঁচতে ভালোবাসে। কিন্তু টুটু বোস ছিলেন এমনই একজন মানুষ, যিনি বকতেও পারতেন, একইসঙ্গে অবাধ স্নেহ দিতে পারতেন। সত্যিকারের অভিভাবকের যে-কাজ, সেই কাজটা তিনি করতে পারতেন অনায়াসেই।

শেষ দেখা টুটুবাবুর ৭৮ বছরের জন্মদিনে। বালিগঞ্জের বাড়িতে। একটা গান গাইতে বলেছিলেন। দুরুদুরু বুকে গেয়েছিলাম ‘ভিনদেশি তারা’।
টুটুবাবু চলে গেলেন। মাথার ওপর থেকে ছাতা চলে গেলে, যা হয়, এখন অবস্থা ঠিক সেরকমই। শেষ শোনানো গানের ছেঁড়া পঙ্ক্তির মতো: একলা লাগে ভারি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved